এক মাসের গল্পে সুপর্ণা বোস (পর্ব – ২)

চাঁদের কণা
গাড়ির সিটের ওপর ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলেন মিলি।হাতের ফাইলগুলো একটু ঠেলে সরিয়ে দিয়ে মাথাটা পিছন দিকে আলতো করে হেলিয়ে চোখ বুজলেন।মস্তিষ্কের একটু বিশ্রাম দরকার। প্রথমদিকে এই ধরণের সেমিনারে নিজের জীবনের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা ও উত্তরণ নিয়ে কথা বলতে বেশ ভালই লাগত।ভিতর থেকে একটা তাগিদ আসতো কিছু বলার।ইদানিং ক্লান্তি আসছে।হয়ত অত্যধিক কাজের চাপের কারণে। যেদিন তিন বান্ধবী মিলে স্পেশাল চাইল্ডদের জন্যে প্লেস্কুল, ‘প্রস্ফুটন’ শুরু করেছিলেন সেদিন মাত্র চারজন শিশুকে ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন।তারমধ্যে দুটি ছেলে ও একটি মেয়ে তাদের নিজেদেরই।একটি বাচ্ছা ছেলে মিলির স্বামী অর্ণবের কলিগের পরিচিত।
স্কুল চালানো কালীন নিজেদেরকে ক্রমাগত প্রশিক্ষিত করে গেছেন তাঁরা।স্পেশাল এডুকেটরের ট্রেনিং নিয়েছেন।বিভিন্ন ওয়ার্কশপ জয়েন করেছেন।শিশুগুলিকে আরো একটু বয়সোচিত উপযুক্ত করে তোলার জন্যে মেধা ও সামর্থ্য ঢেলে দিয়েছেন অক্লেশে।তাঁদের ঐকান্তিক পরিশ্রমের ফল দেখা গেছে শিশুদের আচরণে। তাদের নিজস্ব ভূবন আছে কিন্তু সে তো মানুষের পৃথিবীর বাইরে নয়!তাই এখানকার আদবকায়দা শিখতে হবে।শিখতে হবে প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে জড়িত সেল্ফ কেয়ারের বিষয়গুলি।নিজে নিজে দাঁতমাজা চানকরা অথবা পোশাক বদল করা। শিখতে হবে নিজের প্রয়োজন ও চাহিদা প্রকাশের ধরণ।
কোট আনকোট নরমাল শিশুরা খুব সহজেই এসব শিখে নিতে পারে কিন্তু স্পেশাল চাইল্ডদের ক্ষেত্রে বিষয়টা ততটাই কঠিন। বিশেষ করে পিউবার্টি হিট করার সময়টিতে হরমোনাল চেঞ্জ ও তজ্জনিত শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলিকে সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।কেয়ারগিভারদের জন্যে এই সময়টা খুবই কঠিন।সৌভাগ্যবসত এই কাজে কুমকুম,সুকান্তদের মত নিবেদিতপ্রাণ ছেলে মেয়েদের সঙ্গে পেয়েছেন মিলি।সত্যি বলতে কি কতটুকুই বা পারিশ্রমিক দিতে পারেন তিনি ওদেরকে! এই ফিল্ডে যারা কাজ করতে আসেন তারা সচরাচর মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার একটা উচ্চ আদর্শ থাকে।তা না হলে দুনিয়ায় করার মত অনেক কাজই থাকে। অন্তর থেকে ভাল না বাসলে এ কাজ করা সম্ভব নয়।এই যে মিলির গাড়ি চালাচ্ছে যে ছেলেটি।তার নাম পারভেজ।গাড়ি চালানো ছাড়াও আরো অনেক কাজই করতে হয় তাকে।যেসব শিশুদের বাড়ির লোক তাদের স্কুলে আনতে পারে না তাদের বাড়ি গিয়ে শিশুকে গাড়ি করে স্কুলে নিয়ে আসে এবং পৌঁছে দিয়ে আসার কাজটিও করে পারভেজ।এই কাজে তাকে সাহায্য করে সুকান্ত।দুবেলা কোলে করে এনে গাড়িতে তোলা বড় সহজ ব্যপার নয়।পারভেজ হাসিমুখে সেসব সামলায়।
বর্তমানে তিনজন বয়োসন্ধিছোঁয়া ছেলেকে প্রকাশ্য স্থানে যৌন উদ্দীপনা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি শেখাবার দায়িত্বে আছে পারভেজ ও সুকান্ত।সারাদিনে তিনবার তাদের মী-টাইম দেওয়া হয় এবং একান্তে সঠিকভাবে হস্তমৈথুনের দ্বারা স্বস্তিবিধানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে পাঁচটি মেয়েকে মেন্সট্রুয়াল হাইজিন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।তাদেরকে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার শেখানো হচ্ছে হাতে কলমে।এই বিষয়টি পরিচালনা করে কুমকুম নামে একজন তরুণী প্রশিক্ষক। কুমকুমের অধ্যবসায় দেখে মিলি নিজেও অভিভূত হয়ে যায়।একটি মেয়ে যখন নবছর বয়েসে পৌঁছায় তখন থেকে তাকে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের ট্রেনিং দিতে শুরু করে কুমকুম যাতে ঋতুমতী হওয়ার পর সেই শিক্ষা তারা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারে।বাস্তবিক এইভাবে ট্রেইন করার কাজটি অত্যন্ত কঠিন কারণ সব ছেলেমেয়ের ফাংসানালিটির লেভেল সমান নয়।এইসব কর্মীরাই মিলির সত্যিকারের সহযোদ্ধা।তার প্রতিষ্ঠানের সম্পদ।
গাড়ি পার্কসার্কাসের সিগনালে দাঁড়াতেই জানালার কাচে টোকা পড়ল।সেই মেয়েটা।শ্যামল মুখে ডাগর দুটি চোখ।লালচে ঝাপরঝুপুর চুল।ময়লা ফ্রক।পিঠের বোতাম অর্ধেক নেই।হাতে একরাশ লাল গোলাপ নিয়ে এসেছে।গেলো হপ্তায় এই মেয়েটির থেকেই একগোছা রক্ত গোলাপ কিনেছিলেন মিলি।ষাট টাকা দাম।মিলি ফুলগুলি হাতে নিয়ে মেয়েটির হাতে একটা একশটাকার নোট ধরিয়ে দিয়েছিলেন।মেয়েটি তার ইজেরের ট্যাঁক হাতড়ে বাকি টাকা বার করতে করতেই সিগনিলের আলো সবুজ।ততক্ষণে পারভেজও স্টার্ট দিয়েছে গাড়িতে।মিলি মেয়েটিকে বললেন,
_ব্যালেন্সটা আর ফেরত দিতে হবে না।তুমি রেখে দাও।
কিন্তু মেয়েটি একবগ্গা।সে খুচরোটা ফেরৎ না দিয়ে ছাড়বে না।গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে সে পরের সিগনাল পর্যন্ত এসে পড়ল।মিলি কাচ নামিয়ে সস্নেহে বললেন,
_তোমায় বললাম যে ফেরৎ দিতে হবে না?এভাবে এতোদূর কেউ ছুটে আসে?
মেয়েটা হাঁফাতে হাঁফাতে বলল
_তুমার পইসা তুমি লিয়ে যাও।ফুলের দাম যা তার লে বেশি লিব নাই
মিলি খুশি হল মেয়েটির সততায়।কতই বা বয়স ওর।বড় জোর বছর বারো!মিলি মেয়েটির হাত থেকে মলিন চারটে দশ টাকার নোট নিয়ে পার্সএ রাখলেন। খানিকটা পরে পারভেজকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
_দেখেছ মেয়ের আত্মসম্মানজ্ঞান? খোঁজ নিয়ে দেখো তো মেয়েটা কোথায় থাকে,কে কে আছে ওর।
_ঠিক আছে ম্যাডাম।দু এক দিনের মধ্যেই খবর এনে দেব কিন্তু ম্যাডাম ও তো স্পেশাল চাইল্ড নয়?
_না না।সে অর্থে স্পেশাল নয় কিন্তু নিডি।আর বেশ ইন্টেলিজেন্টও।ওকে একটু সাপোর্ট দিতে পারলে…
পোটেনশিয়ালস আছে।কথাগুলো খানিকটা যেন নিজেকেই বলা।
মিলি এখন প্রস্ফুটনে ফিরে যাবে।রাত নটা নাগাদ সোনাকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় ফিরবে।প্রস্ফুটন একই সঙ্গে চিলড্রেন ‘স স্কুল ও ট্রেনিং সেন্টার এবং ডে কেয়ার।সকাল সাতটা থেকে সন্ধে সাতটা পর্যন্ত খোলা থাকে।স্পেশাল চাইল্ডদের ফাংশনালিটি লেভেল অনুযায়ী তাদের জীবনের পাঠ ,বিভিন্ন ভোকেশনাল ট্রেনিং ও প্রয়োজনে রিহ্যাবিলিটেশন দেওয়া হয়।মিলির স্বপ্ন এই স্কুলটিকে রেসিডেন্সিয়াল স্কুল হিসেবে গড়ে তোলা।তাতে প্রশিক্ষণ সহজ ও ফলপ্রসূ হবে।প্রশিক্ষকদেরও কোয়ার্টার দিয়ে রাখার বন্দোবস্ত করা যাবে। মিলি খোলা চোখে স্বপ্ন দেখতে থাকেন। একটু ইন্টেরিয়ারে কয়েক বিঘে জমি।আরো কিছু প্রয়োজনীয় ইক্যুইপমেন্টস। সরকারি সাহায্য। আরো অনেক বেশি সংখ্যায় স্পেশাল বাচ্ছাদের ঘষেমজে মূলস্রোতের কাছাকাছি এনে ফেলা।সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করার কাজগুলি আরো বেশি মাত্রায় সম্ভব করতে হবে।
কেন জানি মিলির আজ মনে পড়ছে দশ বছর আগে বেনারসের গঙ্গায় ভাসানো সন্ধ্যার দীপমালার দৃশ্য।সকলের মতই মিলিও একটি শালপাতার বাটিতে করে জ্বলন্ত প্রদীপ ভাসিয়ে ছিলেন সোনার নামে।অন্য আরো অনেক প্রদীপের সঙ্গে গা ঘেঁষে তার প্রদীপটিও ভেসে যাচ্ছিল স্রোতের টানে।সন্ধের অন্ধকারে বহুক্ষণ সেদিকে চেয়েছিলেন মিলি।