অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৫৯)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
আলোতে ভালোতে মিশে আছে যে শরৎ
বৃষ্টি শেষের দিনে কবিতা প্রহর
ভালোবাসা , তুমি এসো কাব্য-সুষমায়
দিনশেষে নামে যেন নম্রতার স্বর
কোজাগরী চাঁদ ভাসানো পূর্ণিমার দুদিনের মাথায় সেই আকাঙ্খিত রবিবারের আগে শনিবার দিনটি এলো। শুভ আর প্রলয় সকালেই চলে এসেছে। বাদল আর তিথি তো ছিলোই । সব মিলিয়ে কবিতা ভুবনের চাপা উত্তেজনায় যেন আগের দিন থেকেই সবাই থরথর করে কাঁপছে । রবিবার সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত অধিবেশন । প্রস্তাব দেওয়া হবে, প্রতি তিনমাসে একবার মিলিত হবার । ছমাসে একবার ষান্মাসিক পর্যালোচনা। বছরের শেষে আবেগের পুণর্মিলন ও আবেগ সরিয়ে কঠোর আত্মসমালোচনা। প্রত্যেকের কাজের অনুপুঙ্খ বিবরণ ও বিশ্লেষণ । আপাতত প্রতি সপ্তাহের শেষে শনি ও রবি এই কবিতার আশ্রয়ে দুদিন কাটাবে শুভ , প্রলয় , অরুণিমা আর অর্ধেন্দু । সঙ্গে তিথি , বাদল, অমলেন্দু তো থাকলোই। তরুণ কবিদের নিয়ে অন্তত দু ফর্মার একটি কবিতা সংকলন প্রতি মাসে প্রকাশিত হবে। এই মুহূর্তে রাঢ় বাংলার ও জঙ্গলমহলের কবিরাই সেখানে অগ্রাধিকার পাবে । পরবর্তী কালে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলার কবিদের প্রকাশিত কবিতা নিয়ে সংকলন বেরোবে । কবিতা প্রকাশের জন্য কারোর থেকে একটা পয়সাও দাবি করা হবে না। সঙ্গে থাকবে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের কবিতার বাংলা অনুবাদ । বহির্বিশ্বের কবি বন্ধুদের কাছে হাত পাতা হবে কবিতার জন্য । আজকের পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার তরুণ কবিদের কবিতার অনুবাদ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হবে। আপাতত ইউরোপের কবিদের দায়িত্ব দেওয়া হবে মেঘলাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব তুলে নেবে সে । কলকাতায় ফিরে এসেও এই কাজটাই অক্লান্তভাবে করে যাবে সে , একথা নিশ্চিত বলা যায়। অমলেন্দুর মনে পড়ে যায় , গত শতাব্দীর পাঁচ আর ছয়ের দশকে বাংলা ভাষায় দৈনিক কবিতার কাগজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে । আজ তা স্বপ্নের মতো মনে হয়। তবু জেদ থাকলে সেটাও করা সম্ভব হবে । কারণ , এখন হাতের মুঠোয় নেট দুনিয়ার আধুনিকতা। ই-ম্যাগাজিনের মাধ্যমে দৈনিক কবিতা প্রকাশ করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয় । সেই গুরুদায়িত্ব পালন করবে অমলেন্দু নিজে। কবিতা দুনিয়ার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এই প্রজন্মের তরুণ কবিরা তাদের নিজেদের লেখা কবিতা যদি পরের দিনই ছাপার অক্ষরে দেখতে পায় ,তবে সেটা তাদের উঠে আসার পক্ষে খুব উল্লেখযোগ্য ঘটনা হবে। নেশা, আত্মতুষ্টি , পরস্পরের পিঠ চুলকানি ,আর সংগঠনের নামে দলবাজি থেকে বিরত থাকলে এবং নিজের কাজের প্রতি একশো শতাংশ বিশ্বাস রাখলে , সেটা অবশ্যই সম্ভব।
শনিবারের এই দুপুরের দিগন্তে প্রলয় ,শুভ , তিথিদের কাছে কথাগুলো বলতে বলতে অমলেন্দুর কন্ঠ থেকে প্রত্যয় ঝরে পড়ছিলো । সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা,অরণ্য সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখা, সাম্যবাদের প্রতি অবিচল আস্থা, শিল্পী ও শিল্পসত্তার একক ও সমবেত স্বাধীনতা — এই নিয়েই আমাদের কবিতাজীবন গড়ে উঠবে । সেদিন দুপুরের অনেকটাই গড়িয়ে গেল আলাপ আলোচনায়। সন্ধে পেরিয়ে রাত নটা পর্যন্ত চলল তার রেশ। আগামীকালের অনুষ্ঠানসূচিতে যেন কোন দ্বিধা বা দ্বন্দ্ব দেখা না দেয়–তারই নকশি কাঁথা বুনে চলল এই তমোঘ্ন কয়েকজন কবিতার মানুষ। প্রত্যেকের মধ্যেই অনুরণন তুলছে উন্মনা নামে কবিতার নারীর এই মুহূর্তে না থাকা। অথচ ,কেউ মুখ ফুটে বলছে না সে কথা , পাছে অমলেন্দু স্যারের মনে দুঃখ লাগে। অমলেন্দু সেই কথা বুঝে কখনও একটু অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছেন। কোনো কথা বলতে গিয়ে কখনও তার চোখের পাতায় হয়তো ফুটে উঠছে অব্যক্ত বেদনা । সেই সঙ্গে এই মুহূর্তে তার পাগল বন্ধু বিন্দাসের জন্যেও মনের হাহাকার গুমরে গুমরে উঠছিল। কবিতা জন্মের শুভ মুহূর্তে এই বাউল মানুষটা থাকবে না , এটা ভাবতেই তার বুক ফেটে যাচ্ছিল। তিথি আর বাদল আলোচনা শেষের প্রহর মাতিয়ে দিলো গানে আর কবিতায় । বাদল শোনলো সুকান্তের বোধন , আর তিথি গেয়ে উঠলো সেই সুকান্তের কবিতার গীতিরূপ , ঠিকানা — জালালাবাদের পথ ধরে ভাই ধর্মতলার পথে ,
দেখবে ঠিকানা লেখা প্রত্যেক ঘরে
ক্ষুব্ধ এ দেশে রক্তের অক্ষরে, রক্তের অক্ষরে…
আড্ডার মধ্যে কখন যে শুভ আর প্রলয় নিঃশব্দে খিচুড়ি বসিয়ে দিয়েছে , চায়ের কাপের অমোঘ আকর্ষণে সে কথা কেউ মনেও রাখেনি । কোজাগরী শেষের চাঁদের বন্যায় ভেসে যাওয়া সারা পল্লী হঠাৎ যেন ম ম করে উঠলো খিচুড়ির গন্ধে। খেতে বসে অমলেন্দু শোনালেন — তাঁর দুই তরুণ বন্ধু , শিক্ষক দম্পতি শিমুল রহমান ও পারভিনের কথা । হুগলি থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে ওরা আসবে । কবিতা শোনাবে , এই কবিতাজন্মের সঙ্গে তাদের নাড়ির যোগ রচিত হবে । সবাই হৈ হৈ করে উঠলো সেকথা শুনে । প্রলয় বললো — তাহলে ওদের আগামীকাল বাড়ি ফিরতে দেওয়া যাবে না । সারারাত এখানেই আড্ডা মারবো । খিচুড়ির প্রথম দলাটা মুখে তুলতে গিয়ে শুভর চোখ ছলছল করে উঠলো । ধৈর্যের বাঁধ প্রথম ভাঙলো কবি শুভই — উন্মনাদিকে খুব মিস করছি । এমন স্বপ্নের দিনে , সারাদিন কবিতা জন্মের দিনে , পরিপূর্ণ কবিতার মানুষ উন্মনাদিই থাকবে না ? কেউ অমলেন্দুর দিকে তাকাতে পারছে না। অথচ অমলেন্দু বুঝতে পারছেন , সকলের অন্তর তার দিকেই তাকিয়ে আছে ।
রাত প্রায় একটা নাগাদ সবাইকে ঠেলে গুঁতিয়ে ঘুমোতে পাঠালেন অমলেন্দু। ঘরের আলো নিভিয়ে , শেষ শরতের সীমাহীন নির্জনতায় ডুবে গিয়ে, একটু অপেক্ষায় থাকলেন সাইলেন্ট মোডে থাকা ফোনের স্ক্রিনের দিকে অপলক তাকিয়ে।কোনো কোনো বেদনাদীর্ণ মুহূর্তে মানুষ তার দীর্ঘশ্বাস গোপন রাখতে পারে না । অবশেষে রাত গভীরের নিমগ্নতা ক্লান্ত অমলেন্দুকে ঘুম পাড়িয়ে দিলো।
ভোরের প্রথম আলো ফোটবার কিছুক্ষণ পরে অমলেন্দুর ফোন ভাইব্রেট করলো । এক ঝটকায় ঘুম ভেঙেই মনে হল উন্মনার ফোন।চশমাটা চোখে গলিয়ে দেখতে পেল , ফোনে বিন্দাসের নাম । অমলেন্দুর গোপন বিষাদের পাশে ফুটে উঠলো অন্য আনন্দ — অমল আলোর মতো নির্মল আনন্দ ! হ্যালো বলতে গিয়ে গলা ধরে গেল তাঁর । ও প্রান্তে প্রায় চিৎকার — ও গুরু , কাল অনেক রাতে ঘরে ফিরেছি গো। একবাটি বাসি মুড়ি চিবিয়ে ভোরের অপেক্ষায় জেগে ছিলাম গো। ভোর না হতেই দৌড় লাগালাম তোমাকে দেখবো বলে….
ও গুরু ,তুমি একবার ছাতে উঠে এসো তো । তোমার বাগানের পিছনে ধানমাঠের আলের ওপর দাঁড়িয়ে আছি গো । তোমার পাগল বন্ধু বাউল বিন্দাস যে ফিরে এসেছে ! আজ আমাদের কবিতাজন্মের তীর্থে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হবে যে। সে তীর্থভূমিতে না এসে কি পারি ? মনের আবেগ চেপে ছাদে উঠে এলো অমলেন্দু। নিচে সবাই অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ভোরের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়েছে শরৎ ও হেমন্তের সন্ধিক্ষণের কাছাকাছি সবুজ দিগন্তে। আলপথের ওপর একটা খেজুর গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গানের বিন্দাস , প্রাণের বিন্দাস ঘুরে ঘুরে গাইছে — দেখেছি রূপ সাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা ,
তারে ধরি ধরি মনে করি , ধরতে গেলে আর মেলে না…
দূর থেকে সব কথা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না , তবু বহুশ্রুত এই অমর গীতি শেষ শরৎকে যেন সোনার রঙে রাঙিয়ে দিয়ে গেলো।
কোজাগরী পূর্ণিমার পরের রবিবারে , আজকের এই সকাল দশটা উপস্থিত জনা কুড়ি পঁচিশ জন মানুষকে যেন পরম অন্তরঙ্গতায় বেঁধে ফেললো ।গ্রামের সদ্য কিশোর-কিশোরী — চন্দন আর কুঁড়ি , এ গ্রামেরই পঁচাশি বছরের প্রাণবন্ত মানুষ আনন্দ কিশোর মাইতিকে রজনীগন্ধার মালা ও উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নিলো। সেই শ্রদ্ধেয় মানুষটির হাতে প্রকাশিত হলো– কবি প্রলয়ের প্রচ্ছদ ভাবনায় ঝকঝকে ক্রাউন সাইজের পত্রিকা। প্রচ্ছদে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে পত্রিকার নামটি — আমাদের কবিতাজন্ম । সারারাত না ঘুমোনো পাগল বিন্দাসের দরাজ গলায় ফুটে উঠেলো উদ্বোধনী সঙ্গীত , হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানে দেশভাগের নির্বাণহীন যন্ত্রণা — হবিগঞ্জের জালালি কৈতর , সুনামগঞ্জের কুড়া,
সুরমা নদীর গাঙচিল আমি শূন্যে দিলাম উড়া ,
শূন্যে দিলাম উড়া রে আমি যাইতে চান্দের চর ,
ডানা ভাইঙ্গা পড়লাম আমি
কইলকাত্তার উপর , তোমরা আমার চেনোনি …
উপস্থিত মানুষরা এই গানে আকুল হলো , ভেসে গেলো। তারপর অমলেন্দু তাঁর স্বাগত ভাষণে ঘোষণা করলেন — কবিতাজন্ম ও কবিতা আশ্রয়ের শপথ ।
পত্রিকা প্রকাশের পর , প্রধান অতিথির ভাষণে বৃদ্ধ আনন্দবাবু সুন্দরভাবে বোঝালেন — কবিতার মধ্যে দিয়ে কবি জসীমউদ্দীনের মতো , জীবনানন্দের মতো , বাংলার গ্রাম নিয়ে , যেন শহরের মানুষও চিন্তা করে । গ্রামের বিকাশকে , গ্রামের সার্বিক আগ্রগতিকে যেন সবাই তুলে ধরতে পারে । এই কবিতার আশ্রয়ের মাধ্যমেই কবিতার আকাঙ্খা ও প্রতিবাদ নিয়ে গ্রামের মানুষ যেন এই দেশের দিক দিগন্তে ছড়িয়ে দিতে পারে কবিতার জয়বার্তা। আমাদের কুঁড়ি’মায়ের মতো আশে পাশের গ্রামের শত শত কিশোর কিশোরী কুঁড়িরা যেন শত সহস্র ফুলে বিকশিত হয়, কবিতা পরিবারের সকলের কাছে আমার এই অনুরোধ থাকলো । এই মানুষটির কথা শুনে অমলেন্দুর মনে হলো , একজন সত্যিকারের বন্ধু ও অভিভাবক পেলেন তিনি ও এই পরিবারের সকলে । মানুষটির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে যেন পাহাড়ি ঝর্ণার জলের পবিত্রতা অর্জন করলেন কবিমন অমলেন্দু ।
সেই কোন সকালে বেরিয়ে , হুগলি জেলা থেকে আসা কবিতা পাগল শিমুল ও পারভিন এই সময়ের কবিদের যেসব কবিতা আবৃত্তি করে শোনালো , তার মধ্যে কবি বাদল মেঘ , শুভ , প্রলয় আর উন্মনার কবিতাও রয়েছে । কী উজ্জ্বল তাদের উপস্থিতি ! কী প্রাণবন্ত তাদের নিবেদন ! প্রতিটি কবিতার রূপ রস বর্ণ গন্ধ এই সকাল পেরোনো সদ্য দুপুরকে উদ্ভাসিত করে দিলো। অমলেন্দুর বাগানে অযত্নে বেড়ে ওঠা গাছগুলো যেন মুহূর্তের মধ্যে অভিনন্দন জানালো সমাগত অতিথিদের।
তিথি আর অরুণিমা যখন হাতে হাতে পানীয় জল , চা আর সদ্য ভাজা গরম বেগুনি পৌঁছে দিচ্ছিল প্রত্যেকের কাছে , চায়ে চুমুক দেওয়ার আগে মঞ্চে বসে অমলেন্দু যখন শুভর কাছে জল চাইলেন , ঠিক তখনই , সেই শিউলি উঠোনের সুগন্ধ ছাপিয়ে যে নারীমূর্তি এসে দাঁড়ালো গেটের কাছে — যাকে দেখে প্রাণের বিন্দাস হৈ হৈ করে গেয়ে উঠলো — তোরা কুঞ্জ সাজাস লো , আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে…
ঠিক তখনই বিন্দাসের হাতে হাত রেখে . একতারা ছুঁয়ে মুগ্ধ চরাচর যেন বলে উঠলো — উন্মনা এসেছে , কবিতার নারী উন্মনা এসেছে — প্রথম হেমন্তের মতো মৃদু পায়ে।
খুব স্বাভাবিকভাবে উন্মনা মঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছে গেল ।প্রলয়, শুভ ,তিথি ,অরুণিমা ,অর্ধেন্দু, বাদল মেঘ সবাই হৈ হৈ করে তাকে মঞ্চে তুলে আনলো। সমস্ত আবেগকে অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিত্বের আড়ালে রেখে , একমুখ হাসি দিয়ে কবিমন অমলেন্দু তাঁর কবিতার নারী উন্মনাকে বসালেন মঞ্চে। লজ্জায় কুঁকড়ে যাওয়া উন্মনা কোনোমতে টেবিলের ওপর রাখা জলের বোতল থেকে জল খেলো । বিদায়ী শরৎ ও শুভাগত হেমন্ত যেন একসাথে বলে উঠলো– উন্মনা , তুমি কিছু বলো। আনন্দ বাবু বললেন — মা উন্মনা , সবাই তোমার কাছে কিছু শোনার প্রত্যাশায় আছে । তুমি বলো ।হুগলি জেলার শিমুল ও পারভিন, জঙ্গলমহলের বেশ কয়েক জন তরুণ ও অভিজ্ঞ কবি আর উঠোনে পড়ে থাকা ঝরা শিউলি যেন একসাথে বলে উঠলো — ও কবিতার নারী তুমি কিছু বলবে না ? আঁচলে মুখ মুছে, চোখের জল ও নিজের আবেগ সামলে মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়ালো উন্মনা । ধীরে ধীরে কয়েকটি মাত্র বাক্যে নিজের কথা জানালো সে । আমি পারবো । সংসারের সব কিছু সামলেও আমি বারবার এখানে ছুটে আসবো । আমাকে আপনারা এই কবিতা পরিবারের যে কাজের জন্য নির্বাচন করবেন , একজন কর্মী হিসেবে সেই কাজ করবো । নিজেকে ও নিজের পরিবারকে কবিতাজন্মের জন্য উপযুক্ত করে তুলবো — এই আমার প্রতিজ্ঞা। আমাকে আপনারা আপনাদের একজন বলেই জানবেন। বাসে আসার পথে আমি কয়েকটা লাইন লিখেছি । আপনারা শুনবেন ? কেউ কোনো কথা বলছে না। বাতাসে তখনও শুধু ঝরা শিউলির হালকা গন্ধ । ব্যাগ থেকে কবিতার খাতা বার করে উন্মনা ধীরে ধীরে পড়তে লাগলো তার নিজের কবিতা — ছায়াঘেরা পাঠশালা
নীলু চেয়েছিল মেঘের বাগানে ফুল
বিলে চেয়েছিল গল্পের ডালাপালা
তিথি চেয়েছিল তারা দিয়ে গাঁথা দুল
আমি তাই গড়ি পাগলের পাঠশালা
ঋজু এসে বলে সিলেবাস বদলাও
মিঠি রেগে বলে অঙ্ক শেখাবে নাকি ?
সোহম বলেছে নৌকো বানিয়ে দাও
মিন্টু বলেছে ফুল ফোটানো যে বাকি !
তিতির বলেছে মাপিপিসি এনে দাও
তাতান চেয়েছে এক্ষুনি লেখা ছড়া
তিয়াস এঁকেছে মন পবনের নাও
তোয়াই এঁকেছে ছাতিমতলার পড়া
সুধা চেয়েছিল অমলের লেখা গান
অমল ভরেছে সুধার দুহাত ফুলে
ছায়ার আঁচলে দুপুরের পিছুটান
দুজনে হেসেছে প্রথম লেখার ভুলে
আকাশ নেমেছে মাটির সঙ্গ পেতে
মেঘ নেমে আসে ছোট্ট পাহাড় ঘিরে
নদী থমকায় সাগরের দিকে যেতে
বৃষ্টি মেখেছে রোদ চলকানো হিরে
সকলে বলেছে সেই ইস্কুল চাই
বাঁশরি শেখাবে কিশোর কৃষ্ণ কালা
সকলে বন্ধু ,সবাই সবার ভাই
আমি তাই গড়ি ছায়াঘেরা পাঠশালা
কবিতা শুরুতে যে স্তব্ধতা ছিল , শেষেও সেই স্তব্ধতা। শুধু বিমুগ্ধ প্রকৃতি যেন সবার পিছনে গেটের কাছে দাঁড়ানো পাগলা বিন্দাসের গলায় প্রাণ ভরিয়ে গেয়ে উঠলো–
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছো নয়নে নয়নে।
হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে,
হৃদয়ে রয়েছো গোপনে ,
রয়েছো নয়নে নয়নে…
ক্রমশ
আগামী সংখ্যায় শেষ হবে এই উপন্যাসটি
কবিতাটি খুব সুন্দর। উপন্যাসটির প্রথম অংশ পড়তে পারলে ভালো হত