সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ২৩)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো

ছুটি কিছুদিন পর দেখল বাসুদেব লোহার খুব শান্ত প্রকৃতির।
মণিও বলল – ওকে দেখলে ভয় করে, কিন্তু খুব শান্ত। ওদের তো খাটুনি করতে হয়, দেখিস জঙ্গল থেকে কাঠকুটো কুড়িয়ে আনে মাথায় করে, যেদিন ইশকুল বন্ধ, সেদিন বাবুদের বাড়িতে কাজও করতে হয়। আমি একদিন বাসুদেবকে বিষ্ণুপদ স্যারের বাড়িতে চ্যালাকাঠ চিরতে দেখেছি। বল, ওরা পড়বার সময় কোথা থেকে পাবে!
 সত্যিই তো, খুব কষ্ট করেই পড়া চালাতে হয় ওদের।
কিছুদিন থেকে বাবাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে। বাড়ির সবাই কেমন যেন চিন্তিত। ছুটি বুঝতে পারছে কিছু একটা তো হয়েছে। খুব গুরুতর কিছু। বাড়ির খোলামেলা হাওয়াটা ক্রমশই ভারী হয়ে উঠছে। বাবা মা ও বড়দাদা গলা নামিয়ে কীসব আলোচনা করছেন।  সে ঢুকলেই বন্ধ করে দিচ্ছেন।
এরই মধ্যে একদিন মণি বলল – বাড়িতে কথা হচ্ছে জানিস আমাকে রতনপুর বড় ইশকুলে ভর্তি করে দেওয়া হবে।
– কেন?  এতদূর কেন যাবি এখন?  ওটা তো ক্লাস সেভেন থেকে।
– তুই কিছু শুনিস নি?  বাড়িতে কেউ কিছু বলেনি?
– না তো।
– উইলসন ইশকুল উঠে যাচ্ছে রে।
– মানে?  কেন?
– ম্যানেজাররা ঠিক করেছে কুলিদের জন্যে ইশকুল দরকার নেই। ওদের কাজ হল চা – পাতা তোলা। বেশি পড়াশোনা করলে ওরা কি আর কাজ করবে?
– সে কি রে?  এটা কোনও কথা হল নাকি?
– কি করবি বল, ওরা তো মালিক। ওদের ইচ্ছে হলে ওরা করবে।
একটা অচেনা অজানা ভয় এসে ছুটিকে আঁকড়ে ধরল। কাউকে কিছু বলল না। আজ তার হিহি হাসি টিফিনের সময় ছুটোছুটি কোনও কিছুতে মন নেই। বাড়ির পরিবেশ বেশ কিছুদিন থেকেই তো পালটে গেছে। সে শুধু বুঝতে পারছিল না।
বাড়ি ফিরে শান্ত হয়ে খেয়ে শুয়ে পড়ল। এই মাসের শিশুদের “ধ্রুবতারা” নিয়ে পড়তে লাগলো “জিম করবেটের বাঘ শিকার”।
আমার দ্বিপ্রাহরিক ঘুম ভেঙে গেল। ঝুম মেরে আছে চারপাশ।  বড্ড নিশ্চুপ। মানুষের পথচলা অনেকটা নদীর মতই, বাধা আসে কতরকম,, যমুনা বন্ধ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি গ্রন্থ  আছে”উপল ব্যথিত গতি”। কী চমৎকার মরমী নাম।
বিছানা ছেড়ে এসে জানালায় দাঁড়ালাম। একটি বেড়াল প্রতিবেশীর দালানের পাঁচিলের খাঁজখোঁজ থেকে বেরোনো অকাজের বুনো গাছের পাতার গন্ধ শুঁকে বেড়াচ্ছে। কিছুদিন পর এ বাড়ির মালিক এই বুনো গাছগুলো ছেঁটে দেবে। অনেক সময় পাঁচিলের ভেতর থেকে এই গাছগুলোর শেকড় টেনে আনা যায় না। তখন আবার বেরোয়, আবার ছাঁটতে হয়। জীবনের অনিবার্য অনিশ্চয়তা, আপেক্ষিকতা ও অসমাপ্তির অনুভব নিয়ে এইসব আগাছা ছাঁটতে ছাঁটতে এগোতে হয়। কোনও কোনও সময় তো ক্লান্তির ভারে নুয়ে পড়ে মানুষ।  আবার দাঁড়ায়, তার যুদ্ধ জারি থাকে,  একমুহূর্তের জন্যেও পথচলা থামালে যে চলবে না। চলো চলো। কোথায়? সেই অনিবার্যতায়। প্রস্থানের পথে!  তবু এত আগাছা এত পাঁচিল এত মরণোন্মুখী নিজের দিকে ছুটে আসা তাপ, ঝড়,  আঘাত, অপমানকে লুফে নিতে নিতে আবার ওটাকে মহাশূন্যে ছুঁড়ে দিতে দিতে এই যে পথচলা তার কোনও বিকল্প হয় না, জবাবও হয় না।
মুশকিল যা, সব তাপ সব আঘাত, সব কষ্ট নিজে নিজে সইতে হয়,  কত অপমান বুকের ভেতর বাসা বাঁধে তাকেও শূন্যে ছুঁড়ে দেওয়ার অবিরাম প্রয়াস চালিয়ে দিতে হয়।
বাবা কাউকে কিছু বলতেন না, চাপা স্বভাবের মানুষ ছিলেন,  একা সব বহন করতেন, তাই বলে থেমেও থাকেননি, অবিরাম চলা, বাধাগুলো দু’হাতে  সরাতে সরায়ে এগিয়ে যাওয়া।বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে বলি – এত সহ্যশক্তি কোথা থেকে পেয়েছিলে বাবা?  এমন এগিয়ে চলার আলোকিত পথ কে দেখিয়েছিল তোমাকে?
ক্রমশ
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।