অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৩৪)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
তোমার জন্য হবো চৈত্রের ঝড়
আঁচল ওড়াবে সে ঝড়ের পাগলামি
বর্ষণ শেষে মেঘ দিগন্ত ঘিরে
তোমার জন্য চিরদিন সেই আমি
বক্তব্য রাখতে শুরু করে অমলেন্দু লক্ষ্য করলো — উন্মনা নদীর দিকে তাকিয়ে একমনে কী যেন ভাবছে ।বাকি কজন চুপ করে রয়েছে অমলেন্দুর বক্তব্য শুরু করার আগে। শুধু তিথির দৃষ্টিতে এমন একটা আকুতি রয়েছে , যেন সে কিছু বলতে চায় । কথা শুরু করার আগে অমলেন্দুর অস্বস্তি বেড়ে যাচ্ছিল । এই প্রথম তার মনে হচ্ছিল — কেউ কেউ তার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।উন্মনার স্নিগ্ধতা , শুভ প্রলয় বাদল মেঘের আগ্রহ ছাপিয়ে , তিথির চোখের ভাষাটা যেন একটু অন্যরকম।তবু , সাংবাদিক সুলভ স্মার্টনেসে যাবতীয় সংশয় সরিয়ে ফেলে অমলেন্দু একটানা তার বক্তব্য বলে যেতে থাকলো । কবিতার ভাবনা , বা পরিশীলিত আবৃত্তি নিবেদন থেকে সেই কথন ভঙ্গি যেন একটু অন্যরকম। তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যে উপস্থিত সকলকে অমলেন্দু বোঝালো — মানুষ জন্মের সীমিত ও দুর্লভ মুহূর্তগুলোকে , কাজের মানুষ , চিন্তাশীল মানুষ, দার্শনিক মানুষরা কিভাবে কাজে লাগায় । রবীন্দ্রনাথের বিপুল রচনার হয়ে ওঠা অথবা বিজ্ঞানীদের যুগের পর যুগ পরীক্ষাগারে কাটানোর ফলে , যে বোধ ও মানসিক উপকরণ সৃষ্টি হয় , সেটাই হয়ে ওঠে মানবজাতির চিরদিনের সম্পদ । যে কোনো জিনিস শুরু করলে তবেই সেটা শেষ হওয়ার কথা আসে। একদল মানুষের ভাবনায় যদি কবিতাজন্মের বা কবিজন্মের বীজ রোপণ করা হয় , তাহলে তার বেড়ে ওঠার পাহারাদার ও বন্ধু হতে হবে তাদেরই। সেই লেগে পড়ে থাকার ধৈর্য যদি না থাকে , তাহলে প্রফেশনালিজম কিভাবে সম্ভব হবে ? কবিতা জীবনের চারপাশে একটা দূষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হবে। যেখানে তাদের কাজের প্রতি আশেপাশের মানুষদের সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধাবোধ থাকবে । তারা যে অসামাজিক কোনো কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত নয় ,সেটা বোঝানোর দায় সেই কবিদেরই নিতে হবে।এই আশ্রয়ের উঠোনে যে মুক্তমঞ্চ থাকবে , সেখানে প্রতিটি মেলামেশায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষরা আসবেন । মানে , সেই মুক্তমঞ্চ দিক আর দিগন্তকে একই সঙ্গে বরণ করে নেবে। সেখানকার হারমোনিয়ামের রিডে
আঙুল ছুঁইয়ে একজন সঙ্গীতশিল্পী ভাব বিনিময় করবেন , কোনো তরুণ চিত্রকর অথবা ভাস্করের সাথে। একজন মূকাভিনেতা বোঝাবেন কবিতায় ও জীবনে নীরবতার ভাষা কেমন ।একজন অভিজ্ঞ কবি কবিতার হয়ে ওঠার মুহূর্তগুলোকে যখন ব্যাখ্যা করবেন , তখন মনযোগী ছাত্রদের মতো নোট নেবেন হয়তো একজন কর্পোরেট বিশেষজ্ঞ। একজন লগ্নিকারী এখানকার সেমিনারে বসে হয়তো বুঝতে পারবেন — এই কবিতার আশ্রয়কে টিঁকিয়ে রাখা সমাজের পক্ষে কতটা জরুরি । দর্শনের অধ্যাপক অথবা সমাজবিজ্ঞানী বুঝিয়ে দেবেন এই সমাজে কবি ও কবিতার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কিনা । অথবা , প্রয়োজন থাকলেও , সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তাদের গুরুত্ব কতটুকু ? কোনো রাজনৈতিক নেতা এই মুক্তমঞ্চে এসে যদি অনুভব করতে পারেন , আবৃত্তি গান নাটক ও মূকাভিনয় , রাজনৈতিক বক্তৃতার মতোই সাধারণ মানুষের কাছে ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ , তাহলে — “সভাশেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হইবে “– এই ধারণা থেকে সরে এসে তিনি নতুন কিছু ভাবতে পারবেন ।একজন সিনেমা পরিচালক, নাট্যকার বা অভিনেতা এখানে এসে যদি বুঝতে পারেন ,তাদের চিত্রনাট্যে বা নাটকে কবিতার ব্যবহার , প্রয়োগ শিল্পকে উৎকর্ষতার চূড়ান্তে পৌছে দিতে পারে , তবেই এই মুক্তমঞ্চের আয়োজন সার্থক হবে । হাঁ,আদর্শের ধুনি জ্বেলে তো রাখতেই হবে । বছরের পর বছর ,যুগের পর যুগ বাঁচিয়ে রাখতে হবে সেই আদর্শকে । আমাদের প্রজন্মের শেষে দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের কাছে হয়তো সফলতা ধরা দেবে । সেখানেই আমাদের প্রচেষ্টার সার্থকতা । আধুনিক সমাজে , সর্বাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগের যুগেও , গান-কবিতা-শিল্পকর্ম ও নতুন কিছু করবার গুরুত্ব যে অপরিসীম , সে কথা তো সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে । পিছিয়ে গেলে চলবে না। কোনো ঝোড়ো সন্ধ্যাতে, মায়েরা যেমন তুলসি মঞ্চের প্রদীপকে হাতের আড়াল দিয়ে হাওয়ার দাপট থেকে রক্ষা করেন , ঠিক সেইভাবেই আমাদের এই কবিতাজন্মের উঠোনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
হয়তো কিছুটা বয়সের জন্যেই , বক্তব্যের মাঝপথে থেমে গিয়ে একটু দম নিলো অমলেন্দু। শূন্য দৃষ্টিতে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকলো । চৈত্র এবার শেষের দিকে এসে, গরম হাওয়া আর ঘূর্ণিধূলো একটু বেশি করেই পাঠাচ্ছে মনে হল। তৃষ্ণার্ত হয়ে এদিক ওদিক তাকাতেই , উন্মনা তার নিজস্ব জলের বোতল এগিয়ে দিতে গেল । কিন্তু তখন ওকে ছাপিয়ে , প্রায় বিদ্যুৎ গতিতে , তিথি নিজের জলের বোতল অমলেন্দুর দিকে এগিয়ে দিলো । কিছুটা অপ্রস্তুত অমলেন্দু তিথির বোতলটাই টেনে নিয়ে ঢকঢক করে জল খেলো । তার কবিতার নারী উন্মনা ম্লান গোধূলির মতো ম্রিয়মান হয়ে, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে, একটু দম নিয়ে অমলেন্দু আবার শুরু করলো — আমার মনে হয়, লেখার জন্য একটি সম্পূর্ণ সমর্পিত হৃদয়ের প্রয়োজন হয়। যে সমর্পণ আমরা দেখেছি লালন বা রামপ্রসাদের গানে । মাইকেলের মেঘনাদবধ রচনায় এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের কবিতায় । আমিও নিরীশ্বরবাদী। খুব ছোটোবেলা থেকেই বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। তবুও , সাধক রামপ্রসাদ ও লালন ফকিরের গানে , রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি বা নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থে আমি যে সমর্পিত হৃদয়ের আর্তি শুনেছি ,তার তুলনা কোথায় ? তোমরা লক্ষ্য করে দেখবে, গীতাঞ্জলির ১৫৭ টি আর নৈবেদ্যর ১০০ টি কবিতায় ,একজন কবির শান্ত ও নিরুদ্বেগ হৃদয়ের প্রতিটি বিন্দুতে যেন বুদ্ধ পূর্ণিমার দুকুল ভাসানো চাঁদের আলো এসে পড়েছে । মাইকেলের মেঘনাদবধ পড়তে গিয়েও একই অনুভব হয়। স্রোতের বিপরীত দিকে ভাবনাকে ঘুরিয়ে দেবার চ্যালেঞ্জ , মনন ও চিন্তায় ঝড়ের হাওয়া বইয়ে দেবার দুঃসাহস…..কী আশ্চর্য ! তাই না ? আর আমরা কী করছি ? দু’ একটা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে , ফেসবুকের ওয়ালে গাদা গাদা প্রশংসার বন্যায় ভেসে গিয়ে , নিজেদের প্রফেশনাল লেখক বলে পতাকা উড়িয়ে দিচ্ছি ! আমি যদি তোমাদের মতো কবিতা লেখার মেধা অর্জন করতে পারতাম , তাহলে এই ক্ষণজন্মাদের সৃষ্টির কাছে পরিত্রাণহীন নতজানু হতাম। আমি শুধু কবিতাকে দিক দিগন্তে ছড়িয়ে দিতে পারি । সেই আমার গর্বের শীর্ষবিন্দু। আর্ভিনস্টোনের লাস্ট ফর লাইফ পড়লে বোঝা যায় , শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগের বেঁচে থাকার লড়াইটা কী তীব্র ছিল ! তাঁর সানফ্লাওয়ার ছবিটি যে বিশ্বকে মাতোয়ারা করে দিলো , তা কি তিনি দেখে যেতে পেরেছিলেন? জীবনানন্দের কবিতার অনুভূতি যখন আমরা স্পর্শ করতে পারলাম ,তখন সেই সত্যদ্রষ্টা কবি আর ইহজগতে নেই । কবি লোরকা যখন গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেলেন ,পুড়ে ছাই হয়ে গেলেন , তখনও তার পকেটে ছিল এক গুচ্ছ অপ্রকাশিত সনেটের তাজা পান্ডুলিপি ! অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট , টেন ডেইজ দ্যাট শ্যুক দ্য ওয়ার্ল্ড,হাউ দ্য স্টিল ইজ টেমপার্ড, ইলিউশান অ্যান্ড রিয়ালিটি, গোরা, অখণ্ড শ্রীকান্ত, অগ্নিবীণা,পথের পাঁচালী, হাঁসুলী বাঁকের উপকথা, পদ্মা নদীর মাঝি — এইসব অনন্য সাধারণ রচনাগুলো কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে বলে তোমাদের মনে হয় ? খুব সহজে বা অনায়াসে কি ? রোম শহর যেমন একদিনে গড়ে ওঠেনি , তেমনি , মহান শিল্পের সৃষ্টিও একদিন হয়নি ; হয়েছে একাগ্রতার শেষ বিন্দুতে পৌঁছে — এটাই আমার মনে হয়। স্বামী বিবেকানন্দের এক একটি প্রবন্ধ , রামকৃষ্ণদেবের কথামৃত , বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়, রবীন্দ্রনাথের সহজ পাঠ– আমাদের প্রচলিত ধ্যান ধারনাকে বদলে দিয়েছিলো। একজন তরুণ কবিকে কালি কলম মন দিয়ে সেই দিগন্তকে খুঁজে পেতে হবে । আমরা যেন মনে রাখি ,দস্যু রত্নাকর তার বারো বছরের সাধনার পর বাল্মীকি হতে পেরেছিলেন। বারো বছর আগের তাঁর মুখের খেউড়ের ভাষা ওষ্ঠ থেকে মুছে ফেলে , জলস্রোতের মতো স্বাভাবিকতায় উচ্চারণ করেছিলেন ,মা নিষাদ শ্লোক।
উন্মনা বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছে , তার কবিমন অমলেন্দু বড্ড বেশি সেন্টিমেন্টাল । প্রবল পুরুষদের মতো সে চোখের জল লুকিয়ে ফেলার শিল্পটা আজও রপ্ত করে নিতে পারেনি। তাই, এত সহজেই আবেগের বশে নির্মম সত্য উচ্চারণ করে ফেলে। উন্মনা পাগলের মতো ভালোবাসা এই মানুষটাকে ভীষণভাবে ছুঁতে চাইছিলো; তবু,নিজেকে প্রণপণে সংযত করলো সে । আর পাঁচটা বুদ্ধিমান মানুষের মতো চোখের জল লুকিয়ে ফেললো নিমেষেই । মিটিংয়ের উপসংহার সেই টানলো — বিকেল পাঁচটা বাজে । এরপর বাস ধরে বাড়ি ফেরা
মুশকিল হবে। বৈশাখের প্রথম দিকে , আমাদের বড়িতে আবার মিলিত হব আমরা ।আমার মা মৃত্তিকা,আর কন্যা করতোয়া আপনাদের সবাইকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছে ।ছুটির দিন হলেই ভালো হয় । একটা কথা বলি । তর্ক বিতর্কের ঝড় যেদিকেই গড়াক না কেন ,আমার মনের কুরুশ-কাঁটায় কিন্তু কবিতাজন্মের অনুভব বুনতে শুরু করে দিয়েছি । বৈশাখের দ্বিতীয় রবিবারে আমরা মিলিত হতে পারি কি ? সবাই হাত নেড়ে সমর্থন জানানোর ওপরে গলা তুলে , পাগলা বিন্দাস চৈত্রের ঝোড়ো হাওয়ার মতো গেয়ে উঠলো — সঙ্গীতগুরু হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ঢেউ দোলানো গান —
লঙ্গর ছাড়িয়া নাওয়ের দে দুখী নাইয়া , বাদাম উড়াইয়া নাওয়ের দে……
ঘুমিয়ে পড়েছিল অমলেন্দু। রাত তখন পৌনে একটা। ফোন বেজে উঠতেই বালিশের পাশে পড়ে থাকা চশমাটা পরতে গিয়ে দেখলো — তিথি ফোন করছে ! বিস্ময়ের একটা ঝটকা লাগলো যেন ! তিথির ফোন ? এত রাতে ? হঠাৎ মনে হল, উন্মনা বাড়ি ফিরে গিয়ে মেসেজ করে জানিয়েছিলো, কিন্তু রাতে ফোন করলো না কেন ?
ক্রমশ