সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ২৪)

কেল্লা নিজামতের পথে
মুর্শিদাবাদের যতবার এসেছি, একটা জায়গায় থমকে গেছি বারবার। পলাশী। লোকে বলে The Great battlefield of Plassey. পলাশীর একটা প্রান্তর কিভাবে সারা বাংলার একটা সময় কালের নিয়ামক হয়ে উঠলো, সেটা ভাবতে বসেই যেন ডুবে যেতে হয় একটা সময়ের অন্ধকারে। যেখানে এক ভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ঘিরে আছে বাংলার মাটি। সব বিদেশী শক্তি তখন প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে বনিকেরা বেশে এই সোনার বাংলায় একটুখানি ঠাঁই করে নিতে। তখন বাংলার রাজনৈতিক সীমানা বিস্তৃত। পূর্বে সিলেট থেকে শুরু করে পশ্চিমে বিহারের রাজমহল। উত্তরে পাহাড় থেকে দক্ষিণে উড়িষ্যার সমুদ্রতট। এই বিশাল সাম্রাজ্য রক্ষার দায়ভার মুর্শিদাবাদের হাতে। মুঘলরা তাদের রাজত্বকে বিভিন্ন সুবায় ভাগ করে প্রতি সুবার জন্য নিয়োগ করেন আলাদা আলাদা নবাব নাজিম। এলাকা থেকে কর তুলে দিল্লীকে রাজস্ব পাঠানো ব্যতিরেকে নবাবরা শাসনে মোটামুটি স্বাধীনই। দিল্লী থেকে বাদশার পক্ষে সবকটা সুবায় নিয়মিত উপস্থিত থেকে শাসনব্যবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান কখনোই সম্ভব না। যাতায়াতও তখন সুলভ নয়। কলকাতা থেকে দিল্লীর বাদশা দরবারে যেতেই তখন লেগে যেত প্রায় তিন মাস। সে এক বিশাল যাত্রাপথ। ফলে সব সুবাতে কখন কী পরিস্থিতি তা নিয়ে বাদশা আলমগীরের যে খুব একটা মাথাব্যথা ছিল তা নয়। শুধু একজন মুঘল ফৌজদার সময় অসময়ে খবর ঠিক পৌঁছে দিত দিল্লীতে। বাদশা আকবরের সময় থেকে সবকিছুই বড় সুচারু আর গুছনো। এই সবের পিছনে যে মানুষটার অবদান ভোলবার নয় তিনি হলেন টোডরমল। রাজস্ব মন্ত্রী। আকবরের নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন। রাজত্বের সম্পূর্ণ অংশকে তিনি ১৬ টি সুবায় ভাগ করেন৷ আর রাজত্ব পরিচালনার সুবিধার জন্য রেখে দিতেন একজন নবাব নাজিম৷ শাসনকার্যে তিনিই সর্বেসর্বা। বাংলা সুবার কাজকর্ম এক সময় পরিচালনা হত ঢাকা থেকে। মুর্শিদকুলীর আগেও আজিমুশ্বান নবাব কার্য পরিচালনা করতেন ঢাকা থেকেই। কিন্তু মুর্শিদকুলীই প্রথম রাজ্যপাট পরিবর্তন করেন। এরপর মুর্শিদাবাদই হয়ে ওঠে তামাম বাংলা সুবার কেন্দ্রবিন্দু। আর অস্তমিত হয় ঢাকার জৌলুশ।
মুর্শিদাবাদের জল হাওয়াও ভালো। ভাগীরথীর ধার ঘেঁষে আজ আলো নেই। সারাদিন ঘুরে যখন অস্থায়ী বাসায় ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছি, দরজায় আবার সেই পুরনো শব্দটা। শব্দটা যেন খুব চেনা। ধাক্কা দেবার ধরনটা একই। আজকের মুর্শিদাবাদ অন্ধকার। আজ পড়ে আছে নবাবীয়ানাটুকু। মানুষের চেহারাতেও তার ছাপ। এবার উঠে দরজাটা খুলে চমকে উঠেছিলাম। আবার সেই চেনা চেহারাটা। গালে লাল দাড়ি। ছিপছিপে চেহারা। দরজা খুলতেই তিনি ডাকলেন বাইরে। চা খাবার আমন্ত্রণ। তাঁর ডাকে সাড়া দিতে ইচ্ছে হল। সুতরাং অন্তরের বিবাদ কাটিয়ে ঘরে একটা তালা ঝুলিয়ে বেরিয়েই পড়লাম তাঁর সাথে। কৌতুহল তো ছিলই। তাঁর সাথে কথা বলার ইচ্ছেটাও সরিয়ে দিতে পারলাম না। নবাব না থাক। তুর্কীয় নবাবী চেহারার মানুষের অভাব নেই মুর্শিদাবাদে। প্রথমেই নাম জিজ্ঞাসা করায় উত্তর দিলেন জনৈক বৃদ্ধ। মির্জা মহম্মদ আলি। নামেও যেন নবাবীয়ানা। নবাবী রক্ত। আমি নির্দ্বিধায় জিজ্ঞাসা করলাম তাঁর নবাবী যোগসূত্রের বিষয়ে। ঘাড় নেড়ে জানালেন না। তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন নবাব আলীবর্দীর খাস লোক। এমনকি পলাশীর প্রান্তরেও দাঁড়িয়ে থাকার সাক্ষী তাঁর পূর্বপুরুষেরা। স্বভাবতই কৌতুহল চেপে রাখতে পারলাম না। জিজ্ঞাসা করে বসলাম পলাশীর সেই দিনটার সম্বন্ধে। ১৭৫৬ সাল। ২৩শে জুন। বাংলার ইতিহাস নির্ধারক হিসাবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিন যদি কিছু থাকে, এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকতে পারে না। একটা প্রহসন। আর দুশো বছরের ইংরেজ দাসত্ব। এক আশ্চর্য পরিণতি। তাই মির্জা সাহেবকে জিজ্ঞাসা করে বসলাম ২৩শে জুন ৫০০০০ সেনা নিয়েও কিভাবে হেরে গেছিলেন নবাব? মাত্র ৩০০০ সেনা নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে একরকম লুকিয়ে থাকা ক্লাইভকে পর্যুদস্ত করতে পারলো না? এত উত্তর একটাই। বিশ্বাসঘাতকতা। মির্জা সাহেব মুচকি হাসলেন। বললেন, ইয়ে সওয়াল মত পুছো বাবু। সওয়াল জবাব করতে করতে পুরা উমর বিত গ্যায়া। অব হাম আপকো এক সওয়াল পুছতা হুঁ। আপ ব্যাতাইয়ে জ্বি। আপকা কলকাত্তা শহর ক্যায়সে মেট্রোপলিটন বনে? যব মুর্শিদাবাদ থে, তব কাঁহা থা কলকাত্তা? আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। আবার মুচকি হাসলাম। আর চায়ে চুমুক দিলাম। নতুন বন্ধুর সাথে গল্প তখন জমে উঠেছে।