গল্পতে তপন মন্ডল

স্বামী স্ত্রী
৩৮ বছরের জয়দীপ শর্মা সেনাবাহিনীতে মেজর পদে কর্মরত। সৈন্যবাহিনীতে তার দক্ষতা বেশ প্রশংসনীয়। সন্ত্রাসীদের কাছে জয়দীপ ভীষন ভয়ানক যম স্বরূপ। বিভিন্ন সংবাদপত্র গুলিতে জয়দীপের সাফল্য বহুবার ফলাও করে ছাপানো হয়। কয়েক দিনের ছুটি নিয়েছে জয়দীপ। সে নিজের প্রথম বিবাহ বার্ষিকীতে যোগ দেবে।
গত বছর সজনীকে বিয়ে করে জয়দীপ ভোপালে নিজের বাড়িতে সকলকে একপ্রকার চমক দেয়। বহুদিন সেনাবাহিনীতে চাকরি করছিল জয়দীপ। পরিবার থেকে পাত্রী দেখা চলছিল কিন্তু সব জায়গায় নিরাশ হতে হয়েছে। কোন কোন পাত্রীর বাড়িতে তো জয়দীপকে কাকু বলে সম্বোধন করা হচ্ছিল। আবার কোথাও পাত্রের বয়স বেশি ইত্যাদি অভিযোগও উঠছিল। কোন কোন পরিবার বুড়ো ভাম , ইত্যাদি তাচ্ছিল্যের সুরে উপহাস করতে ছাড়েনি। সঙ্গে ইঙ্গিতপূর্ণ বিদ্রুপের হাসিও।
জয়দীপ অপূর্ণ। প্রয়োজন একাত্ম সহধর্মীনির। সঙ্গিনীই হয়তো তার জীবনে পূর্ণতা ফিরাতে পারে।
বর্তমান জেনারেশন Whats app, Twitter, Facebook, Instagram নিয়েই মেতে আছে। সৈনিকরা কিভাবে জীবন যাপন করে সে বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ করে না কেউ। কেবল নিজেদের আমোদ প্রমোদ নিয়েই ব্যস্ত। সৈন্যবাহিনীতে কাজ করা সৈনিকদের বিবাহ বেশ দূরহ ব্যাপার ।
যাই হোক জয়দীপের জীবনের পূর্ণতা ফেরে গত বছর। মুম্বাইয়ে সেনা ট্রেনিং থেকে ফেরার সময় সজনীর সঙ্গে জয়দীপের প্রথম আলাপ হয়। সজনী শিক্ষিত। তবে অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে সে। দুজনের আলাপ প্রেম স্তরে পৌঁছে যায়। প্রেম শেষ পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে পরিণতি লাভ করে। বিয়ের ১৫ দিন পরে জয়দীপ কাশ্মীরে চলে যায়।
জয়দীপ কাশ্মীর থেকে আজ ফ্লাইটে ভোপাল বিমানবন্দরে নেমেছে। মনটা আজ বেশ তরতাজ। প্রায় এক বছর পর সে সজনীর সঙ্গ পাবে।
জয়দীপ ট্যাক্সি ধরল। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে তার বাড়ির ঠিকানা দিল। তারপর গাড়ির পিছনে সিটে বসে পড়লো । ট্যাক্সি ড্রাইভার ঘাড় নেড়ে জয়দীপের বাড়ির ঠিকানায় রওনা দিল।
ট্যাক্সির পিছনের সিটে বসে জয়দীপ কল্পনার আকাশে ভাসতে থাকলো। রঙিন স্বপ্ন দেখতে থাকলো ।একটা অজানা শিহরণ অনুভূত হচ্ছে তার। সজনীর মুখটি বারবার হৃদয়ের আয়নায় ভাসছে। হৃদয়ের আয়নার সিংহভাগটা দখল করেছে সজনী। সজনীর সুন্দর মুখটা দেখার জন্য জয়দীপ ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো। যদিও প্রায় প্রতিদিন ভিডিও কলে স্বামী-স্ত্রীর কথা -বার্তা ,খুনসুটি হতো। তবে এক বছর পর তারা পুনরায় সাক্ষাতে মিলিত হবে। একে অপরকে কাছে পাবে।
ট্যাক্সি ড্রাইভার বাড়ির ঠিকানায় এসে উপস্থিত। গাড়ির শব্দ শুনে বাড়ির সদর দরজা খুলে গেল। বাড়ির সকলে সদর দরজার বাইরে এসে দাঁড়ালো। এক বছর পর তারা জয়দীপ কে কাছে পেয়েছে।
ট্যাক্সি ড্রাইভার জয়দীপের জিনিসপত্র বোঝাই টলি ব্যাগ নামিয়ে দিল। তারপর সে ভাড়া নিয়ে চলে গেল।
জয়দীপ বাড়ির সকলকে দেখে খুব আনন্দ পেল। হাসিমুখে বাবা ও মাকে প্রণাম করলো। ছোটদেরকে আলিঙ্গন করলো কিন্তু এত জনের মাঝখানে সে সজনীকে খুঁজছে। এত জনের মধ্যেও জয়দীপ সজনীকে দেখতে পেল না। মনের কোনে কিঞ্চিৎ নিরাশার আগমন ঘটলো।
ঘাড় ঘুরিয়ে সদর দরজায় দৃষ্টি ফেলতেই জয়দীপ সজনীকে দেখতে পেল। সজনী লাজুক দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে আনন্দ অশ্রু।
জয়দীপের অন্তরে এক অজানা সুখানুভূতি। এক অজানা আনন্দ। অন্তরঙ্গ আলিঙ্গনের চরম ইচ্ছা।
জয়দীপের পরিবার হই হই করে জয়দীপকে নিয়ে সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল।
সজনী একমুখ লজ্জা নিয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করল। সে নিজের বেডরুমের জিনিসপত্র সাজাতে লাগলো। টেবিলের উপর ছড়ানো বইগুলি সুন্দর পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখলো। ফুলদানিতে জল দিল। আয়নার সামনে গিয়ে নিজের চুল ঠিক করল। নিজের মুখমণ্ডল বারবার পর্যবেক্ষণ করতে থাকলো।
কিছুক্ষণ পর সজনী কিচেন রুমে প্রবেশ করল। সকলের জন্য চা- জলখাবার বানাচ্ছে সে। কিচেন রুমের জানালা দিয়ে সে দেখল, জয়দীপ তার টলি ব্যাগ খুলে সকলের জন্য আলাদা আলাদা উপহার নিয়ে আসেছে। সবার হাতে সেগুলি ভাগ করে দিচ্ছে। সবার মুখে হাসি। সোফায় বসে ছোটরা একে অপরের উপহার গুলি দেখছে নেড়েচেড়ে ।
তবে জয়দীপ সজনীকে খুঁজছে। সে এতদিন পরে বাড়িতে ফিরেছে কিন্তু সজনী এখনো পর্যন্ত স্বামীর কাছে আসেনি। সে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল।
কিছুক্ষণ পর সজনি চা -জলখাবার নিয়ে সোফার পাশের টেবিলে রাখল। তারপর সবাইকে চা-জল খাবার দিল। এক বছর পর এই প্রথমবার সে স্বামীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। স্বামীর হাতে চা- জল খাবারের প্লেট এগিয়ে দিল। দুজনের চোখাচোখি হল কিন্তু চোখ পড়তেই চায় না। দুজনেই মুচকি হাসলো।
জয়দীপ রাতের ডিনার সেরে নিজের ঘরে প্রবেশ করল। সজনীও স্বামীর পিছু পিছু ঘরে প্রবেশ করল। ঘরের দরজা বন্ধ করলো।
জয়দীপ সজনীকে আলিঙ্গন করল। তাদের বুকের হৃদস্পন্দন যেন ঘরে প্রতিধ্বনি হচ্ছে। দুজনেই একে অপরে হাত ধরে তাদের বেডে গিয়ে বসলো। জয়দীপ এবং সজনী একে অপরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। কতদিন তারা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন। নিজেদের আবেগ বশে রাখতে পারছে না। সজনী আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না । সে এগিয়ে গেল স্বামীর কাছে। স্বামীর বুকে মাথা রাখলো। রাগ দুঃখ অভিমান ভুলে ভালোবাসার মানুষটিকে পেয়ে সে একেবারে শান্ত।
সজনী জয়দীপের বুকে মাথা রেখে বলল, আমি তোমার মত একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিতে চাই। যে তোমার মত সৈন্যবাহিনীতে থেকে দেশের সেবা করবে। দেশমাতার বিপদে নিজেকে সমর্পণ করবে। তোমার মত বুদ্ধিমত্তার সাথে সন্ত্রাসকে দমন করবে সফল ভাবে। যে নিজের স্বার্থ নয় দেশের স্বার্থকেই নিজের একমাত্র লক্ষ্য বলে স্থির করবে। নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ বিসর্জন দিয়ে দেশকে বিপদমুক্ত করে দেশবাসীকে রক্ষা করবে।
সজনীর কথা শুনে জয়দীপ বেশ অবাক হল। সজনী খুব সরল অথচ দেশমাতৃকার প্রতি তার ভক্তি, শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীলতা জয়দীপকে আশ্চর্য করল। সে মনে মনে ভাবলো পৃথিবীতে ঈশ্বর সজনীকে পাঠিয়েছে শুধুমাত্র আমার জন্যই তৈরি করে। আর কারো জন্য নয়। সজনী অনাথ হয়েই জন্মগ্রহণ করেছে। আমাকে ভালোবেসে সে জীবনের সমস্ত সুখ আহ্লাদ মেটাতে চায়। আমরা সৈনিকরা হাজারো বিপদের মধ্যে দিন অতিবাহিত করি। জানিনা কখন শত্রুর ছোবলে প্রাণহানি ঘটে। প্রাণ হাতে নিয়ে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে হয়।
সজনীর মতো প্রেমিকাকে বিয়ে করতে পেরে আমার জীবন সার্থক। তার আত্মত্যাগী মনোভাবের কাছে ভারতীয় ফ্যাশনধারী মেয়েরা বড়ই বেমানান। বিবাহিত মহিলারা স্বামীর সঙ্গ ছাড়া থাকতে চায় না। অথচ সজনী হয়তো তাদের থেকে ব্যতিক্রম। সে হাসিখুশিতে শশুর বাড়ির সকলকে আপন করে নিয়ে এক বছর কাটিয়ে দিয়েছে।
সজনী স্বামীর মত পুত্র সন্তানও চাইছে , যে তার বাবার মত সৈন্যবাহিনীতে থেকে ভারত মাতার মুখ উজ্জ্বল করবে।
সৈন্যবাহিনীতে মৃত্যু নিশ্চিত। এ কথা জেনেও একজন মা দেশমাতার সেবায় সন্তানকে বিসর্জন করতে চায়। এমন মহানুভবতা কতজন মহিলার থাকতে পারে? এমন ত্যাগ কতজন মায়ের থাকতে পারে?
স্ত্রীর এহেন বাস্তবিক মানসিকতায় জয়দীপ অত্যন্ত আপ্লুত হল। স্ত্রীকে আজ আরো বেশি করে ভালবাসতে ইচ্ছে করছে তার। দুজনে পুনরায় অন্তহীন আলিঙ্গনে লিপ্ত হল। শ্বাস গভীর হয়ে উঠল।