গারো পাহাড়ের গদ্যে রবীন জাকারিয়া

বাংলার লোকশিল্প

ভূমিকা: প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালিরা মৌসুমী কাজের অবসরের ফাঁকে ফাঁকে হরেক রকম কারুশিল্প সৃষ্টি করতো৷ এদের মধ্যে সুঁচি শিল্প, তাঁত শিল্প, নকশী কাঁথা ও মসলিন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য৷ গৃহিনীরা কাজের বিশ্রামে অনায়াসে নকশীকাঁথা ও কারুময় শিল্পকলা সৃষ্টি করে ফেলতো৷ এসবের সুনাম অনেক আগেই বিদেশে পর্যন্ত ছড়িয়েছে৷ আমাদের লোকশিল্প আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের পরিচায়ক৷

লোকশিল্পের সংজ্ঞা:
লোকশিল্প সাধারন লোকের জন্য সাধারন লোকের সৃষ্টি৷ এর পরিধি এত ব্যাপক ও প্রকৃতি এত বিচিত্র যে, এক কথায় এর সংজ্ঞা নিরুপণ করা যায় না৷ অগাস্ট পেনিয়েলা (August Panella) বলেন, লোকশিল্পের শুধু ‘শিল্প’ শব্দটা বোঝা কঠিন নয়, ‘লোক” শব্দও সমান সমস্যাপূর্ণ৷ তাঁর ভাষায়, ‘In the expression ‘Folk art’ it is not only the word ‘art’ that is difficult to understand, the word ‘folk’ is equally problematic. বিশেষজ্ঞরা লোকশিল্পের সংজ্ঞা এড়িয়ে যান এই বলে যে, দেখলেই তাকে চেনা যাবে৷
সবচেয়ে সহজলভ্য উপাদান মাটি থেকে আরম্ভ করে কাঠ, বাঁশ, বেত, পাতা, সুতা, লোহা, তামা ধাতব দ্রব্য, সোলা, পাট, পুঁতি, ঝিনুক, চামরা পর্যন্ত নানা উপাদান লোকশিল্পে ব্যবহৃত হয়৷ কামার, কুমার, ছুতার, তাঁতী, সোনারু, কাঁসারু, শাঁখারী প্রভৃতি পেশাদার ও অনেক অপেশাদার নর-নারী লোকশিল্পের নির্মাতা৷ বিভিন্ন শ্রেনি, পেশা ও প্রকৃতির কারণে লোকশিল্পকে সংজ্ঞায়ন করা সত্যিই দুঃসাধ্য ব্যাপার৷

নৃতাত্ত্বিক অভিধানে লোক এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে , “Folk in ethnology is the common people who share a basic store for old tradition.” অর্থাৎ, পুরাতন ঐতিহ্যে অংশীদার যেসব সাধারণ মানুষ, নৃতত্বের পরিভাষায় তারা Folk বা লোক নামে অভিহিত।

লোকশিল্প লোক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে তৈরি সমস্ত ধরনের চাক্ষুষ শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করে। লোকশিল্পের অনেক ধরনের সংজ্ঞা রয়েছে, তবে সাধারণত বস্তুগুলির কেবলমাত্র আলংকারিক হওয়ার পরিবর্তে কিছু ধরনের ব্যবহারিক উপযোগ থাকে। লোক শিল্পের নির্মাতারা সাধারণত সংস্কৃতির ললিতকলা ঐতিহ্যের পরিবর্তে একটি জনপ্রিয় ঐতিহ্যে মাধ্যমে প্রশিক্ষিত হয়ে থাকেন। গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ যারা উন্নত সমাজের কাঠামোর মধ্যে বিরাজমান করে কিন্তু ভৌগোলিক অথবা সাংস্কৃতিক কারণে শিল্পের উন্নত ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাদের নির্মিত এ শিল্পকে লোকশিল্প রূপে বিবেচনা করা হয়।

লোকশিল্প একটি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক জীবনের শিকড় এবং জীবন ব্যবস্থা প্রতিফলিত হয়। তারা লোকশিল্প এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ক্ষেত্রের সাথে যুক্ত সুস্পষ্ট সংস্কৃতির চিরায়ত রূপকে ধারণ করে। দৃশ্যমান লোকশিল্প একটি ঐতিহ্যগত সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যবহারের জন্য ঐতিহাসিকভাবে তৈরি করা বস্তুসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে। অদৃশ্য লোকশিল্প সঙ্গীত, নাচ এবং আখ্যান কাঠামোর মতো শিল্পসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রকৃতপক্ষে দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য উভয়ই গড়ে উঠেছিল তখনকার প্রয়োজন মিটানোর জন্য। যখনই এর বাস্তবিক উদ্দেশ্য শেষ হয়ে যায় বা হারিয়ে যায়, তবে এর প্রাথমিক উদ্দেশ্যে বা যে কারণে এটি সৃষ্টি হয়েছিল তা প্রয়োজনীয়তা ছাড়া সেটির রুপান্তরের কোন কারণ অবশিষ্ট থাকে না।

লোকশিল্পের শ্রেণিবিভাগ:
ফোকলোরের তিনটি প্রধান ধারা রয়েছে৷ ১| মৌখিক ২| বস্ত্বগত ও ৩| অঙ্গক্রিয়াগত৷ লোকজ চারু ও কারুশিল্প একত্রে লোকশিল্প হিসেবে অবিহিত৷ লোকশিল্পের তিনটি প্রধান শাখা রয়েছে৷ যথা-চিত্র, ভাস্কর্য ও স্থাপত্য৷ প্রতিটি শাখার আবার নানা উপবিভাগ রয়েছে৷ উপকরণ, ক্যানভাস ও রীতি অনুযায়ী উন্নত শিল্পের ন্যায় লোকশিল্পেরও নিম্মরুপ শ্রেণিকরণ করা যায়:
১| অঙ্কন ও নকশা৷
২| সূচিকর্ম৷
৩| বয়নশিল্প৷
৪| আদর্শায়ন৷
৫| ভাস্করণ৷
৬| স্থাপত্যশিল্প৷

নকশি ছাঁচ লোকশিল্পকলার একটি স্থায়ী ফর্ম। মাটি, পাথর অথবা কাঠ দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইনের ছাঁচ তৈরি করা হয়। এ ছাঁচে ফেলে বস্ত্তকে বিভিন্ন আকৃতিতে রূপদান করা হয়। কাঠের নকশা করা ছাঁচে রং লাগিয়ে কাপড় ও কাঁথা ছাপানো হয়। কাঠ, মাটি ও পাথরের ছাঁচে মিঠাই, ক্ষীর, আমসত্ত্ব, গুড়ের পাটালি ইত্যাদি তৈরি করা হয়।

চারু ও কারু লোকশিল্প:
চারু ও কারু লোকশিল্প বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোককলা; ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে এর উদ্ভব। আলপনা, মনসাঘট, লক্ষ্মীর সরা, মঙ্গলঘট ইত্যাদি সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন লোকশিল্প। পটচিত্রে ধর্মীয় আবেগ যুক্ত থাকলেও তা জীবিকার উপায় হিসেবে গণ্য। নানারকম ডিজাইন ও অলঙ্করণে শোভিত আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি গৃহস্থের ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটায়। খেলার পুতুল, সখের হাঁড়ি, সোনা-রূপার অলঙ্কার ইত্যাদি সৌখিন দ্রব্য হিসেবে ব্যবহূত হয়। তবে ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক-সব শিল্পকলায়ই কিছু না কিছু নান্দনিক আবেদন থাকে। তাই হিংস্র পশু বা রাক্ষসের মুখোশচিত্র যতই কদাকার হোক, নির্মাতার হাতের ছোঁয়া এবং ঐতিহ্য-সংস্কার-প্রথাগত আবেগের সংমিশ্রণে তার মধ্যেও এক প্রকার রস সঞ্চারিত হয়, যা বীভৎস রস নামে খ্যাত।

টেরাকোটার কাজ বাংলাদেশে কেন বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং এ কলারীতিটি এখনো ভিন্ন তাৎপর্য ও ব্যঞ্জনায় কেন টিকে আছে তার কারণ বোঝা কঠিন নয়। নির্মাণ ও বস্তুগত উপাদান সৃষ্টিতে ভূপ্রাকৃতিক কারণে বাঙালি শিল্পী ও নির্মাতার প্রধান মাধ্যম হয় ইট ও পোড়ামাটি। অতএব শত সহস্র বছর আমাদের বাস্তুভিটা নির্মাণে মাটি পোড়ানো ইট ও অনুষঙ্গী উপাদান যেমন ব্যবহৃত হয়েছে তেমনি টেরাকোটার মাধ্যমে আমাদের ঐতিহ্যিক বস্তুগত শিল্পকলাও লোক-ভাস্কর্য হিসেবে টিকে থেকেছে এবং নতুন রূপ ও সমকালীন চিন্তাচেতনারও প্রকাশমাধ্যম হয়েছে। প্রাচীনকালের মন্দির ও প্রাসাদ অলংকরণের ওই লোকজ মাধ্যমটি ধর্মীয় আবহের খোলস ছেড়ে ব্যবহৃত হয়েছে ইতিহাসের উপাদান হিসেবেও। কান্তজির মন্দিরই তার উদাহরণ। এমন ব্যাপক, মনসংবদ্ধ, সূক্ষ্ম ও ব্যঞ্জনাধর্মী শিল্প নৈপুণ্যতা এদেশে বিরল। আমাদের লোকশিল্পীদের এ এক অনন্যকীর্তি। আধুনিককালে নবভাস ও বিষয়ে বিন্যস্ত হয়েছে। সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনার মর্মবাণীকেও ধারণ করছে টেরাকোটা শিল্প। এই ধারায় খুব তাৎপর্যপূর্ণভাবেই বাঙালি জাতিসত্তার প্রতীক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীর বটতলার নজরুল মঞ্চের বেদির তিন দিকের দেয়ালে আছে এর ব্যবহার। এর উদ্দেশ্য বাঙালির হাজার বছরের ভাষার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাজার বছরের লোকায়ত শিল্পকলার সংযোগে ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের সুদৃঢ় ভিত্তি নির্মাণের মাধ্যমে আধুনিকতার নবব্যঞ্জনা সৃষ্টি। অন্যদিকে আবহমান শিল্প-সৃজন ঐতিহ্যের ব্যবহার করে বেদির সৌন্দর্যে একটি স্বকীয় ও নতুন মাত্রা যোগ করা। বাংলা একাডেমী এই টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ভাস্কর্যের ব্যবহার করেছে একাডেমী সেমিনার কক্ষের দেয়ালে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের একটি বাস্তব মূর্তিকল্প ধরে রাখা হয়েছে পোড়ামাটির কাজে। এতে ঐতিহ্যের আধারে একালের গণসংগ্রামের স্মারক ইতিহাস নান্দনিক বিভায় মূর্ত হয়ে আছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনসহ কিছু হোটেল এবং ব্যক্তিগত আবাসন ভবনেও পোড়ামাটির কাজের নতুন ব্যবহার দেখা যাচ্ছে ইদানীং। ঐতিহ্যসচেতন এই আধুনিকতাও ইতিহাসের ধারাবাহিকতার পরিচয়বাহী।

সাবেককালের সামন্ত এলিটরা কান্তজির মন্দিরে পোড়ামাটির প্যানেল ব্যবহার করে যে অপূর্ব সৌন্দর্য সৃষ্টির ঐতিহ্য স্থাপন করেছিলেন একালেও সে-ঐতিহ্য ইতিহাসের প্রগতি ধারায় স্থান করে নিচ্ছে ভিন্নতর তাৎপর্যে। অতএব লোকশিল্পকলার অনড় (Static) কোনো ঐতিহ্য শুধু নয়, ধারাবাহিকতায় অন্বিত (Continuity) এক নব মাত্রিকতার শিল্পমাধ্যমও হয়ে উঠতে পারে, হয়ে উঠতে পারে বিপ্লবী প্রেরণা প্রকাশক নব নন্দনতত্ত্বের উদ্ভাবনাময় আঙ্গিক।

চারু ও কারু দুটি ভিন্ন প্রকৃতির শিল্প। রঙতুলির সাহায্যে নির্মিত চিত্রকলা ও সুই সুতার সাহায্যে নির্মিত সূচিশিল্প চারুশিল্পের অন্তর্গত; আর মৃৎশিল্প, দারুশিল্প, বস্ত্রশিল্প, বাঁশ-বেত-শোলা-শঙ্খ-দন্ত নির্মিত বিবিধ হস্তশিল্প এবং সোনা-রূপা-পিতল নির্মিত ধাতবশিল্প কারুশিল্পের অন্তর্গত। তবে কতক লোকশিল্প আছে যেগুলিকে এভাবে বিভাজন করা যায় না, যেমন: সখের হাঁড়ি, মনসাঘট, লক্ষ্মীর সরা এগুলি একাধারে চারু ও কারুশিল্পের নিদর্শন বহন করে। মাটির তৈরী সাধারণ হাঁড়ির গায়ে রঙতুলি দিয়ে মাছ, পাতা কিংবা রেখাদির চিত্র অঙ্কিত হলে তখন তাকে সখের হাঁড়ি বলে। নকশি পাটি বুননশিল্প; এতে রঙ-বেরঙের বেত দিয়ে বুনন কৌশলে গাছ, পাখি, মসজিদ ইত্যাদির ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়। এ কারণে নকশি পাটিও চারু ও কারুশিল্পের সমন্বিত নিদর্শনরূপে গণ্য হয়।

সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পট পুতুলের বাঙলা (কলকাতা, ১৯৭৯) বইয়ে বলেছেন, ‘বাঙলার মাটির পুতুলকে লক্ষণ, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি দিক দিয়ে বিচার করে মোটামুটি দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। প্রতীকধর্মী বা সিম্বলিক, আর বাস্তবধর্মী বা ন্যাচারালিস্টিক। প্রত্নবস্তুর মধ্যে পাওয়া পুতুলগুলোর প্রায় সবই প্রতীকধর্মী। এই পুতুলে কোনো ছাঁচ লাগে না। হাত টেপা পুতুল হিসেবে এর পরিচিতি। বাংলাদেশের ফরিদপুর, বরিশাল, কুমিল্লা, মাদারীপুর, জামালপুর, রাজবাড়ীর রামদিয়া ও ময়মনসিংহ শহরসংলগ্ন বলাশপুরে পুতুল তৈরি হয়। ইচ্ছা পূরণ বা মানতের জন্যও মাটির পুতুল উপযোগী উপকরণ। সাভারে ঘোড়াপীরের মাজারে মানতের ঘোড়ার পুতুলের স্তূপ লক্ষণীয়।

বাংলার লোকশিল্পের বিবরণ:
গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষ দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করার মাধ্যমে নিপুণ শিল্পদক্ষতায় সাধারণ যন্ত্রপাতি দ্বারা যেসব সামগ্রী তৈরি করে তাকে লোকশিল্প বলে। সহজ কথায় লোকশিল্প হচ্ছে সাধারণ লোকের জন্য সাধারণ লোকের সৃষ্টিকর্ম। সাধারণ মানুষ জীবনের প্রয়োজনে যেসব কাজ করে থাকে তার ভেতরের সৌন্দর্য এবং আনন্দটুকুই হচ্ছে লোকশিল্প।

বাংলার লোকশিল্পর সম্ভার অফুরন্ত। বঙ্গীয় সংস্কৃতির শিকড় নিহিত রয়েছে বাংলা সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা, নাটক ও চলচ্চিত্রে। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু মহাকাব্য ও পুরাণ-ভিত্তিক জনপ্রিয় সাহিত্য, সংগীত ও লোকনাট্যের ধারাটি প্রায় সাতশো বছরের পুরনো। উনিশ শতকে অধুনা পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা ছিল বাংলার নবজাগরণ ও হিন্দু সমাজ-সংস্কার আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহ্য হাজার বছরের বেশি পুরনো। ৭ম শতাব্দীতে লেখা বৌদ্ধ দোহার সঙ্কলন চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। মধ্যযুগে বাংলা ভাষায় কাব্য, লোকগীতি, ও পালাগানের প্রচলন ঘটে। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বাংলা কাব্য ও গদ্যসাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে।

লোকশিল্পের উপকরণ:
লোকশিল্পের উপকরণ অতি সাধারণ। স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত মাটি, কাঠ, কাপড়, সুতা, শোলা, শঙ্খ, নল, বাঁশ, বেত, শিং ইত্যাদি দিয়ে নানা ধরনের শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়। সোনা, রূপা, পিতল, হাতির দাঁত প্রভৃতি মূল্যবান উপকরণও ব্যবহার করা হয়। লোকশিল্পের যন্ত্রপাতিও অতি সাধারণ। এসব সাধারণ উপাদান ও যন্ত্রপাতি দ্বারা বাংলার লোকশিল্পীরা যুগযুগ ধরে অসামান্য শিল্প তৈরি করে আসছে। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত পেশাদার-অপেশাদার শিল্পীদের বেশির ভাগই গ্রামে-গঞ্জে বসবাস করে। কামার, কুমার, ছুতার, পটুয়া, সোনারু, কাঁসারু, শাঁখারি, তাঁতি প্রভৃতি চারু ও কারু শিল্পী জাতপেশা হিসেবে বিবিধ শিল্পকর্মে পুরুষানুক্রমে নিয়োজিত আছে। হস্তনির্মিত এসব শিল্প তাদের জীবিকারও উপায় বটে। আলপনা ও নকশি কাঁথার শিল্পীরা হচ্ছে গৃহস্থ ঘরের সাধারণ নারী; শিল্পী হিসেবে তাদের আলাদা কোনো পরিচয় নেই। পল্লী অঞ্চলে এরূপ আরও কিছু সৌখিন শিল্পী আছে যারা নান্দনিক চেতনা থেকে নানা ধরনের খেলনা, আসবাবপত্র ও সাজ-সরঞ্জাম তৈরি করে থাকে।

লোকশিল্পে মোটিফের ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মোটিফ হচ্ছে বাঙালির ঐতিহ্যাশ্রিত কতগুলি স্থায়ী ফর্ম বা ডিজাইন, যেগুলি নানা আঙ্গিকে ব্যবহূত হয়। যেমন পদ্ম, কল্কা, সূর্য, সজীব গাছ, পুষ্পিত লতা ইত্যাদি মোটিফরূপে চিত্রে, নকশায়, সূচিকর্মে, বুননে ও খোদাই কাজে পরিলক্ষিত হয়। এগুলির সঙ্গে জাতীয় ঐতিহ্য, সংস্কার, বিশ্বাস, প্রতীক ও সৌন্দর্যের চেতনা জড়িয়ে আছে। মাছ, হাতি, ঘোড়া, ময়ূর, মকর, স্বস্তিকা, বৃত্ত, বর্ফি, তরঙ্গ, মন্দির-মসজিদ ইত্যাদি মোটিফরূপে অঙ্কিত হয় বিভিন্ন চারু ও কারু শিল্পে। এগুলির মধ্যে মাছ প্রজননের, ধানছড়া সমৃদ্ধির, পদ্ম পবিত্রতার ও স্বস্তিকা সৌভাগ্যের প্রতীকরূপে গণ্য হয়ে থাকে।

উন্নত শিল্পের মতো লোকশিল্প নির্মাণেরও নানা পদ্ধতি আছে। উপকরণ ও ক্যানভ্যাসভেদে লোকশিল্পের বিভাজনগুলি হচ্ছে এরূপ: ১. অঙ্কন ও নকশা (painting and sketch): আলপনা, পটচিত্র, ঘটচিত্র, মুখোশ, দেয়ালচিত্র, উল্কি ও অন্যান্য অঙ্গচিত্র, চালচিত্র, করন্ডিচিত্র, সখের হাঁড়ি, নকশি পুতুল ইত্যাদি; ২. সূচিকর্ম (embroidery): বিবিধ নকশি কাঁথা, রুমাল, শাড়ি ও অন্যান্য পোশাক; ৩. বয়নশিল্প (weaving): নকশি পাটি, নকশি শিকা, নকশি পাখা, ঝুড়ি, ফুলচাঙ্গা; ৪. মডেলিং বা প্রতিরূপ দেওয়া (modelling): পুতুল ও খেলনা, হাঁড়ি-পাতিল, মুখোশ, ছাঁচ, নকশি পিঠা, নকশি দরমা, মিষ্টিদ্রব্য, অলঙ্কার, নৌকা, রথ, তাজিয়া, খাট, পালঙ্ক, বাক্স, সিন্দুক, পাল্কি ইত্যাদি; ৫. খোদাই কাজ (engraving): খোদাইকৃত কাঠের দ্রব্য, পোড়ামাটির ফলকচিত্র, নানা ধাতুশিল্প; ৬. খচিত করা (inlaying): মণি, মুক্তা, হীরা ও পান্নাখচিত বিবিধ অলঙ্কার, রঙিন কাঁচ-পাথর দ্বারা দালান-কোঠা অলঙ্কৃতকরণ ইত্যাদি।

লোকশিল্প বিলুপ্তির কারণ?
লোকশিল্প আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত কিন্তু বর্তমানকালে বিলুপ্তপ্রায় । এদেশের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে লোকশিল্পের এক নিবিড় সম্পর্ক আছে । কিন্তু বিভিন্ন কারণে আজ গ্রামীণ লোকশিল্প বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে । নিম্নে লোকশিল্প বিলুপ্ত হবার কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হলোঃ

১। যথাযথ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের অভাবে আমাদের গ্রামীণ লোকশিল্প বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ।
২। লোকজন গ্রামের লোকশিল্পের সামগ্রীর চেয়ে শহরের কলকারখানায় তৈরি জিনিসের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে ।
৩। আবার অনেক লোকশিল্প কারিগরের আগের মতো দক্ষতা ও শিল্পীমন নেই ৷
৪। প্লাস্টিক দ্রব্যের প্রতি আকর্ষণ । এসব কারণে লোকশিল্প ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ।
ঘ) লোকশিল্প সংরক্ষণের উপায়?
আমাদের সকলকে লোকশিল্প সম্পর্কে সাধারণ জনগণকে সচেতন করতে হবে । লোকশিল্প চর্চা অব্যাহত রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে যেমন :

১। লোকশিল্পের কারিগরদের যথাযথ সুযোগ সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে ।
২। লোকশিল্প কে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে ।
৩। জাদুঘরে কিংবা অন্যকোন প্রদর্শনীর স্থানে লোকশিল্প সংরক্ষণ করতে হবে । সুপরিকল্পীত উপায় এবং সুরুচিপূর্ণ লোকশিল্প প্রস্তুতের দিকে মনোযোগ দিতে হবে

উপসংহার: বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় লোকশিল্পের প্রয়োজন বা উপযোগিতা জাতিতাত্ত্বিক দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ কিন্ত দুঃখজনকভাবে বর্তমানে লোকশিল্পের অনেক উপাদানই আজ বিলুপ্তির পথে৷ এমতাবস্থায় লোকশিল্পের নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, সেগুলোর উৎস-ইতিহাস এবং শিল্প বিচার জরুরী হয়ে পড়েছে৷ আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও গৌরবকে ধরে রাখার স্বার্থে সরকারি ও বেসরকারকারি পর্যায়ে লোকশিল্পের জন্য আর্থিক বিনিয়োগ ও বাজারজাত ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে৷ দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য লোকশিল্পীদের উৎসাহ বাড়াতে হবে৷ এতে লোকশিল্পসহ আমাদের হারানো দিনের অনেক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে৷

তথ্যসূত্র: (ক্রমানুসারে নয়)
– উইকিপিডিয়া৷
– বাংলাপিডিয়া৷
– দৃষ্টিভঙ্গী, অনলাইন পত্রিকা৷
– ফেসবুক পোস্ট৷
– নূরে আলম সিদ্দিকী শান্ত, শিক্ষার্থী, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা
– Daily Manobkatha
– www.myallgarbage.com
– সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, পট পুতুলের বাঙলা বই
– Folk Arts And Crafts of Bengal : The Collected Papers : Gurusaday Dutt-Calcutta, 1990.
– Folk Arts of Bengal : Ajit Mukherjee University of Calcutta, 1964, New and Revised edition.
– NCTB নবম-দশম শ্রেণি বাংলা বই৷ আমাদের সংস্কৃতি, লেখক আনিসুজ্জামান৷
– NCTB অষ্টম শ্রেণি সাহিত্য কণিকা বই৷ আমাদের লোকশিল্প, লেখক কামরুল হাসান৷
– NCTB অষ্টম শ্রেণি বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বই৷ তৃতীয় অধ্যায়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন৷
– অন্যান্য।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।