T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় দিলীপ কুমার ঘোষ

দুর্গতিনাশিনী

তার আইডিয়াটা যে এমন ক্লিক করে যাবে সবুজ ভাবতে পারেনি। আইডিয়ার কৃতিত্ব অবশ্য ঠিক তাকে দেওয়া যায় না, যদি কাউকে পুরো ক্রেডিট দিতে হয় সে সবুজের দোলা বৌদিকেন্দ্রিক দুষ্টু স্বপ্নকে। সেই স্বপ দেখেই তার প্রথম মনে হয়, তাই তো, এমন করা গেলে মন্দ হয় না! স্বপ্নের টেন পার্সেন্ট অন্তত তাতে ফুলফিল হয়।
আমরা পুজোর ছ’মাস আগে থাকতেই এবার হেদিয়ে মরছিলাম দুর্গাপুজোর থিম কী করা যায় তা নিয়ে। সবুজের আইডিয়াটা সেক্ষেত্রে ইউনিক মনে হওয়ায় আমাদেরও হ্যাপা কমে গেল। সবুজের আইডিয়াকে মান্যতা দিয়ে বারোয়ারির পুজোর থিম ঠিক হল লাইভ ঠাকুর।
থিম তো ঠিক হল। কিন্তু এরপর এল পাত্রপাত্রী থুড়ি লাইভ ঠাকুরের জন্য জ্যান্ত নারীপুরুষের নির্বাচন। তা নিয়ে চলল অনেক আলাপ আলোচনা, তর্ক বিতর্ক, দলাদলি, রাজনৈতিক তথা আর্থ-সামাজিক প্যাঁচ কষাকষি। শেষমেশ মারমার-কাটকাট নির্বাচন প্রক্রিয়ার শেষে মোড়ের মিষ্টির দোকানের পটলা হল গণেশ। তার হয়ে সফল ওকালতি করেছিলেন তার শাঁসালো পিতৃদেব, যিনি বর্তমানে তিনটি জেলার মোট তেরোটি কনফেকশনারি স্টোর্সের মালিক। বলিউডের স্বপ্নে বিভোর মৈনাক হল কার্তিক। তার উড বি প্রোডিউসার শ্বশুরের লম্বা হাতযশ এক্ষেত্রে কাজ করেছিল। মিত্রপাড়ার হার্টথ্রব চিনির বোন মিনির সরস্বতী হওয়াটা ছিল গ্ল্যামার কোশেন্টের জয়জয়কার। আর হঠাৎ ফুলেফেঁপে টাকার কুমির হয়ে ওঠা প্রোমোটার নটবর ধরের লক্ষ্মীট্যারা মেয়ে রিমিকে বাধ্যত করতে হয়েছিল লক্ষ্মী। মহিষাসুর হওয়ার জন্য প্রথমদিকে কোনও নমিনেশন জমা পড়েনি। প্রেস্টিজ পাংচারের ভয়ে কেউ মহিষাসুর হতে চাইছিল না। কিন্তু যখন জানা গেল দুর্গা হবে রাখি সাওয়ন্ত কাম কিম কার্দাশিয়ান কাম সানি লিওনের পাড়া সংস্করণ দোলা বৌদি আর দুর্গার একটা পা মহিষাসুরের কাঁধে থাকবে তখন পরিস্থিতি এক লহমায় সম্পূর্ণ বদলে গেল। ‘দেহি পদপল্লবমুদারম্’ বলে আসলি এবং জালি রেকমেন্ডশনসহ সাঁইত্রিশজন মহিষাসুর হতে চেয়ে আমাদের কাছে ঝুলোঝুলি করতে আরম্ভ করল। শেষ পর্যন্ত লবির জোরে এবং এক্স ফ্যাক্টর মানে সাঁইত্রিশ ইনটু টু প্লাস ওয়ান সাকুল্যে পঁচাত্তর হাজার টাকা পুজো চড়িয়ে টেক্কা মেরে বেরিয়ে গেল সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী নব পাত্র।
নব পাত্রের এই দাঁও মেরে বেরিয়ে যাওয়ায়, রঙিন স্বপ্নের সলিল সমাধি ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় সবুজের আঁতে কিন্তু বেশ ভালো ঘা লাগল। আইডিয়াটা যে শুধু তার ছিল তাই নয়, তার বাইরেও রুলিং পার্টির প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মেজোকর্তার খুড়তুতো শ্যালক সে। সেই তাকে কিনা অন্ধকারে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল আমআদমি নবকে মহিষাসুর হিসাবে প্রোমোট করার!
আসলে স্বপ্নে দেখা একান্ত আপন দোলা বৌদি তার বুকে এমন দোলা লাগিয়ে দিয়েছিল যে লেটেস্ট ডেভেলপমেন্ট থেকে সবুজের ফোকাস টোট্যালি সরে গিয়েছিল। সিংহ হয়ে দেবী দোলার সবটুকু পৃষ্ঠে ধারণ করার সুখস্বপ্নে বুঁদ হয়ে যখন সে ভাবছিল চতুর্থীর মিডনাইটে ফেসবুকে মতামত জানতে চাইবে পুরুষ পিঠের কোন অংশ সবথেকে বেশি সংবেদনশীল সেই সময় দোলা বৌদির পোস্ট থেকেই সে প্রথম জানতে পারল দেবী দুর্গা ওরফে দোলা বৌদি কদলীবৃক্ষসম একটি পদ সংস্থাপন করবে মহিষাসুর স্কন্ধে। এমন সংবাদে সবুজ হতভম্ব হয়ে গেল। তার স্বপ্নের নারীর একটি পায়ের অধিকার হারানোর যন্ত্রণা তাকে হতোদ্যম করে দিল। আর তাকে সম্পূর্ণ বিবশ করে দিল নবর মহিষাসুর হওয়ার ব্রেকিং নিউজ। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এই নিদারুণ সংবাদে সবুজ পুরো বিধ্বস্ত হয়ে পড়ল। অবশ্য সোর্স কাজে লাগিয়ে সে আধঘণ্টার মধ্যেই আসল রহস্য জানতে পারল। নবকে বেছে নেওয়ার পিছনে দোলা বৌদি কলকাঠি নেড়েছে জেনে সে ভেবলে গেল। প্রথমে ভেবেছিল এটা আ্যন্টিলবির লোটন সাঁতরার কাজ। তা না। শেষ পর্যন্ত কিনা পিছন থেকে ছুরি মারল দোলা বৌদি! সবুজ বুঝতে পারল আসলে পুজোর সেনসেশন হয়ে ওঠার সাথে সাথে ভবিষ্যৎ আখেরও গুছিয়ে নিতে চাইছে দোলা বৌদি। তাই অপশন চাইছে। ঠিক হ্যায়,বকত্ আনে দো!
সেই লাইভপুজোর চারদিন দেখতে দেখতে কেটে গেল। অন্যবারে আমাদের পুজোর উদ্বোধন পঞ্চমীর দিনই হয়ে যায়। আর ছ’দিন ধরে চলে মণ্ডপ এবং ঠাকুর দেখার পালা। প্রত্যেকবারই দর্শকের ঢল নামে আমাদের প্যান্ডেলে। এবারে অবশ্য পূর্বের সমস্ত রেকর্ড গেল ভেঙে। ভিড় উপচে পড়ল। চারদিন এত ভিড় হল, সামলানোর জন্য পুলিশের বাইরেও বেসরকারি সিকিউরিটি গার্ড মোতায়েন করতে হল।
আজ বিজয়া দশমী। যখন জানা গেল জেলার এক নম্বর ক্রাউড পুলার আমাদের বারোয়ারির লাইভ ঠাকুরের বিসর্জনও হবে লাইভ তখন বিসর্জন ঘিরে ভাসানঘাটে যাকে বলে একটা মিনিকুম্ভ বসে গেল। যে মানুষেরা চারদিন ভিড় ঠেলে প্যান্ডেলে এসে ঠাকুর দেখা থেকে বঞ্চিত ছিল তারা তো বটেই, তার বাইরেও যারা মণ্ডপে ঠাকুর দেখে গিয়েছিল তারাও আর একবার শেষ দেখার জন্য ভিড় জমাল।
এক কাঠামোর প্রতিমা না হওয়ায় এক এক করে গণেশরূপী পটলা, কার্তিকরূপী মৈনাক, সরস্বতীরূপী মিনি এবং লক্ষ্মীরূপী রিমি বিসর্জিত হল। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাদের অপেক্ষারত ভাসমান লাইফবোটে তুলে নেওয়া হল। এরপর সবার আগ্রহ কেন্দ্রীভূত হল বিসর্জনের মূল আকর্ষণের প্রতি। সবাই সাগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল একই কাঠামোস্থিত দুর্গারূপী দোলা বৌদি, সিংহরূপী সবুজ এবং মহিষাসুররূপী নবর বিসর্জনের। এবার এল তাদের বিসর্জনের পালা। তাদের একত্রে নিক্ষেপ করা হল ডুব জলে। সবাইকে একসঙ্গে তুলে নেবে বলে লাইফবোট এগল যথারীতি। কিন্তু কোথায় কী! এক সেকেন্ড-দু’সেকেন্ড-তিন সেকেন্ড করে প্রায় মিনিটখানেক সময় কেটে গেল। কই, কেউ লাইফবোটে করে উঠে আসছে না তো! জাস্ট ভ্যানিশ হয়ে গেছে দোলা-সবুজ-নব! সকলের আগ্রহ এবার আস্তে আস্তে বদলে যেতে লাগল আশঙ্কায়। খারাপ কিছু ঘটে গেল কি না ভেবে সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। ভাসানের রাতে সকলেই কমবেশি একটু নেশার ঘোর পছন্দ করে। তাই ডুবুরিরাও স্বাভাবিকভাবেই ছিল নেশায় মাতোয়ারা। কিন্তু এমন বিপজ্জনক সম্ভাবনায় তাদের নেশা গেল কেটে। লাইফ জ্যাকেট গলিয়ে জলে ঝাঁপানোর জন্য প্রস্তুত হল তারা। এ রকম টেনশড্ এবং কনফিউসড্ সময়ে দেখা গেল দোলা বৌদি হাঁচড়-পাঁচড় করতে করতে জলের ভিতর থেকে যা হোক করে ভেসে ওঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই প্রচেষ্টায় সফল হচ্ছে না। কারণ দুই মূর্তিমান নব-সবুজ তার দু’পা চেপে ধরে স্রেফ ঝুলে রয়েছে!

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।