অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৪৬)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
হৃদয়ের যে আঁচলে তোমার গভীর ছায়া ধরি,
আমার হৃৎপিণ্ড,সে তো সেইখানে পড়ে আছে বাঁধা;
তোমাকে জানবো বলে আকন্ঠ পিপাসার্ত থাকি,
এই আমি উন্মনা যুগে যুগে অনিবার্য রাধা!
মঞ্চের উপর উন্মনার হাত থেকে জল নিয়ে পান করতে করতেই অমলেন্দুর মাথাটা কেমন টলে গেল । কেমন যেন ঘোর ঘোর লাগা ভাব । এতক্ষণ একটানা বক্তব্য বলতে বলতে তিনি লক্ষ্য করেছেন , মন্ত্রমুগ্ধ মানুষের শ্রবণের গভীর আর্তি। উপস্থিত কবিরা ভাবতেই পারছিলো না তাঁদের স্যার এমনভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। এবার বৈশাখের শুরুতেই গরমটা জাঁকিয়ে পড়েছে। বেলা সাড়ে এগারোটার সূর্য যেন সমস্ত প্রাণশক্তি নিঃস্ব করে দিচ্ছে। মঞ্চের ধার থেকে পেডেস্ট্রালের হাওয়াও যেন গরমের হলকা ছোটাচ্ছে। এবার প্রতিবাদী অর্ধেন্দু সত্যি সত্যি নার্ভাস হয়ে গেল । সামনে পড়ে থাকা নিজের ব্যাগ থেকে খবরের কাগজ বের করে অমলেন্দুর একটা হাত জড়িয়ে প্রবল বেগে হাওয়া করতে লাগলো উদ্বিগ্ন ও অপরাধী মুখে । অনেকে স্টেজের ওপর উঠে এসেছে । তিথি ও অরুণিমা ব্যস্ত হয়ে পড়লো অমদেন্দুকে নিয়ে । ঠান্ডা মাথার উন্মনা মুহূর্তের মধ্যে কর্তব্য স্থির করে ফেললো।মা মৃত্তিকার প্রেসার ওঠা নামা করে বলে , সে বাড়িতে প্রেসার মাপার যন্ত্র মজুত রাখে। বীরভূমের একজন সিনিয়র কবি মানস পান্ডে পেশায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ব্যাগে কিছু ওষুধ পত্র থাকে। তিনি প্রেসার মেপে একটু উদ্বিগ্ন মুখে বললেন — প্রেসার বেশ কিছুটা লো । বিশ্রাম দরকার। নিশ্চয়ই উনি ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করেন না । সাংবাদিক হিসেবে অতিরিক্ত পরিশ্রম করেন । তাই গরমে প্রেসার ফল করে মাথা ঘুরে গেছে । কথাগুলো অমলেন্দুর কানে কিছুটা ঘোরের মতো লাগছিল । তার মনে হলো ,আমি তো পারবো । এখনও মিনিট পনেরো কুড়ি আমার বক্তব্য রাখা বাকি ছিল । ইশারাতে সে কথা জানাতেই , উন্মনা প্রাণপণে ওঁর দুটো হাত চেপে ধরলো । চোখে উদ্বেগ ও অনুরোধের ছাপ স্পষ্ট । আবছা ঘুম ঘুম ঘোরের মধ্যেও অমলেন্দুর মনে হলো , উঠোনে সজনে গাছের ছায়াটা তাকে বিশ্রাম নিতে বলছে । পাগলা বিন্দাস , বাদল মেঘ আর অর্ধেন্দু ধরাধরি করে ওঁদের স্যারকে উন্মনার ঘরের বিছানায় শুইয়ে দিলো । অমলেন্দুর খুব ঘুম পাচ্ছে । অথচ তার মনে হচ্ছে বিছানাটা তার খুব চেনা । চাদরের গভীর থেকে এক ঝলক নতুন ফুলের গন্ধ এসে যেন তাঁকে অভিভূত করে দিলো । বারবার হাত নেড়ে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন , সব ঠিক আছে । অনুষ্ঠান যেন তার নিজের গতিতে চলে । ডাক্তার মানসবাবু এবার সবাইকে নিয়ে সম্মেলনে ফিরে গেলেন । কবি প্রলয় , শুভ ,বাদল মেঘ , আর অর্ধেন্দু সবাই মিলে চেষ্টা করতে লাগলো পরিস্থিতিটাকে স্বাভাবিক করতে । কেননা , ডাক্তারবাবু জানিয়েছেন , কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে । কবি প্রলয় অবাক হয়ে গেল ঐ সময় অর্ধেন্দু , তিথি ও অরুণিমার তৎপরতা দেখে । প্রলয় ,শুভ ছুটলো রান্নাবান্নার দিকে ,দুপুরের খাবার আয়োজন করতে । তর্কে বিতর্কে, কবিতাপাঠে , গানের কলিতে অনুষ্ঠান আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠছে ক্রমশ ।কিছুটা উদভ্রান্তের মতো অর্ধেন্দু অরুণিমাকে ডেকে বললো — দিদিভাই , আমার বোধহয় এইভাবে ওনাকে আক্রমণ করা ঠিক হয়নি । অরুণিমার পাথরের মতো গম্ভীর মুখ হঠাৎ বদলে গেল এক মুঠো স্নেহে — ভাই , একটা কিছু গড়ে তুলতে গেলে তো মত মতান্তর হবেই । তুমি ভেঙে পোড়ো না । তবে ভবিষ্যতে আমরা প্রত্যেকেই নিজের আচরণ সম্পর্কে আবশ্যই সচেতন হবো। আসলে কি জানো ভাই , কোন পর্যন্ত বলবো আর কোথায় গিয়ে থামবো , সেটার ওপরেই মানুষের ব্যক্তিত্ব নির্ভর করে ।
মঞ্চের ওপর সংগঠনের গঠনতন্ত্র নিমে একটু চাপান উত্তর চলছিল । প্রলয় এসে বিষয়টার হাল ধরলো। ঠিক হলো — কবিতাপাঠ , আবৃত্তি চলতে চলতেই মধ্যাহ্নভোজন চলবে।কবি সম্মেলন শেষ হলে একটা খসড়া কমিটি সকলের অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে । তারপর তিথি ও বিন্দাসের গান দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হবে ।
মাঝ দুপুর পেরিয়ে এখন বেশ গরমের প্রহর। মৃত্তিকার বাড়িতে কোনো এ সি নেই । তবু , ভারী পর্দার , বন্ধ জানলার একটা শান্ত নির্জনতা থেকেই যায় । এই মুহূর্তে প্রায় অন্ধকার ঘরে , অমলেন্দুর শান্ত মুখশ্রী ঘিরে মৃত্তিকা , তিথি আর অরুণিমা ।উন্মনা দধভূজা হয়ে এক সঙ্গে মঞ্চের অনুষ্ঠান আর অতিথি আপ্যায়ন সামলাচ্ছে । একটু ও আর এস গুলে ঘরে ঢুকতেই , তিথি আর অরুণিমা দাঁড়িয়ে উঠে বললো — দিদি তুমি এদিকটা দেখো , আমরা বাইরেটা সামলাচ্ছি । মা মৃত্তিকাও উঠে গেল তোয়াকে খাওয়ানোর জন্য।যাওয়ার সময় তিথি আর অরুণিমাকে দুটো খেয়ে নিতেও বললো । পিছনে ফিরে কিছু একটা বলতে গিয়ে দেখলো , অমদেন্দুর ঘুমন্ত মুখ ঘিরে তার মেয়ের অন্তর্লীন ব্যকুলতা। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো মৃত্তিকা । তারপর ধীরে ধীরে দরজাটা ভেজিয়ে চলে গেল । মায়ের অনুভব দিয়ে আত্মজার আর্তি স্পর্শ করার চেষ্টা করলো । অমলেন্দুর দিকে বেদনার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকা উন্মনা লক্ষ্যও করলো না যে , তার মায়ের ঠোঁটদুটো অস্ফুট উচ্চারণে কী যেন বলতে চাইছে । মায়ের ভাবনা যদি শব্দে রূপ পেত , তাহলে হয়তো এইরকম হতো — যা মেয়ে , তোর স্বাধীন ডানায় যেমন খুশি উড়ে যা । একটা নিশ্চিত ছায়া , অনেকটা আশ্রয় , সবুজে সবুজ অরণ্য তুই নিজেই খুঁজে নে । যা মেয়ে , তুই তোর ভালোবাসার কাছে ফিরে যা ।
যাবার সময় মৃত্তিকা দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে গেল । সেই শব্দ কানে যেতেই লজ্জায় নীল হয়ে যাওয়া উন্মনা দরজার ভারী পর্দার দিকে তাকালো । বাইরের কোলাহল এখন একটু স্তিমিত। অসুস্থ মানুষটার ঘুমন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো , তার কবিমনের দুটো চোখের পাতা খুব সুন্দর । একেই বোধহয় আঁখিপল্লব বলে ! ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলো নিশ্চিত ও অমোঘ একটি কবিতার লাইন —
তুমি আমার বেঁচে থাকা , তুমি আমার খড় ও কুটো ,
তুমি আমার ভূমিকম্পে কুড়োনো চাল দু এক মুঠো ।
আমার ভ্রমণ তোমার কাছে ,আমার ফেরাও তোমার কাছে ,
তুমি আমার দীর্ঘ প্রবাস ,
তোমার জন্য শিমূল পলাশ ।
তোমার জন্য পরের জন্ম , তোমার জন্য না ছাড়া হাল ,
প্রতীক্ষাতে , প্রতীক্ষাতে , প্রতীক্ষাতে
অনন্ত কাল ….
এই মুহূর্তে বাইরের জগৎ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে , কবিতার নারী উন্মনা, কবি উন্মনা , তার উন্মুখ ঠোঁট দুটো নামিয়ে আনলো ঘুমন্ত অমলেন্দুর দুটি চোখের পাতায় । অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে গেলো সেই আলতো ঠোঁটের স্পর্শে। অমলেন্দুর ঘুম ভাঙলো না ।উন্মনা যেন অমলেন্দুর আঁখিপল্লবে চাঁপা ফুলের গন্ধ পেলো । পরক্ষণেই মনে হলো — সকালে তিথি সঙ্গে এনেছিল একগুচ্ছ স্বর্ণচাঁপা। মেয়েদের প্রত্যেকের চুলে গুঁজে দিয়েছিল একটি করে । ঘরের রূপসী অন্ধকারের মধ্যে , সেই গন্ধই ঘুরে ফিরে আসছে । উন্মনা হৃদয় উজাড় করা ফিসফিস শব্দে বললো — আরেকবার তোমার চোখের পাতায় আমার স্পর্শ রাখতে দেবে , কবিমন ?
পাগল মনটাকে অনুভূতির চূড়ান্ত পর্যায়ে এনে , অমলেন্দুর ঘুমন্ত মুখশ্রীর ওপর একটু বেশিই ঝুঁকে পড়েছিল উন্মনা । হঠাৎ একটা শব্দ পেয়ে চমকে দেখলো — দরজার পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়া আত্মজা তোয়ার দুচোখে অবাক বিস্ময় টলটল করছে !
ক্রমশ