T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় রীতা চক্রবর্তী

মনের লাটাই যখন সুতো ছাড়ে
আজকাল শরতের আকাশের দিকে তাকিয়ে কল্যাণময় চুপ করে বসে থাকে। এই নীল আকাশের সাদা মেঘেরা তাদের স্বপ্নভেলায় করে ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় দূরসুদূরে ফেলে আসা স্মৃতির আকাশপাড়ে যেখানে বিশ্বকর্মা পূজোর দিন আকাশ জুড়ে নানা রংয়ের ঘুড়ির মাঝে ছোটকার পেটকাট্টি একের পর এক ঘুড়ি কাটছে। কাল্টু ছোটকার
লাটাই ধরে মাঝে মাঝেই চেঁচিয়ে উঠছে, ছোটকা সবুজ মোমবাতিটা। বাড়ির সবাই শেষ বেলায় ছাদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠছে, “ভোওওওকাট্টা।”
সকালে সবাই পড়ার ঘরে বই খুলে বসে বাইরে কান পেতে রয়েছে একটা ডাকের অপেক্ষা। আর তখনই,
লাল্টু , কাল্টু, বিল্টু, পুন্নি, তিন্নি, – সব কোথায় গেলি রে। আরে চলে আয় তাড়াতাড়ি। আজ আর অত পড়তে হবে না। ও বড় বৌদি, ওদের ছেড়ে দাও এখন। বেলা তো ন’টা বাজতে চলল। এখনও যদি শুরু না করতে পারি তবে কি মান সম্মান কিছু থাকবে? সকাল থেকে একবারও আকাশটা দেখেছ কি? দেখ, দেখ আকাশে কেমন রং লেগেছে!
ছোটকা ডাকলেই তো হলনা। মা বলবে তবেতো। মা সামনে রয়েছে বলেই তো বই খুলে রাখতে হয়েছে। কি যে পড়া হচ্ছে তার একবর্ণও বোঝা যাচ্ছেনা। কেবল মৌচাকে যেমন ভোঁ ভোঁ আওয়াজ হয় তেমনি ঘরময় একটা একটানা একঘেয়ে সুর কখনো একটু জোরে কখনো আস্তে আস্তে বেজে চলেছে। এইবার রেহাই পাওয়া যাবে। আর কেউ আটকে রাখতে পারবেনা। কিন্তু মা তো এখনো যেতে বলছেনা। তিন্নি কিছুক্ষণ মার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, যাব বম্মা? বাবা ডাকছে!
হ্যাঁ, যাও, আর গিয়ে
শুরু করে দাও তোমাদের ঘুড়ি লাটাই পূজো। এতক্ষণ তো তোমরা এই জন্যই ঘুন ঘুন করছিলে। বাড়ির বড়রাই যদি কথা না শোনে তবে ছোটগুলোর আর কি দোষ। বাচ্চাদের
লেখাপড়া হবে কি করে যদি বড়রা এই ভাবে আস্কারা দেয়! মা ছোটকাকে শুনিয়ে শুনিয়ে কথাগুলো বলতে থাকে। আমরা ছোটকার মাঞ্জাবাহিনী ততক্ষণে হাজির হয়ে গেছি। ‘ফলো মি’ বলে ছোটকা ছাদের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেছে।
আহা, ছাড়না। আজ বিশ্বকর্মা পূজো।ওরা ঘুড়ি ওড়াবেনা? সারা বছর তো দু’বেলা নিয়ম করে পড়াচ্ছ। একদিন নাহয় একটু কম করেই পড়ালে। তাতে ওদের রেজাল্টে খুব হেরফের হবেনা। আর তোমারোতো একআধদিন বিশ্রাম দরকার হয়, নাকি – বলে বাবা আপনমনে হা হা করে হেসে ওঠে।
দাদা এখনো ছাদে যাওনি? চলো চলো – বলতে বলতে সেজকা ছাদের দরজার চাবি হাতে’ সর সর’ বলে আগে গিয়ে তালা
খুলে দিলে আমাদের সাথে সাথে বাবাও ছাদে পৌঁছে যায়। তারপর ছোটকার হাত থেকে ঘুড়ি গুলো নিয়ে সুতো ঠিকমত বাঁধা আছে কিনা, কান্নি আছে কিনা সেসব পরীক্ষা করতে শুরু করে।
বাবা বলে, ঘুড়ি যে আকাশে পতপত করে উড়বে তার জন্য পট্টি আর যুত ঠিক থাকা চাই বুঝলি। যুত বা জোট বা জোড় যাই বলিসনা কেন এই সুতোর বাঁধন যদি সঠিক মাপে মাঝ বরাবর না হয় তবে তো ঘুড়ি কাঁপতে থাকবে। অন্য ঘুড়ির প্যাঁচে পরে ভোকাট্টা হয়ে যাবে। তাই জোড়টা ভালোকরে দেখতে হয় বলতে বলতে বাবা অভিজ্ঞ চোখে প্রতিটা ঘুড়িকে পরখ করে নিচ্ছে।
দোতলার ছাদে যখন বাড়ির বড়োরা ঘুড়ি নিয়ে ব্যস্ত তখন পূন্নি হঠাৎ জোরে জোরে গন্ধ শুকতে শুকতে বলে মেজমার লুচি ভাজা হয়ে গেছে। শিগ্গির চল। দাদারা চলে এলে একবারে শেষ করে দেবে। তখন হাঁ করে বসে থাকতে হবে। পূন্নিকে দৌড়ে নীচে নামতে দেখে আমরাও একছুটে নীচে একেবারে রান্নাঘরের দোরগোড়ায় হাজির হয়ে যাই।
এদিকে চারটে লাটাইয়ের তিনখানাই
খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে ছোটকা বদ্দাভাইকে আমাদের ছাদের থেকেই চিৎকার করে ডাকছে।
দাদারা তো আজ সকাল থেকেই আমাদের দুটো বাড়ি পরে অমল কাকুদের তেতলার ছাদ দখল করে রেখেছে। ওরা নীলু বিলুদের সাথে ঘুড়ি ওড়ায় প্রতিবছর।
ছোটকার হাঁকডাকে দৌড়ে এসে একটা লাটাই দিয়ে গেছে । এদিকে বাবা একটা কাটা পেটকাটির সুতো কোনোরকমে হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলেছে ছাদে দাঁড়িয়েই। দিনের প্রথম লুটে নেয়া ঘুড়িটা বাবার হাত ধরে হয়েছে বলে ছাদে বেশ হৈ হৈ হচ্ছে। ছোট পিসেমশাই পিছন থেকে এসে ছোটকার হাতের লাটাইটা নিয়ে ঘুড়ির সুতোয় যেই না টান দিয়েছে বদ্দাভাইয়ের দূর আকাশের চাঁদিয়াল ভোকাট্টা।
ঘুড়ি লাট খেয়ে নেমে আসছে দেখে
আমরা জোরে হাততালি দিতে শুরু করেছি। ছোটকা বলে দিয়েছে যে ভোকাট্টা হলেই হাততালি দিবি তোরা। আমরা সুবোধ বালকের দল! আজ ছোটকা যা বলবে তাই করতে হবে। বিকেলে রসগোল্লা খাওয়াবে বলেছে। তার ওপর আবার ছোটমনি আর পিসেমশাই এসেছে মানে কেল্লাফতে। আজ তো রান্নাঘর থেকে মাংসের গন্ধ বেরোবেই। বিল্টুও তাই বলে গেল যে মেজকা থলি হাতে বেরোবার সময় মেজমাকে জিজ্ঞেস করেছে, “আর কিছু কি লাগবে?”
সেজকা হাতের লাটাইটা বাবার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সুতোর টান ধরে রেখেছে। বাবা বলছে –
এই লাটাইটা নিয়েই আমরা মাঞ্জা দিতে যেতাম।
সুরো আর মনা কাঁচ গুড়ো করে ছেঁকে রাখত। সাবুর আঠাতে রংমিশিয়ে লাল নীল সবুজ হলুদ রঙের সুতো তৈরি করতাম আমরা। মাঞ্জায় আমাদের বেশ নাম ছিল বুঝলি। এই লাটাইটা সুরো এতদিন ধরে যত্ন করে রেখেছে। এটা আমাদের ছোটবেলার বুঝলি – বলতে বলতে সেজকার ঘুড়ি ভোকাট্টা। আমরা তো তখনও
হাততালি দিচ্ছি। আর সেজকা আমাদের দিকে ছুটে আসছে, তবে রে বাঁদরের দল। আমার ঘুড্ডি ভোকাট্টা আর তোরা হাততালি দিবি। খুব ফূর্তি না। দেখাচ্ছি তবে। ওদিকে ছোটকা হাতের ইশারায় পালাতে বলছে দেখে আমরাও তখন ভোকাট্টা।
কাল্টু, তোর মেজমার কাছ থেকে আমাদের জন্য একটু চা নিয়ে আয়। তিন্নিইই-পুন্নিইই, মা একটু খাবার জলের জগটা দিয়ে যা তো।
দুপুরে খাবার পর্ব শেষ করে মায়েরাও যখন লাটাই হাতে ঘুড়ির দেশে পৌঁছে যেত পিসেমশাই তখন কতরকম টিপস দিয়ে মেজমা সেজমাকে ইন্সপায়ার করত। মনি তো ঘুড্ডি ওড়ানোয়
হেব্বি এক্সপার্ট। ছোটকার সাথে মনির প্যাঁচের খেলা না দেখলে আমাদের মন ভরত না। একবার তো ঘুড়ির আকাশে তাকিয়ে “টান” বলে ছোটকা এমনভাবে ঘুরে গেল যে পেছনে দাঁড়ানো ছোটমাকে নিয়েই ধপাস। মা তখন
দৌড়ে গিয়ে ছোটমাকে তুলে বসায়।
‘তোকে বারণ করলাম, শুনলিনা। এই ভরভরন্ত
সময়ে হৈ হুল্লোরের মধ্যে কেউ আসে? – বলতে বলতে ছোটমাকে নিয়ে নিচে নেমে আসে মা। সেবার অবশ্য একটু পরেই আমাদের ছাদ ফাঁকা হয়ে যায়। মা বাবা আর ছোটকা মিলে ছোটমাকে হসপিটালে নিয়ে যায়। ছোটমা যে সেই গেল আর ফিরলনা। দুদিন দুরাত ছোটমার সাথে হসপিটালে থেকে মা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি
ফিরেছিল। সেই থেকে তিন্নি সেজমার কাছে পুন্নির পাশের জায়গাটা পেয়েছে।
সুখদুঃখে মেশানো ছোটবেলার সেইসব দিনগুলোকে চোখের সামনে হাঁটতে চলতে দেখে সেখানেই হারিয়ে যায় কল্যাণময়।
সেই খুব বকাখাওয়া বা আদরের মুহূর্তগুলো, বাবার প্রশ্রয়, ছোটকার বিচ্ছুপানা, মেজকার দায়িত্ববোধ , বম্মার সতর্ক শাসন, আত্মীয়দের যখন তখন আসা যাওয়ার আনন্দের মুহূর্তগুলো
প্রতিদিন যেন আরো উজ্জ্বল হয়ে
মনের আকাশে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছে।