ক্যাফে ধারাবাহিক ভ্রমণ সিরিজে সুব্রত সরকার (পর্ব – ৫)

সিকিমের পাহাড়ি গ্রাম- দেখা না-দেখার পাকইয়ং
শরৎ আকাশে বাদল মেঘ। বিদ্যুৎ এর ঝিলিক চোখ রাঙাচ্ছে। দার্জিলিং মেল এর জানালা দিয়ে দেখছি আর ভাবছি এই অসময়ে কেন আবার এমন কালো মেঘ ও ঘন বৃষ্টির রণসজ্জা!..
বৃষ্টির জল মাথায় করেই নামলাম দার্জিলিং মেল থেকে। এনজেপি স্টেশনে যখনই প্রথম পা পড়ে, মন মেতে ওঠে আনন্দে। এ যেন গেটওয়ে অফ স্বপ্নপুরীর অচিন ঠিকানা! এখান থেকে চারদিকে চলে যাওয়া যায়। মন যেখানে চায়, ছুটে যাও!.. পাহাড়, নদী, জঙ্গল, চা বাগান, উপত্যকার সবুজ গ্রাম সব তোমার জন্যই অপেক্ষা করে আছে। পথিক, তুমি তিষ্ঠ ক্ষণকাল, মন যেথায় চায়!..
আমার এবারের সূচীতে সিকিমের তিন পাহাড়ি গ্রাম রয়েছে। প্রথমে যাব পুব সিকিমের এক অচিন গ্রামে- পাকইয়ং। সেখানে আমার দুটো দিবস-রজনী একলা ভ্রমণের আনন্দে কাটবে। যাব শেয়ার জিপে। জিপ ছাড়বে শিলিগুড়ি থেকে।
নিউ জলপাইগুড়ি থেকে অটোয় চেপে শিলিগুড়ির বিশাল সিনেমা হলের কাছে এসে সার্ভিস জিপ পেয়ে গেলাম। আগাম কথা হয়েছিল দূরভাষে, তাই পেয়ে যেতে কোনও অসুবিধা হল না। আমার অনুরোধ ছিল, সামনের সিটটা যেন পাই! টুরিস্টদের জন্য এটা হট সিট! পেয়ে গেলে ভুবন জয়, না পেলে কি যে কষ্ট হয়!.. তারা তামাং কথা রেখেছে। আমার জন্য ফ্রন্ট সিট বুকড্!.
গাড়ি ছাড়ল সময় মত। তারা তামাং স্টিয়ারিং ধরে হাসিমুখে বলল,” পাকইয়ং, পহেলে বার যা রাহা?”
আমি হেসে বললাম, “কেন? দু’বার যাওয়ার মত জায়গা নাকি!.”
তারা এবার লাজুক হেসে বলল,”মেরা গাঁও, মেরা দেশ বহুত সুন্দর। আপনি চলুন, দেখবেন কত ভালো লাগবে।”
গাড়ি যত ছুটছে। মেঘ- বৃষ্টি তত সেজে সেজে উঠছে। ভালো লাগছে এমন এক বৃষ্টিভোজা সফরে পাহাড়ী পথে। সেবক রোড ধরে গাড়ি ছুটতে ছুটতে করোনেশন ব্রিজ পেরিয়ে, কালীঝোরা, লোহাপুল, ২৯ মাইল, মেল্লি হয়ে কিরনেতে এসে থামল। চা বিরতি। তারা মজা করে বলল, “স্যার, ইহা পে মাইনাস-প্লাস সব কুছ কর লিয়ে।”
গরম মোমো ও চা খেতে খেতে রেস্টুরেন্টের খোলা ছাদ থেকে দেখলাম তিস্তার ঘোলা জল প্রবল স্রোতে বয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ে বৃষ্টি যত বাড়ছে, তিস্তা দামাল রুপে ভয়ংকর রুপসী হয়ে উঠছে। পর্যটকের চোখে তা দেখে ভীষণ আনন্দ পেলাম। কিন্তু কোথায় যেন আবার একটু ভয়ও হল, এই অতিবৃষ্টি পাহাড়কে বিচ্ছিন্ন করে দেবে না তো!..
কিরনে থেকে গাড়ি রংপো হয়ে পাকইয়ং এর পথে ছুটতে শুরু করেছে। বৃষ্টি ভেজা পিচ্ছিল পথে তারা তামাং গাড়িকে বশে রেখে বেশ ছুটিয়ে নিয়ে চলে এল পাকইয়ং। শিলিগুড়ি থেকে ১২০ কিমি পথ উজিয়ে চলে এলাম।
আমার রাতঠিকানা পাকইয়ং এর পাহাড় শীর্ষে আপার নামচেবং গ্রামের কাঞ্চনজঙ্ঘা হোম স্টেতে। তাই সেই চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে নিতে হল একটা ছোট গাড়ি। এপথে পাকইয়ং এর নতুন এয়ারপোর্টকে ঝাপসা চোখে এক ঝলক দেখতে পেলাম।
হোম স্টেতে পৌঁছেই মনটা প্রসন্ন হয়ে গেল। বেশ পরিচ্ছন্ন, প্রশস্ত জায়গা জুড়ে ফুলে, ফলে, অর্কিডে আর নিজস্ব জৈব বাগিচা নিয়ে নির্মল সুন্দর। আজ আমিই একমাত্র অতিথি।
পাহাড়মুখী সেরা ঘরটাই আমাকে দিলেন কপিল ছেত্রী। কপিল খুব গুণী অর্কিডওলজিস্ট। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরষ্কার নিয়েছেন তাঁর বাগানের সেরা সেরা অর্কিডের জন্য। সেই ছবিগুলোও দেখলাম।
আমার চোখের সামনে তিনশো ষাট ডিগ্রি ছড়ানো সবুজ পাহাড়-জঙ্গল, ছোট ছোট মায়াবী উপত্যকা। কিন্তু মেঘ আর কুয়াশায় সব ঢাকা। যেন ঘুমিয়ে আছে পাহাড়। মুখ লুকিয়ে আছে উপত্যকারা। অথচ এই পাহাড়ের মধ্যেই মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা, শায়িত বুদ্ধ, হিমালয়ের চেনা চেনা সব বিখ্যাত শৃঙ্গগুলো।
হোমস্টের ঝুল বারান্দায় বসে আরও দেখা যায় দূরের নাথাং ভ্যালি, মারতম প্যাডি উপত্যকা, রুমটেক মনাস্ট্রি, রেনক, আর পাখির চোখে গ্যাংটক শহরকে। কিন্তু আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না! ঘন মেঘ, কুয়াশা আর বৃষ্টি সব সুন্দরকে মুড়ে রেখেছে। প্রকৃতির এই নিষ্ঠুরতা সহ্য করার কষ্ট নিয়ে বসে বসেই কাটল গোটা বিকেল সন্ধেটা।
রাত গভীর হতেই বৃষ্টি আরও দস্যি হল। বিদ্যুৎ চলে গেল। প্রবল তর্জন গর্জন হচ্ছে আকাশে।
পরেরদিন ভোরে খবর পেলাম ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে গেছে নর্থ সিকিমে। চুংথাং এ ক্লাউড বাস্ট করেছে, ড্যাম ভেঙে পড়েছে সেনা ছাউনির ওপর। অনেক জওয়ান নিখোঁজ। রাস্তা ভেঙে চৌচির। সিংতাম জনপদটা চৌচির। বিচ্ছিন্ন গোটা উওর সিকিম। এবং এন জি পি ফেরার রাস্তাও বন্ধ হয়ে গেছে!.. সবই কপিলজীর ভয়ার্ত মুখে শুনলাম। আমার মোবাইল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। আমিও বিচ্ছিন্ন আমার পরিচিত সব কিছু থেকে।
তারপর পুরো দুটো দিন এই ঘনঘোর দুর্যোগের আবহে বিদ্যুৎহীন, মোবাইল বিহীন এক অন্য যাপনের রোমাঞ্চ ও মনকেমনের মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে অনেক না দেখাকে রেখে ফিরে আসতে হয়েছে পাকইয়ং থেকে। প্রকৃতির কাছে আজও আমরা কত অসহায়। তবু আমাদের অবিবেচনা থামছে না। পাহাড়ে এত নগরায়ন, এত ডিফরেস্টেশন, প্রকৃতির ওপর এত অত্যাচার আর কত বাড়বে জানি না। তাই প্রকৃতিও তার প্রতিশোধ নেয় এভাবেই!..
পাহাড় থেকে নীচে নেমে আসার অন্যপথে পাড়ি দিতেই হল চতুর্থ দিনের সকালে। আমার নর্থ সিকিমের জঙ্গু উপত্যকায় তিনরাত্রি থাকার কথা ছিল। কিন্তু সে পথে এখন আর যাওয়া সম্ভব নয়। অন্যপথে, অন্য ভ্রমণে পা বাড়ালাম।
পাকইয়ং এর পথে পায়ে হেঁটে হেঁটে গ্রাম ভ্রমণের আনন্দ পেয়েছি। বোজোতার ভিউ পয়েন্টে বসে পাকইয়ং উপত্যকার শোভা দেখেছি।
পিপলিটাঁড়ের জঙ্গলে পাখিদের গান শুনেছি। কপিলজী বারবার বলেছেন, “স্যার, ফির একবার জরুর আয়েঙ্গে, মেরা পাকইয়ং আপকো আচ্ছা লাগেগাই লাগেগা।”
“ভোরের সব তারারাই আছে রাতের আকাশের অন্ধকারে “বুদ্ধদেব বসুর এই কবিতার পঙক্তিটা মনে মনে আওড়ে কপিলজীকে বললাম, “পাকইয়ংকে না দেখেও যা দেখে গেলাম তার জন্যও একবার আসতাম। আই প্রমিস, ফির মুলাকাত হোগা! “
কপিলজী বিষন্নমনে হাসছেন বিদায় মুহূর্তে। চতুর্থ দিনের এই সকালে একটু রোদ উঠেছে। আকাশ কেমন যেন উদাসীন। এই প্রথম রোদের নরম আলো এসে পড়েছে কপিলজীর মুখে। আমি মনে মনে ভাবলাম, আর দুটো দিন যদি থেকে যেতে পারতাম, হয়তো এই রোদের আলোয় নিশ্চয়ই উজ্জ্বল ঝকঝকে কান্চনজঙ্ঘাকে হাসতে দেখতাম। হিমালয়ের শৃঙ্গগুলোর আলোহাসি দেখে চোখ-মন জুড়োত। শায়িত বুদ্ধকে হয়তো বলতাম, “আর কতকাল তুমি ঘুমোবে!.. ওঠো। জাগো। এই পৃথিবীকে হিংসা মুক্ত করো!..”
বিদায় পাকইয়ং!..ভালো থেকো পাকইয়ং!.
কিভাবে যাবেন- নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে সোজা পাকইয়ং চলে আসা যায়। আবার শেয়ার জিপেও শিলিগুড়ি থেকে দিব্যি আসা যায়। গ্যাংটক থেকেও খুব কাছে পাকইয়ং। সার্ভিস জিপ আছে।