সাপ্তাহিক শিল্প কলায় শিল্পের জন্য শিল্প – লিখেছেন অ্যালবার্ট অশোক (পর্ব – ৬৩)

গরুর বাট থেকে নাক কাটা অব্দি

কদিন ধরেই একটা শব্দ ঘুরছিল মাথায়। দি আডা(র) একটা শর্ট ফিল্ম। এবং সেটা একটা ক্রিটিক্যাল মেকিং, না দেখলে বোঝানো যাবেনা। প্রদর্শনীর গ্যালারীতে যে শিল্পীরা শর্টফিল্ম বা ভিডিও বানায়। তার একটা প্রদর্শন গ্যালারীতেই হয়। কিন্তু আমি যতগুলি ভিডিও দেখেছি, তেমন ইমপ্রেসড্‌ হইনি। দু একটা যেগুলি ইমপ্রেসড্‌ হওয়ার মতো ছিল সেগুলি পাব্লিকলি ব্যান্ড্‌। আপনি ইচ্ছা করলেই দেখতে পাবেননা, অনলাইনে।

আডারের নির্মাতা শিল্পী মারিয়ানা সিমনেট( ১৯৮৬তে জন্ম। The Udder, Marianna Simnett’s new Jerwood Prize-winning piece. ১৫ মিনিটের ভিডিও। আমি গত ৩০ বছর ধরেই, শর্ট ফিলম বানাব, বানাব করছি। শুধু তাই নয়, ১৯৮৫/৮৬ নাগাদ, আমি একটা গ্রাফিক উপন্যাস করি তা একটি সিনেমা সাপ্তাহিকের ২য় পাতায় একবছর ধরে প্রকাশ হচ্ছিল। এরপরেও অনেক স্ক্রিপ্ট আমি বানিয়েছিলাম কিন্তু সেগুলি নিয়ে বেশি এগোইনি। প্রতিবন্ধকতা ছিল। ১৫ /২০ মিনিটে দারুন ফিল্ম বানানো যায়। তো গরুর স্তন, ‘আডার’ দেখার পর আমার মাথা ঘুরে গেল। তো ফিল্মটার মধ্যে একটা চরিত্র আছে, যে একটা গ্রুর ফার্ম দেখাশুনা করে। সে বধির। একজন ফার্মের মালিক আছে আর তিনটে ভাইবোন আছে। এই হল চরিত্র সমাবেশ।
এক সুন্দর নিটোল গ্রাম্য গোচারণ ভূমির গল্প। যেখানে একটি দুধ উৎপাদন ও সরবরাহের ডেয়ারি আছে। রোবট গরুর পালক। সিসিটিভি থেকে সকল আধুনিক সরঞ্জাম এখানে আছে। এইরকম দুধের ডেয়ারীগুলি সাধারণ মানুষের কাছে কত নিরাপদ? গরুর বাট থেকে রোবট মেসিন দুধ ধুইয়ে আনে। গরুর বাটে নানা অসুখ বিসুখ জীবানু – mastitis – ব্যাক্টেরিয়া জাতীয় সংক্রমণ । দেখাশুনা করার লোকটা বলছে এখানে বাইরের কোন রোগজীবানু ঢুকতে পারবেনা, তার জন্য তেমন ব্যবস্থা যেমন কুমারীত্ব নিরাপদের মত এক বদ্ধ এলাকা। যন্ত্র বা রোবট গরুর স্বাস্থ্য দেখে, তার যৌনতা দেখে, তার দুধ দোয়ানো দেখে, সমস্ত কাজ করে দেয়। এমনকি তার বাটের চুলগুলিও কামিয়ে দেয়। অন্যদিকে মহিলা একজন যিনি খামারের মালিক, তার বড় মেয়ে ইসাবেলা ও তার ছোট দুই ছেলে। মেয়েকে বন্দী করে রাখতে চান। ইসাবেলা কিশোরি, তার আবদ্ধ জায়গায় ভাল লাগেনা, সে কোনমতে আবদ্ধ ডেয়ারিটি থেকে বেরিয়ে যায়। চারিদিকে নির্জন, সবুজ মাঠ। ইসাবেলার মা ভাবছে, ইসাবেলা খুব বেশি সুন্দরী তার কুমারীত্ব বাঁচানো বড় চিন্তার বিষয়। ইসাবেলা যেন গরুর বাট, বাইরের ধুলাবালিতে কাদা লাগবে। তার অসুখ করবে। ছেলে দুটি ইসাবেলাকে নিয়ে ফিসফাস করে কানে কানে। একটার ধারণা ইসাবেলার কিছুও হবেনা খামারের বাইরে গেলে । আরেকটা ভাবছে তাকে কেউ আক্রমন করবে।

দেখা যাচ্ছে কিশোরি ইসাবেলার মধ্যে এক নারী ও তার যৌন চেতনা জেগে উঠছে, সে লিপস্টিক মাখছে। কিন্তু পাছে যদি কোন যৌন আক্রমন হয় তার জন্য সে তার নাক কেটে ফেলল। ও কুৎসিত হয়ে নিজেকে নিরাপত্তা দেবে।
এখানে প্রশ্ন তাহলে কি কুমারীত্ব বা সতীত্বযত্ন করতে গিয়ে , যত্ন জীবনে অত্যাচারী হয়ে উঠল? এই এতটুকু গল্প দিয়ে সে অনেক প্রশ্ন ও অনেক পৌরাণিক কাহিনীর স্মরণ করেছে।
স্কটল্যান্ডের এক খ্রীস্টান সন্ন্যাসিনী, Saint Æbbe of Coldingham নাম ঈবি, তিনি সতীত্ব বা কুমারীত্বকে বড় করে দেখতেন, তিনি নান বা সন্ন্যাসিনীদের প্রধান ছিলেন। জলদস্যুর আক্রমন ও ধর্ষনের হাত থেকে বাঁচাতে নিজের নাক কেটে ফেলেছিলেন, ও সবাই তার পথ অনুসরণ করে বাকী নানেরাও নাক কেটে ফেলে। ড্যানি ও তার জলদস্যু সঙ্গীরা কুৎসিত নানদের দেখে এত রেগে গেছিল তারা পুরো হস্টেল সহ গীর্জা পুড়িয়ে ঈবি সহ সকল নানদের হত্যা করে চলে গেল। উপসংহার হল, সতীত্ব বাঁচল ঠিকই কিন্তু জীবনে বাঁচলনা কেউই।
মারি আনার শর্ট ফিল্মে জন মিলটনের কাব্যনাটক ‘কোমাস’, মিলটন যেটাকে ‘মাস্ক’ বলতেন , তার কাহিনীর ছায়া আছে। Comus, masque by John Milton, presented on Sept. 29, 1634, before John Egerton, earl of Bridgewater, at Ludlow Castle in Shropshire, and published anonymously in 1637 কোমাস অভিনীত হয়েছিল ১৬৩৪ সালে।
আমি মারিয়ানা সিমনেটের গল্পটা নিয়ে উৎসাহী ছিলাম, গল্পটা নিয়ে বিশদ পড়তে গিয়ে ঢুকে গেলাম ইংল্যান্ডের এক বিখ্যাত কবি Geoffrey Hill । যাকে নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। যে কবিকে নিয়ে প্রচুর বাকবিতন্ডা আছে। তিনি নাকি দুর্বোধ্য কবি। অনেকে অনেক রকম কথা বলেন। কিন্তু বৃটেনের বড় বড় সাহিত্যিকরা তাকে উচ্চপ্রশংসা করেন। নোবেল লরিয়েট Seamus Heaney সীমাস হিনি সহ অনেকেই জিওফ্রে হিলের ৫০ বছরের উপর সাহিত্য সাধনা, গোঁড়া ইংলিশ, ও ট্রাডিশনাল মূল্যবোধ, ও কবিতাকে শ্রদ্ধা করেন। তার লেখা Scenes from Comus জন মিলটনের কোমাস কাব্য নাটকের থেকে নেওয়া।
আমার আগ্রহ বেড়ে গেল জিওফ্রে হিলের লেখার উপর। তার কবিতা পড়তে লাগলাম। কবিতার ব্যাখ্যা পড়তে লাগলাম। কবিতার ভিতর এক সমুদ্র বিষয় থাকে। তার আঙ্গিক উপস্থাপনা ইত্যাদি উপলব্ধির বস্তু ও পড়ার আসক্তি।
প্যারাডাইস লস্ট এর উপাদান ও পশ্চৎভুমিতে ঢুকে গেলাম। জন মিলটনের ব্যক্তিগত জীবন, কোন ঘটনা কোন ঘটনাকে জন্ম দিচ্ছে। গ্রীকপুরাণ এর গল্প, Comus কোমাস এক চরিত্র, সে উৎসব, আনন্দ ও রাতের কামনার চপলতার ঠাকুর। ডাইওনিসাসের (Greek mythology) god of wine and fertility and drama; the Greek name of Bacchus পুত্র, ডাইওনিসাস হল মদ ও উর্বরতার ঈশ্বর। কোমাস কামুক। সে পথচারীদের ঠকায় ও তাদের যাদু মদ খেতে দেয়। পথচারীরা সেই মদ খেলেই জন্তু হয়ে কোমাসের সাথে থাকে। সে রাতকে ঘুমের জন্য ভাবেনা, সবাইকে বলে রাত হল স্ফুর্তির জন্য। সুতরাং স্ফুর্তি কর সবাই। একদিন এক মহিলা রাস্তা হারিয়ে বনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল, কোমাস যাদুবলে এক সাধারণ রাখালের বেশ ধরে মহিলার কাছে গিয়ে বন্ধুর মত আচরণ করে তার উপর বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করল। বলল, সে মহিলাকে সাহায্য করতে পারে সে এই বনেই থাকে। মহিলা জানাল তার দুইভাই সহ সে তার বাপের রাজ্যে যাচ্ছিল, পথে এই বনে এসে দুজনকেই হারিয়েছে। কোমাস মিস্টি কথা বলে মহিলাকে আশ্বস্ত করল, সে তার দুইভাইকে খুঁজে দেবে প্রতিশ্রুতি দিল। মহিলা আশ্বস্ত হয়ে কোমাসে্র সাথে চলল। রাতে কোমাস মহিলাকে মদ দিল খেতে, মহিলা খাবেনা। সে জানে মদ খেলে লোকে দুর্বল হয়ে পড়ে, আর সতীত্ব হারায়। কোমাস তাকে বোঝায় সতীত্ব আর সৌন্দর্য চিরদিনের নয়, কোমাসের কথায় রাজী না হয়ে সে যৌনসুখ হারাচ্ছে, তার সুন্দরতার মাহাত্ম্য হারাচ্ছে। কিন্তু মহিলার ওই এক সুর। সে সতীত্ব হারাবেনা।
এদিকে বনে দুইভাই আলাপ করছে, তারা খুব চিন্তিত তাদের বোনের জন্য। বড় ভাই ভাবছে, বোন সুন্দরী বিপদে পড়বে, তার কুমারিত্ব কে বাঁচাবে। ছোটভাই প্রবোধ দিচ্ছে, বোন তার কুমারিত্ব নিয়ে খুব সচেতন সে এসব হতে দেবেনা। এই কথা গুলি বনের পাশে এক পরী Sabrina নাম সাব্রিনা, শুনে তাদের সামনে রাখালের বেশে এসে বলে, কোমাস নামে এক বদ লোক থাকে, তার কাছে তাদের বোন বন্দী। তখন ঐ জলপরী দুইভাইকে নিয়ে এসে বোনকে উদ্ধার করে।ও তারা বাপের বাড়িতে গিয়ে আনন্দ উৎসব করে।
মিলটন এটাকে নাচের ও গানের মাধ্যমে কাব্যনাটিকা করে রূপদান করেন।
জিওফ্রে হিল তার ৭০ বছর বয়সে ‘ সিনস ফ্রম কোমাস’ কাব্যগ্রন্থটি রচনা করেন তিন খন্ডে। ইংল্যান্ডে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। শর্ট ফিল্মের পরিচালিকা মারিয়ানা সিমনেট, জিউফ্রে হিলের সিন্স ফ্রম কোমাস , সেখান থেকেই তার আডারের চরিত্রের ভাবনাগুলি জারিত করেন।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!