সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অর্পিতা বোস (পর্ব – ৮)

বৃত্ত
সাত্যকীর এই রোগীদের অনেকেই এখন সামনের বাগানে। তারা অধিকাংশই কোথায় আছেন নিজেরাই জানেন না। এই রিহ্যাবই ওনাদের নিজের ঘরবাড়ি যেন।
বাগানের এক প্রান্তে একটা বালতি আর মগ নিয়ে বসে আছেন স্নেহলতা। রোজই নিয়ম করে থাকেন। তবে ভুলে যান স্নান করেছেন কিনা। অথচ একসময় ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন! সত্যিই একসময় টাকাপয়সার হিসাব রাখা যত্নশীল মানুষটা এখন নিজের যত্নের হিসাব রাখতে পারেন না। তবে স্নেহলতা নিজের নাম, মেয়ের নাম আরও কিছু কথা এখনও ভালো বলতে পারেন। মাসে দুটো ছুটির দিন ওনার মেয়ে নাতনি এলে তাদের চিনতে পারেন। টুকটাক কথাও বলেন নাকি। পুরোনো কথা কিছু মনে আছে। স্নেহলতার মতো রোগীরাও এখানে থাকেন যাদের উপযুক্ত দেখভালের লোকের অভাব। তাছাড়া এই রিহ্যাবের অনেক রোগীকেই বিভিন্ন জায়গা থেকে খুঁজে নিয়ে এসেছে সাত্যকী। তাদের এবং এই রিহ্যাবের কিছু খরচ এভাবে উঠে আসে। যেমন দেবেশবাবু। অদ্ভুত লেগেছিল প্রথম যেদিন দেবেশবাবুর ছেলেকে দেখেছিল সাত্যকী। চেম্বারে উদভ্রান্তের মতো এসেছিলেন । হাতজোড় করে অনুরোধ করেছিলেন দেবেশবাবুকে এখানে রাখার জন্য। ওনাকে দেখে সাত্যকী বুঝেছিল দেবেশবাবুর ছেলেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। অবশ্য পরিস্থিতি কখনও এমন হয়। কাস্টমসের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার দেবেশবাবুর মস্তিষ্কেও তখন ডিমেনশিয়ার শিকড় ছড়িয়েছে গভীরে। সারা দিনরাত এক অদ্ভুত কল্পজগতে বসবাস তখন দেবেশবাবুর। সেই জগতে উনি ভয়াবহ কিছু দেখছেন আর আতঙ্কে চিৎকার করে চলেছেন দিনরাত। কিন্তু ঘরে দেবেশবাবুর ছোট নাতি এই অবস্থায় আতঙ্কিত। ঠাকুরদার এমন ব্যবহার শিশু মনে গভীর প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে প্রতিবেশীরা দেবেশবাবুর ছেলেকে অভিযোগ করছেন রাতে দেবেশবাবুর চিৎকারে অসুবিধার কথা জানিয়ে। সব মিলিয়ে দেবেশবাবুর ছেলে উপায়ন্তর না দেখে সাত্যকীর কাছে এসেছিলেন। সাত্যকী বুঝেছিল এই রোগ শুধুমাত্র রোগীকে নয় দুর্বিষহ করে তোলে রোগীর পরিবারের জীবনকেও। দেবেশবাবু এখন এই রিহ্যাবে নিঃশব্দে যাপন করেন। কোনও শব্দ নেই ওনার মুখে। কৃত্রিম উপায়ে খাওয়ানো হয়, গান শোনানো হয়। আর নার্স হাত-পা ম্যাসাজ করে সচল রাখার চেষ্টা করে। অনেকবার ডাকলে চোখ মেলে তাকান এইটুকুই। মুখে কোনও ভাবান্তর দেখা যায় না। এমনই অবস্থা হয় প্রায় সবার। তবে ব্যতিক্রম আছে। যেমন রুম নম্বর পাঁচকে একদিন সিস্টার অমৃতা বাড়ি ফেরার পথে দেখেই সাত্যকীকে ফোন করেছিল। রাস্তায় নাকি বসে চিৎকার আর কান্নাকাটিও করছিল। পরিচিত কাউকেই খুঁজে পায়নি সিস্টার অমৃতা। সাত্যকী আর রিহ্যাবের স্টাফেরা সবাই জানে অনেকসময় পরিবারের লোকজনও এভাবে ছেড়ে চলে যান রোগীকে। সবার সামর্থ্য থাকে না হয়তো, অথবা এমন রোগী রাখার অনুকূল পরিবেশ থাকে না। নিরুপায় হয়ে রেখে যান অনেকেই। কিন্তু রুম নম্বর পাঁচ এখন আর চিৎকার করেন না। কখনও কখনও এলোমেলো কিছু শব্দ বলেন। যদিও গোটা একটা বাক্য কখনও কেউ শুনতে পায়নি। তবে গান শুনে কখনও হাততালি দেন। রূপসা ওনার কাছে গিয়ে কথা বললে উনি হাসেন। রূপসা না থাকলে বোধহয় এমনভাবে এই রিহ্যাব চালাতে পারত না সাত্যকী। রূপসা শুধুমাত্র নার্স হিসাবে দায়িত্ব পালন করে না। আন্তরিকভাবে পাশে থাকে প্রতিটা রোগীর। রোগীরাও রূপসার সাথে তাদের মনের ভেতরকার কথা আদান-প্রদান করে।
“হাতটা ছাড়ুন..”
রূপসার গলায় চিন্তায় ছেদ পড়তেই সাত্যকী অবাক হয়ে বাগানে তাকায়। রাহুল রূপসার হাতটা আঁকড়ে ধরে হুইল চেয়ারে বসে আছে। রূপসা বিরক্তিভরে রাহুলের থেকে সরতে চাইছে! অবাক হয় সাত্যকী! রূপসা কখনও কোনো রোগীর সাথে এমন বিরক্তিসূচক আচরণ করেনি। কিন্তু আজ!
নাহ্! আজ না সেই সাত মাস আগেও রূপসার ব্যবহারে প্রথম অবাক হয়েছিল সাত্যকী।
রাহুলের কেসটা বুঝিয়ে নিজের চেম্বারে বসেছিল সাত্যকী। হঠাৎই সিস্টার বন্দনা এসে জানায় রূপসা রুম নম্বর সাতে অজ্ঞান হয়ে গেছে। ছুটে গিয়েছিল সাত্যকী। মুখে চোখে জলের ছিটে দেওয়াতে রূপসার তখন জ্ঞান আসে। কিন্তু অদ্ভুত এক আতঙ্ক ছিল যেন চোখেমুখে। বাবার নিখোঁজ হওয়া এবং সারাদিনের ধকলের জন্য হয়তো সাময়িক শরীর খারাপ হয়েছিল। একটু পরে নিজেই রূপসাকে বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে এসেছিল সাত্যকী। তবে অদ্ভুত লেগেছিল রূপসাকে। চোখেমুখে এক অদ্ভুত আতঙ্কের চিহ্ন ছিল। বাড়ি ফেরার পথে কোনও শব্দ করেনি রূপসা।
পরদিন রূপসা এসেই সাত্যকীকে অবাক করে জানিয়েছিল রাহুলের কেসটাতে অন্য কাউকে দায়িত্ব দিলে ভালো হয়। কিন্তু সাত্যকী জানত রূপসার মতো রাহুলের যত্ন আর কেউ রাখতে পারবে না। সেদিন কারণ জানতে চাইলে রূপসা চুপ করে ফিরে গিয়েছিল কাজে। নাহ! কর্তব্যে এতটুকুও গাফিলতি নেই রূপসার। শুধু কোথাও রাহুলের সাথে অন্যান্য রোগীদের মতো একাত্ম হতে পারে না রূপসা।
ক্রমশ…