গল্পতে অর্পিতা বোস

আন্ডার সেকশন ফোর নাইনটি এইট এ
ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহেই এত গরম! বারোটা বাজতে চলল আর দেরি করলে লাইন পড়ে যাবে। তাছাড়া আজকে মহিলাদের লাইন বেশি হয় মন্দিরে। সেখানে একটু অসুবিধাই হয় সন্তোষের। কিন্তু উপায় নেই। বয়স তো পঁয়ষট্টি পেরিয়েছে। সাথে হাজারটা রোগ সঙ্গী। তাই এখন আর আগেরমতো সন্ধ্যা পর্যন্ত উপোস থাকতে পারেনা।
নাহ্ আর দেরি করা চলবেনা।
আপনমনে বিড়বিড় করে ঝুড়িটা হাতে নেয়।
ডাব, বেল, ফল, আকন্দ মালা, ধুতরো ফুল বেলপাতা আর তিনটে মোমবাতি গুছিয়ে নেয়। জলের ঘটিটা আনতে ঠাকুর ঘরের দিকে পা বাড়াতে চোখে পড়ে শুভ্রর ছোটবেলার ছবিটা। হাতে তুলে নেয়। পরম মমতায় হাত বোলায়, যেন সেই মাতৃহারা ছোট্ট শুভ্রর গায়েই হাত বোলাচ্ছেন।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে। ওরা তো খোঁজও রাখেনা। কতদিন হলো ছেলে, বৌ নাতির সাথে দেখাও হয়নি। তবে কথা হয়েছিল গত সপ্তাহে। ঠিক কথা না। হুশিয়ারি। ছেলের নামে একতলাটা লিখে দিতে নারাজ হওয়ায় নরমে গরমে অনেকদিন বলছিল। কিন্তু সন্তোষ রাজি হয় নি। ব্যবসার মূলধনের জন্য ছেলের বৌ রুমেলাকে প্রায় নিজের সঞ্চয়ের নব্বই শতাংশ তুলে দিয়েছিল। রুমেলার বুটিক এখন ভালো চললেও কখনও সন্তোষের হাতে কিছু তুলেও দেয়নি। সন্তোষও চায়নি।
কী হবে?
একা মানুষ থাকেন এই দোতলায় আর একতলার ভাড়ায় মোটামুটি চলে যাচ্ছিলো। কিন্তু ঝামেলা শুরু করল শুভ্র হঠাৎই। কিছুতেই বোঝাতে পারলনা শুভ্রকে যে ভাড়ার টাকাটা সন্তোষের প্রয়োজন। আর তারপর গত বুধবারের ফোনে শুভ্রর কথাটা কানে বাজছে এখনও,
“তুমি যদি আমার কথা না মানো তবে কিন্তু ফল ভালো হবেনা।”
আপনমনেই ব্যঙ্গের হাসি হাসে সন্তোষ। এই ছেলের কথা বলার জন্য মানত, পুজো!
হ্যাঁ এই শিবের পুজোও তো মাতৃহারা শুভ্রর জন্যই।
নির্ঘুম কত রাত কেটেছে দুঃশ্চিন্তায় যখন প্রায় দুবছরের শুভ্রর মুখে কথা ফোটেনি। মানসিকভাবে উদভ্রান্ত সন্তোষের সাথে এমনই এক শিবরাত্রির সকালে বাজারে দেখা অসীমের। নিজের মানসিক অবস্থার কথা জানাতেই অসীম সামনের মন্দির দেখিয়ে বলেছিল,
– ভোলেবাবার কাছে মানত কর। বাবা সব ঠিক করে দেবেন।
কোনো ভাবনাচিন্তা না করেই ছুটে গেছিলো মন্দিরে। সেই থেকে শুরু শিবের পুজো। মানত করে ছেলেকে নিয়ে গেছে হরিদ্বার, বিশ্বনাথ মন্দির থেকে নানা শিবমন্দির। সাথে চালিয়েছে স্পিচ থেরাপির মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা।
অবশেষে শুভ্র ভালোভাবেই কথা বলতে পেরেছে। কিন্তু সন্তোষ ছাড়তে পারেনি শিবের পুজো, উপোস এসব সংস্কার।
এসব ভাবনার মাঝেই কানে আসে বেলের শব্দ।
“যাই! ”
উত্তরটা যেন দরজার ওপাশে পৌঁছায়না। বেলটা একটানা বাজিয়ে চলেছে ওপাশ থেকে। বিরক্ত হয়ে দরজা খুলতেই হতচকিত হয়ে যায় সন্তোষ। গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন পুলিশ।
কিছু বলার আগেই অফিসার বলে ওঠেন,
— মিস্টার সন্তোষ মজুমদার। আপনার এগেইনস্টে এফ আই আর করেছে আপনার ছেলের বৌ। আন্ডার সেকশন ফোর নাইনটি এইট এ। বধূ -নির্যাতনের কেস। আপনাকে থানায় যেতে হবে।
কোনো শব্দ খুঁজে পায়না সন্তোষ। মাথাটা টাল খায়। সকাল থেকে উপোসের জন্য হয়তো সুগার ফল করেছে। চোখে অন্ধকার নেমে আসার আগে দেখতে পায় শুভ্রর নামে পুজো দেওয়ার জন্য ফল ফুল ভর্তি ঝুড়িটা…