সাপ্তাহিক শিল্পকলায় “ভারত ও পাকিস্থানের দুই পিকাশো – ৫”- লিখেছেন আলবার্ট অশোক (পর্ব – ২০)

মকবুল ফিদা হোসেন

সৈয়দ সাদেকোয়ান আহমেদ নকভি –

মকবুল ফিদা হুসেন  তাঁর সমসাময়িক যে কোনও শিল্পীর চেয়ে বেশি অর্থ উপার্জন করেছেন, তবু তাঁর জীবনযাপন  জিপসির/যাযাবরের মতো ছন্নছাড়া ছিল। তিনি তথাকথিত জেট সেট ( বিত্তশালী ও ক্ষমতাশালী) সমাজে চলাফেরা করেছেন কিন্তু মদ পান করেন নি, ধূমপান করেন নি বা বা কোন রকম সমালোচিত হওয়ার মতো খারাপ কাজ করেননি। লাইফ স্টাইলটি বিজোড় হতে পারে, ইন্তু তিনি যাই করেছেন সবগুলি নিয়েই তার জীবন। তবে মকবুল ফিদা হুসেন প্রতিটি ভারতীয় শিল্পীর চেয়ে পরিমাণে ও গুণগত মানে বেশি ছবি এঁকেছিলেন।
তিনি ডজন ডজন  অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতেন এবং সবগুলিই বাতিল করতেন ।তাকে সমাজের উপরের স্তরের লোকেরা, সুন্দর সুন্দর মানুষেরা তাকে খাওয়াতেন ও তাকে সিংহ বানিয়েছেন, কিন্তু দিনের শেষ তার কিন্তু বন্ধু হাতে গোনা কয়েকজন রাখতেন। তিনি পর পর কয়েকদিন একই পোশাক পরতেন এবং বিকেলে  তার ফিয়াটের পিছনের সিটে কোঁকড়ে বিকেলের ঘুম ঘুমাতেন। তার মজা করার ধারণা ছিল তার বন্ধুদের সাথে বাচ্চাদের মত ইয়ার্কি করা আর তার পাপ সম্পর্কে ধারণা ছিল অন্তহীন চা খাওয়া।
তার চেহারার মধ্যে একটা দীপ্তি থাকত। লম্বা চওড়া গড়ন , সাদা চুল দাড়ি, চোখ থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, উজ্জ্বল সাদা পোশাক। যেন দেবদূত। এই চেহারা যে কোন মানুষকে বশীভূত করে দিতে পারত।
পৌরাণিক স্তর: হুসেন নিজের চারপাশে জড়িয়ে রেখেছেন এমন পৌরাণিক কাহিনী যা আঁকার জন্য একটি অবিশ্বাস্য শারীরিক প্রাণবন্ততা তার ছিল। যেন একটি শৈল্পিক ডায়নামো যা তিন ঘণ্টার মধ্যে শিল্পের একটি উজ্জ্বল ক্যানভাস নামিয়ে দিতে পারে। (তাঁর বিখ্যাত মহাভারত সিরিজের  ২৯ টি বিশাল বিশাল ক্যানভাস আঁকতে কেবল দু’মাস লেগেছিল।
হুসেন যেখানে সেখানে বসে ছবি আঁকতেন।
হুসেন পিকাসোর আদর্শে বিশ্বাসী, পিকাশো বিশ্বাস করতেন: “যখন তুমি তোমার কাজের কাছে চলে আস, তখন তুমিই সবকিছু তোমার কাছে। তুমি তখন একটি সূর্য, তোমার পেটে তখন এক হাজার রশ্মি (“When you come right down to it, all you have is yourself. Your self is a sun with a thousand rays in your belly.”)
হুসেনের ক্ষেত্রে আগুন ঠিক তার পা পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল। তিনি এক জায়গায় এক ঘন্টার বেশি বসে থাকতে পারবেন না; এক সপ্তাহের বেশি এক শহরে থাকতে পারেন না এবং এক মাসের বেশি সময় বিদেশে থাকা তার কাছে অসম্ভব। তিনি  অপ্রত্যাশিত সময়ে  অপ্রত্যাশিত জায়গায় হঠাৎ হঠাৎ উদয় হতেন। আগে কিছু না জানিয়েই বন্ধুর অ্যাপার্টমেন্টের মেঝেতে তার দীর্ঘ, লম্বা ফ্রেমটি ছড়িয়ে  আঁকতে বসে যান, আবার কাউকে কিছু না জানিয়েই পরের দিন অদৃশ্য হয়ে যেতেন। হুসেনের বন্ধুরা কেউ তাতে কিছু মনে করতেননা। কারণ সবাই তাকে শ্রদ্ধা করতেন।
মকবুলের ছবি খুব সাধারণ ও বাচ্চাদের মতন। তিনি তার মনের ছবিটার একটা রেখা দিয়ে এঁকে নিতেন, তারপর ইচ্ছেমত পছন্দের রঙ দিয়ে ভরতেন ভারী পোছ বা ইম্পেস্টোর মত করে। কোন টোনাল কোয়ালিটির ধার ধারতেননা সীতা এঁকে না বোঝানো গেলে পাশে সীতা লিখে দিতেন। কোনরকম জটিল কথাবার্তায়, ভাবনায় যেতেননা। মোটা মোটা রেখা তার ফিগার গুলি ধরে রাখত। তিনি সবরকম উজ্জ্বল বা ম্লান রঙ ব্যবহার করতেন। আর সব ক্যানভাসই বড় বড়। তার ছবির চরিত্রগুলির মধ্যে বেশি ঘোড়া, আর নারী। ছবি আঁকার প্যাটার্ণ  জীবনের ২য় ভাগের পর একই রকমের। অনেক সময় হাত, পা, মুখ আঁকতেননা।
হুসেনের আঁকার প্যাটার্ণকে অনেকেই চালাকি মনে করতেন ও সমালোচনা করতেন। কিন্তু তাতে হুসেনের কোন প্রতিক্রিয়া ছিলনা।
তার কোন স্টুডিও ছিলনা। আর ঘন্টা দেড় দুইয়ের মধ্যেই যা আঁকার তা আঁকতেন। যেখানে যেতেন সেখানেই ক্যানভাস ও রঙ তুলি নিয়ে যেতেন, সেখানেই সেসব ফেলে রেখে আসতেন, সাথে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন ছিলনা। তার অর্থ  ৬০ বছরের আগেই তিনি অনেক টাকার মালিক হয়ে পড়েছিলেন। ফলে বস্তুর উপর তার কোন মায়া বা টান ছিলনা। রাজকীয়তা ছিল তার স্বভাব।
শৈল্পিক আগুন তাকে গ্রাস করেছিল,  তার বয়সে সমসাময়িক বেশিরভাগ শিল্পী যখন  অবসর গ্রহণের কথা ভাবছে এমন এক বয়সে হুসেন  উদ্দীপ্ত। তারুণ্যে ভরপুর। তিনি  দিনে কয়েক মাইল হাঁটতেন, প্রায়শই খালি পায়ে, দীর্ঘ এবং লম্বা লম্বা কদমে যা বেশিরভাগ ক্রীড়াবিদকে লজ্জাইয় ফেলে দিতে পারত। তাঁর শৈল্পিক কাজকর্ম পূর্বের তুলনায় আরও সুন্দর এবং জীবনের প্রতি তার  ক্ষুধা, শেষ হবার ছিলনা।। হুসেনের  জীবন একটি যাদু রহস্য ভ্রমণ, এবং এটি উদযাপনের তার পদ্ধতিটি তাঁর নিজস্ব।
জন্মসূত্রে হুসেন নামে একজন ভারতীয় নাগরিক ২০১০ সাল অব্দি, ৯৫  বছর বয়সে লন্ডনের একটি হাসপাতালে কাতারি নাগরিক হিসাবে ২০১১ সালে মারা যান।

একনজরেঃ
জন্ম 17 সেপ্টেম্বর 1915, মৃত্যু 9 জুন 2011 (বয়স 95 বছর)
পেশা পেন্টিং, পেইন্টিং স্টাইল কিউবিস্ট
শিক্ষা স্যার জে জে স্কুল অফ আর্ট (Sir Jamsetjee Jeejebhoy School of Art in Mumbai) ২বছর ক্লাশ করেন পরে রোজগারের জন্য ছেড়ে দেন।
পুরষ্কারঃ পদ্মশ্রী (১৯৬৬) পদ্মভূষণ (১৯৭৩), পদ্ম বিভূষণ (১৯৯১),কেরালা সরকার কর্তৃক রাজা রবি ভার্মা পুরষ্কার (2007)। সম্মানসূচক ডক্টরেটস – বানারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া এবং মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় শিল্প পুরষ্কার (২০০৪) ললিত কলা আকাদেমি, নয়াদিল্লি। আজীবন অর্জনের জন্য আদিত্য বিক্রম বিড়লা ‘কলাশিকার’ পুরষ্কার (1997) Aditya Vikram Birla ‘Kalashikkar’ Award (1997)।
সেরা পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (1968)।National Film Award for Best Experimental Film (1968) for ‘Through the Eyes of a Painter’ in India.
বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে Golden Bear short film award (1967) for his film ‘Through the Eyes of a Painter’ at Berlin International Film Festival and was purchased by Museum of Modern Art (MOMA), New York.
আন্তর্জাতিক  International Biennale Award (1959), Tokyo. টোকিও।
রাজনৈতিক কর্মজীবন রাজ্যসভার সাংসদ (12 মে 1986 – 11 মে 1992) রাজীব গান্ধীর আমন্ত্রণে
জাতীয়তা ভারতীয় (1915-2010),কাতারি (২০১০-২০১১)

শেষ

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!