সাপ্তাহিক শিল্পকলায় শিল্পের জন্য শিল্প – লিখেছেন আলবার্ট অশোক (পর্ব – ৩৫)
ইজম ও শিল্প রচনার বিবর্তন
‘ইজম’ কি মোটামুটি আমি দেখিয়েছি, আমার গত প্রকাশিত ধারাবাহিক লেখায়। আমি সেইসব ‘ইজম’ গুলি প্রকাশ করেছি যেগুলি সাধারণতঃ সাধারণ পাঠকের কাছে ও শিক্ষার্থীদের কাছে আগ্রহ ও কৌতূহল ছিল। ইজম হল সহজ কথায়, বৌদ্ধিক বিকাশ যেখানে একের পর এক শিল্পীরা নতুনের সন্ধান এনেছেন। এই আনার জন্য তারা সামাজিক পটকে কাজে লাগিয়েছেন, সমাজকে জানিয়েছেন তাদের নতুন দর্শণের কথা। সমাজ নতুন ভাবনাতে সমৃদ্ধ হয়েছে।
যদি এই ইজম বা নতুনের আন্দোলন না থাকত, সমাজ বিকাশ হতোনা। সেই নিরিখে ইজম হল, বুদ্ধির বিকাশ ও নতুন কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয়। সমাজ ও শিল্প সংস্কৃতি হল নদীর মতন চলমান।জোয়ার ভাটা থাকে। তাতে ভালমন্দ ঘটে।
ছবি আঁকলেই বা শিল্প সংস্কৃতিতে কিছু করলেই শিল্পী হওয়া যায়না। ৯৯ শতাংশ মানুষই কারিগর পর্যায়ের। তারা একজনের থেকে কিছু শেখে, একই ছাঁচে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে উৎপাদন করে।যেমন দূর্গা প্রতিমার মুখের ছাঁচ কুমোরেরা করে। সাধারণ মানুষ তাদের শিল্পী বলে, এমন শিল্পী তো লাখে লাখে হয়, কয়জনকে লোকে মনে রাখবে? আর কয়জনের কাজ তাদের কাছে সৃষ্টি বলে মনে হয়? কয়জনের কাজ সংগ্রহশালায় স্থান পায়? বিশেষ কাজ না হলে সংগ্রাহক তা সংগ্রহ করবেনা, ফলে, সবার কাজ বিশেষত্ব না পেয়ে জঞ্জালে চলে যাবে।
আপনার ঘর সাজাতে যে ছবি লাগে তা তৈরির জন্য লাখো কবি শিল্পী সাহিত্যিক প্রমুখ আছে। মিউজিয়াম সাজাতে লাখে একজনকে পাওয়া যায়। যিনি বিশেষ কিছু তৈরি করেছেন ও অবদান রেখেছেন। এই বিশেষ অবদান সৃষ্টি তারাই করতে পারেন যিনি এই নিয়ে চর্চা করেন, পড়াশুনা করেন, গবেষণা করেন। এসবের জন্য দরকার শিল্পের ইতিহা। ইতিহাস শিল্পের আন্দোলন ও তার বিশেষত্ব লিখে রাখে, আমরা সহজ কথায় এসব ইতিহাস ও তার পশ্চাদভূমিকাকে ইংরেজি ভাষায় বলি ‘ইজম’(ism)।
আদিম শিল্প- গুহাযুগের মানুষদের সৃষ্ট গুহার দেওয়ালে আঁকার পর হাজার হাজার বছর কেটে গেছে। আধুনিক যুগে অনেক বৌদ্ধিক আন্দোলন এসেছে, সেগুলি বাংলাভাষায় চর্চার অভাবে বাংলা নাম করণ হয়নি। যেমন- Chronological Order ◦ Mannerism (mid 1500s) ◦ Neo classism (mid 1700s) ◦ Romanticism (late 1700s- early 1800s) ◦ Realism (France, mid 1800s) ◦ Impressionism (late 1800s) ◦ Post Impressionism (very late 1800s and into the turn of the 20th century) ◦ Symbolism (Turn of the twentieth century) ◦ Cubism (first two decades of 1900s) ◦ Surrealism (birth in 1924) ◦ Abstract Expressionism (birth in 1940s)।
সুতরাং শিক্ষার্থী বা আগ্রহী শিল্প প্রেমিকদের এসব ইতিহাস না জানা থাকলে ছবি ভাস্কর্য বোঝা একেবারেই অসম্ভব। সব ছবি একই মনে হবে। আর অন্ধের মতন মানে খুঁজবেন। যেমন প্রিরাফায়েলাইট, রিয়েলিজম, ন্যাচুরালিজম, ফটোরিয়েলিজম, ম্যাজিক রিয়েলিজম, ইত্যাদি। বা ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ ও ‘মানুষের জন্য শিল্প’ এসব কথার অর্থ কি?
আজকে, এই ২০২১ সালে দাঁড়িয়ে বাংলা ও ভারতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক অধঃপতন এতই নীচে এসে দাড়িয়েছে, তার সাথে জটিলতাও বেড়েছে, মানুষ বাধ্য হয়ে পড়ছে ফাঁকি দিয়ে, বা যেনতেন করে টাকা রোজগার , শুধু রোজগার নয়,বাঁচার জন্য, প্রয়োজনের অতিরিক্ত রোজগার ও প্রতিযোগিতায় রোজগার। ফলে, পড়াশুনায় সময় বার করা মানুষের কাছে মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে। এরকম পরিস্থিতি থেকে সমাজ ও মানুষের উন্নতি একদম শূন্য। যে দায়িত্ব সরকারের ছিল, বা সমাজের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলির ছিল তা সব স্তব্দ।

In Parmigianino’s Madonna with the Long Neck (1534–1540), Mannerism makes itself known by elongated proportions, highly stylized poses, and lack of clear perspective.
উপরের ছবিটি ম্যানারিজমের (Mannerism)
গিরোলোমো ফ্রান্সেসকো মারিয়া মাজোলা (Girolamo Francesco Maria Mazzola (11 January 1503 – 24 August 1540), also known as Francesco Mazzola or, more commonly, as Parmigianino), ফ্রান্সেসকো মাজোলা নামেও পরিচিত বা আরও সাধারণভাবে, পারমিজিনিনো নামে, ইতালিয়ান, তার শহর” ছোট্ট পার্মার”এ। তিনি ছিলেন একজন ইতালীয় ম্যানারিস্ট চিত্রশিল্পী এবং প্রিন্ট মেকার যা ফ্লোরেন্স, রোম, বোলোগনা এবং তার আদি শহর পার্মে পরিচিত ছিলেন। তাঁর ছবিতে একটি “সূক্ষ্ম কামুকতা” (“refined sensuality”) থাকে এবংসবসময়েই একটু লম্বাটে ধরণের ফিগার দেখা যায়। তিনি প্রথম প্রজন্মের সেরা পরিচিত ম্যানারিস্ট শিল্পী হিসাবে চিহ্নিত হন। এখানে তার কিছু ছবি দেওয়া হল।
যেকোন শিল্প সৃষ্টিতে স্রষ্টার একটা অননুকরণীয় ভংগী (নির্মাণে, ভাবনায়, উপস্থাপনায় ইত্যাদিতে) থাকে। কেউ এই ভংগী ১০০ ভাগ অনুকরণ করতে পারেনা। কারণ যিনি অনুকরণ করেন, তার নিজের একটা কাজের ঢং থাকে। ফলে স্রষ্টার বিশেষ ঢংটির আলাদা মূল্য থাকে। মূল্য পায়। স্রষ্টা যতগুলিই কাজ করেন প্রতিটিতে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট বিরাজমান থাকে। দর্শক এই বিশেষ ঢং দেখে চিনতে পারেনা শিল্পীকে।
“ম্যানারিজম”(Mannerism) শব্দটি ইতালীয় ম্যানিরা ( maniera,) থেকে এসেছে, যার অর্থ “স্টাইল” বা “পদ্ধতি”(“style” or “manner”)। ইংরেজী শব্দ “স্টাইল” এর মতো, ম্যানিরা হল নির্দিষ্ট ধরণের স্টাইল (হতে পারে সুন্দর শৈলী, বা একটি কুৎসিত শৈলী) বা এমন একটি নিখুঁত কাজ মনে হতে পারে যেটির কোনও গুণ বলে দিতে হয়না। লাইভস অফ দ্য এক্সিলেন্ট পেন্টার্স, স্কাল্পটরস এ্নড আর্কিটেক্টস Lives of the Most Excellent Painters, Sculptors, and Architects (1568) এর দ্বিতীয় সংস্করণে জর্জিও ভাসারি (Giorgio Vasari) তিনটি ভিন্ন প্রসঙ্গে ‘ম্যানিরা” শব্দটি ব্যবহার করেছেন: শিল্পীর পদ্ধতি বা কাজের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করার জন্য; ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীর শৈলীর বর্ণনা দিতে, যেমন বাইজেন্টাইন স্টাইল (Byzantine style) বা মাইকে্লএঞ্জেলোর ম্যানিরাকে/স্টাইলকে বোঝাতে বা শৈল্পিক মানের একটি ইতিবাচক কথা বলতে।
রেনেশাঁ আর্ট/শিল্প যখন চরম বিকশিত, সাল হিসাবে ১৫২০ থেকে ৩০ নাগাদ। এবং ষোড়শ শতাব্দীর শেষ অবধি, শিল্পীরা নিজস্বক শৈলীতে বিশ্বাস করতেন। তারপর বারোক স্টাইল (Baroque style) এ চাপা পড়ে যায় সতের শতাব্দীতে। রেনেশাঁর সময় শিল্পীরা proportion, balance, and ideal beauty র উপর জোর দিত। কিন্তু ম্যানারিজমের কৌশল ছিল এগুলি অতিরঞ্জিত করে আরো বিশেষ আকর্ষন বাড়ানো। অর্থাৎ বাস্তবকে সুন্দরের জন্য কিছু অতিরঞ্জন করা প্রয়োজন হয়েছিল। দেখা গেল ফিগারের proportion ঠিক নেই কিন্তু ভাল লাগছে দেখতে। কিংবা অধিক কুৎসিত বা ভারসাম্যতা নেই অথচ দৃষ্টি নন্দন।
শিল্পের কাজ মানুষকে চিত্তবিনোদন ও ভাবনাকে পৌছে দেওয়া। ম্যানারিজমে শিল্পের গুণ বেড়ে উঠেছে, বা মানুষের আকর্ষণ বেড়েছে।
ম্যানারিজম শিল্পের সকল ক্ষেত্রেই বিস্তৃত। কবিতা গান নাটক ইত্যাদি। ম্যানারিজমের কিছু উদাহরণ এখানে দেওয়া হল।
জিউসেপ আর্কিম্বোলোডো (Giuseppe Arcimboldo ইতালিয়ান) (1526 বা 1527 – 11 জুলাই 1593) একজন ইতালিয়ান চিত্রশিল্পী ছিলেন যিনি ফল, শাকসব্জী, ফুল, মাছ এবং বইয়ের মতো সামগ্রীর সম্পূর্ণরূপে তৈরি কল্পিত প্রতিকৃতি তৈরির জন্য বিখ্যাত। এটা তার ছবি আঁকার ম্যানার বা স্টাইল।
একটি শিল্প আন্দোলন একটি নির্দিষ্ট সাধারণ দর্শন বা লক্ষ্য সহ শিল্পের একটি প্রবণতা বা শৈলী তৈরি হয়(An art movement is a tendency or style in art with a specific common philosophy or goal), তারপরে একটি নির্দিষ্ট সময়কালে শিল্পীদের একটি দল অনুসরণ করে (সাধারণত কয়েক মাস, বছর বা দশক) বা কমপক্ষে, তার সার্থকতার সাথে আন্দোলন কয়েক বছরের মধ্যে সংজ্ঞায়িত হয় ও প্রচারিত হয়।। আধুনিক শিল্পকলায় শিল্পের গতিবিধি বিশেষত গুরুত্বপূর্ণ , যখন প্রতিটি ক্রমাগত আন্দোলন আসে পুরাণ আন্দোলনকে চেপে তখন একটি নতুন আন্দোলনকে আবিন্ত গার্ডে (avant-garde.) হিসাবে বিবেচিত হয়।