গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী

সময় যখন বিচার করে

বর এসেছে, বর এসেছে বলে মেয়ে বৌয়েরা হুড়মুড়িয়ে ছুটল বর দেখতে। এদিকে নববঁধূর সাজে একা বসে আছে চৌধুরী বাড়ির ছোট মেয়ে চিনু। তার আশেপাশে তখন কেউ নেই।
না, বোধহয় সবটা ঠিক বলা হলো না। একজন রয়েছে অতন্দ্র প্রহরীর মতো যার দুই চোখ এই মেয়েটির কাজল চোখের ইশারার অপেক্ষায় রয়েছে। সবাই চলে যেতেই চিন্ময়ী ব্যাকুল হয়ে ওঠে। খুব আস্তে করে নীলু বলে ডাকতেই সামনে এসে দাঁড়ায় নীলাদ্রী। ছোটবেলা থেকেই নীলু আর চিনু একে অপরের সঙ্গী, একসাথে একই বাড়িতে বড় হয়েছে। নীলুর মা জ্যোতির্ময়ী সদানন্দ চৌধুরীর বাড়িতে বহুবছর ধরে আছেন। অসাধারণ সুন্দরী এই বাল্যবিধবা সদানন্দবাবুর দুরসম্পর্কের বোন। চৌধুরীগিন্নি শুভ্রাদেবীর বড়োমেয়ে মিনুর জন্মের সময় জ্যোতিদি’ এই বাড়িতে প্রথম আসেন। রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী জ্যোতির্ময়ীকে সবাই জৈ’দি বলেই ডাকে। সেসময়ে সংসারের সব দায় দায়িত্ব হাসি মুখে সামলেছেন। মাস ছয়েক পরে জৈ’দি কাশী যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করলে চৌধুরী
মশাই তাকে সসম্মানে কাশীতে রেখে আসেন।
তবে চিনুর জন্মের সময় আবার জৈ’দি এবাড়িতে ফিরে আসেন সঙ্গে পাঁচ বছরের এক ছেলেকে নিয়ে। কৌতুহলী জনতার প্রশ্নের জবাবে জৈ’দি বলেন, এই ছেলে তারই। বিধবার কিভাবে ছেলে হল? ওই পিতৃপরিচয়হীন ছেলে কিভাবে এই বাড়িতে থাকবে? আত্মীয় পরিজন কি বলবে? – ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে ভাইয়েদের সাথে চৌধুরী মশাইর ঘোরতর অশান্তি হয়। তবে জৈ’দি সেই যে এসেছেন আর ফিরে যাননি। এই জৈ’দির ছেলে নীলুর ওপর চিনুর সুরক্ষার দায়িত্ব রয়েছে। নীলুও চিনুকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে। স্কুল, কলেজ, প্রাইভেট টিউশন, নাচের ক্লাস, গানের ক্লাস – সব জায়গায় নীলু রয়েছে সাথে। সেই নীলুকে ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে – এটা চিনু কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। আসলে চিনুর জীবনে নীলু ছাড়া অন্য কোনও পুরুষ আজও আসেনি। নীলু ওর সব আব্দার দায়িত্ব নিয়ে পূরণ করেছে।
তাই অস্থির চিনু নীলুকে ডেকে বলে, “চল, এইসময় আমরা কোথাও পালাই। তোকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবনা। আমি এক মুহূর্তও বাঁচব না তোকে ছেড়ে। আমাকে তুই বাঁচা।”
নীলু তখন গভীরভাবে আদর করে অস্থির চিনুকে শান্ত করে। তারপর বলে, “নারে! আমরা পালাব না। তুই কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে পরে থাক। কেউ ডাকলে সাড়া দিবিনা। দেখে যেন মনেহয় তুই অজ্ঞান হয়ে গেছিস। তারপর বাকিটা আমি সামলে নেব।”
ততক্ষণে মহিলা বাহিনী হৈ হৈ করে ঘরে ঢোকে আর চিনুকে মাটিতে পরে থাকতে দেখে চিৎকার করে সবাইকে জড়ো করে। চৌধুরী মশাই অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত। খবর পাঠালেন,” নীলুকে বলে দাও, একটা ডাক্তার ডেকে আনুক।”
এদিকে বরের বাড়ির লোকজন নতুন বৌ দেখতে এসে দেখে বৌ “ফিট” পরেছে। মুখে মুখে রটে যায় চৌধুরী মশাই একটা “ফিটের রুগী”কে গছানোর জন্য গাড়ি – বাড়ি – গয়না – নগদটাকা ঢেলে দিচ্ছে। আসল ব্যাপার হল উনি নিজের অসুস্থ মেয়ের জন্য একটা সুস্থ ছেলে কিনে নিচ্ছেন। এরপর ঘরজামাই করে রাখতে চাইলে কেউ কিছু করতে পারবে না। বর কর্তার কানে একথা পৌঁছতে দেরি হলনা। তিনি বিয়ের আসর থেকে বর তুলে নিয়ে গেলেন। এমনকি ঘোষনা করে দিলেন যে, “এই লগ্নভ্রষ্টা মেয়ের দিকে কেউ ফিরে তাকাবে না। এমন ঠগবাজ পাপী লোকের বাড়িতে জলগ্রহন করাও পাপ।
“লগ্ন ভ্রষ্টা” কনের জীবনে অভিশাপ নেমে আসে – এইবলে বাড়ির মেয়েরা কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। জৈ’দি, চৌধুরী মশাই – সবাই এরকম পরিস্থিতিতে অসহায় বোধ করছেন। তাদের উপস্থিতিতে শুভ্রাদেবী পুরোহিতকে ডেকে বলেন, “আপনি বিয়ের আয়োজন করুন। এ বিয়ে আজই হবে।আমার মেয়ে কিছুতেই লগ্ন ভ্রষ্টা হবে না।” লোক পাঠিয়ে তিনি নীলুকে ধরে আনেন। আর লেঠেল দাঁড় করিয়ে রাখেন যাতে কেউ এই বিয়েতে বাধা দিতে না পারে।
“এই বিয়ে কিছুতেই হতে পারে না” – বলে জৈ’দি তুমুল আপত্তি তোলেন। শুভ্রাদেবী কারণ জানতে চাইলে তিনি আর কিছু বলতে পারেন না। চৌধুরী মশাই চিৎকার করে ওঠেন,”এটা কি হচ্ছে?” – কিন্তু শুভ্রাদেবীর আগুন ধরানো চোখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে যান। আর তখনই তার
মনের ভিতর থেকে উত্তর আসে, “তোমার কি মনে হয়, এটা কি হচ্ছে? একবার ফিরে দেখতো নিজের অতীতের দিকে! দেখো, কি করে সময় নিজের হিসেব মিলিয়ে নিচ্ছে! যাকে জীবনভর ঠেকিয়েছ সেই তোমার বিবাহিত স্ত্রী তোমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে তুমি কত বড়ো পাপ করেছ। তুমিও তো নিজের বোনকে ভোগ করেছ। তার গর্ভে তোমার সন্তান জন্মেছে। তুমি নিজেই এই জঘন্য পাপ কাজ করেছ। পৃথিবীর নিয়ম হল পাপ করলে তার প্রায়শ্চিত্ত এখানেই করতে হবে। স্বর্গ নরক বলে কোথাও আলাদা কিছু নেই। তোমার পাপের শাস্তি তুমি এই জীবনে ভোগ করবেই। না হলে মুক্তি নেই। তাইতো তোমার চোখের সামনে তোমার সন্তান একে অপরের প্রতি আসক্ত। তুমি সব কিছু ঠিকঠাক বুঝেছ বলে মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছ। কিন্তু সময় হল সবথেকে বলবান। তার কাছে সব কাজের বিচার হবেই হবে।আজ তুমি তোমার কাজের ফল পেলে। এবার ন্যায় অন্যায়ের বিচারক নিজে তোমাকে সেই ফল দিলেন।”

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।