অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (অন্তিম পর্ব)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
বারবার ফিরে আসি যেন ,
ভাষাজননীর কাছে , টিলা, নদী, শালজঙ্গলে ।
প্রচেষ্টায় ,ব্যর্থতায় ,অপেক্ষায়,
সকাল ও গোধূলির নীড়ে।
হে আমার প্রতি মুহূর্তের স্বাধীনতা ,আমাদের এই দিনলিপি,
এই সব দিনরাত্রির শিলালিপি যেন লেখা হয়।
আঙুলে আঙুল ছোঁয়া দৃষ্টি বিনিময়ে ,
বৃষ্টিতে , রোদ্দুরে আর কবিতার মুগ্ধ জীবনে —
ভালোবাসা যেন ভালো থাকে ।
উন্মনার ফিরে আসাকে ঘিরে যে প্রাণের উৎসব তরঙ্গে তরঙ্গে বয়ে গেল এই দুপুর ও গোধূলির উঠোনে ,তার টানেই যেন অধিবেশন শেষেও অনেকেই থেকে গেল সেদিন, উন্মনাকেও যেতে দিলো না ওরা। । কবিতার আশ্রয়ে কবিতার বন্ধুরা এই ভরসন্ধ্যায় এখন জমাটি আড্ডায় মজে গেছে । উন্মনা, তিথি ,অরুণিমা,বাদলমেঘ ,প্রলয় ,শুভ ,অর্ধেন্দু আর শিমুল ও পারভিন– সবাই। এখন থেকে এই বাড়ি আর অমলেন্দু স্যারের একার বাড়ি নয়। শরতের শেষ সন্ধ্যা দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে এই কবিতা আশ্রয়ের কথা । এই বাড়ি এখন যেন ভালোবাসা আর স্বপ্নে বোনা চাঁদ ও রূপকথার বাড়ি। এই বাড়ির পরিচিত কাজের মানুষটিও আড্ডার অন্যতম সঙ্গী হয়ে গেছে। সেই মানুষটার হাতে মাখা জলে ভেজা মুড়ি ও চপ , সঙ্গে কাপের পর কাপ চা যেন সান্ধ্য মাধুর্য ছড়িয়ে দিয়েছে । হৈ হৈ করতে করতে, অধিবেশন শেষে চলে যাওয়া পাগলা বিন্দাস আবার ঢুকলো তার প্রাণের গান আর দুই কিশোর কিশোরী চন্দন ও কুঁড়িকে নিয়ে — শোনো গুরু,উন্মনাদি যখন স্টেজে কবিতা বলছিলো ,তখন আমার এই ছোটো ফোনেই রেকর্ড করে নিয়েছিলাম। আমার এই ছোট্ট দুজন বন্ধুকে দু একবার শোনাতেই — ও কুঁড়ি, চন্দন , তোরা একবার শুনিয়ে দে । কী আশ্চর্য ! দুটি ছেলে মেয়ে তাদের চিকন গলায় বলে গেল উন্মনার কবিতা ছায়াঘেরা পাঠশালা —
সকলে বলেছে সেই ইস্কুল চাই
বাঁশরি শেখাবে কিশোর কৃষ্ণকালা
সকলে বন্ধু , সবাই সবার ভাই,
আমি তাই গড়ি ছায়াঘেরা পাঠশালা…
সারাদিনের ধকলে অমলেন্দু কিছুটা স্তিমিত। সকলে মিলে জোর খাটিয়ে উন্মনাকে এখানে রেখে দেওয়ায় , বোধহয় বাড়িতে মেয়ের চিন্তায় সেও কিছুটা বিব্রত । তবু সদালাপী শিমুল , পারভিন আর সকলের সঙ্গে সেও হাততালি দিয়ে উঠলো — দারুণ দারুণ ! পারভিন বললো– আচ্ছা কুঁড়ি , চন্দন , তোমরা রবিঠাকুরের ডাকঘর নাটকের কথা জানো ? দেখেছো টিভিতে বা রেডিও নাটকের শুনেছো ?
কুঁড়ি এক গাল হেসে উত্তর দিলো– হ্যাঁ গো জানি । চন্দনই তো ওদের স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশনে ডাকঘর নাটকে অমলের ভূমিকায় অভিনয় করেছে । আমার তো আলাদা স্কুল । সুধা হয়েছে ওদের হেড স্যারের মেয়ে অনন্যা। খুব ভালো লেগেছে অমল , সুধা আর দইওয়ালাকে । দই…দই…ভালো দই…লাজুক চন্দন চুপ। এবারে চন্দনের নীরব ও কুঁড়ির সরব আবদার — আমরা আশেপাশের পাঁচটা গ্রামের ছোটরা এই কবিতার পাঠশালায় কবিতা শিখবো , ছবি আঁকবো , অংক, ইংরেজি ,ভূগোল, বিজ্ঞান না বুঝলে দৌড়ে আসবো তিথিদি আর বাদলদার কাছে। বিন্দাস তাড়াতাড়ি বলে উঠলো–গুরু তুমি ভেবোনা , আমি এদের এসব শিখিয়ে পড়িয়ে এনেছি। পাহাড়ি ঝরনা দেখেছো ? এরা সেই রকমই স্বাভাবিক । শিশুরা আজও মনে আর মুখে এক। ও উন্মনা দিদিভাই , তুমি এবার থেকে মেয়েকে নিয়ে সেই পাগলের পাঠশালায় এসো। আমাদের তোয়া অনেক নতুন বন্ধু পাবে । আস্ত একটা আকাশ পাবে । আমরা এই পাঠশালায় লালন , রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলকে একসঙ্গে চাই। শালবনের দিগন্তে পাহাড় চাই, ছয় ঋতু বারো মাসে মা প্রকৃতির রূপ রূপান্তর দেখে , দুহাত তুলে গেয়ে উঠতে চাই সেই গান।এবার সত্যি সত্যিই বিন্দাস ঘুরে ঘুরে গাইতে লাগলো–বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না, আমি রবো না রবো না ঘরে, বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না। কারোকে বলতে হলো না , সবাই ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগলো। ছোট বড় সবাই সেই নাচে গানে একাকার হয়ে গেলো । অমলেন্দুর মনে হলো, এটা পূর্ববঙ্গের বিখ্যাত ধামাইল গান। তার কন্ঠও গেয়ে উঠলো। উন্মনাও শেষ পর্যন্ত ওদের সঙ্গে গলা মেলালো। ব্যাপক হৈ চৈ আর শরতের শেষ সন্ধ্যাকে হিম রাতের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে , চন্দন আর কুঁড়িকে সঙ্গে নিয়ে বিন্দাস সবাইকে বিদায় জানালো।
মুঠোতে মাখা মুড়ি আর চায়ের কাপ হাতে একটু সরে গিয়ে শুভ, প্রলয়, আর অর্ধেন্দু কী সব যেন জরুরী কথা সেরে নিচ্ছিলো । অরুণিমা হৈ হৈ করে বললো — নো গোপনীয়তা। এখানে সব আলোচনা খোলাখুলি হবে । শুভ প্রাণপণে বললো– না না , আসলে প্রতি সপ্তাহের শেষে আমরা তিনজন কিভাবে এখানে আসবো সেই আলোচনাই করছিলাম। অরুণিমা হেসে বললো — আমি যোগাযোগ রাখবো । অনেক কষ্ট করে প্রুফ দেখা শিখেছি । স্যারের কাছে পেজ মেকআপ আর অন্যান্য জরুরি তালিম নিয়ে প্রেসে দৌড়বো। মনে থাকে যেন , প্রতি মাসে কাগজ বেরোবে।বেরোবেই । অমলেন্দুর খুব ভালো লাগছিল এই স্নিগ্ধ ও সচেতন আলোচনা । একটু থেমে থেমে তিনি বললেন — উন্মনা, তুমি কিছু বলবে না ? উন্মনা যেন লজ্জায় আরো মিশে গেলো। শুধু বলতে পারলো–আপনার কাছে সব শুনবো বলে হাঁ করে আছি। আমি যেভাবেই হোক চেষ্টা করব এখানে নিয়মিত আসতে । একটা কথা আমি বিশ্বাস করি –যে কোনো কাজেই প্রফেশনাল হতে হয়। শ্যাম আর কুল দুটোই একসঙ্গে রাখা যায় না। তবে আমার বাস্তব পরিস্থিতি খুব কঠিন । তাকে মোকাবিলা করতেই হবে । যাই হোক , আমি চেষ্টা করবো স্যার । আপ্রাণ চেষ্টা করবো। অমলেন্দু বললেন — আমি তোমার কাজের সম্পর্কে একশো শতাংশ নিশ্চিত উন্মনা। শুভ ,অর্ধেন্দু ,প্রলয় ,অরুণিমা, তিথি আর বাদল,তোমাদের বলছি , এখানে ধীরে ধীরে একটা প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তুলতে হবে। তরুণ কবিদের কাব্যগ্রন্থ আর কবিতার আবৃত্তি সম্পর্কিত আলোচনা, প্রবন্ধ ,এখান থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হবে। এখানে না এসেও বাংলার তরুণ কবিরা যেন বুঝতে পারে , এটা তাদের আশ্রয় । নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে উত্তর বাংলার একজন বিদগ্ধ সম্পাদক এখানে আসছেন, বাংলায় প্রচলিত ছড়া আর পোস্ট মডার্ন কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে । আমরা সবাই অনেক কিছু শিখবো তাঁর কাছ থেকে। ডিসেম্বর মাসে মেদিনীপুর থেকে দুজন সিনিয়র বাচিক শিল্পী আসবেন ,কবিতার আবৃত্তি ও কণ্ঠচর্চা বিষয়ে ছোটদের ওয়ার্কশপ নিতে। আমরা সবাই সেখানে যোগ দেবো। আমার বন্ধু পাগল বিন্দাস আমাদের নতুন করে যেন বাল্মীকির মা নিষাদ বাণী শুনিয়ে দিয়ে গেলো। আহা, কী অসাধারণ কনসেপশন ! আমাদের লালন, রবি ,নজরুল একসঙ্গে চাই। নিজের গাম্ভীর্য ভুলে প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলেন অমলেন্দু — ঠিক এই কথাটাই তো বর্তমান পৃথিবীর সবথেকে জরুরি শ্লোগান। মুহূর্তের মধ্যেই আবার নিজেকে শান্ত করে বললেন– এরই সঙ্গে চাই একটা লাইব্রেরি , যেখানে শুধু কবিতা নয় , সব ধরনের বই থাকবে। এমনকি স্কুলের পাঠ্য বই পর্যন্ত । শুনে সবাই হাততালি দিয়ে উঠলো। শুনতে শুনতে কবিতার নারী উন্মনা শেষ পর্যন্ত যেন পূর্ণতায় ফুটে উঠলো — আচ্ছা স্যার , আমাদের এখানে মাসে , দু মাসে একবার করে মুক্তচিন্তার আয়োজন করা যায় না ? অমলেন্দু জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকলেন তার দিকে। উন্মনা আবার শুরু করলো — ধরা যাক, একটা কাল্পনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কনসেপশন। চিন্তাবিদ মনীষীদের রচনা থেকে , তাঁদের ভাব ও ভাবনাকে নিয়ে যদি নতুন করে,বারবার আলোচনা করতে চাই আমরা , তাহলে কেমন হয়? অমলেন্দু বিস্মিত হয়ে বললেন — ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলবে ? উন্মনাকে এখন কথায় পেয়েছে। সে বলে চললো — আপনি কনসেপশনের কথা বলছিলেন না স্যার , বিন্দাসদার মতো এটা আমার একটা কনসেপশন । ধরুন, যেখানে অতীতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শের সঙ্গে পরিচয় ঘটবে বর্তমান প্রজন্মের, যেখানে বুদ্ধ ,চৈতন্য ,বিবেকানন্দ, গান্ধীজি , নেলসন ম্যান্ডেলাকে গভীরভাবে জানবো আমরা। যেখানে শেক্সপিয়ার, কিটস, শেলী আর লেনিন, মার্কস, গ্যালিলিও, হকিন্স ,আইনস্টাইন, চে গেভারা আলোচিত হবেন ।পাবলো নেরুদা আলোচিত হবেন । যেখানে ডিরোজিও, রামমোহন, বিদ্যাসাগর আর বাংলার রেনেসাঁ নিয়ে আলোচনা হবে। বাংলা ভাষা আন্দোলনের আদর্শে প্রাণিত হবে নতুন প্রজন্ম। যেখানে ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া আর দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন, যেখানে আনা ফ্রাঙ্কের ডাইরি আর অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট উপন্যাস নিয়ে কথা হবে। তর্কে, বিতর্কে, যুক্তি ও বিশ্লেষণে নতুন করে জেগে উঠবো। আমরা শুনবো ,আমরা নতুন করে শিখবো। আমরা গভীরভাবে ভাববো । ভাবতে ভাবতে সেখান থেকে উঠে আসবে আমাদের নতুন কবিতা। কথাগুলো বলতে বলতে উত্তেজনায় থর থর করে কাঁপছিলো উন্মনা। অতীতের বাগবাজারে, মায়ের ঘাটে বসে শুনবো , মা সারদা আর সিস্টার নিবেদিতার কথা। রামকৃষ্ণদেবের কথামৃত আর সাধক রামপ্রসাদের সঙ্গীত-মুখর অতীতকে এভাবেই না হয় আমরা ফিরিয়ে আনবো ! কখনও মাদার তেরেসার আদর্শের কাছে মাথা নিচু করে বসে থাকবো। একটু থেমে উম্মনা আবার বললো — জানেন , সুস্থ হয়ে উঠে আমার অধ্যাপক স্বামী নিশ্চয়ই এখানে কিছু বলার জন্য আসতে আগ্রহী হবেন। পড়ানোর সাবজেক্টের বাইরে তাঁর ভালোলাগার বিষয়– পৃথিবীর বর্তমান ভৌগোলিক পরিমন্ডল আর জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনের বিপদ ও ভয়াবহ ফলাফল । এ নিয়ে তিনিও নিশ্চয়ই কিছু কথা বলতে চাইবেন আগামী প্রজন্মর কাছে। কবিতার নারী উন্মনা এভাবে নিজেকে বিকশিত করার পর সবার মুখে যেন আশ্চর্য আভা ফুটে উঠলো। নতুন চিন্তার ফসল বুনতে লাগলো সবাই। প্রলয় বললো– আমি দাজ ক্যাপিটাল বুঝতে চাই। শুভ বললো — আমি দুটো বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করতে চাই। আধুনিক ইউরোপ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার কবিতা পড়তে চাই। অর্ধেন্দু বললো– আমি গালিলিও স্যারের দূরবীনে ছায়াপথের কবিতাকে খুঁজতে চাই। তিথি যেন বীণার মতো করে বেজে উঠলো–বাখ, মোৎসার্ট, চাইকোভস্কি আর মিয়াঁ কি মল্লারের তানসেনকে এক ছাতার নিচে পেতে চাই। বাদল তার হাতে হাত রেখে বললো– শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলা আর জার্মানির হুমবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনকে পেতে চাই বুকের মধ্যে । ব্রেখটের অনসম্বল থিয়েটারকেও পেতে চাই একই সঙ্গে। শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্তর কালজয়ী নাট্য প্রযোজনা নিয়ে বিদগ্ধ আলোচনা শুনতে চাই। সিনেমাকে বুঝতে চাই ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, শ্যাম বেনেগালের ভাবনার গভীরে ডুব দিয়ে। শুনতে শুনতে মুগ্ধ অমলেন্দু বললেন–এখানে একটা আলোকিত পৃথিবীর আধুনিক মানচিত্র গড়ে তুলতে চাই। শিমুল বললো — বাল্মীকি আর মাইকেল মধুসূদনের কাছে ছন্দ শিখতে চাই। নদী ,মেঘ, বৃষ্টি ও দিগন্তের কাছে শিখতে চাই কবিতার ধীর, মধ্য ও দ্রুত লয়ের চলন। প্রকৃতির কাছে শিখতে চাই রাগ ও রাগিনী।পারভিন শিমুলের দিকে তাকিয়ে বললো — নেতাজি, মাস্টারদা, ক্ষুদিরাম ,মাতঙ্গিনী, ভগৎ সিং এর কাছ থেকে ভয়হীন পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার মন্ত্র শিখতে চাই । দ্য ভিঞ্চি আর ভ্যানগগের মতো শিল্পীর কাছে তুলি ও কল্পনাকে বুঝতে চাই। অমলেন্দুর বাড়ির কাজের মানুষটা চুপচাপ এতক্ষণ কাপের পর কাপ চা বিলি করছিলো। সে এসে বললো– আমি স্বামীজির পায়ের কাছে বসে উপনিষদ আর গীতার কর্মযোগের ব্যাখ্যা শুনতে চাই। আমিও থাকলাম এই কবিতার আশ্রয়ে। অমলেন্দু আবার বলে উঠলেন–আমরা সবাই থাকবো কন্বমুনির গুরুগৃহ থেকে ম্যাক্সিম গোর্কির পৃথিবীর পাঠশালায়।তারই সুর ধরে বাইরের প্রকৃতি আর ঘরের মানুষেরা একই সঙ্গে বলে উঠলো–জীবন যেন কবিতার মতো সুন্দর হয়। নদী বললো, টিলা বললো , শালজঙ্গলে বারো মাস ছয় ঋতু বললো, ইউরোপ থেকে ফোন তরঙ্গে প্রিয় বন্ধু মেঘলা বললো,পাঁচটা দশটা গ্রামের কচি কৃ্ুঁড়ি , চন্দন ও অমল-সুধারা বললো– জীবন যেন কবিতার মত,সকালের আলোর মতো উদ্ভাসিত হয় ! অমলেন্দুর পরিশীলিত ব্যক্তিত্ব নিশ্চিতভাবে জানিয়ে দিলো–চিররহস্যময় কবিতার জন্মদাতা কবিদের সম্মান দিতে শিখুক এই দুনিয়া। যাঁরা সাম্যবাদী পৃথিবীর কথা বলেন , তাঁরা প্রকৃত অর্থেই কবি। একদিন প্রকৃত কবিকে দেখলে সমাজ সংসার উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাবে । মানুষের জীবনে যাবতীয় সারস্বত ও নান্দনিক চেতনা উঠে আসুক কবির কলমে । কবিতাই শ্রেষ্ঠ উপলব্ধি । স্বেচ্ছাচারিতা আর যাবতীয় সামাজিক দুর্বিপাক যেন কবির সামনে এসে ঔদ্ধত্য মুছে ফেলে। অত্যাচারীর নিষ্ঠুর হাতে কবির মৃত্যু হলে গোটা পৃথিবী যেন প্রতিবাদে ফেটে পড়ে, ঠিক যেমনটা ঘটেছিলো কবি ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকার হত্যাকান্ডের পর। প্রতিটি মানুষের জন্য যেন কবিতাজন্ম ও কবিতার জীবন বেঁচে থাকে।
সেদিন রাতে খাওয়ার সময় বিন্দাসের উপস্থিতি না দেখে অমলেন্দু একটু অবাক হলেন — সবাই মিলে খাওয়ার মুহূর্তটাকে বিন্দাস যদি তার গানের মধ্যে দিয়ে ভরিয়ে দিতো ,তাহলে দিনের শেষটুকু বড় সুন্দর হত যে ।
খাবার শেষে সবাই মিলে আবার ছাদে উঠে এসেছে । শরতের মধ্য রাতের হিম নামছে , রাত সাড়ে এগারোটার এই গ্রামীণ আঁধারে । কাছে দূরের কোনো কিছু হালকা কুয়াশায় না দেখা গেলেও , দূরের জঙ্গল ও টিলার মৃদু শিহরণ যেন উপস্থিত সকলের মধ্যে চারিয়ে গেল । সন্ধে পেরোনো জমজমাটি আড্ডায় কথা ও স্বপ্নের যে উন্মাদনা উঠে এসেছিলো , তা এখন কোজাগরী পেরোনো মুগ্ধ চরাচরের মতো স্তব্ধ । সেই অতল নির্জনতায় ডুবে অমলেন্দু ভাবছেন — তাঁর স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত সফল হতে চলেছে । পরবর্তী প্রজন্মকে তিনি বোঝাতে পেরেছেন , কবিতার দিগন্তব্যপী সৌন্দর্যের কথা । কবিতাজন্মের গুরুত্বের কথা । কবিতার আশ্রয়ের ছায়াময়তার কথা । ঘনিয়ে আসা অন্ধকারের মৌনতাকে সম্মান জানিয়ে খুব আস্তে আস্তে শোনালেন — বিশ্বকবির নৈবেদ্য’র সাতচল্লিশ সংখ্যক কবিতা —
আঘাতসংঘাত-মাঝে দাঁড়াইনু আসি।
অঙ্গদ কুণ্ডল কণ্ঠী অলংকাররাশি
খুলিয়া ফেলেছি দূরে….
কবিতা শেষ করার পরে , নিজের কন্ঠস্বরকে প্রায় অতলে নামিয়ে এনে বললেন —
এই কবিতায় বিশ্বকবি যে সফল চেষ্টা আর নিষ্ফল প্রয়াসের কথা বলেছেন ,সেই আমাদের বীজমন্ত্র হোক। আমাদের সব প্রচেষ্টা হয়তো সফল হবে না , তবু প্রতিটি নিষ্ফল প্রয়াসকে পাশে রেখেই একটার পর একটা মাইলস্টোন পেরিয়ে যাবো। বন্ধুরা, তোমরা মনে রেখো , আমাদের জীবনে সফলতা খুব সহজে আয়ত্তে আসে না । আমাদের মিলিত প্রচেষ্টার ফল ভোগ করবে চন্দন আর কুঁড়িদের প্রজন্ম। তিথি অমলেন্দুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করে উচ্চারণ করলো ,
তার একটি অনন্য স্বপ্নের কথা–
দাদা , আমাদের এই কবিতার উঠোনে একটা মাটির মঞ্চ তৈরি করবো । যেখানে একজন লোকসঙ্গীত শিল্পীর সঙ্গে দেখা হবে একজন চিত্রশিল্পীর । যেখানে ছোটো ছোটো নাটকের দল তাদের নতুন প্রযোজনা নিয়ে মাঝে মাঝেই হাজির হবে । আর সেই নাটকের শেষে , একজন তরুণ কবি গলা তুলে নির্ভয়ে পড়বে তার নতুন কবিতা। একজন রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী গেয়ে উঠবে , তোমার কাছে এ বর মাগি , মরণ হতে যেন জাগি গানের সুরে …
সবাই দেখলো,স্যারের সামনে জানু পেতে বসা তিথির মাথায় অভিভূত অমলেন্দুর আশীর্বাদের হাত । বাকি সবাই অনিবার্য ভাবে ছুঁয়ে থাকলো তিথিকে। শিমুলের হাতে হাত রেখে ,পারভিন বললো — এই কথাগুলো শোনবার জন্যেই তো হাজার হাজার মাইল হেঁটে যাওয়া যায়। শিমুল তোমার মনে হয় না ,আজ আমাদের এখানে আসা সার্থক হল ? শিমুল ছোট্ট উত্তর দিলো — সত্যি ,শুধু কবিতাকেই আঁকড়ে ধরে সাত জন্ম বেঁচে থাকা যায় । বন্ধু তিথির এই কথাগুলোই তো কবিতা মনে হল । ধীরে ধীরে আবছা ঠান্ডা নামছিলো। সবাই যখন সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েছে , উন্মনা হঠাৎ পেছন ফিরে অমলেন্দুর দিকে তাকালো । দৃষ্টিতে অতল গভীরতা,যা মুহূর্তেই তোলপাড় করে দিলো অমলেন্দুর হৃদয় । দাঁড়িয়ে গেলেন তিনি। হিমনামা ছাতের ওপর আধভাঙা চাঁদের দিকে তাকিয়ে, উন্মনা বললো — কবিমন, তুমি কবিতা লিখতে পারো না , এ কথা আমি অতীতেও বিশ্বাস করিনি , আজও করি না। যাঁর মেধা , মন , দৃষ্টির প্রতিটি বিন্দু কবিতার মতো সুন্দর, তিনিই আমার সার্থক কবিমন ; কবির অন্তরে কবি । তবু , তোমার মতো করে কয়েকটা লাইন লিখেছি । শুনবে ?
হৃদয় থেকে উঠে আসা অনিবার্য ইচ্ছেকে সংযত রেখে , উন্মনার একান্ত আপন কবিমন শুধু বলতে পারলো — হ্যাঁ , শোনাও ।
ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে উন্মনা শোনালো তার কবিতা–
নিমগ্নতাই তবে
এই আমাদের দুলকি চালের ঘরসংসার শ্যামলিমা ,
ভালোবাসার গাছ গাছালি ঘেরা ।
আমের ডালে ঝরা পাতার দুপুর বিকেল কাটলে ,
তোমার কাছে , তোমার কাছেই ফেরা ।
এই আমাদের অন্তবিহীন পরিভ্রমণ ,
সারাজীবন পুতুল পুতুল খেলা ;
জানলা কপাট ঘর দালনের আগল পাগল নেই ,
তোমার সঙ্গে ভাঙা রাসের মেলায় ।
প্রাণের আলোয় গান ডেকেছে, বান এসেছে ,
শ্যামলিমা , আকাশের উৎসবে ;
এখনও কি খেয়াঘাটের কড়ি গুনবো ?
তোমার সঙ্গে খেলা শুরুর নিমগ্নতাই তবে !
হাতে হাত রেখে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তারা দেখলো ,ফাঁকা করিডোরে একটা মানুষও নেই । দুটো ঘরে মাথা গুঁজে যে যেমন ভাবে পারে শুয়ে পড়েছে । বারান্দার স্তিমিত আলো , এই কবিতার আশ্রয় , মৃদু হেসে ওদের যেন শুভরাত্রি জানালো।
ঠিক গতকালের মতো , আজও ভোরের আলো ফুটতেই , পাগলা বিন্দাসের ফোন বেজে উঠলো । গুরু ,জানি তোমরা সবাই খুব ক্লান্ত । তবু সবাইকে নিয়ে কালকের মতো ছাদে উঠে এসো । আজ নতুন একটা দৃশ্য দেখাবো। আমি আজকেও ওই আলপথে দাঁড়িয়ে আছি গো । সেই খেজুর গাছের নিচে । দেরি হয়ে যাওয়ার আগে এসো । সকালের আলোয় একটা নতুন দৃশ্য দেখবে। কবিতাজন্মের সবাইকে ডেকে তুলে ছাদে উঠতেই কী দেখলো তারা ? দূরের আলপথের ওপর খেজুর গাছের ঠিক নিচে, বাউলের পোশাক পরা বিন্দাস একরাশ কচিকাঁচাদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । অন্ততপক্ষে কুড়ি পঁচিশ জন কিশোর কিশোরীকে জুটিয়ে এনেছে বাউল বিন্দাস। তারা ছুটোছুটি করছে । দুহাত তুলে নাচছে । ভোরের দিগন্ত আর মাঠ ভরা সবুজের মতো , কবিতার মতো, গুচ্ছ গুচ্ছ ফুলের মতো মনে হচ্ছে তাদের । সেখানে কুঁড়ি, চন্দন , সুধা , অমলেরা একাকার হয়ে গেছে। আলাদা করে কারোকে চেনা যাচ্ছে না । প্রাণের মানুষ বিন্দাস ঘুরে ঘুরে গাইছে–
আমি কান পেতে রই ,ও আমার আপন হৃদয়গহন-দ্বারে
বারে বারে
কান পেতে রই…
ঘুম ভেঙে ওঠা প্রথম সূর্য হাসছে ,ধানের মাঠ হাসছে ,আলপথ হাসছে,আলের ওপর একলা খেজুর গাছ আর দূরের টিলা- শালজঙ্গল ,নদী হাসছে । হাতে হাত রেখে হাসছে কবিতাজন্ম ও কবিতা আশ্রয়ের সকলে। হ্যাঁ , ওরা সবাই বিশ্বাস করে —
জীবন একদিন কবিতার মতো সুন্দর হবে।
সমাপ্ত
(একটি অকপট স্বীকারোক্তি)
আপাতত আমার কথাটি ফুরোলেও নটে গাছটি কিন্তু মুড়োলো না । সম্ভব-অসম্ভব, স্বপ্ন ও কল্পনার এই কাল্পনিক উপন্যাসের প্রথম খন্ডের ইতি টানলাম এখানেই। ইচ্ছে থাকলো , যদি সামর্থে কুলোয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই কাহিনির দ্বিতীয় খণ্ড শুরু করবো । ষাট পর্বের এই উপন্যাসটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার চিন্তন ও দূরভাষ-কথন নিপুনভাবে বুনে তুলেছেন শিক্ষিকা ও প্রকৃত অর্থেই কবিতার মানুষ অনিন্দিতা শাসমল। তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই । কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি টেক টাচ টকের অন্যতম সম্পাদক রাজশ্রী বন্দোপাধ্যায়ের প্রতি ও টেক টাচ টক পরিবারের সকলের প্রতি। সবশেষে ভালোবাসা ও নতজানু শ্রদ্ধা জানাচ্ছি এই উপন্যাসের পাঠক- পাঠিকাদের । শহরে ও গ্রামাঞ্চলে ছয়ঋতু , বারোমাসে সবাই সপরিবারে খুব ভালো থাকুন।
বিনীত
আরণ্যক বসু
১০ এপ্রিল ২০২৪
চৈত্র ১৪৩০