গল্পেরা জোনাকি তে অনিন্দিতা মিত্র

হঠাৎ বসন্ত

হলুদ ট্যাক্সির প্রতি আমার অদ্ভুত এক প্রেম আছে। এখনও দরকার অদরকারে ট্যাক্সিতেই যাতায়াত করি। আজকাল সবাই নানা অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি বুক করেন, আমি একদম ওসব পারি না। “ দিদি এখানেই নিয়ে আসার কথা বলেছিলেন তো? এটা নিউটাউনের বিশ্ববাংলা গেটের খুব কাছেই। মোবাইলে লোকেশন দেখে বলুন। “ “ আমি ফোনের খুঁটিনাটি অনেক কিছুই জানি না। এখানেই নামিয়ে দিন। “ গাড়ি থেকে নেমে টাকা মিটিয়েই একজনকে জিজ্ঞেস করলাম “ দিগন্ত নিউজ ডটকমের অফিসটা কোথায় একটু হদিশ দেবেন প্লিজ?” “ ম্যাডাম, এই বাড়ির পাশের বাড়িতেই অফিস। লিফট দিয়ে উঠে যান তিন তলায়।” অবশেষে সিকিউরিটির ফাঁস পেরিয়ে নিউজ ডটকমের অফিসে ঢুকলাম। একজন স্টাফ কম্পিউটারের সামনে থেকে উঠেই আমাকে নিয়ে গিয়ে বসালেন একটা ঘরে। “ ম্যাডাম একটু বসুন। সাগরিকাদিকে ডেকে দিচ্ছি। “ আমি আলোকিতা সেন, লেখালেখি করি আর শহরতলির একটা কলেজে স্যোশিওলজি পড়াই। কিছুদিন আগেই আমার গল্পগ্রন্থ “ কনে দেখা আলোর মাঝে” – শীলাবতী স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে । ওই অনুষ্ঠানেই সাগরিকার সঙ্গে আমার আলাপ হয়। সাগরিকার মাধ্যমেই নিউজ ডটকম আমার ইন্টারভিউটার প্রস্তাব দেয়। আমার আবার এইসবে খুব এলার্জি আছে। জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দীপাবলির রেশ কদিন আগেই কেটেছে। হেমন্ত পা ফেলেছে চারপাশে । এখন সন্ধে হয়েছে। চারপাশটা সাদা হলুদ রঙের আলোয় সেজে আছে। কুয়াশার প্রলেপ কুণ্ডলী পাকিয়ে জড়িয়ে ধরে আছে নগরকে। হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের উপর থেকে দূরের সবকিছুকেই পুতুলের সংসার মনে হচ্ছে। “ আরে আলোকিতা ম্যাডাম যে! কেমন চলছে সবকিছু? খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে।” সাগরিকা খুব হাসিখুশি প্রাণবন্ত মেয়ে। একটা বাউলের পোশাকের মতো শাড়ি পরে সাগরিকাকে অপরূপ উজ্জ্বল লাগছে। “ এই চলছে।” আলোকিতাদি তুমি একজন প্রফেসর আর সাহিত্যিক। তুমি বলছি বলে কিছু মনে করলে না তো?” “ আরে! আমি লিখি এটুকুই! নিজের ইমেজ আর আইডেন্টিটি নিয়ে এতটুকু গর্ব আমার নেই।” “ এজন্যই তুমি তুমিই। আর এই কারণেই তুমি সহজেই মানুষের মনের ভেতর ঢুকে যেতে পারো এবং মাটির কাছাকাছি পৌঁছে সৃষ্টির ফুল ফোটাতে পারো। যাইহোক এবার অনুষ্ঠান শুরু করবো। কফি খেয়ে তাড়াতাড়ি চলে এসো। আর একটা কথা! আমার কাছে স্টুডিওরুমে আসার আগে একবার মেকআপ রুমে যেয়ো। “ “ ঠিক আছে সাগরিকা।” মেকআপ রুমে গিয়ে ফাইনাল টাচআপ নিয়েই গেলাম সাগরিকার কাছে। “ উফ দিদি চোখে একটু আইলাইনার লাগতে পারতে তো! যাইহোক! তোমাকে অপূর্ব লাগছে। নিজের ভেতরের আলোতেই তুমি আলোকিত, এখানেই তোমার নামের সার্থকতা। যাইহোক দিদি অনুষ্ঠান শুরু করছি। তৈরি থেকো।” মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে রেডি করে নিলাম। “ নমস্কার দর্শক বন্ধুরা। আজ আবার প্রতি বৃহস্পতিবারের মতো শুরু করছি দিগন্ত নিউজ ডটকমের অতি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান সৃজনী। আপনারা জানেন এই অনুষ্ঠানে আমরা শিল্প সংস্কৃতি ও সাহিত্য জগতের বিশিষ্ট মানুষজনদের আনার চেষ্টা করি। তাঁরা এসে আমাদের সমৃদ্ধ করেন। আজ আমরা আমাদের মধ্যে পেয়েছি আমাদের খুব পছন্দের একজন সাহিত্যিক আলোলিকা সেনকে। আলোকিতাদির কথা আর নতুন করে বলার কিছুই নেই। উনি একাধারে একজন অধ্যাপক, তাছাড়া সাহিত্যিক হিসেবে আলোকিতাদি একজন চেনা অতি পরিচিত মুখ। ওঁর লেখা গল্প, উপন্যাস, কবিতা ঠিক যেন আমার আপনার কথাই বলে! কিছুদিন আগেই দিদির গল্পগ্রন্থ কনে দেখা আলোর মাঝে- সম্মানিত হয়েছে।” নিজের এত প্রশংসা শুনলে আমার যেন কেমন একটা অস্বস্তি লাগে। এই কথাটা ভাবতে ভাবতেই মন দিলাম আলোচনায়। সাগরিকা বললো “ এবার সরাসরি চলে যাই দিদির সঙ্গে কথোপকথনে।” সাগরিকা: দিদি এই অনুষ্ঠানে আপনাকে পেয়ে আমরা আপ্লুত। আপনার কেমন লাগছে ? বলুন। আমি: আমার মতো একজন ক্ষুদ্র শব্দশ্রমিককে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য দিগন্ত নিউজ ডটকমকে জানাই অন্তরের শ্রদ্ধা ও নমস্কার। এই অনুষ্ঠানের কথা আমি শুনেছি। তবে এখানে এসে দর্শকদের মুখোমুখি বসে আলোচনায় অংশ নিতে পারবো কখনও ভাবিনি। আবারও পুরো চ্যানেলককে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই। সাগরিকা: আমাদের কথাবার্তা শুরু হোক আপনার কবিতা দিয়ে। একটু নিজের লেখা কবিতা পাঠ করতে অনুরোধ করছি। আমি: আমি কিছুদিন আগের একটি লেখা পাঠ করার চেষ্টা করছি। অভিমানী বিরহগাথা : অজন্তার অনিন্দ্য চিত্রকলা জুড়ে যৌবনের উষ্ণ চুম্বনের স্মৃতিদাগ। পাহাড়ের যে রাস্তাটা গিয়ে পড়েছে কুসুমবনের মধ্যিখানে সেখানে সহস্র বছরের টিলার জঙ্ঘায় বর্ণময় রঙের মিশেলে আলপনা আঁকে অভিমানী বিকেল। পাথরের নীল ভাস্কর্যে কোনো এককালে অনামা এক বৌদ্ধ শ্রমণ হয়তো জমা রেখেছিল চোখের জল, প্রতীক্ষার জোনাকি-ফুল কুড়োতে কুড়োতে ঝোরার রুমঝুম প্রবাহে হারিয়ে যায় একঝাঁক বুনো টিয়া। ইতিহাসের অলিন্দে অলিন্দে স্মৃতিনদীর কাব্যময় প্লাবিত স্রোত, দেওয়ালে খোদিত রাজকুমারীর মায়াময় চিবুকে বাসা বাঁধে শতাব্দী প্রাচীন উপকথারা। রৌদ্রগন্ধ মেখে এক রঙিন প্রজাপতি ছুঁয়ে যায় তথাগতের বুক, ধূসর গুহার কোমল ছায়ায় জন্ম নেয় অজস্র বিরহগাথা। সাগরিকা: অসাধারণ, নিমেষে একরাশ মুগ্ধতার রোদ্দুর ছড়িয়ে দিলেন। আমি: ধন্যবাদ। সাগরিকা: সাহিত্যের জগতে আসার প্রসঙ্গে কিছু শুনতে চাই। আমি; আমি লেখা শুরু করি মায়ের মৃত্যুর পর। মায়ের চলে যাওয়ার শূন্যতাবোধ আমাকে খুব যন্ত্রণা দিত। তখনই কলম আর কাগজে মনের তাগিদে আঁচড় কাটার চেষ্টা করতাম। আমার জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে চন্দননগরে। ওখানেই পড়াশোনা, বেড়ে ওঠা সবকিছুই। চন্দননগরের বাড়ির সেই পরিবেশ, নোনা দেওয়ালের ঘরে খেলে যাওয়া রোদ্দুরের আলপনা আমার স্মৃতিতে আজকেও অক্ষত আছে। আমার লেখালেখির মধ্যেও ওই বাড়িতে কাটানো মুহূর্তের ঝলক মাঝে মাঝেই ভেসে ওঠে। সাগরিকা: তাহলে এক্ষেত্রে বলতেই হয় যে আজকের আলোকিতা সেন হয়ে ওঠার পটভূমিকায় বাড়ির লোকজন, পরিবেশ সবকিছুর প্রভাব আছে। আমি; অবশ্যই। আমার জীবনে সৃজনশীলতা অনেক পরে এলেও সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা জন্ম হয় অনেক আগে। পুরোনো বাড়িটার বারান্দার কথা বলতেই হয়। আমাদের ছোটবেলায় প্রায়শই লোডশেডিং হত। মায়ের কোলে বসতাম ওই বারান্দায় গিয়ে। জ্যোৎস্নার অবিশ্রান্ত ধারা ধুয়ে যেত বাড়িটার কড়িবর্গা, খিলান, বারান্দার মেঝে। আধো অন্ধকার আলোর মধ্যে মায়ের মুখটা আজকেও বড্ড মনে পড়ে। মা অনর্গল বলে যেত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুকুমার রায়, নজরুল ইসলামের কবিতা। এইভাবেই সাহিত্যের সঙ্গে আমার জীবন জড়িয়ে যায়। তারপর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পড়তে শুরু করি বাংলা সাহিত্য আর বিশ্বসাহিত্য। এভাবেই ভালোবাসা আর ভালোলাগার পরিধি বাড়তে থাকে। আমি খুব মশগুল হয়ে পড়ি অথবা পড়তাম। অনেক চরিত্রের সঙ্গেই নিজেকে রিলেট করতে পারতাম। সাগরিকা: জীবনের অভিজ্ঞতা সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে কতটা ছাপ ফেলেছে? আমি: সৃজনশীলতা আর একজন সাহিত্যিকের জীবন পরস্পরের থেকে বিযুক্ত নয়। আমার জীবন কখনই এক পথে চলেনি। এত ঘাত প্রতিঘাতের প্রবাহ এসেছে যে মাঝে মাঝেই মনে হয়েছে এই বোধহয় জীবনের ডিঙি ডুবে গেল । আবার দেখেছি সব প্রতিকূলতার পাহাড় পেরিয়ে জীবনের ঝরনাধারা নিজের নিয়মেই ঝরতে শুরু করেছে। জীবন আমাকে খুব কাছ থেকে সব অনুভূতি – শোক, বিচ্ছেদ, প্রেম অপ্রেম, বিষাদ সবকিছুই দেখিয়েছে। এইসব অনুভূতির টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতাগুলোকে মনের মাধুরী আর রঙ মিশিয়ে আমার লেখায় ফোটাতে চেয়েছি এবং এভাবেই চরিত্রগুলো নির্মাণ করে প্রাণ-প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে জীবনের উপলব্ধি সাহায্য করেছে। তাছাড়া বৈচিত্র্যময় ঘটনাপ্রবাহ জীবনবোধ ও দর্শনকেও প্রতিনিয়ত আপডেটেড করেছে। সাগরিকা: আপনার লেখা গল্প, উপন্যাসে অনেক সময়েই ধরা পড়েছে সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির ছবি। আপনি কখনও সরাসরি রাজনীতি করেছেন? আমি: এখানে রাজনৈতিক সংযোগ বলতে যদি শুধুমাত্র দলের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন ও সংযুক্ত হওয়াতে বোঝায়, তবে দলীয় রাজনীতি আমি করিনি। আমি এই কথাটা খুব বিশ্বাস করি যে মানুষ যেমন রাজনৈতিক জীব তেমনই সামাজিক জীবও বটে।রাজনীতি শব্দটা একটা বৃহৎ প্রেক্ষাপট আছে। যেকোনো সৃষ্টিশীল মানুষের কাছে পৃথিবীটা একটা কাচের বলের মতো। ধর্ম, জাতপাত, ভৌগলিক ব্যবধান সবকিছুর উপরে মনুষ্যত্বই আসল। আর সৃষ্টিশীল মানুষরা একটু সংবেদনশীল ও আবেগপ্রবণ হন। মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম, মনুষ্যত্বের অবনমন, রাষ্ট্রীক নিপীড়ন দেখলেই তাঁদের মনের বীণায় বেদনার সুর বাজবেই। সুতরাং সমকালীন পরিবেশ ও পরিস্থিতির চিত্র সৃষ্টির উপজীব্য বিষয় আগেও হয়েছে ভবিষ্যতেও হবে। সাগরিকা: আপনার গল্প ও উপন্যাসের পাতায় সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় বিভেদের বিরুদ্ধে জোরালো কণ্ঠস্বর শোনা যায়। এ বিষয়ে কিছু শুনতে চাই। আমি: সাম্প্রদায়িকতা ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশের বহুত্ববাদী সমাজে একটা অভিশাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। একদিন এই ধর্মীয় বিভেদের জন্য মানুষের ঘর ভেঙেছে, ভারতবর্ষ টুকরো টুকরো হয়েছে। সুতরাং এ বিষয়ে বলতেই হবে, মানুষের মঙ্গল আর আমাদের মিশ্র কালচারের প্রবাহমানতাকে ধরে রাখার জন্য বলতেই হবে। আমিও যতটুকু পারি লেখার মাধ্যমে বলার চেষ্টা করি। সাগরিকা: কিছু বছর আগে প্রকাশিত আপনার উপন্যাস “ আলোছায়ার বাঁকে” প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসটি বেশ আলোচিত হয়েছে। এখানেও আপনি ধর্মীয় উগ্রবাদকে তীব্র সমালোচনা করে মানবতাবাদের বিজয় সঙ্গীত গেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে কিছু বলুন। আমি: প্রসঙ্গত বলি “আলোছায়ার বাঁকে” আমার দ্বিতীয় উপন্যাস। আমার প্রথম উপন্যাস মেঘকন্যাদের দেশে- বের হওয়ার কয়েক বছর পর ওটি প্রকাশিত হয়েছিল। ওখানে দুটো কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো জয়ী আর আশমান। দুজনের ছোটবেলার প্রেম, একসঙ্গে বেড়ে ওঠা তারপর বিপরীত ধর্মের জন্য দুজনের মিলনের ক্ষেত্রে সামাজিক পারিবারিক বাধার উপস্থিতি-এসব নিয়েই ঘটনাক্রম এগোতে থাকে। সব বিভেদ আর প্রতিবন্ধকতা প্রেমের টানের কাছে নতজানু হয়। সবকিছুর বেড়া টপকে দুজনের মিল হয়, ভালোবাসা জিতে যায়। আসলে মনুষ্যত্ব আর ভালোবাসার উপর কিছুই নেই। সাগরিকা: অনুষ্ঠান আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ করতে হবে। দিদি আর একটা কবিতা শুনতে খুব ইচ্ছে করছে। আমি: ঠিক আছে। আমি আমার কাব্যগ্রন্থ “ নিহত নক্ষত্রপুঞ্জ” থেকে একটা কবিতা পড়ছি। তুমি এলে…

তুমি এলে, পলকে ভেঙে তছনছ হয়ে গেল মনের জঠরে শায়িত শান্ত সমাহিত বুদ্ধমূর্তির স্থিরতা, অপেক্ষার বাগান সেজে উঠলো অমলতাসের হলুদ আলোয়। প্রেমে পড়লে নারী হয় দুর্দম পাহাড়ি ঝোরা, পুরুষ হয়ে ওঠে চন্দন গাছ। উড়ন্ত চিলের নীল ডানায় জন্ম নেয় কুয়াশার দীর্ঘশ্বাস। তুমি এলে, বেদনের পারিজাত বনে শত শত কুঁড়ি ফুটে উঠলো পদ্যফুল হয়ে। সাগরিকা: অসাধারণ দিদি। আমরা দিনের শেষে তো পরিবারের সদস্যদের কাছেই ফিরি। আপনার পারিবারিক জীবন নিয়ে কিছু বলুন। আমি: আমার মা বাবা দুজনেই চলে গেছেন। দিদি বসুন্ধরা ইউকে-তে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পদে কাজ করে। আমার আর জীবনসঙ্গী আকাশের কয়েক বছর আগেই ডিভোর্স হয়ে গেছে। আকাশ এখন জার্মানির একটা ইনস্টিটিউটের গবেষক। আমাদের দুজনের দাম্পত্য সম্পর্ক না থাকলেও বন্ধুত্ব এখনও আছে। লেখালেখি নিয়ে কথা হয়,এইভাবেই জীবন চলছে। সাগরিকা: আমরা একেবারেই অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে চলে এলাম। দিদি আপনাকে পেয়ে আমরা খুব সমৃদ্ধ হলাম। খুব ভালো লাগলো। আমাদের দর্শকদের কিছু বলুন। আমি: নিউজ ডটকমের সব দর্শকদের জানাই অন্তরের নমস্কার ও শ্রদ্ধা। আমাদের সৃষ্টি পাঠকদের জন্যই। আপনাদের জন্যই লেখার চেষ্টা করি। আপনারা আমার পাশে থাকবেন। অজস্র ধন্যবাদ। সাগরিকা: বন্ধুরা আজকের মতো শেষ করছি সৃজনী। আপনারা আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ মেল মেসেজের মাধ্যমে মতামত জানাতে পারেন। ভালো থাকবেন। নমস্কার। অনুষ্ঠানের শেষে যখন উঠতে যাচ্ছি তখন সাগরিকা আমার দুটো হাত ধরে বললো, “ দিদি তুমি কিছু মনে করোনি তো?” কথার ইঙ্গিত বুঝলেও কিছুটা চুপ থেকে বললাম, “ কোন কথায়?” “ তোমার ব্যক্তিগত জীবনের প্রসঙ্গ না তুলতেই পারতাম! প্লিজ কিছু মনে করো না।” “ তুমি এমন করে বলছো কেন সাগরিকা? জিজ্ঞেস করতেই তো পারো। এটাই আমার জীবন, এটা আমার কাছে সূর্যের আলোর মতোই শাশ্বত ও সত্যি। আমাকে এবার যেতে হবে।“ “ গাড়ি বুক করলে?” “ নাহ্, বেরিয়ে কোনো না কোনো গাড়ি অথবা ট্যাক্সি পাব। চিন্তা করো না।” “আচ্ছা দিদি, সাবধানে যাও।” অফিসের বাইরে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বুকের ভেতরটাতে কেমন একটা রিনরিন ব্যথা অনুভব করলাম। সামনেই দেখলাম একটা বেশ সাজানো ক্যাফে, ভাবলাম এখন কিছু খেয়েই যাই। ছোট্ট ছোট্ট আলো দিয়ে চারপাশ সাজানো। ঢুকেই দেখলাম একটা ধ্যানমগ্ন বুদ্ধদেবের মূর্তি, মূর্তির চোখমুখে ছড়িয়ে আছে হাসির চিরকালীন আলো। চেয়ার টেনে বসতেই একজন মহিলা অর্ডার নিতে এলেন। চিকেন প্ল্যাটার অর্ডার করলাম। বাড়ি ফেরার পর এক কাপ গরম কফি ছাড়া কিছুই খাব না। অতীত আমি ঘাঁটতে চাই না। মাঝে মাঝে স্মৃতির উছল স্রোত এসে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সময়ের তালে তালে যন্ত্রণার তীব্রতা ফিকে হলেও রেশ রয়েই গেছে। আকাশ আমার জীবনের এমন এক আখ্যান যে আখ্যানের প্রতিটা অধ্যায়ে লেগে আছে বিচ্ছেদের ছোঁয়া। আকাশের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল এক অদ্ভুত সময়ে। মা চলে যাওয়ার পর বাড়ি ফিরে খুব একা লাগতো। তারপর কলম ধরার তাগিদ অনুভব করলাম। তখন চন্দননগর থেকেই কলেজে যাতায়াত করতাম। মা চলে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বাবাকেও হারাই। দিদি আর সুতীর্থদা বরাবরই বিদেশেই থাকতো। একটা পত্রিকায় আকাশের বিজ্ঞান সংক্রান্ত কিছু লেখা পড়ি। বিজ্ঞানের ছাত্রী না হলেও প্রবন্ধের ব্যাপ্তি আর বিষয় নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা আমাকে মুগ্ধ করে। তারপর মেলের মারফত যোগাযোগ হয়। আকাশকে প্রথম দেখি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে। আকাশের বুদ্ধিদীপ্ত চোখমুখ, রাজনীতি, সমাজ, সাহিত্য সম্পর্কে প্রগাঢ় জ্ঞান আমাকে আকৃষ্ট করে। আস্তে আস্তে আলাপ বন্ধুত্ব বাড়তে থাকে। মাঝে মাঝেই ফোনে আমাদের ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হত। অনেক সময় কথা না হলে একটা উচাটন অনুভব করতাম। বন্ধুত্বের সম্পর্ক ক্রমশ প্রেমের রূপ নেয়। চুটিয়ে প্রেম আর ডেট করার পর দুজনে বিয়ে করি। আমাদের দেশে লিভ টুগেদার এখনও খুব প্রচলিত শব্দবন্ধ নয়। লোকজন খুব একটা সুনজরেও দেখে না। আমার মনে হয় আজকের এই আধুনিক যুগে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একসঙ্গে লিভিং করে একে অপরকে সময় দিয়ে বোঝার দরকার আছে। মানুষ ঠেকায় পড়লে শেখে! বিয়ের কিছুদিন পর পরই বুঝলাম প্রেম অবধি ঠিক ছিল। সব জড়তা দূরত্বের আড়াল পার করে দুজনে শরীর ও মনে এক হতে পারছি না। পাশাপাশি থাকলেও দুজনে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন মেরুর মানুষ হয়ে রয়ে গেছি। আকাশকে একা দোষ দিই না। নিজেরও অনেক গাফলতি ছিল। কয়েক বছর পর মনে হয়েছিল দুজনেই একটা প্রাণহীন সম্পর্ক বয়ে বেড়াচ্ছি। তারপর দুজনেই আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিই। স্মৃতির রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে বুঝতেই পারিনি যে খাওয়া হয়ে গেছে। বিল মিটিয়ে বেরিয়ে দু পা ফেলতে মনে হলো জোরে ফোনটা বেজেই চলেছে। ধরতেই দেখলাম আমার পরিচিত এক গবেষক অনিন্দ্য কল করেছে। “ তোমার ইন্টারভিউটা শুনলাম। বেশ ভালো লাগলো। জানো তো সাহিত্য সংক্রান্ত পড়াশোনার অভাব আছে। তবুও! যাইহোক তুমি এখন কোথায় আছো?” “ আমি নিউটাউনের টাওয়ারের কাছেই আছি। তুই কবে ফিরলি আমেরিকার কনফারেন্স থেকে?” অনিন্দ্য আমার চেয়ে বয়েসে জুনিয়র। গবেষণার সূত্রে অন্তরঙ্গতা তৈরি হয়ে গেছে। তাই তুই বলে ফেলি। ও কখনও আপত্তি করেনি। “ দুদিন আগে। তোমাকে কল করা হয়নি। দাঁড়াও, আসছি। “ মিনিট ছয়েকের মধ্যেই অনিন্দ্য এসে উপস্থিত। উদাস চোখে অনিন্দ্য এক ঝলক তাকাল আমার দিকে, আমি বললাম, “ কিছু বলবি?” “ টাওয়ারের উপর খানিকটা উঠি চলো।” অনিন্দ্য আমার আজকের পরিচিত নয়, বেশ কয়েক বছর ধরেই চিনি। তবে আজ যেন একটু অন্যরকম লাগছে। খানিকটা উঠেই অনিন্দ্য বললো, “ আলোকিতা দেখো এখান থেকে শহরটা কেমন মায়াবী লাগছে!” চমকে উঠলাম। অনিন্দ্য আমাকে কখনও ম্যাডাম ছাড়া কিছুই বলেনি। অদ্ভুত অবক্ত্য এক শিহরন মনের বীণার তারে সুরের ঝঙ্কার তুলল। “ তোমাকে দেখে ‘বসন্ত যে রঙিন বেশে ধরায় সে দিন অবতীর্ণ ‘- গানটার কথা মনে হচ্ছে। অনেক সময়েই ভেবেছি তোমাকে একটা কথা বলবো, বলতে গিয়ে তোমার ব্যক্তিত্বের সামনে আটকে গেছি। ভেবেছি যদি কিছু মনে করো, সুসম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়, এসব ভেবেই আর…” আকাশ চলে যাওয়ার পর নিজেকে সারাদিন কেজো জগতের বর্ম পরিয়ে রাখি। কাউকেই ঘেঁষতে দিই না, অনেকেই জীবন নিয়ে আর একবার ভাবতে বলেছিল, নিজেকে জড়াইনি। আজ যেন মুহূর্তের মধ্যেই হারিয়ে যাওয়া কিছু অনুভূতির রঙ আমার মনের ধূসর ক্যানভাসকে রঙিন করতে চাইছে। “ আলোকিতা বাকি জীবনটা আমরা দুজন একসঙ্গে থাকতে পারি না? ভালবাসার আদালতে বয়েস, ধর্ম সব ব্যবধান মিথ্যে।” “ তুই তো জানিস আমার আর বিয়েতে জড়ানোর….” ভেজা গলা আমাকে আর কিছু বলতে আটকে দিল। “ দরকার নেই, সামাজিক ছাড়পত্রের চেয়ে সম্পর্ক আসল, সুখ দুঃখ ভাগ করটাই সম্পর্কের মূল কথা।” অনিন্দ্য নিজের হাত ছোঁয়ালো আমার হাতে। স্তব্ধ হয়ে গেলাম মুহূর্তে। ক্রমশ রাত নামছে শহরের গা ঘেঁষে। আমাদেরই দিকে নীরবে চেয়ে আছে আদিম নক্ষত্রপুঞ্জ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

2 Responses

  1. শ্রীতমা দাস মুখার্জি says:

    অপূর্ব লেখা

  2. Punam Sil says:

    একটা আলাদা প্রশান্তি অনুভব করলাম লেখাটার মধ্যে দিয়ে।
    এই উন্মুক্ত চিন্তাধারার প্রকাশের মধ্যে দিয়ে আজকের দিনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাওয়া যায়। খুব সুন্দর এবং মন ভালো করে দেওয়া একটি গল্প❤️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।