সাপ্তাহিক শিল্পকলায় শিল্পের জন্য শিল্প – লিখেছেন আলবার্ট অশোক (পর্ব – ৩১)
প্রি–রাফায়েলাইট
প্রি-রাফায়েলাইট ( Pre-Raphaelite Brotherhood) “PRB” কারা ছিল, জানেন?
সবাই বুঝবেননা, যারা দৃশ্যগত দুনিয়ার, ছবি ভাস্কর্য নাটক ও সাহিত্য পড়াশুনা করেন ইতিহাস জানেন, তারাই বুঝবেন, আমার উদাহরণ। আমি জানি আপনি আমার চেয়ে অধিক বিদ্বান , তর্কের খাতিরে ফাঁক ফোকর খুঁজবেন, আমার কথা ভ্রান্ত প্রমান করার চেষ্টা করবেন, কিন্তু আমি অটল এটাই জানবেন।
১৮৪৮ সালে প্রি রাফালাইট মুভমেন্ট শুরু। এই শিল্প আন্দোলন, আজকে যে স্বাধীনতা শিল্পীর ভাবনার জন্য বলি তার গ্রহনীয় দর্শনের জমি তৈরি করে দিয়েছিল। মাত্র কয়েকটি মানুষ।
১৮৭২ নাগাদ ইম্প্রেসনিজম, ১৮৮০ নাগাদ পোস্ট ইম্প্রেসনিজম, ১৯০৫ সালে ফভিজম, ১৯০৭ সাল নাগাদ কিউবিজম,১৯১৫ সাল নাগাদ ডাডাইজম, ১৯২০ তে সার–রিয়ালিজম,এরপর ক্রমশঃ অনেক আর্ট মুভমেন্ট। ১৯৪০ এ ম্যাজিক রিয়ালিজম, ১৯৫৪তে অ্যান্টি পোয়েট্রি এইভাবে আপনি যদি ইতিহাস দেখেন। মানুষ নিজেকে মেধা খরচ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। আর এই স্বাধীনতা সমাজকে বিকশিত করেছে। প্রভাবিত করেছে বোধের জাগরণ দিয়ে। ইউরোপ আমেরিকা নিজের জাগরণ পেয়েছে এইসব সাংস্কৃতিক বিকাশের মাধ্যমে। ওখানে লেনিন -মাও- কাস্ত্রোর মত খুনেদের বিপ্লব তৈরি হয়নি। অনেক সুন্দর কৃষ্টি এমনিতেই এসেছে। মার্ক্স এঙ্গেলস যেখানে যেখানে গেছে সেই জায়গা গুলিতেই অতিরিক্ত পচন এসেছে। রাশিয়া, তাড়াতাড়ি বুঝে ছিল, চীন খোলনলচে পালটে একনায়ক্ত্ব কায়েম করে চলছে। আর বাংলা? একটা জাতি বিষাক্ত- ভোপালের গ্যাসের চেয়েও অধিক পঙ্গুত্ব করে দিয়েছে। আজকের বাংলা একদিনে এমন হয়নি।
এই শিল্প আন্দোলনগুলি কিন্তু ঐ হাতে গোনা ৫/৭ জন ব্যক্তির সাংস্কৃতিক ভাবনার ফসল। ভাবুন কিউবিজম , ডাডাইজম , ইম্প্রেসনিজম, এক্সপ্রেসনিজম, অ্যাবস্ট্রাক্ট ইত্যাদি শব্দগুলির মানে না জানলেও শব্দগুলি নিয়ে লোকের ভালবাসার কৌতূহলের অবকাশ নেই। এখানে রক্তপাতের দুঃস্বপ্ন নেই। আছে আনন্দ। অনাবিল আনন্দ। আমি সেই আনন্দের খোঁজ আপনাদের দিই। আমি বিশ্বাস করি এই সাংস্কৃতিক জাগরণ, চর্চা একমাত্র মহৌষধ, বাংলার বুকে নতুন সূর্যের আলো আনার।

left side: Presumed portrait of Raphael, right side:Raphael, The School of Athens
১৮৪৮ সালে, লন্ডনে, এক গুপ্ত সোসাইটি তৈরি হয়। কিছু শিল্পী ও লেখক মিলে। তাদের নাম Pre-Raphaelites। ঐ সময় লন্ডনের রয়্যাল অ্যাকাডেমি রাফায়েলের কাজ, শিল্প কর্ম , সুন্দরের ও শিক্ষার দৃষ্টান্ত স্বরূপ, ব্রিটিশ দের মধ্যে রাফায়েলের আদর্শ ও মহত্বের প্রচার ও প্রভাব বিস্তার (promotion) চালাচ্ছিল। রাফায়েল (Raffaello Sanzio da Urbino, known as Raphael, a renaissance master) জন্মান ১৪৮৩তে, মারা যান ১৫২০তে, জন্ম মৃত্যু ইতালিতে। প্রি রাফায়েলাইটরা বা সেই গুপ্ত সমিতির লোকেরা রয়্যাল অ্যাকাডেমির এই কাজটির বিরুদ্ধাচরণ করছিল। এছাড়াও তারা তখন যেসব খুব জনপ্রিয় নানা ছবি শিল্পীরা বানাচ্ছিল, যেমন এই বাংলাতে দেখবেন, সর্বত্র, শিল্পী মানেই কোন মেধাবী কিছু নয়, বুদ্ধের মুখ, রাধা কৃষ্ণ, গণেশ, দেসবদেবী, পাতি ল্যান্ডস্কেপ ইত্যাদি ক্লিশে জিনিস বানায়, আশা করে বিক্রী হয়ে যাবে। কিন্তু বিক্রী হয়না। তবু এই ট্র্যাশগুলির শিল্পী ২০০০ টাকায় যদি কোন একটা ক্যানভাস বিক্রী করে, ভাবে বড় দরের শিল্পী হয়ে গেছে ফেবুতে তার পোস্ট চলে। অথচ এগুলিকে সবাই মন্দ বলে , মিডিওকার বলে, তাতে তারা লজ্জা পায়না। ঠিক তেমনি, ঐ সময় ব্রিটিশদের মধ্যেও চলছিল।
প্রী রাফায়েলাইটরা জন রাস্কিনের (John Ruskin 1819 -1900) কথা তেমন শুনত। জন রাস্কিন হলেন সেই সময়ের একজন লেখক শিল্পী ও শিল্প সমালোচক। জন রাসকিন বলতেন,”প্রকৃতির কাছে যাও ‘go to nature’” । প্রি রাফায়েলাইটরা, ভাবতেন, শিল্প হল খুব আত্মগম্ভীর ব্যাপার। তাকে অধিক বাস্তবতা দিয়ে ধরতে হবে।তারা প্রথমে পুরাণ থেকে, সাহিত্য বা কবিতা থেকে, – যেগুলি প্রেম, জন্ম মৃত্যু নিয়ে বিষয় থাকে। বা আধুনিক সামাজিক সমস্যা নিয়ে ছবি বা সাহিত্যের পরিকল্পনা ভাবত। এই ছোট দলটার মূল সদস্যরা হলেন William Holman Hunt, John Everett Millais, and Dante Gabriel Rossetti.

Christ in the House of His Parents, by John Everett Millais, 1850
১৮৬০ সাল থেকে , দ্বিতীয় দফায়, প্রি রাফায়েলাইটরা সমাজে অধিক প্রভাব বিস্তার শুরু করেছিল। রোসেটির (Dante Gabriel Rossetti) কাজ থেকে ও তারা অধিক অনুপ্রেরণা পেয়েছিল। রয়্যাল অ্যাকাডেমির নীতি যা তাদের কাছে মনে হয়েছিল, কল্পনা বিহীন ও কৃত্রিম ইতিহাসজাত তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। ১৪ ও ১৫ শতাব্দীর ইতালীর পেইন্টিংকে রয়্যাল অ্যাকাদেমি মনে করত আদর্শ। আর পূর্ব রাফায়েল, বা প্রি- রাফায়েল যারা , তারা মনে করত, রেনেশাঁ যখন মধ্য গগনে, বা রাফায়েলের আগের যে সময় ছিল, যেখানে প্রকৃতির ছবি জটিল হয়নি , সেই সব সময়ের আদর্শ।
এই প্রি রাফায়েলাইট রা বয়সে নবীন ছিল ধরে নিন তাদের আন্দোলন যখন করে তাদের গড় বয়েস ২৫ বছর।
অ্যাকাডেমিক শিল্প শিক্ষা, কিছু গোঁড়ামি সহ রয়্যাল অ্যাকাডেমি (Royal Academy of Arts) প্রবর্তন করতে চেয়েছিল। রয়্যাল অ্যাকাডেমিএর পত্তন করেন Sir Joshua Reynolds, প্রি রাফায়েলাইটরা ব্যংগ করে স্যার যোশোয়াকে বলত “Sir Sloshua” স্যার স্লোশোয়া। শ্লশি (“sloshy”)থেকে শ্লোশোয়া। শ্লশি মানে কোন তরল বস্তু, বা পেইন্টিং করার সময় বিশ্রী ভাবে ,রঙ ছিটিয়ে নষ্ট করা।
প্রি রাফায়েলাইটরা দেখিয়ে দিয়েছিল রয়্যাল অ্যাকাডেমির অ্যাকাডেমিক নীতি থেকে অনেক গুণ ভাল কিছু কাজ। এখানে কিছু ছবি সেই সময়ের
এত কিছু বলার পর আমি আবার পাঠককে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। বাংলাকে উন্নতি করতে হলে পড়া, চর্চা ও মেধা দিয়ে সংস্কৃতির বিকাশ করতে হবে। আর এ সম্ভব হাতে গোনা কয়েকজন নিয়েই। দেখতে হবে গাধা গরু নিয়ে যেন না হয়। একজন অভিজ্ঞ সাংস্কৃতিক মানুষের অধীনেই সম্ভব।
১৮৫০ সালে, প্রি-রাফেলাইট ব্রাদারহুড বিতর্কের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছিল,মিলাইসের চিত্রকর্ম Christ in the House of His Parents প্রদর্শনীর পরে বহু পর্যালোচক ছবিটাকে ঈশ্বর নিন্দনীয় বলে বিবেচনা করেছিল। বিখ্যাত চার্লস ডিকেন্সও নিন্দা করেন। ডিকেন্স মিল্লাইস মেরিকে কুৎসিত বলে মনে করেছিলেন। মিল্লাইস তাঁর ছবিতে মেরির মডেল হিসাবে তাঁর শ্যালিকা মেরি হজকিনসনকে(Mary Hodgkinson) ব্যবহার করেছিলেন। ভ্রাতৃত্বের মধ্যযুগীয়তাকে আক্রমণ করা হয়েছিল পিছিয়েপড়া হিসাবে এবং ছবিতে বেশি পুংখানুপুংখ বর্ণনা ও নিষ্ঠাকে কুৎসিত ভাবা হয়েছিল। এবং চোখের কাছে ঝাঁকুনি হিসাবে নিন্দিত হয়েছিল । ডিকেন্সের মতে, মিল্লাইস পবিত্র পরিবারকে মদ্যপ এবং বস্তিবাসীদের মত চেহারা এঁকেছিল, সংকীর্ণ এবং অযৌক্তিক “মধ্যযুগীয়” ভঙ্গিকে উপস্থাপনা করেছিল।
এই বিতর্কের পরে, কলিনসন ভ্রাতৃত্ব ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন এবং বাকী সদস্যরা তার জায়গায় চার্লস অ্যালস্টন কলিনস Charles Allston Collins বা ওয়াল্টার হাওল দেভেরেলকে Walter Howell Deverell বদল করা উচিত কিনা তা নিয়ে আলোচনার জন্য বৈঠক করেছিলেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। সেই দিক থেকে এই দলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, যদিও এর প্রভাব অব্যাহত ছিল। শৈলীতে কাজ করা শিল্পীরা শুরুতে অবিরত থাকলেও আর “PRB” র নামে কাজ করেনি।
The Times, Saturday, 3 May 1851; pg. 8; Issue 20792: Exhibition of the Royal Academy. (Private View.), First Notice: “We cannot censure at present, as amply or as strongly as we desire to do, that strange disorder of the mind or the eyes which continues to rage with unabated absurdity among a class of juvenile artists who style themselves “P.R.B.,” which being interpreted means Pre-Raphael Brethren. Their faith seems to consist in an absolute contempt for perspective and the known laws of light and shade, an aversion to beauty in every shape, and a singular devotion to the minute accidents of their subjects, including, or rather seeking out, every excess of sharpness and deformity.”
দ্য টাইমস, শনিবার, ৩ মে ১৮৫১; পৃষ্ঠা ৮; ২০৭৯২ সংখ্যা: রয়্যাল একাডেমির প্রদর্শনী। (প্রাইভেট ভিউ।),ভাল সমালোচনা করেনি। উপরের বয়ান থেকে তাই বোঝা যায়।