ক্যাফে ধারাবাহিক গল্পে মনোরঞ্জন ঘোষাল (পর্ব – ৬)

টলি ট্যাব আবিষ্কার
আমি বললাম- কাজটি এক দিনের বা বড় জোর দু দিনের। কাজ সেরে জিনিস পত্র গুছিয়ে আসতে যা সময় লাগবে সেই কটা দিন তো দিতেই হবে।
আমার কথায় ও রাজি হয়ে গেল। আমি তৎপরতার সঙ্গে বাড়ি ফিরে এলাম। আর ও কটা দিন আমার অপেক্ষায় ওখানেই থেকে গেল। কথা হল আমি ফিরে গেলে দু জনে এক সঙ্গে সেই দ্বীপের উদ্দেশ্য রওনা দেব।
আমি আমার কাজ গুছিয়ে। প্রয়োজনীয় যন্ত্র সামগ্রীতে নিজেকে সজ্জিত করে বেরিয়ে পড়লাম লণ্ডনের উদ্দেশ্যে। যাবার পথে ডেনিয়লকে আমার যাবার খবর দিয়ে দিলাম। যাতে সে নিজে প্রস্তুত হয়ে থাকে। আমি যাওয়া মাত্রই যেন সেই দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারি।
১লা অগাস্ট। লণ্ডনের সময় সকাল দশটা। দুজনে জাহাজে চড়ে বসলাম। গন্তব্য সেই দ্বীপ। যার ঠিকানা আমি এখনও জানি না।
ডেনিয়লের এই জাহাজটি ছোট হলেও খুব দ্রুত গামী। য়ুরোপের পাশ ঘেঁসে অতলান্তিক সাগরের বুকে ভেসে চলেছে এখন।
হঠাৎ সেটি বাম দিকে বাঁক নিয়ে ভূ মধ্য সাগরে প্রবেশ করল। ভূ মধ্য সাগরের তীরবর্তী মনোরম সবুজালি শোভা আমার দেখতে ভারী ভাল লাগে। আমি বাইনো কুলারে সেই শোভা দেখে চলেছি।
দূরের গাছ পালা গুলো হঠাৎ যেন কাছে সরে এল। তার কিছুটা পর থেকেই শুরু হল যেন মরুভূমি।
বুঝলাম আমাদের জাহাজটি এখন সুয়েজ খালে প্রবেশ করেছে। বই পড়ে জেনে ছিলাম যে। এই খালটি প্রাকৃতিক নয়। কৃত্রিম। মানুষে তৈরী করেছে। যান চলা চলের সুবিধার জন্য।
তার পর জাহাজ এসে পড়ল আরব সাগরে। বাঁ দিকে আমার দেশ ভারতের গা ঘেঁষে জাহাজ এগিয়ে চলেছে দক্ষিণ মুখি হয়ে।
তখন আর চুপ থাকতে পারলাম না। ডেনিয়লকে বলে ফেললাম যে। তুমি যখন এই পথেই যাবে আমার দেশের পাশে দিয়ে। তখন আমাকে মিছি মিছি অত দূরে টেনে নিয়ে যাবার দরকার কী ছিল? আমি এখানের কোথাও থেকে জাহাজে উঠে পড়তে পারতাম। শুধু শুধু সময় আর জ্বালানি নষ্ট হল।
সে বলল- “মনের মধ্যে ঐ চিন্তার বশবর্তী হয়ে আমি বলে উঠতে পারে নি তোমাকে। তার জন্য দুঃখিত!” তবে সময় নষ্ট হলেও জ্বালানি সমস্যাটা অতটাও বড় নয়। আমি ভূলে গিয়ে ছিলাম যে ওকে এই জাহাজ বানানোর জন্য আমি একটি বিশেষ পরমাণু রিএক্টর দিয়েছিলাম। যেটি যা খুশি পরমাণু জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। এই মনে কর এক খামচা মাটি। কিংবা এক আঁচলা সমুদ্রের জল। যা খুশি দিলেই হবে। তবে সেটি বস্তু হওয়া চাই। তবে মন চিন্তা এগুলি বস্তু নয় তাই এদের ওটিতে জ্বালিয়ে ফেলা যাবে না।
ওটির আরো একটি বিশেষত্ব আছে। ওটিতে শক্তি বিকরিত হয়ে পরিবেশে মুক্ত হতে পারবে না। এক বিশেষ বস্তুর কোট লাগানো আছে। ফলে শুধু যন্ত্রের ব্যয়িত শক্তি খরচ ছাড়া আর কিছুতেই শক্তি খরচ হবে না। ফলে এক খামচা মাটি দিয়ে ওটিকে চালানো যাবে বহু বছর।
সেবারে কয়লা তেল ইত্যাদি জ্বালানির বিকল্প খোঁজ সম্পর্কীত অধিবেশনে আমি প্যরিসের কনফারেন্সে ওটির সম্পর্কে প্রেজেন্টেশন দিয়ে ছিলাম। সকলে বেশ বেশ বলে বাহবা দিয়েছিল। সেই দলে ডেনিয়ল ছিল। ও আমার কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছিল এমন ভাবে যে আমি ওর প্রতি আবেগী হয়ে গিয়েছিলাম। তাই আমার কাছে আবদার করে ও আমাকে এই জাহাজের জন্য রিএক্টরটি দিতে বললে আমি দিয়ে দিয়ে ছিলাম। এখন দেখছি সেটি সঠিক পাত্রে দান হয়েছে। ও এটিকে উপযুক্ত কাজেই ব্যবহার করেছে।
শ্রিলংঙ্কা পেরিয়ে আমাদের জাহাজ যখন দক্ষিণ পূর্ব কর্ণারে ছুটে চলেছে তখন জাহাজের ডেকে ও আমার পাশে একটি বাইনো কুলার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে একটা কথা জিজ্ঞেস করল। যেটি এখন কার বাচ্ছা ছেলেরা হলেও জিজ্ঞেস করত না। বলছে আমি আমার ওষুধটির নাম টলি ট্যাব কেন দিয়ে ছিলাম। অগত্যা উত্তর দিলাম-
তাকে আবার বুঝিয়ে না বললে বিপদ। কখন কোথায় কী বলে বসবে। তার পর যদি কেউ কোথা থেকে পেয়েছ বলে জানতে চায় তো একেবারে ল্যাজে গোবরে হয়ে পড়বে। তার ওপরে যদি আমার নামটা বলে ফ্যালে তো আমাকে নিয়েও টানাটানি শুরু হবে। এটিতো আমার কাম্য নয়। তাই একপ্রকারে নিজের গরজে তাকে সব বুঝিয়ে বললাম।
ক্রমশ……..
আমি বাহিরে ইঁদুরের সঙ্গে ইঁদুরের মতই আরাম কেদারায় গুঁড়ি সুঁড়ি মেরে চুপটি করে বসে আছি। মাঝে মাঝে চোখ তাকিয়ে চারিদিকের পরিবেশ প্রকৃতি দেখছি। না কারোর কোন হেল দোল নেই।
বাতাস স্তব্ধ হয়ে আছে! গাছ পালা গুলো যেন হাত পা গুটিয়ে ভয়ে ভয়ে গুটিয়ে রয়েছে! চারিদিকে যেন কেমন থম থমে ভাব! যেন তারা অশনি সংকেত দিচ্ছে। একটা ঝড় ছুটে আসার আগে যেমন আকাশে চারিদিক একেবারে মেঘ মুক্ত হয়ে পড়ে। যেমন বাতাস আছড়ে পড়ার জন্য একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। এ যেন ঠিক তেমন বলে মনে হচ্ছে!
আমিও গাছ পালাদের মত ঝড় আছড়ে পড়ার আভাসে আগাম সতর্কতা অবলম্বন করলাম! একটি তাল পাতার চেটাই ওর ঘরে টাঙানো ছিল আমি এসেই দেখেছি। ওকে হাঁক দেব ঠিক এমন সময় দেখলাম ও আমার পাশে দাঁড়িয়ে। ও আমাকে খেয়ে নেবার জন্য ডাকতে এসেছে।
মুখে আঙুল চেপে দেখালাম চুপ! তার পর হাতটা নেড়ে দেখালাম কানটা আমার মুখের কাছে নামিয়ে আনো! সে মাথাটা নামিয়ে কানটা আমার মুখের সামনে ধরলে আমি ফিস ফিস করে তার কানে বললাম- “ও সব খাওয়া টাওয়া এখন রাখো! ঘরের ভেতর থেকে চ্যাটাইটি বের করে নিয়ে এসে এখানে বিছিয়ে দাও! তার পর চুপটি করে বস! এখুনি কিছু একটা ঘটবে বলে মনে হচ্ছে!
আমার কথা শুনে সে দৌড়ে গিয়ে ঘরে থেকে চ্যাটাই বের করে মাটিতে বিছিয়ে ফেলল! আমি চেয়ার থেকে নেমে ঐ বিছানো চ্যাটাই এর ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম! মাথাটা এমন ভাবে রাখলাম যে চোখ দুটো তাকিয়ে থাকল সেই ইঁদুরের খাঁচার দিকে, আর একটি কান থাকল মাটির ওপর শুয়ে মাটিকে স্পর্শ করে!
বেশ অনেকক্ষণ কেটে গেল ঐ ভাবে! মনে হল আগে যেন কারো এগিয়ে আসার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল, তবে মনে হচ্ছে এখন সে যেন ফিরে চলে যাচ্ছে!
ডেনিয়লকে ইশারায় দেখালাম তুমি এ দিকে লক্ষ্যঃ রাখো! আমি এখুনি আসছি! বলে মুহুর্তের মধ্যে পকেট থেকে টর্চটি বের করে, সেই পদধ্বনি অনুসরণ করে ছুটে গেলাম সেই দিকে! কিছুটা এগিয়ে ঘন জঙ্গলে গাছের গাড় অন্ধকারে টর্চটিকে জ্বেলে ফেললাম!
হঠাৎ পড়া আলোকে দেখলাম কী যেন সরে গেল হালকা বাতাস সরিয়ে! তারই আঘাতে মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো পাতা গুলো এলো মেল ভাবে একটু সরে গিয়ে শান্ত হয়ে পড়ল! মনে হল কেউ যেন মাছ ধরার জন্য খেপ জাল ফেলে ছিল অন্ধকারে চুরি করে! হঠাৎ তা আলোর ঝলকে গুটিয়ে তুলে নিল!
কোন মানুষ, জীব জন্তু, পাখি কিছুই সরে যেতে দেখতে পেলাম না! এমনকি গাছের ডাল পালা বা পাতাও কোথাও নড়ে উঠল না!
এ এক অবিশ্বাস্য আজব ঘটনা বলে মনে হল আমার। তবে কী অশরীরি কিছু! মনে একবার সেই কথাও উঁকি দিয়ে ছিল। তবে আমি তাকে প্রাধান্য দিই নি। আমি ও সব আশরীরি টশরীরি কিছু বিশ্বাস করি না। আমি বস্ত বাদি। বাস্তব বিশ্বাসী। ধোঁয়া, ছায়া, হাওয়া এসব হলে ঠিক আছে।