সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৭)

কেল্লা নিজামতের পথে
নির্লিপ্ত মুর্শিদাবাদ। কেউ সাত চরে রা কাটে না। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে যা একটু কথা কানে ভেসে আসে আর কি। বাকি নবাবদের তো খুঁজে পাওয়াই দায়। কিন্তু অতীত যে পাল্টাবার নয়। সবকিছু আঁকড়ে ধরে সে ডুবে থাকে একটা সময়ের গভীরে। সেখানে পৌঁছনোটাই যেন চ্যালেঞ্জ। আর পৌঁছতে পারলেও ছুঁয়ে দেখা বড় কঠিন। কত পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি৷ কোথায় আজ আর রাজতন্ত্র? কোথায় আজ নবাবদের রাজত্ব? তবু তাঁরা থেকে যান। মাটি খুঁড়ে যেভাবে ঠিক একদিন বেরিয়ে আসে চন্দ্রকেতুগড়, সেভাবেই মাটির ওপরে দাঁড়িয়েই যেন কথা বলে মাত্র তিন শতাব্দী প্রাচীন নগরী মুর্শিদাবাদ। তিনটে শতাব্দী কি সত্যিই কি অনেকটা পিছিয়ে যাওয়ার সময়? মুর্শিদকুলির সময় থেকে সিরাজউদ্দৌলার সময় মাত্র ৬০ বছর মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ। এরপর ধীরে ধীরে প্রায় তিনশ বছর ধরে একটু একটু করে গড়ে উঠেছে কলকাতা আর সকলের অলক্ষ্যে হারিয়ে গেছে একটা আস্ত নগরী মুর্শিদাবাদ। কিন্তু ওই ৬০ বছরের ছোট্ট সময় মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্য ও সম্পদ অনায়াসে তাক লাগিয়ে দিতে পারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী লন্ডনকেও। এই আশ্চর্য মায়ানগরীর উত্থান বড়ই চমকপ্রদক। হয়তো মোঘলরা কোনদিন ভেবে উঠতে পারেনি যে তাদের সাম্রাজ্যেই বাংলার বুকে তৈরি হতে চলেছে এমন এক আশ্চর্য নগরী যা মুঘল সালতানাতের সমস্ত সাম্রাজ্যে সবথেকে বড় নগরী হিসেবে পরিচয় পাবে। এমনকি বাদশা ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর এই মুর্শিদাবাদ পাবে মুঘল সম্রাটদের আওতার বাইরে এক স্বতন্ত্র রাজ্যের মর্যাদা। এইসবই এক সময় কল্পনার অতীত। কথায় বলে ৩০০ বছরের কলকাতা। কিন্তু সত্যিই কি তাই? যদি তাই হবে, তবে মুঘল সম্রাট আকবরের সভাকবি আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরীতে কলকাতার নাম উল্লেখ কি করে সম্ভব হয়? অর্থাৎ মহানগরীটির উৎপত্তি ৩০০ বছর হতে পারে কিন্তু কলকাতা নামক স্থানটির পরিচয় বহু পুরনো। আর কলকাতা গ্রামের, মহানগরীতে উত্থানের পিছনে যে ঘটনাটি সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, তা হল নিঃসন্দেহে পলাশীর যুদ্ধ। পলাশী এক মাহেন্দ্রক্ষণ। পলাশী এক অধ্যায়। আজকের বাঙালি মীরজাফর এর পিঠে খুব সহজে বিশ্বাসঘাতকের তকমা এঁটে দিতে পারে। বিশ্বের ব্যাংকার জগৎশেঠকে প্রবল বিশ্বাসঘাতক বেঈমান বলে আখ্যায়িত করতেও পারে। কিন্তু প্রশ্ন উঠে আসে যে জগৎশেঠ, মীরজাফররা আগের সমস্ত নবাবের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে গেলেন, আলীবর্দী খানের আমলে নবাবের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বর্গী মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেলেন, তারা হঠাৎ বৃদ্ধ আলিবর্দীর মৃত্যুর পর কেন তরুণ নবাব সিরাজের বিরুদ্ধে চলে গেলেন? মুর্শিদাবাদ ঘুরতে ঘুরতে এই চিন্তা বারবার মাথায় আঘাত করে যায়। কিন্তু উত্তর কই? উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই কেল্লা নিজামতের দরজায় গিয়ে দাঁড়ানো। আশপাশে কান পাতলে শোনা যায় বহু কথা। দাদুর মৃত্যুর পর যে তরুণ নবাব সবেমাত্র বাংলার সিংহাসনে বসেছেন, এমনকি তখনো ঠিক মতো গুছিয়ে উঠতে পারেননি রাজকোষ এবং রাজত্ব, তার মধ্যেই শত্রুদের মোকাবিলা করতে করতে তার রাজকোষ উজাড়। মুর্শিদাবাদ বলে, বাংলার আকবর আলীবর্দী খাঁ। মুর্শিদকুলি বাংলার বাবর হলেও আলীবর্দী সবদিক থেকে গুছিয়ে যেভাবে বাংলার হাল ধরেছিলেন তার আগে পরে নবাবদের ক্ষেত্রে তেমনটি কোনোভাবেই দেখা যায়নি। তবুও বাংলার ইতিহাসে নায়ক নবাব সিরাজ।
সময়ের হাত ধরে বারংবার রাজধানী পরিবর্তন করেছে বাংলা। রাজমহল থেকে ঢাকা হয় মুর্শিদাবাদ এবং অতঃপর কলকাতা। আজও কলকাতা মহানগরী ভেঙে যাওয়া বাংলার পশ্চিম দিকের রাজধানী। আর ঢাকা গেছে পূর্বে। কিন্তু অবহেলায় অন্ধকারে তলিয়ে গেছে মুর্শিদাবাদ। তার সমস্ত গরিমা দিয়ে ধীরে ধীরে সাহেবদের ইচ্ছায় তৈরি হয়েছে কলকাতা। এই কাজ একদিনে হয়নি। হওয়া সম্ভবও না।
কেল্লা নিজামত এর অবস্থান একেবারেই ভাগীরথীর তীরে। কিন্তু আজ যে অংশগুলি ইতিহাসপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য বেঁচে আছে, তা পুরনো কেল্লা নিজামতের এক-তৃতীয়াংশেরও কম। কেল্লা নিজামত অর্থে নবাবদের বাড়ি। কিন্তু সে নবাব আজ আর নেই আর তাদের বাড়িও নেই। এক এক করে প্রায় সবকটি বাড়িই আজ নয় ভাগীরথীর নদীগর্ভে বিলীন আর না হয় ইংরেজদের হিংসা চরিতার্থ করবার ফলাফল হিসাবে মিশে গেছে মাটির সাথে।
মুর্শিদাবাদ অনেক কথা বলে। শহরটি তৈরীর আগের মুহূর্তে বাদশা ঔরঙ্গজেবের নাতি আজিমুশ্বান তখন ঢাকা থেকে বাংলা শাসন করছেন। দিল্লির দেওয়ান হিসাবের মুর্শিদকুলি বা করতলব খান ওই ঢাকাতেই অবস্থান করছেন। এই করতলব খান উপাধিও বাদশারই দেওয়া। এদিকে ঢাকায় খামখেয়ালি আজিমুশ্বানের কার্যকলাপে একেবারেই সন্তুষ্ট ছিলেন না সম্রাট ঔরঙ্গজেব। এমনকি তার কার্যকলাপের কথা শুনে বাংলায় পরপর চিঠি পাঠাতে শুরু করেছিলেন সম্রাট। স্পষ্ট করেছিলেন তার অভিমত। বলেছিলেন, “প্রজাদের সেবা করতে গেছো, অত্যাচার করতে নয়। সুতরাং বিলাসব্যসন ছেড়ে রাজকার্যে মনোনিবেশ করো। তুমি রাজ পরিবারের সন্তান। সেই মান রেখে চলার চেষ্টা করো।”
কিন্তু কোথায় কি? পরিবর্তন হওয়ার মানুষ আজিমুশ্বান নন। এদিকে মুর্শিদকুলি বড় প্রিয় পাত্র বাদশার। তাই বাদশা ঔরঙ্গজেবের প্রশ্রয়েই মুর্শিদাবাদ গড়ে ওঠা ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। অপেক্ষার অবসান হয়েছিল, তৈরি হয়েছিল মুর্শিদাবাদ। মুর্শিদকুলি সুজাউদ্দিনদের হাত ধরে ও জগৎশেঠ ফতেচাঁদ, মহাতপচাঁদদের যোগ্য পৃষ্ঠপোষকতায় মুর্শিদাবাদই হয়ে উঠেছিল মোঘল ভারতের অন্যতম সম্পদশালী নগরী। ভাবতে অবাক লাগছে না? আজ কোথায় সেই সব গল্পকথা? মাত্র ৬০ বছরে গড়ে ওঠা এক আশ্চর্য মায়ানগরী কিভাবে তুরুপের তাস এর মত হুড়মুড়িয়ে ধ্বসে পড়ল শুধু একটি যুদ্ধের পরেই। আর ধীরে ধীরে বদলে গেল বাংলার ভবিষ্যৎ। বলতে পারেন কেন তবে পলাশীর যুদ্ধ বাংলার ইতিহাসে এক মহা সন্ধিক্ষণের ভূমিকা নেবে না? আমরাও যাব পলাশীর যুদ্ধের গল্পে। কিন্তু তার আগে একটু শুনে নেব মুর্শিদাবাদের সেই ষাট বছরের ঝলমলে দিনগুলোর কথা।