সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে রীতা পাল (পর্ব – ১৯)

যাও পাখি দূরে
সবিতা দেবি চিন্তায় পড়ে গেলেন, “ হ্যাঁ। অ্যাক্সিডেন্টের আগে মাঝে মাঝে ফিরতে ওর একটু রাত হত। জিজ্ঞাসা করলে বলতো ওর বন্ধু রঞ্জনার থেকে নোটস নিতে ওর হোস্টেলে গিয়েছিল। এছাড়াও ও প্রফেশনাল ওড়িশি ডান্সার। নানা জায়গায় প্রোগ্রাম করতে যেত। রিহার্সাল থাকত,তাই আলাদা করে চোখে পড়ার মতো ঘটনা আমরা লক্ষ্য করিনি।”
ততক্ষনে সুখেন বাবু এসে যোগ দিয়েছেন আলোচনায়। প্রলয় সুখেন বাবুকে প্রশ্ন করলেন,“ আপনার মেয়ে আপনাকে সব কথা বলতো?”
“ বাবা হিসেবে যতটুকু জানার প্রয়োজন আমি ততটুকুই প্রশ্ন করতাম। মা কে একটু ভয় পেত। আমাকে কোন সমস্যায় পড়লে,যেমন বাবা এ মাসে হাত খরচাটা একটু বাড়িয়ে দিও,বাবা ফিরতে একটু রাত হলে মাকে ম্যানেজ কোরো,এই আর কি। তবে ইদানিং ও অনেক রাত অব্দি ফোনে কারোর সাথে গল্প করত। এ ছাড়া তেমন কিছু চোখে পড়েনি।”
“ ঠিক আছে,তাহলে কাল সবাই কোলাঘাটে চলে আসুন। ললিতের বাবা-মাও এসে গেছে।”
সবিতা দেবী অবাক হয়ে বললেন,“ কোথায়, কোলাঘাট? কোলাঘাট কেন?”
“ রহস্যটা ওখানে শুরু হয়েছিল,তাই রহস্যটা ওখানেই শেষ হবে। চলি – – – -”
সকালবেলায় অলোক আর প্রলয় গাড়ি নিয়ে, কুমারীদের বাড়ি এলো ওদের তুলতে। অলোকের চোখ চলে গেল কুমারীর দিকে। আজ ওকে বেশ ফ্রেশ লাগছে। পুতুল হাতে নিয়ে নিজেই হেঁটে আসছে। সুখেন বাবু,সবিতা দেবী আর কুমারী পিছনের সিটে বসলো। প্রলয় সামনের সিটে আর অলোক গাড়ি চালাচ্ছে। কুমারী একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ছুটে যাওয়া গাছপালার দিকে – – –
সমরেশ বাবুর বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই আরো তিনটে গাড়ি দেখা গেল। প্রলয় নেমে আলোকে কিছু বলে সমরেশবাবুর বাড়ি ঢুকে গেল। অলোক সাবধানে কুমারীকে নামিয়ে ভিতর নিয়ে গেল। সঙ্গে সবিতা দেবী ও সুখেন বাবুও ঢুকলেন। কুমারী অবাক হয়ে বাড়িটা দেখছে। আজ সমরেশবাবুর ড্রইংরুম একেবারে লোকজনে ভর্তি। ললিতের বাবা-মা আগে থেকেই আছে। নয়ন ওর বাবা-মাকে নিয়ে এসেছে। মিস্টার হালদার ও এখানকার থানার স্থানীয় ওসিও আছেন। প্রলয় মুখার্জি সবাইকে এখানে আসতে বলেছেন,তাই সবাই এখানে এসে উপস্থিত।
প্রলয় প্রথমে বললো,“ সমরেশ বাবু,সবাই তো উপস্থিত। এবার আপনার মেয়ে রঞ্জনাকে ডাকুন।”
“ আসলে ওর শরীরটা ভাল না। আপনার যা বলার আমাকে বলুন।” সমরেশ বাবু বেশ গম্ভীর হয়ে বললেন।
“ আসলে রঞ্জনাকে এখানে দরকার। ওর তো অ্যাক্সিডেন্ট হয়নি তাহলে ও তো শারীরিকভাবে সুস্থ। হয়তো মানসিক আঘাত সহ্য করতে পারেনি। কিন্তু এখানে আসলে ওর ভালোই লাগবে। ওকে ডাকুন।”
সবিতা দেবী বলে ফেললেন,“ ওরা ব্যাঙ্গালোর থেকে কবে ফিরলো?” সবাই চুপচাপ। প্রলয় বলল,“ কার কথা বলছেন? কে ব্যাঙ্গালোরে গেছে?”
“ কেন রঞ্জনা? দু’দিন আগেই তো আমরা এখানে এসেছিলাম। সমরেশ বাবু বললেন, ওরা ব্যাঙ্গালোরে গেছে।”
“ না,না,কেউ কোথাও যায়নি। রঞ্জনা এখানেই ছিল,তাইতো সমরেশ বাবু!”
সমরেশ বাবু চুপ করে রইলেন।
রঞ্জনার মা রঞ্জনাকে নিয়ে আসলেন। রঞ্জনা কুমারীর দিকে তাকাতে তাকাতে নিচে নামল। কুমারী তো চুপ করে আনমনা হয়ে একদিকে বসে আছে। অধৈর্য হয়ে ললিতের বাবা বললেন,“ আপনি ঠিক কী কারণে আমাদের ডেকেছেন সেটা বলুন! আমার ওয়াইফের শরীর ভালো না। তাই আপনি একটু তাড়াতাড়ি করুন,মিঃ প্রলয়।”
প্রলয় বেশ কঠিন গলায় উত্তর দিল,
“ আপনার একমাত্র ছেলে,সে আর এই পৃথিবীতে নেই। জানতে চাইবেন না ছেলের মৃত্যু ঠিক কিভাবে হয়েছিল ?”
ক্রমশঃ