সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অর্পিতা বোস (পর্ব – ৬)

বৃত্ত

হুইস্কির গ্লাসটা টেবিলে রাখে অর্জুন। নেশাটাও ঠিকঠাক হচ্ছেনা। মনের মাঝে একটা ঝড়। অপরাধবোধ। গভীর ভাগচাষীর ছেলে আজ ওসি। দারিদ্র্যতার কোনও লেশমাত্র নেই এই কোয়ার্টারের কোনও অংশে। খুব ভালো থাকার রেসে যথেষ্ট ভালো স্থান দখল করেছে অর্জুন। কিন্তু প্রায়ই একটা দীর্ঘশ্বাস গিলে ফেলে। আর আজ যেন এক ঝটকায় সব স্মৃতিরা তাজা হয়ে ওঠে। ফিরে যায় দশ বছর আগে-

দশ বছর আগে সদ‍্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সেকেন্ড অফিসার অর্জুন মন্ডল। সকালে থানায় ঢুকতেই থমকে গেল। অসহায়ের মতো বেঞ্চে বসে আছেন অনিমেষ স‍্যার। আর ঠিক পেছনে চোখ পড়তেই একটা থমকে যায়। রুপসা আপাদমস্তক শাড়িতে জড়িয়ে মাথা নীচু করে বসেছিল। শরীরে অত‍্যাচারের ছাপ। চোখের কোণে কালি। মাথাটা প্রায় বুকের সাথে লাগানো।
অর্জুনকে দেখে এগিয়ে এলেন অনিমেষ স‍্যার। ছলছল চোখে কাঁধে হাত রাখলেন স্থান, কাল পাত্র ভুলে। কয়েক মুহূর্ত অর্জুনও একটু ভ‍্যাবাচ‍্যাকা খেয়েছে। তবুও নিজেকে সামলে মুখে একটা আলতো হাসি এনে স‍্যারকে সামনের চেয়ারে বসতে বললেও রূপসার দিকে আর তাকায়নি।
অনিমেষ স‍্যার চেয়ারে বসে সব ঘটনা জানান। আর সাথে অর্জুনের ওপর নিজের ভরসার কথা জানান। কিন্তু অর্জুনের মনে তখন অন্য খেলা চলছিল। সব অপমানের বদলা নেওয়ার সূত্রপাত।
কর্তব্যরত লেডি কনস্টেবলকে দিয়ে পরীক্ষার জন্য রূপসাকে লেডি ডাক্তারের কাছে পাঠায়। রূপসা হাঁটতেও পারছিলনা। হ্যাঁ, এক পৈশাচিক আনন্দ ছিল মনে। ভুলে গেছিল অনিমেষ স‍্যারের সমস্ত উপকার!

গরীব ভাগচাষীর ছেলে অর্জুন। মেধাবী ছিল কিন্তু দারিদ্রের জেরে পড়া বন্ধ হতে চলেছিল। অনিমেষ স‍্যার বাবাকে বুঝিয়ে অর্জুনের পড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অনিমেষ স‍্যার সেদিন অমন করে দায়িত্ব না নিলে আজকের এই চাকরি, পদমর্যাদা বা সামাজিক সম্মান কিছুই হতো কিনা সন্দেহ আছে। তবুও সব ভুলে গেছিল অর্জুন সেদিন। শুধু প্রতিহিংসা ছিল মনে।সেই প্রতিহিংসাতেই পঞ্চায়েত প্রধানের ছেলে রাহুলের কেসটা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। যদিও নিজেকে প্রবোধ দেয় ওপরমহলের চাপে নতুন চাকরি পাওয়া অর্জুন অসহায়।
তবে রেপ কেসের আসামীকে বেকসুর খালাস পাওয়ানোর জন‍্য অর্জুনের কম ঝামেলা পোহাতে হয়নি।
কোর্টে যখন উকিলের নানা প্রশ্ন রূপসার চোখে জল আনছিল অর্জুন যেন নিজের অপমানের বদলা সুদে-আসলে উসুলের তৃপ্তি অনুভব করছিল।
আজ এত বছর পর নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে।
সত্যিই এতবছর যা প্রতিশোধ বা উচিৎ শিক্ষা মনে করেছে আসলে সবটাই ছিল গভীর অপরাধবোধ। মুক্তি পায়নি আজও অর্জুন।
অবশ্য সেদিন অনিমেষ স‍্যার ওকে সব অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। মুক্তি! নাহ!আসলেই এক সাজা দিয়েছিলেন !

সেদিন আদালত চত্বর থেকে বেরোনোর আগে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন অনিমেষ স‍্যার। চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করেছিল অর্জুন । নির্বিকারভাবে অর্জুনের কাঁধে হাত রেখে স‍্যার বলেছিলেন,
— আমার গুরুদক্ষিণা পেলাম আজ। সঠিক শিক্ষা দিতে পারিনি তোমাকে, তাই তোমার এই কাজটাই আমার গুরুদক্ষিণা মনে করলাম। ক্ষমা করলাম তোমাকে অর্জুন। তুমিও মনে অপরাধবোধ রেখোনা।

মনটা ভার হয়ে আসে। সময় পেরিয়ে গেছে অনেক। স্মৃতিতেও পলি পড়েছিল। অথবা জোর করেই পলি জমিয়েছিল। কিন্তু পাপবোধ কমেনি একটুও। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হুইস্কির গ্লাসটা আবার টেনে নিল।

১৩|

সাত নম্বর রুমে ঢুকতেই যেন রূপসার পা দুটৌতে কেউ বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে। নড়াচড়ার ক্ষমতাও হারিয়ে গেছে। বিছানায় যে শুয়ে আছে তার সাথে আবার এই জীবনে দেখা হবে রূপসা কখনও ভাবেওনি।
যার জন্য রূপসার জীবনটা বদলে গেল সে
কেমন পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। রূপসা যেন ভুলে যায় বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটা এখন রুগী। ওষুধের জন্য ঘুমাচ্ছে। রূপসার মনে হচ্ছে এক্ষুনি ছুটে আসবে তার দিকে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।