সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ২৬)

কেল্লা নিজামতের পথে

মুর্শিদাবাদ মানেই উঠে আসে বর্গীদের কথা। তাদের বাংলায় প্রবেশের প্রধান রাস্তা ছিল পশ্চিম ঘেঁষা পাহাড় পথ। দুর্গম রাস্তা৷ এখন যেখানে পাঞ্চেত বাঁধ, গড়পঞ্চকোট দূর্গ। একসময় সেই পথই ছিল বর্গীদের মুক্তাঞ্চল। উড়িষ্যা হয়ে পঞ্চকোট পাহাড় পেরিয়ে বর্ধমান অভিমুখে তাদের আগমন। প্রায় বার্ষিক নিয়মের মতো মারাঠা দস্যুরা ছুটে এসেছে বাংলায়। কখনো বর্ধমান, কখনো মেদিনীপুর, কখনো মুর্শিদাবাদ, কখনো হুগলি। শুধু কোম্পানির জায়গা কলকাতাকেই যেন কোন গুরুবলে ছেড়ে দিয়েছিল বর্গীরা। অথচ ভয়ঙ্কর বর্গীদের হাত থেকে কলকাতা শহরকে বাঁচাতে একটা বিরাট খাল কেটেছিল কলকাতাবাসী। কোম্পানি তাতে টাকা না দেওয়ায় শহরবাসীই চাঁদা তুলে খনন করে খাল। এই খালই কলকাতার বিখ্যাত মারাঠা ডিচ। যার নামে আজও বাগবাজারে গলির নামকরণ রয়েছে৷ মারাঠা ডিচ লেন। মারাঠা ডিচ আর আজ নেই। এর ওপর দিয়ে তৈরি হয়ে গেছে আপার ও লোয়ার সার্কুলার রোড। কিন্তু মারাঠা আক্রমণের স্মৃতি কলকাতাকে ছুঁতে পারেনি কখনো। তাই কলকাতাবাসী প্রত্যক্ষ করেনি সেই ভয়াবহ মৃত্যুলীলা ও তাণ্ডব।
বর্গীদের হাতে আক্রান্ত হয়েছে মুর্শিদাবাদও। এমনকি ধনপতি জগতশেঠের গদি লুঠ করে প্রায় কমবেশি তিন লক্ষ নবাবী টাকা লুঠ করে তারা। নবাব যখন যুদ্ধের জন্য মুর্শিদাবাদে নেই, তখনই শহর আক্রান্ত হয়। সুযোগের সদ্ব্যাবহার করতে দস্যু মারাঠাদের জুড়ি মেলা ছিল ভার। সুদূর মহারাষ্ট্র থেকে একটা সাত হাত কম্বল আর বর্শা হাতে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে তারা ছুটে যেত হাজার হাজার মাইল। চৌথ আদায় করে আবার ফিরে যেত নিজ রাজ্যে। মহারাজ শিবাজী একা হাতেই মারাঠা সাম্রাজ্য তৈরি করেছিলেন। সেই থেকেই প্রায় ১৮১২ সাল পর্যন্ত সেই সাম্রাজ্যের রমরমা। তারপরে বিদেশী শাসন ভারতের ক্ষমতা হাতে পেলে মারাঠারা অস্তমিত হয় ধীরে ধীরে৷ এর মধ্যেই তাদের বহু তাণ্ডব। বাংলার ক্ষতি করে সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে দুবার ভাবেনি তারা। নবাব আলীবর্দীর মত তুর্কি যোদ্ধাও একরকম নাকানিচোবানি খেয়ে যান বর্গী আটকাতে৷ পরে ভাস্কর পণ্ডিতকে ছল করে হত্যা করা ছাড়া আর কোনো উপায়ই ছিল না নবাবের হাতে। নবাব আলীবর্দীর সেনারাও প্রশিক্ষিত। তাই বারবার বাংলার মাটি লাল করে দেওয়া মারাঠারাও বেশিদিন থিতু হতে পারত না এ দেশে। জমিয়ে বসার আগেই সৈন্য নিয়ে ছুটে গিয়ে তাদের তাড়াতেন নবাব। মারাঠা বর্গীদের কথা বলতে গেলে প্রথম যে ভয়ানক সেনাপতির কথা উঠে আসে তিনি ভাস্কর পণ্ডিত৷ ভাস্কর রাম কোলহাটকর। নাগপুরের শাসক রঘুজী ভোঁসলের প্রধান সেনাপতি। সৈন্যচালনায় তার দক্ষতা অপরিসীম। ছত্তিশগড় ও বাংলায় মারাঠা আক্রমণের পিছনে তার ভুমিকা উল্লেখযোগ্য। বাংলা থেকে চৌথ সংগ্রহ করার লক্ষ্যে রঘুজী যখন মারাঠা যোদ্ধাদের এক করলেন, ভাস্করকে করলেন তাদের নেতা। ভাস্করও বীর। গেরিলা যুদ্ধে তার দক্ষতা বলবার মত। এরপর দলে দলে ঘোড়সওয়ার বর্গী নিয়ে ভাস্করও এগিয়ে এলেন বাংলার মাটি ছুঁতে। এক্ষেত্রে একজনের কথা না বললেই নয়। তিনি হলেন মীর হাবিব। নবাব সুজাউদ্দিনেই জামাই। আলীবর্দী খাঁ নবাব হবার পর থেকেই বিষয়টা ভালোভাবে নিতে পারেনি হাবিব। তাই আলীবর্দীর শত্রু মারাঠাদের সাথে হাত মেলাতে তিনি দুবার ভাবেননি। আর মীর হাবিবের মত একজনকে পেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে মারাঠারা। বিশ্বাসঘাতক হিসাবে আমরা মনে রাখি মীরজাফরকে। কারণ ইতিহাস সেভাবেই লেখা হয়েছে। তার আগেও বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ছিল৷ মীর হাবিব মারাঠাদের ছক এঁকে বুঝিয়ে দেন মুর্শিদাবাদ আক্রমণের ব্লুপ্রিন্ট। মুর্শিদাবাদ হাবিবের হাতের তালুর মত চেনা। তাই নবাবের দুর্বলতা থেকে সৈন্যচালনার হালহকিকত, সবই মারাঠাদের বোঝালেন তিনি। এরপর থেকেই মারাঠারা বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দিতে শুরু করে হাবিবকে। কাটোয়ায় মারাঠা সৈন্যবাহিনীর দায়িত্ব পড়ে তার ওপর। ১৭৪২ সালটা মারাঠা বর্গীদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেই বছর ভাস্কর পণ্ডিত বাংলায় দুর্গাপুজো করেন। লুঠের সম্পদ ও টাকা দিয়ে শক্তির আরাধনায় মেতে ওঠে তারা। কাটোয়ার কাছে দাঁইহাটে সমাজবাটি পাড়ার দুর্গাপুজো আজও ভাস্কর পণ্ডিতের পুজো বলে খ্যাত। স্থানীয় মানুষেরা একটা ভাঙা পাঁচিলের দিকে তাকিয়ে ইতিহাসের কথা বলেন। সেই পাঁচিলের সাথেই জড়িয়ে আছে দুর্ধর্ষ দস্যু মারাঠাদের স্মৃতি। ভাস্কর পণ্ডিতের স্মৃতি। শোনা যায় সোনার দেবী প্রতিমা গড়ে জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে পুজো শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু মহানবমীর দিন আলীবর্দী খাঁ হঠাৎ আক্রমণ করে ছত্রভঙ্গ করে দেন মারাঠা দস্যুদের। ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচান ভাস্কর। পুজোর মধ্যেই হঠাৎ আলীবর্দীর আক্রমণের কোনো আভাস ভাস্কর পাননি সেদিন। ফলে যুদ্ধের বদলে সেদিন পালাতে হয় তাদের। তাছাড়া উপায় ছিল না। বাংলায় বর্গীদের ওপর এভাবেই বারবার হামলা চালান নবাব আলীবর্দী। তার ফলে বারবার পুজোয় বাধা পড়ে। আবার বারবার শুরুও হয় পুজোর উদ্যোগ। সেই পুজোই স্থানীয়দের উদ্যোগে চলে আসছে আজও। আজ আর বর্গীরা নেই। রয়ে গেছে দাঁইহাটের পুরনো পাঁচিল ও দুর্গাপুজো৷ অবিলম্বে এইসব নিদর্শন সরকারী বা বেসরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু না হলে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন বাংলায় বর্গীহানার কোনো স্মৃতিই আর খুঁজলেও পাওয়ার উপায় থাকবে না। শুধু গড়পঞ্চকোটের পাহাড়ে এখনো পড়ে আছে কিছু বর্গীহানার স্মৃতি। অরক্ষিতই। আজকের বাংলায় এইসব প্রায় হারিয়ে যাওয়া কিছু চিহ্ন বাঁচিয়ে রেখেছে মারাঠা দস্যুদের। বাংলা থেকে ফিরে যাবার সময় কেউ কেউ এখানেই থেকেও যান। বাড়িঘর বানিয়ে বাংলাকেই আপন করে নেন। ইটাচুনা রাজবাড়ী তার জীবন্ত এক উদাহরণ। হুগলির খন্যান গ্রামে ইটাচুনা রাজবাড়ী বর্গী স্মৃতির এক অধ্যায়৷ বাংলায় থেকে যাওয়া বর্দী কুন্দনরা (মতান্তরে কুন্দ্রা) এই বাড়ি তৈরি করেন। আজও সেই জায়গার নাম বর্গীডাঙা। বর্গীহানার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মুর্শিদাবাদের পথ চলা। বাংলার আর্তসামাজিক প্রেক্ষাপটে বর্গীহানার এই দশটা বছর ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।