অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ১)

আরণ্যক বসুর রোমান্টিক ও সবুজে সবুজ ধারাবাহিক উপন্যাস
শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
কার্তিকে কার্তিক পুজো,
দুষ্টুমি দুষ্টুমি ;
এখনও তো প্যান্ডেলের শোভা,
জগদ্ধাত্রী তুমি ।
কোলপোষা ল্যাপটপ নিয়ে , চায়ের দোকানের বাইরের বেঞ্চে বসে কোনোরকমে এক আঙুলে টাইপ করে রিপোর্ট পাঠাচ্ছে অমলেন্দু
মন্ডল। জেলা শহরের মাঝারি মানের কাগজের আরও সাধারণ সাংবাদিক। জেলা বাঁকুড়া। আপাতত হাত পুড়িয়ে রেঁধে খাওয়ার ঠিকানা কুসুমডাঙা গ্রাম।
কাছে দূরে টিলাজঙ্গল , নদী। আরও দূরে মুকুটমণিপুরের হাতছানি।অমলেন্দু একটা নিখাদ কিংসাইজ বিড়ি ধরায় , প্রফেশনাল বিড়িখোরদের মতো। দুদিকে ফুঁ দিয়ে লাইটারটা জ্বালাতে গিয়ে এই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে সে উপলব্ধি করলো , যে তার হাত কাঁপছে । তাই দেখে পাশের বেঞ্চি থেকে অমলেন্দুর সামনে উঠে এলো , ওই অঞ্চলের আলাভোলা গায়ক ক্ষ্যাপা বিন্দাস। সবাইকে বেশ শুনিয়ে শুনিয়েই বললো, দাদা গো , এই প্রথম দেখলাম তোমার হাত থেকে….
কেন খাও বলতো এইসব ছাইভস্ম ? অমলেন্দু সাধারণত কোনো তীক্ষ্ণ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে পারে না । সত্যিই তো , কী হয় বিড়ির ধোঁয়ায় ? বুদ্ধিতে শান পড়ে নাকি ? ধুত্তোর , ওসব ফালতু কথা । তবুও বিড়ি আর লাইটার না থাকলে…..
ক্ষ্যাপা বিন্দাস খুব উৎসাহ নিয়ে বললো , আগের সপ্তাহে রোববারের কাগজে , দলমার হাতিদের মানুষের চাষের জমি তছনছ করে দেওয়ার রিপোর্টটা খুব ভালো হয়েছিলো গো । অমলেন্দু জানে , এগুলো সবই চা খাওয়ার ছুতো । ঈশারায় চায়ের দোকানের মালিক হরিপদকে দুটো চিনি ছাড়া চা , আর স্থানীয় বেকারির বিস্কুট অর্ডার দিল। তারপর ল্যাপটপ বন্ধ করে , আরেকটা বিড়ি ধরিয়ে ক্ষ্যাপাকে সাঁকো নাড়িয়ে বলে উঠলো— একটা গান হবে না ? ক্ষ্যাপা বিন্দাস সবার কথায় খুশি না হলেও , অমলেন্দু গান গাইতে বললে ওর খুব ভালো লাগে । মুখে একটা অন্য আলো পড়ে । তাতে সিকিভাগ লজ্জা , সিকিভাগ খুশি , আর বাকিটা পাগলের বিন্দাস হয়ে যাওয়ার আনন্দ ! কিন্তু গান শুনবে কি ? সেই মুহূর্তে পাশের জগদ্ধাত্রী পুজোর প্যান্ডেল থেকে , একটু নরম শব্দের ডিজে বেজে উঠলো । আর সেই গান শুরু হতেই , জগদ্ধাত্রী পুজোর তিনদিন পরের সকাল আনন্দে নেচে উঠলো । উদ্বাহু হয়ে নাচতে শুরু করলো বেশ কিছু কুচোকাঁচা। এমনকি দোকানের খদ্দের সামলে , কোমর দোলাতে লাগলো মালিক হরিপদ। অমলেন্দু লক্ষ্য করলো যে , উদিত নারায়ণ এই গানটা খুব ভালো গেয়েছে , আর ডিজেটাও খুব নরম স্বরে বাজছে—
ভোলি সি সুরত ,আঁখো মে মস্তি , দূর খাড়ি শরমায়ে়..
সবাই একসাথে হায় হায় বলে মাটিতে বসে পড়লো। নাচ কিন্তু ভুবনডাঙ্গার প্রথম বৃষ্টির মতো ঝরঝর করে চলতে লাগলো…
এক ঝলক দিখলায়ে কভি , কভি আঁচল মে ছুপ যায়ে…
আবার সমবেত হায় হায় ।
মেরি নজর সে তুম দেখো তো ইয়ার নজর ও আয়ে…
ব্যাগ দুলিয়ে টিউশন পড়তে যাচ্ছিলো , গাঁয়ের দুই কিশোরী কন্যা নন্দনা আর চন্দনা । তারাও হঠাৎ রাস্তার উপর জমাটি নাচ দেখে , নিজেরাও মনে মনে খানিকটা বোধহয় কোমর দোলায় আচ্ছন্ন হলো , কিন্তু তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলেও গেলো। এবার অমলেন্দু মন শক্ত করে বললো (আসলে শক্ত না হলে ওকে কেউ পাত্তাই দেয় না) — এই গানটা হয়ে গেলে , ডিজেটা বন্ধ করতে বল তো । কেউ একজন পাশের প্যান্ডেলে গিয়ে কথাটা জানাতেই , গানটা শেষ হতে ডিজেটাও বোবা হয়ে গেলো।
( ক্রমশ )
একটি বিনীত নিবেদন–এই উপন্যাসের সব চরিত্র ও কাহিনি সম্পূর্ণ কাল্পনিক।কোথাও মিল খুঁজে পেলে , সেটা লেখকের অনিচ্ছাকৃত বলেই মেনে নিতে হবে।জায়গার নামগুলো , নদী জঙ্গল পাহাড় , এগুলো বাস্তব ও কল্পনাকেই ছুঁয়ে থাকবে। আপনারা প্লিজ একটু মানিয়ে নেবেন। ও হ্যাঁ… এই উপন্যাসের সময়টা..তা ধরুন অনতিঅতীত হবে….