সম্পাদকীয়

আগুনের করাল গ্রাস

ছোটবেলায় ভূগোল বইয়ে পড়তাম আমাদের ভারতের বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের কথা। ভৌগলিক বৈচিত্র্য প্রভাবিত করে মানুষের সংস্কৃতিকে, এমনকি খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানকেও। বাকি সংস্কৃতিগুলি টিকে থাকার লড়াই করে গেলেও বাসস্থান তার লড়াই করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই। সেই শীতের অঞ্চলে যেখানে তুষারপাত হয়, সেখানে তীব্র ঢাল যুক্ত টালির ছাদ, অতি বর্ষণের অংশে টিনের চাল, তীব্র গরমের থেকে বাঁচতে মাটির পুরু প্রাচীর যুক্ত শান্তির বাসগৃহ, বন্যার হাত থেকে বাঁচতে উঁচু প্লাঙ্কিন যুক্ত কাঠের ঘর, সমুদ্র সৈকতে সাইক্লোন থেকে বাঁচতে নীচু করে গোলপাতায় ছাওয়া কুঁড়েঘর এসব এখন প্রায় শেষের পথে। সর্বত্রই এখন বিজ্ঞানের নামে অবৈজ্ঞানিক ভাবে বানানো ছাদ ঢালাই করা বাক্সের মতো বহুমঞ্জিল ইমারত। তার মধ্যেও ডুয়ার্স অঞ্চলে এখনও টিমটিম করে টিকেছিল যে কয়েকটি প্লাঙ্কিন যুক্ত কাঠের দ্বিতল বাংলো, তাদের একটি আমাদের অতি পরিচিত ও প্রিয় হলং বন বাংলো। কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারণে সেই হলং বন বাংলো ভস্মীভূত হয়ে গেছে গত ১৮ই জুনের অভিশপ্ত রাতে। মানুষ আজকাল বড় লোভী হয়ে গেছে, তেমনি হয়েছে বোকাও। নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এতটা অদূরদর্শী জীব পৃথিবীতে আর একটিও নেই। তাই কি করে কি হলো, আর পরবর্তীতে কি হবে এ বিতর্কে আর যাচ্ছি না। আমি নিজে ডুয়ার্সের সন্তান, তাই ডুয়ার্সে ঘোরাটা আমার বরাবরই ঝটিকা সফর। কখনো তেমনভাবে রাত কাটানো হয়নি বাইরে। গত জানুয়ারি মাসে মাকে বলছিলাম, চলো তোমার অবসর জীবনে একবার ঘুরে আসি হলং বন বাংলো থেকে। মার জীবনেও অবসর ঠিকমতো এলো না, আর আমাদেরও এই পরিকল্পনা পিছিয়েই যাচ্ছিলো। একদিন ইউটিউবে সার্চ করেছিলাম হলং বন বাংলো দিয়ে। ‘ঘোষ বাবু অ্যাডভেঞ্চার্স’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে চোখ আটকে গেলো। তারপর মন্ত্রমুগ্ধের মত ৩৭ মিনিটের ভিডিওটা দেখতে দেখতে মনে মনে পায়ে পায়ে মায়ে পোয়ে ঘুরে এলাম হলং বন বাংলো থেকে। কিন্তু সশরীরে সেখানে যাওয়ার আক্ষেপটা থেকেই গেলো। শুনেছিলাম হলং এ একরাত থেকে বাতাবাড়ি বা মূর্তির সরকারি বাংলোতেও বুকিং করতে হবে। একে তো বাতাবাড়ি, মূর্তি আমার আশৈশব নিয়মিত যাতায়াত, তার উপরে সেসব বাংলোর আতিথেয়তাও নাকি খুব নিম্নমানের। তাই মনে মনে হলং এ রাত কাটানোর পরিকল্পনা কিছুটা ফিকে হয়ে গিয়েছিল। তবে একবার সচক্ষে ডুয়ার্সের অন্যতম হেরিটেজকে দেখবো, এমন আশা ছিলোই। কিন্তু সত্যিই ভাবতে পারিনি সে আশা আশাই থেকে যাবে। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, লাটাগুড়ি, বানারহাট, ওদলাবাড়ির মতো শহর ও মফস্বল গুলিতে হারিয়ে যেতে বসেছে কাঠের বাড়ি। আমার শৈশবের দু’এক বছর কেটেছিল কাঠের প্লাঙ্কিন করা বাড়িতে। যদিও তার স্মৃতি আমার তেমন নেই বললেই চলে। ময়নাগুড়িতে আমার এক মামাবাড়ি এখনো কাঠের, তবে জীর্ণ দশা। কতদিন থাকবে বলা মুশকিল। হলং বন বাংলোর মতোই আমার দেখার সৌভাগ্য হয়নি শিকারপুরে অবস্থিত আদি ভবানী পাঠকের মন্দিরটি। যেটি কাঠ ও টিন সহযোগে একদম প্যাগোডা স্টাইলে বানানো। সেটিও এমন বিধ্বংসী আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায় ২০১৮ সালে। পরে অবশ্য প্রায় একই আদলে তৈরি করা হয়েছে সেটিকে। দেখেও এসেছি, কিন্তু পুরনো সেই কাঠের গন্ধটা আর পাইনি। হলং আর যাওয়া হলো না। আর কোনদিন যাবোও না যদি ওখানে মডার্ন রিসোর্ট তৈরি হয়। আশা করবো হলং বন বাংলো ঠিক যেমনটি দেখতে ছিল, ঠিক তেমনভাবেই যেন কাঠ দিয়ে পুনর্নির্মিত হয়। শুধু সেই প্রাচীন কাঠের গন্ধটা মিস করবো। তখন তোমায় দেখতে যাবো হলং বন বাংলো। যদিও এ দূরাশা জানি। কাঠ মহার্ঘ্য বস্তু। কাঠ দিয়ে এর পুনর্নির্মাণ চাইলেও সম্ভব নয়। সেই কাঠ, শাল হোক বা সেগুন এভাবে ভস্মীভূত হয়ে গেল, এটা অভাবনীয়। কতিপয় প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষ এখন রয়েছেন দ্বিধা দ্বন্দ্বে। সেই কাঠের রাজকীয় স্ট্রাকচার যেমন ভোলার নয়, তেমনি নতুন করে অরণ্য ধ্বংস করে কাঠ কেটে আবারো এমন বাংলো তৈরি কতটা বাস্তব পরিকল্পনা? মাঝখান থেকে জয় হয় অশুভ শক্তির। এর আগে ২০১১ সালে পুড়ে যায় জয়ন্তী বন বাংলো, এরপর যে কার পালা!

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।