গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী

বসে আছি পথ চেয়ে
কাঁচের জানালার এপাশে একা বসে আছে রমলা। একদৃষ্টিতে অনেকক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢাকা। মুষলধারায় বৃষ্টির দাপটে একটু দূরের বাড়িঘরগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে। সামনে কলাবাগানের গাছগুলো হাওয়ার দাপটে একবার এদিকে একবার ওদিকে নুঁয়ে পরছে। দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন ওদের কান ধরে ওঠবস করাচ্ছে। কলাগাছের পাতাগুলি হাওয়ার সাথে লড়াই করতে করতে পরাজিত সৈনিকের মতো শত কুঁচিতে ছিঁড়ে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শত্রুর শানিত তরবারির আঘাতে বিবশ হয়ে গেছে সম্পূর্ণ শরীর। তবুও দেহে প্রাণ আছে। তাইতো পাতাগুলি এখনো গাছের সাথেই আটকে রয়েছে। গাঁদা ফুলের বাগানের প্রতিটি গাছের মাথা মাটিতে ঠেকে গেছে। ওরা যেন মাটিকে প্রণাম করে বলছে, “মাগো, রক্ষা কর আমাদের, আমরা যে তোমারই সন্তান।” প্রাচীরের ওপারে যে বড় ড্রেনটা আছে সেটাকে এই মুহূর্তে দেখে মনে হচ্ছে একটা ছোটখাটো নদী। বৃষ্টিতে টইটম্বুর ড্রেনের পাড়ে সারি সারি মাছরাঙা বসে আছে। একটা মাছ ধরতে পারলেই সখাসখিতে মিলে ঠোকরাতে শুরু করে দিচ্ছে। ওদের খাবারের ফেলে দেয়া অংশটুকুর ভাগ নিতে কাক আর চিলের মধ্যে ঝগড়া বেধে যাচ্ছে।
রমলার আজ কিছুই ভালো লাগছে না। বড্ড একা লাগছে। আজ সকাল থেকেই মুষলধারায় বৃষ্টি হয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে কিছুক্ষণ থামে। আবার বড় বড় ফোঁটায় শুরু হয়ে যায়। ভাবখানা এমন যেন অনেকদিন পর এই জলঝরানোর কাজটা পেয়েছে। তাই মন দিয়ে কাজ করছে। কাজের ঠেলায় হাঁপিয়ে গিয়ে একটু দম নিতে থেমে যায়। তারপর দ্বিগুণ জোরে বড় বড় ফোঁটায় ঝরে পরে।
ছেলেমেয়েরা যখন ছোট ছিল তখন এরকম বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি খাবার ধুম পরে যেত। রমলার বাপের বাড়ি কাছে বলে ওবাড়ির সবাই চলে আসতো খিচুড়ি উৎসবে। সবাই মিলে বৃষ্টিদিনের খিচুড়ি সেলিব্রেট করা হতো। নিজের দুই মেয়ে একছেলে, তার সাথে ওবাড়ি থেকে দুই ভাই তিন বোন বাবা মা – সবাই একসাথে মিলে বৃষ্টিবেলার খিচুড়িতে মেতে ওঠার আনন্দ ছিল আকাশছোঁয়া। মা তখন সুস্থই ছিলেন। আয়োজন যাই হোক না কেন, রান্নাটা ছিল মায়ের হাতে। তখন মায়ের ওপর সব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে কাটত কিছুটা সময়।
আজ সব কেমন এলোমেলো ছন্নছাড়া। অনেক দেখেশুনে বড় মেয়ের বিয়ে দেয়া হল। বাচ্চা হতে গিয়ে ওভারিয়ান কার্সিনোমা ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ট্রিটমেন্ট শুরু হলেও মা – বাচ্চা কাউকে বাঁচানো যায়নি। ছোট মেয়ে এলজিবিটির সদস্য। ছেলেও তাই। ওরা কেউই বাড়িতে আসেনা। স্বামী সন্তানশোকে পাথর হয়ে গেছে। সারাদিন একলা একটা ঘরে নিজেকে বন্দী করে রেখেছে। একটা কথাও বলে না। খেতে দিলে খায় না দিলে চায় না। রমলার দিনগুলি বড় নিঃসঙ্গ কাটে। তার ওপর আবার এমন বৃষ্টি হলে তো মনখারাপের পাহাড় এসে সামনে দাঁড়ায়। এমন দিনে মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। মনের কথা বলে একটু হাল্কা হতে বিশ্বাসের কাউকে দরকার হয়। মা ছাড়া আর কাউকে তো ভারাক্রান্ত মনের কথা বলা যায় না! ছোটবেলার বন্ধুদের কথা খুব মনে পড়ে। কত সহজে মনের গোপন কথা বলা যেত তখন। সেসব কথা শুনে কখনো কেউ কিন্তু হাসাহাসি করে নি যেমন ছেলে মেয়ে দুটো অহরহ করে।বরং সমাধানের চেষ্টা করেছে। আজকাল রমলার কথা কেউ ভাবেন। কেউ ভুল করেও জানতে চায় না রমলার মনের কথা। ইদানিং সংসারের কথা মনে হলে বড্ড কষ্ট হয়। জীবনটা যেন সাহার মরুভূমির মতো রুক্ষ হয়ে গেছে। ছিটেফোঁটা আনন্দও আর অবশিষ্ট নেই। কোথাও যেন প্রাণের কোনো চিহ্ন নেই। এই বাড়ি গাড়ি নিয়ে কি হবে যদি মনের কথা বলার মতো মানুষই না থাকে জীবনে? ভীষণ একা এই নিঃসঙ্গ জীবনে
এখন শুধু শরীরের পতনের পথ চেয়ে সময় কাটানোর চেষ্টা করে যাওয়া। ঠিক বাইরের কলাগাছেগুলোর মতো হেরে যাওয়ার পরেও শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মহাকালের অপেক্ষায়।