অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৪৫)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

মাঝে মাঝেই মন খারাপের হাওয়া
কখনও কখনও জীবন পেরিয়ে যাওয়া
কেন যে বিপুল যুক্তির জাল বুনি…
তার চে’ বরং প্রাণ পেতে দিয়ে শুনি।

স্বাভাবিকভাবেই বৈশাখের প্রথম রবিবারের আকাশে দীপ্তিমান সূর্য , চাঁদোয়ার ছায়ার নিচে উন্মুখ কবিদল , বাগানের দিক থেকে ভেসে আসা রান্নার সুগন্ধ , অস্থায়ী মঞ্চের ক্ষণস্থায়ী আলো , সুন্দর মাইক্রোফোন , ফুলের ঝাড় থেকে রজনীগন্ধার সুবাস — সবাই যেন উন্মুখ হয়ে ছিল অমলেন্দু স্যারের বক্তব্য শোনার জন্য। আজ বড্ড বিষণ্ণ ও বিপন্ন মনে হচ্ছে অমলেন্দু স্যারকে।মনে হচ্ছে , এই স্নায়ুযুদ্ধের জন্য তিনি আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না । চিরদিন দাপিয়ে কবিতা বলা অমলেন্দু ডান হাতে কর্ডলেস ধরে প্রাণপণে কাকে যেন খুঁজছিলেন।সেই একক ও সমবেত খোঁজার দিগন্তে কোত্থাও উন্মনাকে দেখা গেল না। জীবনে বহুবার ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি হওয়া সাংবাদিক অমলেন্দুর অনিচ্ছাকৃত দীর্ঘশ্বাসের শব্দ মাইক্রোফোনেও ধরা পড়লো । মঞ্চে বসা অর্ধেন্দু আঙুলের নখ খুঁটতে খুঁটতে সেই দৃশ্যটা ভালোভাবে উপভোগ করলো বলে মনে হলো। দর্শকের সামনের সারিতে বসা অরুণিমা ম্যাডাম , উন্মনাকে খুঁজতে গিয়ে তাকালো মা মৃত্তিকার দিকে । মৃত্তিকা তাকালো কিশোরী তোয়াইয়ের দিকে । তোয়া তাকালো ক্রমশ ঘনিয়ে আসা গ্রীষ্ম দুপুরের দিকে । গ্রীষ্ম দুপুর আকুল হয়ে তাকালো সজনে গাছের ছায়ার দিকে । সজনে গাছের ডাল-ঝিরঝির পাতারা ডাকলো– ও কবিতার নারী উন্মনা , তুমি কোথায় গো ? তোমাকে না দেখতে পেয়ে , তোমার কবিমন যে কথার খেই হারিয়ে ফেলেছে …
মঞ্চের ওপর দাঁড়ানো অমলেন্দু মুহূর্তের ভগ্নাংশে উপলব্ধি করলেন একটি চরম সত্য — একদিন হয়তো এইভাবেই তার জীবন থেকে হঠাৎ হারিয়ে যাবে উন্মনা। উন্মনার জীবন থেকেও মিলিয়ে যাবে সে। তবুও বসন্ত দিন গড়িয়ে যাবে গ্রীষ্মের দিকে। গ্রীষ্মদিন জৈষ্ঠ্যের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেয়ে উঠবে– এসো শ্যামল সুন্দর…..
তবুও পৃথিবী ঘুরবে ।‌ কেউ দাঁড়িয়ে যাবে না । হয়তো পৃথিবীর অন্য কোথাও উন্মনা তার কাজ করে যাবে । আর , শাল জঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতুতে অমলেন্দুকেও তার কাজ করে যেতে হবে ।
মঞ্চে এই মুহূর্তে অমলেন্দুর চওড়া কাঁধ পেরিয়ে, যেন কানে কানে কেউ বলে গেল — গোটা দুনিয়ার সর্বকালের সেরা অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের সেই দৈববাণী — “সো মাস্ট গো অন।” চার্লির “লাইম লাইট” থেকে রাজকাপুরের “মেরা নাম জোকার” একসঙ্গে বলে উঠলো — “সো মাস্ট গো অন।” মাইক্রোফোনের সামনে নমস্কার শব্দটা বলার সঙ্গে সঙ্গে অমলেন্দু বুঝতে পারলো — তার কবিতার নারী উন্মনা এই বাড়িরই কোনো গহন গোপনে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে। কিন্তু , প্রাণ পেতে দিয়ে উন্মুখ হয়ে রয়েছে তার প্রিয় কবিমনের নির্দিষ্ট ও সুনিশ্চিত বক্তব্য শোনার জন্য । অনুভূতিপ্রবণ মাইক্রোফোনে গমগম করে উঠলো অমলেন্দুর কন্ঠস্বর — প্রিয় বন্ধুরা , আমি কৃতজ্ঞ আপনাদের কাছে । আপনারা আমাকে কবিজন্ম ও কবিতা জীবনের রূপরেখা সৃষ্টির জন্য সুযোগ দিয়েছেন। আমি জানি, আমার বক্তব্যের উপর আপনাদের ভবিষ্যৎ ভাবনা নির্ভর করছে । আমার পরেও অনেকেই মতামত জানাবেন। তাই ভূমিকা না করে আমি শুরু করছি । এখানে আমি বা আমরা ব্যক্তিগতভাবে কারোর স্বপক্ষে বা বিপক্ষে বলতে আসিনি‌ । আমরা এসেছি একটা ক্ষয়ে যাওয়া ও ঘূণ ধরে যাওয়া সিস্টেমের বিপরীতে নতুন ধারণা গড়ে তুলতে । বিশ্বকবির ভাষায়–
শুধু নিজ বল আছে সম্বল , সেই ভালো ওগো সেই ভালো….
এই সংগঠনে আমার আড়ালে বা বিরুদ্ধে যা যা বলা হচ্ছে , সেটাও তো একটা গঠনমূলক আলোচনা । আমার সমালোচনা যাঁরা করছেন ,তাঁরা তো আসলে নিরপেক্ষতার মুখোশ খুলে , একটা কিছু গড়ে তুলতে চলেছেন। সেখানে আমরা সবাই কর্মী । কেউ নেতা নয়। হয়তো আপনাদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষ আমার কথাকে বিশ্বাস করেন , বিশ্বাস করেন যাবতীয় আঘাত সংঘাতের বাইরের কবিতার মতো একটা জীবন আমাদের সবার জন্য অপেক্ষা করে আছে । ধাঁধা , হেঁয়ালি , ভুলভুলাইয়া পেরিয়ে , জগৎ শেঠের গুপ্তধন খুঁজে বার করবার মতো সেই জীবনটাকেও তো আমাদের আবিষ্কার করতে হবে! আচ্ছা বলুন তো , এই মুহূর্তে কোনো প্রাজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত কবিকে তাঁর সৃষ্টির জগৎ থেকে তুলে এনে বলা যায় কি — চলুন , আমরা যখের ধন উদ্ধারে নেমেছি । নিশ্চয়ই বলা যায় না এমন কথা। আসলে , এখন তো বাঁশ, দড়ি, তক্তা, ত্রিপল এনে একটা মঞ্চ বাঁধবার কথা । যেমন করে কিশোর বেলায় মঞ্চ বেঁধে বড়দের মতো নাটক করতাম , সেই রকম একটা মঞ্চ তো প্রস্তুত করা উচিৎ প্রথমে ; যেখানে সভাপতির আসনে বসবেন একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবি , যাঁর পায়ের কাছে বসে আমরা সবাই শুনবো মৃত্তিকার অনু পরমাণু ভেঙে নতুন কোনো মহাপৃথিবীর গল্প ! জীবন ছাড়িয়ে , জীবনের থেকেও বড়, অন্য কোনো আরম্ভের নিবিড় রূপকল্প ! যেখানে অ্যারিস্টটল , সক্রেটিস, রবীন্দ্রনাথ , আইনস্টাইন , দ্য ভিঞ্চি একাকার হয়ে যান । সেই জায়গায় তো পৌঁছতে হবে আমাদের। তাই না ? আমি ঠিক সেই কথাটাই আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই বন্ধুরা।ছোটোবেলা থেকে কর্মী হবার অভ্যেস আমাকে মিছিলের মুখ আর কবিতার ভাষা এক করে দিতে শিখিয়েছে । আমি মিছিলে, নাটকে ,কবিতায় , গানে থাকতে থাকতে যে প্রফেশনাল আউটপুটটা দিতে শিখেছি , সেটাই একটা কবিতার সংগঠনকে গড়ে তোলবার প্রথম পদক্ষেপ । সৃষ্টিশীল ও একই সঙ্গে কর্মী হওয়া প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে বড্ড বেশি প্রয়োজন । আইনস্টাইনের মতো নতুন দিগন্ত আবিষ্কারের “বীজ ও মহাবিশ্ব ” সকলের মধ্যে থাকে না । থাকে না গীতাঞ্জলি বা গোরা লেখার মতো আশ্চর্য ক্ষমতা। একজন সুদক্ষ ইঞ্জিনিয়ারের মতো বিশাল নদীর ওপর ব্রিজ বানাতে নাও যদি পারি , তবুও দক্ষ কর্মী হয়ে , সেই সেতুর অনু পরমাণু গড়ে তো তুলতে পারবো । কলকাতার বিদ্যাসাগর সেতু যেদিন উদ্বোধন হলো , সেদিন তো ইঞ্জিনিয়ার ও কর্মীরা হাতে হাত রেখে একসঙ্গে সেই স্বর্গীয় দৃশ্য দেখেছিল , তাই না ? বন্ধুরা, এবার আসি কবিতার কথায়।একজন মান্যতাপ্রাপ্ত কবি যখন রাত জেগে , নিজের আঙুলগুলো মোমশিখা করে জ্বেলে একটি কালজয়ী কবিতার জন্ম দেন , ভাই অর্ধেন্দু , তুমি মনে রেখো , সেখানে উপস্থিত হবার যোগ্যতা আমার নেই। কিন্তু , সেই কবিতা যখন প্রকাশিত হয়ে পত্র পত্রিকার মাধ্যমে আমার কাছে আসে , আমি নিজে একজন একক পাঠক হিসেবে সেই আশ্চর্য কবিতা পড়ে , আনন্দ বিষাদে দোল খাই ,কান্না হাসির দিগন্তে ঘুরে বেড়াই । রাজদ্বার বা শ্মশান আমার কাছে এক হয়ে যায় । আমি চিৎকার করে বলি — কবিতা , আমি তোমার জন্য হাজার মাইল হাঁটতে পারি । তারপর, আমি ও আমার মতো হাজার হাজার কন্ঠশিল্পী সেই কবিতাকে লক্ষ লক্ষ মানুষের কান পেরিয়ে প্রাণের কাছে পৌঁছে দিই। রবীন্দ্রনাথের “ঝড়ের খেয়া” থেকে জীবনানন্দের “আট বছর আগের একদিন” পর্যন্ত, অথবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “দেখা হলো ভালোবাসা বেদনায়” থেকে পূর্ণেন্দু পত্রীর “হে সময় অশ্বারোহী হও” অব্দি কবিতার জয়ধ্বনি হয়েই চলেছে আমাদের কন্ঠের মাধ্যমে, আমার মায়ের ভাষা বাংলা ভাষাতে । আমি ঘোষণা করতে চাই —
“সত্যি কথা বলার সাহস আমার আছে এই ভাষাতে।
বাঁচার ইচ্ছে , ভাসার সাহস, ডোবার দুঃসাহসের নেশা এই ভাষাতে , এই ভাষাতেই…”

অমলেন্দু বুঝতে পারলো, তার আজন্ম চর্চিত কন্ঠস্বরের বেড়া ডিঙিয়ে দমকে দমকে কাশি উঠে আসছে….
তার কথা ও কবিতা আচমকা কাশির দমকে ডুবে যেতেই , অর্ধেন্দু ছুটে এসে ওর দুটো হাত জড়িয়ে ধরলো — দাদা , একটু বসুন । বিশ্রাম করুন। অরুণিমা ছুটলো তিথির কাছে ।‌ সবার লক্ষ্য স্টেজের ওপর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া মানুষটার দিকে । গ্রীষ্ম ঋতুর স্থির চিত্রের মতো , প্রথম আষাঢ়ে মেঘদূতমের বৃষ্টিফোঁটার মতো , ঠিক সেই মুহূর্তে জল হাতে মঞ্চের ওপর উঠে এলো কবিতার নারী উন্মনা। রবীন্দ্রনাথের চন্ডালিকায় যেমন প্রকৃতি ও আনন্দ , সাহারা মরুভূমির বুকের ওপর যেমন একখন্ড চেরাপুঞ্জির মেঘ , কুরুক্ষেত্রের অষ্টাদশ দিনে পুত্র হারা গান্ধারীর স্তব্ধ হাহাকারের কাছে যেমন ‘মা’ বলে ডেকে ওঠা ; ঠিক তেমন করেই, আশ্চর্য ও অনিন্দ্যসুন্দর দৃষ্টি বিনিময় হলো কবিতার নারী উন্মনা ও কবিমন অমলেন্দুর মধ্যে।
উন্মুখ শ্রোতারা সবাই দেখলো,তৃষ্ণার শেষ বিন্দুতে পৌঁছে, কবিতার অমলেন্দু জল পান করছে।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।