সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৪০)

কেল্লা নিজামতের পথে
শুরু হল কলকাতার যুদ্ধ। একদিকে হাজার পঞ্চাশেক নবাবী সৈন্য৷ আর বিপরীতে যুদ্ধ না জানা কয়েকশো ইংরেজ সৈনিক৷ দিনটি ১৭৫৬ সালের ১৬ই জুন৷ বাগবাজারের পেরিন পয়েন্ট থেকে শুরু হল গোলাবর্ষণ। তখন বাগবাজার খালের একদিকে নবাবী সেনা৷ আর অন্যপারে কোম্পানির কুড়ি পঁচিশ জন রক্ষী। ইংরেজদের তরফে আঠারোটি কামান। যুদ্ধ প্রায় একতরফা৷ তবু ইংরেজ গড় রক্ষা করতে আরও ত্রিশজন সেনা দুটি কামান সমেত এসে যোগ দিল যুদ্ধে৷ তখন তাদের সামনে নবাবী সৈন্যদলের মুখে প্রায় চার হাজার সেনা। এই অসম যুদ্ধে নবাবী সেনার কামান দখল করতে বেশি সময় লাগেনি৷ তারপর শুরু হয় কলকাতার বুকে গোলাবর্ষণ। দুপুর ৩ টে থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত চলতে থাকে এই গোলাবর্ষণ। এদিকে কলকাতা জুড়ে তখন গেল গেল রব৷ কে কোন দিকে পালায় তার ঠিক নেই। পরের দিন অর্থাৎ ১৭ই জুন শুরু হলো কলকাতা শহরের উপর নবাব বাহিনীর অবাধ লুটপাট। গঙ্গার ধার ধরে হাঁটতে শুরু করলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। হাতের কাছে যা পান সবই ধুলিস্যাৎ করে দেন। এরপর নবাব বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হয় বড়বাজার। এক ধার থেকে বড়বাজারে সব জায়গায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। সৈন্যরা লুটপাট শুরু করে সমস্ত জায়গায় এবং জায়গাটি দাবানলের পর ভস্মীভূত একটি স্তুপের আকার ধারণ করে।
এদিকে সুযোগ বুঝে হলওয়েল সাহেবরা কয়েকজন নবাবী সৈন্যকে ধরে আনেন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে এবং তাদের থেকে খবর পান পরের দিন নবাব আক্রমণ করতে চলেছেন তাদের সাধের ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ। এমতাবস্থায় দুর্গকে নিরাপত্তা দেওয়া ছাড়া তারা আর কোন কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দেবার ক্ষমতায় ছিল না। তাই দুর্গের চারপাশে স্থাপন করা হলো কামান। একমাত্র উদ্দেশ্য, সেইসব কামান থেকে ক্রমাগত তোপধ্বনির মাধ্যমে যদি নবাবী সৈন্যদের মনে কিছুটা ভয় উৎপন্ন করা যায়। কিন্তু অজস্র সৈন্যের সামনে ইংরেজ গুটিকয়েক সেনা ও ক্যাপ্টেন তখন প্রায় উদ্ভ্রান্ত। ১৮ই জুন সকাল ন’টার সময় মারাঠা ডিচ পেরিয়ে নবাব এগিয়ে এলেন দুর্গের সম্মুখে। এরপর দুর্গের চারদিকে তোপমঞ্চের দায়িত্বে থাকা সাহেবরা যে যার দায়িত্ব রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন। কিন্তু অঢেল সৈন্যর সামনে খড়কুটোর মত গুটিয়ে যেতে তাদের বেশি সময় লাগেনি। দুর্গের পূর্ব দিকের কামানে দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন ক্লেটন। নবাবী আক্রমণ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করলে ক্লেটন সাহেব দুর্গ অভ্যন্তরে হলওয়েল সাহেবকে দিয়ে খবর পাঠান। চেয়ে পাঠান আরও সৈন্য ও অস্ত্র। কিন্তু হলওয়েল সাহেব ফিরে আসতে আসতে দিগভ্রান্ত ক্লেটন কামানের মুখ বন্ধ করে দুর্গ অভ্যন্তরে পালিয়ে বাঁচেন। ধীরে ধীরে সবকটি তোপমঞ্চের ক্যাপ্টেনদের একই হাল হয়। নবাব একে একে দখল করে নেন সবকটি কামান।
অবস্থার অবনতি দেখে দুর্গের অধ্যক্ষ ড্রেক সাহেব নারী ও শিশুদের অবিলম্বে জাহাজে করে অন্যত্র পৌঁছে দেবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তখন গঙ্গায় কোম্পানির তরফে একটি বড় জাহাজ এবং সাতটি ছোট জাহাজ দাঁড় করানো ছিল। এছাড়াও ছিল ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। যেগুলিতে নারীদের চাপিয়ে কলকাতা ছাড়া করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না ইংরেজদের হাতে। নবাবের হাতে ইজ্জত লুট হওয়ার থেকে পালিয়ে বাঁচা অনেক সম্মানের। অধ্যক্ষ সাহেব ম্যানিংহোম ও ফ্রাঙ্কল্যান্ড সাহেবের হাতে সেই দায়িত্বভার অর্পণ করলেন। এদিকে সেই দুই সাহেব ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে নারীর ছদ্মবেশ গ্রহণ করে নিজেরাই সেই জাহাজে করে পালিয়ে গেলেন কলকাতা ছেড়ে। ইংরেজদের ইতিহাস আজও তাদের ক্ষমা করেনি। নবাব সিরাজউদ্দৌলা তখনো ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের প্রাচীরে ক্রমাগত তোপবর্ষণ করে চলেছেন। সেই ভয়ানক সময়ে ইংরেজদের দিগভ্রান্ত অবস্থা এবং অপরিকল্পিত যুদ্ধের ফলাফল যে ভয়াবহভাবে তাদের বিরুদ্ধে এসেছিল তা ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনকালে সবথেকে কঠিন সময় বলে বিবেচিত হয়।
রাত্রি দুটো নাগাদ নবাব সৈন্য দুর্গের প্রাচীর ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল। আর এদিকে সাহেবরাও দুর্গ রক্ষায় অসমর্থ হয়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচানোকেই শ্রেয় বলে মনে করলো। এই নিয়ে দুর্গের অভ্যন্তরে বাগবিতন্ডার অভাব হলো না। সেই রাত দুটোতেই ড্রেক সাহেব সকলকে নিয়ে মিটিং ডাকলেন। সেখানে তিনি দুর্গ থেকে পলায়নের সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে জানতে চাইলেন। নবাবের আকস্মিক আক্রমণ আর তার জেরে কলকাতায় সাহেবদের বিধ্বস্ত অবস্থা চোখে দেখবার মত ছিল না। দুর্গ ছেড়ে পালানো ছাড়া তাদের উপায়ই বা কী ছিল। অগত্যা গঙ্গায় দাঁড় করানো নৌকা আর জাহাজে উঠে তড়িঘড়ি পালিয়ে প্রাণ বাঁচায় সকলে৷ হাতের সামনে যে যা নৌকা পায় তড়িঘড়ি উঠে পড়ে তার মধ্যে। এদিকে নবাবের আক্রমণ অব্যাহত৷ দুর্গ তখন প্রায় ধ্বংসের পথে৷ কলকাতায় আসার পর কোম্পানির প্রথম নিজস্ব গীর্জা ছিল সেই দুর্গের মধ্যেই। নাম সেন্ট অ্যান্স চার্চ৷ সেটিও নবাবের আক্রমণের শিকার৷ নবাব যেন এসেইছেন সাহেবদের সবকিছু সমূলে উৎপাটন করতে। আর সবটুকু উৎখাত করে তবেই তিনি কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদে ফিরবেন। তাঁর এই দৃঢ়চেতা সংকল্পের কাছে ইংরেজরা পালিয়ে কূল পায় না৷ দুর্গ থেকে সবাই নৌকায় কলকাতা ত্যাগ করলে সবশেষে ড্রেক সাহেব পালান। অধ্যক্ষ হয়েও তিনি নবাব সিরাজউদ্দৌলার অতর্কিত আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়া ইংরেজদের ঐক্যবদ্ধ করতে সমর্থ হননি। অগত্যা কোম্পানির প্রতিনিধিদের কলকাতা থেকে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।
কি ভাবছেন বন্ধুরা? ইংরেজদের গল্প এখানেই শেষ হলো? এ তো সবে শুরু। শুধু মাঝের কটা দিন সাহেবদের জন্য খুব খারাপ সময় এসে হাজির হয়েছিল। নিজেদের জমিদারী কলকাতা ছেড়ে অস্বাস্থ্যকর এবং বসবাসের অযোগ্য ফলতায় তারা শেষমেশ আশ্রয় গ্রহণ করে। তারপর আবার তাদের সংগঠিত হওয়ার সময়। ঘুরে দাঁড়াবার সময়। আর ইতিহাসকে নিজেদের মতো পরিবর্তন করবার সময়।