সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৪১)

কেল্লা নিজামতের পথে

ইংরেজদের একরকম তাড়িয়ে কলকাতার দখল তো নিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। শোনা যায় জয়ের পর ২০ই জুন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে নবাব এক রাতে একটি ১৪ ফুট X ১৮ ফুট হাওয়া-বাতাসহীন ঘরে ১৪৬ জনকে বন্দি করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পরের দিন সকালে দেখা যায় শ্বাসবন্ধ হয়ে মারা গেছেন ১২৩ জন। কারণ ওই ছোট্ট ঘরে অত মানুষকে তিনি এমন ভাবে আটকে দেন, যে তারা নিঃশ্বাসটুকু নেওয়ার সুযোগও পায়নি বলে অভিযোগ। কিন্তু কতটা সত্য এই ঐতিহাসিক গণহত্যা? পরে ভারতীয় ঐতিহাসিকরা এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রবল দ্বন্দ্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। অক্ষয় কুমার মৈত্র তাঁর সিরাজদ্দৌলা বইতে বলছেন, “মুসলমানদের কথা ছাড়িয়া দাও। তাঁহারা না হয় স্বজাতির কলঙ্ক বিলুপ্ত করিবার জন্য স্বরচিত ইতিহাস হইতে এই শােচনীয় কাহিনী সযত্নে দূরে রাখিতে পারেন। কিন্তু যাঁহারা নিদারুণ যন্ত্রণায় মর্মপীড়িত হইয়া অন্ধকৃপ কারাগারে জীবন বিসৰ্জন করিলেন, তাহাদের স্বীয় স্বজাতীয় সমসাময়িক ইংরাজদিগের কাগজপত্রে অন্ধকূপ হত্যার নাম পর্যন্তও দেখিতে পাওয়া যায় না কেন?” বক্তব্যটি এক্ষেত্রে ভীষণ প্রাসঙ্গিক নয় কি?

তাছাড়া আগেও বলেছি নবাবের দুর্গ আক্রমণের খবর শহরে রটে যেতেই দলে দলে ইংরেজ পরিবার গঙ্গাপথে পাড়ি দেন ফলতার উদ্দেশ্যে। এমনকি পালিয়ে যান কলকাতার গভর্নর ক্যাপ্টেন ড্রেক, মিঃ ম্যাকেট, মিনচিন, ক্যাপ্টেন গ্র‍্যান্ট সহ প্রায় সব উচ্চপদস্থ কর্মচারী। ফলে জাত্যাভিমানী ইংরেজ এই পরাজয়কে কোনোদিনই মেনে নিতে পারেনি। এদেশে পাড়ি জমানোর পর সে ইংরেজদের এক ভয়ানক স্মৃতি। শোনা যায় স্বয়ং ওয়ারেন হেস্টিংসও পরে কিছুদিন ছিলেন ফলতার এই অস্বাস্থ্যকর ইংরেজ ক্যাম্পে। একে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, তারপর ভয়ানক মশার হানা। সব মিলে প্রায় ওষ্ঠাগত প্রাণ সাহেবদের। যদিও সিরাজের কলকাতা দখলের সময়ে হেস্টিংস কাশিমবাজার কুঠিতে। সকলে কলকাতার দুর্গ ছেড়ে যাবার পরে দুর্গে জনা ৬০ ইংরেজ অফিসার ও সেনা থাকবার ইঙ্গিত পাওয়া যায় স্পষ্টভাবে। তাই সেইরাতে দুর্গে সিরাজের পক্ষে হত্যার জন্য ১২৩ জন ইংরেজ সাহেব খুঁজে পাওয়া নেহাত গল্পকথাই। ইংরেজ রাজপুরুষদের বক্তব্যে বিস্তর অসঙ্গতি। এমনকি শহরের বুকে ঘটে যাওয়া এত বড় একটা ঘটনার কথা পারদপক্ষে জানতে পারলো না কলকাতার মানুষও। এও সম্ভব? আর. উইলসন তাঁর ‘ওল্ড ফোর্ট উইলিয়াম অফ বেঙ্গল’ বইতেও জ্যামিতি দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে ওই ঘরে ১৪৬ জনকে বন্দি করা নিতান্তই একটি গল্পকথা। কলকাতা জয় করে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে ঘনিষ্ঠ মানিকচাঁদকে বসিয়ে মুর্শিদাবাদ ফিরে যান জয়ী নবাব। আর এদিকে জেফানিয়া হলওয়েল সাহেব শুধু নবাবের বিরুদ্ধে এই রটনা রটিয়েই ক্ষ্যান্ত হলেন নি। অন্ধকূপ হত্যার স্মৃতি নিয়ে বর্তমান মহাকরণের সামনে ১৭৬০ সালে বসিয়ে দিলেন একটি প্রকাণ্ড স্মারকস্তম্ভ। আদ্যোপান্ত ইংরেজ ঔদ্ধত্যের প্রকাশ। পরে ১৮২২ সাল নাগাদ এই স্মারক হেস্টিংস কতৃক ভেঙে দেওয়া হলেও ১৯০২ সালের ১৯শে ডিসেম্বর লর্ড কার্জন আবার সেই স্থানেই দ্বিতীয় বার প্রতিষ্ঠা করেন হলওয়েল মনুমেন্ট। কলকাতায় আবার প্রতিষ্ঠা করা হয় নবাব সিরাজের নামে সেই মিথ্যে কলঙ্কিত অধ্যায়টি। আসলে ইংরেজ শাসকরা কোনোদিনই জাত্যাভিমানের বাইরে সম্পূর্ণ বের করে আনতে পারেনি নিজেদের রাজসত্ত্বাকে। অথচ ২০ই জুনের রাতে পরাজয়ের পর বিধ্বস্ত হলওয়েল যখন অন্ধকূপ হত্যার আষাঢ়ে গল্প তৈরি করছেন, তখন কলকাতা জয় করে ইংরেজদের শিক্ষা দিয়ে দাদুর নামে শহরের নাম পাল্টে আলিনগর করে নবাব নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন কলকাতার বুকে। প্রথম দিকে এদেশে আসা ইংরেজদের প্রথম ঘোষিত শত্রু সিরাজউদ্দৌলার কুৎসা রটাতে ও চারিত্রিক বদনাম করতে কম পরিশ্রম করেনি সাহেবরা। এমনকি টাকাও ছড়িয়েছেন দেদার। তার ওপর সিরাজের জীবনে যোগ হয়েছিল কলকাতা আক্রমণের মতো স্পর্শকাতর একটি অভিযোগ। স্বভাবতই ইংরেজদের লেজে পা দিয়ে তিনি আর নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন নি তারপর। ঠিক একবছর পরেই পলাশীর প্রান্তরে হাতেনাতে কলকাতা আক্রমণের ফল পান নবাব।
এদিকে ১৯৪০ সালে হলওয়েল মনুমেন্টকে শহরের কেন্দ্রে প্রকাশ্য অবস্থান থেকে সরাতে প্রথম আন্দোলন সংগঠিত করেন সুভাষচন্দ্র বোস। শহরবাসীর সমর্থনে তিনি নামেন প্রকাশ্য রাস্তায়। তিনি বলতেন, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের নামে কুৎসা ও ইংরেজ ঔদ্ধত্য নয়, বরং সত্য ঘটনা জানা প্রয়োজন মানুষের। ফলপ্রসুও হয় সুভাষের আন্দোলন। ১৯৪০ সালের ২৪ শে সেপ্টেম্বর রাজপথ থেকে তুলে হলওয়েল মনুমেন্টকে সরিয়ে নেওয়া হয় সেন্ট জনস চার্চের ভেতর। প্রকাশ্য অবস্থান থেকে ইংরেজ প্রতিষ্ঠিত এই মিথ্যে স্মারক স্থান পায় গীর্জার ভেতরে লোকচক্ষুর অন্তরালে। আজও রয়েছে সেখানেই। অশ্বত্থ আর আগাছার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অন্ধকূপ হত্যার একমাত্র জীবিত স্মারক। অভিযুক্ত হত্যাকাণ্ডের সেই ঘরটিও চিহ্নিত করা গেছে পরে। বর্তমানে জিপিওকে ফেলে ফুটপাথ ধরে কালেক্টরেট বিল্ডিংয়ের দিকে হেঁটে এলে আজও মাঝখানে রাস্তার ধারেই দেখা যায় সেই ১৮ ফুটX১৪ ফুটের কুখ্যাত জায়গাটি। ডালহৌসি এলাকায় পায়চারি করলে একবার অন্তত থমকে দাঁড়ান জায়গাটিতে। আড়ম্বরহীন জায়গাটিতে তাকিয়ে ভাবুন একবার। ছাদশূন্য চাতালটি নবাব সিরাজের নামে কলঙ্কের বোঝা নিয়ে আজও কিভাবে সাক্ষী দিচ্ছে পুরনো ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের।
এভাবেই কখন যেন কেল্লা নিজামতের ভাগ্যের সাথে নিবিড় ভাবে যুক্ত হয়ে গেছে কলকাতা শহর। কলকাতা আর মুর্শিদাবাদ যেন চিরন্তন ব্যস্তানুপাতিক। একটি শহর ভাঙে, তো অন্যটি গড়ে। আর এই পালাবাদল মাঝেমাঝেই বদলে দেয় সামগ্রিক চিত্রটা। আমি মুর্শিদাবাদ ঘুরতে ঘুরতে কলকাতার কথা ভাবছি। কিন্তু কলকাতায় বসে কজন মুর্শিদাবাদ নিয়ে ভাবে তা অবশ্য জানা নেই। আলো আর অন্ধকার পরস্পরেরবিরোধী। তাই হয়ত একদিকে দিনের আলো ফুটলে আর এক দিকে নামে রাত্রির ঘোর অন্ধকার। আর মুর্শিদাবাদ ও কলকাতার সম্পর্কের থেকে এর ভালো উদাহরণ আর হয় না৷

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।