সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ৪)

কেদার
“একোহপাস্যৌ রচয়িতুং জগদণ্ডকোটিং/ যচ্ছক্তিরস্তি জগদণ্ডচয়া যদন্তঃ।অণ্ডান্তরস্থপরমাণুচয়ান্তরস্থং/ গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি//” (ব্রহ্মসংহিতা; ৫/৩৫)
(ভগবান তার পরমাংশে শতসহস্র ব্রহ্মাণ্ড রচনা করার পরেও তার ভক্তর বশ।ধরা পড়তে না চাইলেও মা যশোদা অনায়াসে তাকে ধরে ফেলেন। সে শক্তি মাতৃত্বপ্রেমের।)
অলোকানন্দার হাতের আঙুল স্পর্শ করেই থমকে গেল সুকুমারী। ভিতরভিতর অলোকানন্দা তিরিতিরি কাঁপছে। গোকুলঘরিয়ার গোঁসাইবাড়িতে জনা কুড়ি ভক্তমণ্ডলীকে নিয়ে গান শোনাচ্ছেন অদ্বৈত গোঁসাই। মাঝেমাঝে কথা বলছেন।
-কৃষ্ণ পাওয়া বড় সহজিয়া পথ। বুঝলে দিদিভাইয়েরা। শ্রীমদ্ভাগবতম বলছে “এবং সন্দর্শিতা হ্যঙ্গ হরিণা ভৃত্যবশ্যতা।
স্ববশেনাপি কৃষ্ণেন যস্যেদং সেশ্বরং বশে।” সমগ্র জগত যার বশীভূত, সেই কৃষ্ণ তোমার বশীভূত হবেন, যদি তুমি তার ভক্ত হয়ে ওঠো।
অদ্বৈত গোঁসাইয়ের পাশেই একতারা হাতে গেরুয়াথান পরে বসে রয়েছেন এক মধ্যবয়সী রমণী। হঠাৎ তার চোখদুটি দেখলে মনে হবে সরোবরে যেন একজোড়া পদ্মফুল ফুটে রয়েছে। ওই মহিলাকে গোকুলঘরিয়ার মানুষ শচীমাতা বলেই চেনে। অদ্বৈত গোঁসাইয়ের সাধনসঙ্গিনী। আজ বিকেল বিকেল অলোকানন্দাকে জোর করেই এখানে নিয়ে এসেছে সুকুমারী।
-গোঁসাইবাড়িতে গেলে তোর মন শান্ত হবে। চল।
সমবেত ভক্তের ভিতর অলোকানন্দা ছাড়াও আরও একজন নিঃশব্দে হাপুশনয়নে কাঁদছিল।তার কপালের সিঁদুর টিপ ধেবড়ে যাবার পরেও এক অপূর্ব লালিমা দিয়েছে যেন। ভিতরের পুঞ্জীভূত জ্বালা উনুনের আঁচের মতোই বের হয়ে আসছে সেই লালিমার ভিতর। সুকুমারী চেনে ওকে। ওর নাম সুলোচনা। রণজয় সেনের ঘরের লোক। অদ্বৈত গোঁসাই বলছিলেন।
-আমাদের শরীরের ভিতরেই লুকিয়ে আছে যোগীদেহের চার চক্র। বৌদ্ধরা তেমনটাই বলে। আর আমরা বলি ত্রিবেণী। ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্না। সুষুম্না পথে অবধূতিকা। তাকে উর্ধ্বপথে চালনা করলে অধরচাঁদ।
অতোসতো বোঝে না অলোকানন্দা। অতো সব শক্ত শক্ত শব্দ শুনলে তার মাথা ভনভন করে। সুকুমারী তাকে বলে এনেছে যদিও। ‘ওখানে গিয়ে ঘরের কথা কিছু ভাববিনি। সব ভুলবি কিছুক্ষণের জন্য।’ বলেছে বটে। তবু অদ্বৈত গোঁসাইয়ের কথা শুনতে শুনতেই ঝলকদর্শনের মতো তার মনে পড়ে যাচ্ছে শাশুড়ির সন্ধ্যার বড়ি দেবার সময় হয়ে এল। কৃষ্ণেন্দু ফিরল না এখনও। আজ রাতে মোহনপোলাও করলে কেমন হয়! আর ওই ছাউনির ভিতর মুরগীছানাগুলো ! অদ্বৈত বলে চলে।
-বৌদ্ধমতে যা বোধি, বাউলমতে তা অধরচাঁদ। মিলনের সময় তাকে একঝলক অনুভব করা যায়। কুবীর কী বলে জানো? শোনো তবে মা বোনেরা।
গোঁসাই সুর ধরে। শচীমাতা একতারায় তান ধরে। দুজনের কপালেই বিন্দুবিন্দু ঘাম। ছিলা অছিলায় দুজনের ত্বক স্পর্শ করছে একে অপরকে। আর ভিতর থেকে শিউড়ে উঠছে অলোকানন্দা। একবার কারেন্ট খেয়েছিল সে মুরগীখানার তারে। অজান্তে তারের ভিতরের তামা বের হয়ে গিয়েছিল হয়তো। বুঝতে পারেনি। এই শিউড়ে ওঠা অনেকটা সেইরকম। কে যেন ভিতর থেকে ডুকড়ে কেঁদে উঠছে। কচিশিশুর মতোই যেন বলে উঠছে তার ক্ষিদে পেয়েছে। একী অলুক্ষুণে কথা! একথা বলতে আছে। ভাবতে ভাবতেই তিরি কেঁপে উঠছে সে। গোঁসাই গাইছেন।-নাভি পর্দ্দ পাদ পদ্দ হৃদি কর পদ্দ আছে আর মুখপদ্দ পদ যুগল নয়নে। আর রয়েছে প্রফুল্লপদ্দ ব্রহ্ম রন্দ্র সহস্রারে…
অলোকানন্দা দেখল সুকুমারীর চোখে জল। গোঁসাই উঠে দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে গাইছেন, ” যে অধর সেই তো হরি, ভাবঘরে নেই করতে চুরি, ধরতে অধরচাঁদ।”
অদ্বৈত গোঁসাইয়ের বাঁধনদাররা খোল করতাল মৃদঙ্গ সহযোগে ততক্ষণে গোঁসাইবাড়ি আনন্দে মাতোয়ারা করে তুলেছেন। ভক্তরা একে একে উঠে নাচতে শুরু করেছে। সুকুমারী অলোকানন্দার হাত ধরে টেনে বলল,”ওরে চল। নাচবি চল।” ‘উঠব না উঠব না’ করেও উঠে পড়তে হল তাকে। সুকুমারীর আঁচল খসে পড়ছে। আলুথালু ভিতরবাসে উঁকি দিচ্ছে শরীর। তবু তার ভ্রুক্ষেপই নেই। গোঁসাই বলে চলেছেন, “অধরচাঁদ রে আমার বালক কৃষ্ণ। ওর কাছে সবাই বশ। ত্রিবেণীসঙ্গমে।” অলোকানন্দা দেখল সুকুমারী একা নয়। সমবেত ভক্তবৃন্ত আলুথালু বেশে মৃদঙ্গের তালে তালে দুই হাত তুলে ‘হরিবোল’ ধ্বনি তুলে নেচে চলেছে।নারীপুরুষ কারোর কোনও হুঁশ নেই যেন।নেশাগ্রস্থর মতো ভেসে আসছে কৃষ্ণধ্বনি। গোঁসাই গাইছেন,”চরণে নূপুর দিলা তিলক কপালে।
চন্দনে চর্চিত অঙ্গ রত্ন হার গলে।” সকলে নাচতে নাচতে ঘুরে চলেছে ঘূর্ণায়মান ব্রহ্মাণ্ডের মতো।অলোকানন্দাও সামান্য হাত তুলেই নামিয়ে আনল। তার লজ্জা করছে। এমনটা সে আগে কখনও করেনি তো। কেমন যেন মনে হচ্ছে তার দুই হাত তুলে ধরলে সে কৃষ্ণেন্দুর হাত ধরবে কীকরে। যদি ছেলেটা বলে বসে,” মাগো আমার। ভয় করছে গো। হাত ধরো গো।”
হাত নেমে আসে ছোট্ট গৌড়ের জন্য। আর ঠিক সময় গোঁসাইবাড়িতে একটি অঘটন ঘটে গেল। তুলসীমঞ্চর দিকে যে জনা সাতেক সংকীর্তন করছিলেন তারা হঠাৎ নাচ থামিয়ে মৃদু গুজগুজ করতে শুরু করলেন। সে দৃশ্য দেখে অদ্বৈত গোঁসাই আর শচীমাতা গান থামিয়ে দিলেন। জটলার ভিতর অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আছে সুলোচনা। রণজয় সেনের বৌ!
ঘটনার আকস্মিকতায় হঠাৎই সংকীর্তনে ছেদ পড়ল। গোঁসাইবাড়ি থেকে অলোকানন্দার ঘর পায়ে হেঁটে মিনিট কুড়ি। অন্ধকার সে পথে একটি বাঁশবন ও আমবাগান পড়ে। সারা সকাল ওই রাস্তায় ট্রেকার দাপাদাপি করলেও সন্ধ্যা নামলেই ও পথে আর কেউ সচরাচর যাতায়াত করে না। ট্রেকার চলাচলও বন্ধ হয়ে যায় ছটার পর। আমবাগানের জায়গাটা রহস্যে ঘেরা। গ্রামের ছোট ছোট মুদীচাদোকানের জটলায় কান পাতলেই শোনা যায় নানান জাগতিক অতিজাগতিক গুজব। কেউ কেউ বলে ওই আমবাগান অভিশপ্ত। মাস তিনেক আগে একটা ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। লাশের মেয়েটির বয়স মেরেকেটে চোদ্দ। পুলিশ প্রমাণ অভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিলেও গ্রামের মানুষের মন তাতে ভরেনি। লাশে তখনও টাটকা পাটভাঙা স্কুলের নীলসাদা পোশাক। মুখে আঘাত চিহ্ন। অত্যাচারের চিহ্ন সারা দেহে। মেয়েটা মা মরা ছিল। বাপ কাজ করত কাঠের কারখানায়। একমাত্র মেয়েকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখেছিল। মেয়েটা মরে যাবার একসপ্তাহ কাটতে না কাটতেই বাপটা বিষ খেয়ে মরল। তারপর থেকেই আমবাগানে কারা যেন ঘোরাফেরা করছে আজকাল। কেউকেউ বলে অসামাজিক কাজকর্ম। কেউ বলে অতৃপ্ত আত্মা। এইসব ভাবনা নিয়ে অলোকানন্দাকে একলা ছাড়তে মন করল না সুকুমারীর।
-চল তোকে ঘরে ছেড়ে দে আসি।
-কী বলো সুকুমারী মাসি। তোমাকেও তো ফেরতে হবে। চিন্তা করো না। আমি ঠিক পৌছে যাব।
-মেলা বকিসনে তো। চল।
অন্ধকারে দুজনেই দুজনের হাত ধরে চলতে থাকে। কথা বললে আত্মারা ভয় পা। পা থপথপ করে পথে ফেললে সাপখোপ আসে না তেমন।
-কী হলো গো ওই বৌটার মাসি?
-কার?ওই সুলোচনা মাগীটার? নাম খানা কী বাহারে গো। কিন্তু যেমন দ্যাবা। তেমনি দেবী। বরটাকে তো তুই হাড়ে হাড়েই চিনিস।
-কে গো ওর বর?
-হা কপাল। তাও জানিস না। ওর বর রণজয় সেন। অবশ্য না চেনারই কথা। বরডা তো আসলে একটা জানোয়ার। বৌডাকে শিকল পরিয়ে রেখেছে যেন। ঘর থেকে বার হতেই পারে না।
-শিকল?
রণজয় সেনকে অলোকানন্দা পছন্দ করে না তেমন। কিন্তু তার বৌটার জন্য হঠাৎ মনের ভিতর মায়া বসছিল তার। কোথায় যেন একটা কোনও সূক্ষ্ম যোগাযোগ আছে। নামখানাও তো ভারি সুন্দর। তার নামের মতোই অমন সুন্দর নাম এই হাঘরে গ্রামেগেঞ্জ নেহাতই বেমানান। সুকুমারী কৌতূকে খিলখিল করে হেসে ওঠে।
-ওরে এ শিকল কি সে শিকল নাকি? পুরুষমানুষের শিকল হলো তার খোরপোষ। আর মাইয়া মানুষের তার সন্দেহ।
-রণজয় সেন ওকে খেতেপরতে দেয় না?
-দেয় বৈকী। কিন্তু শুধু খেতে দিলেই হলো। মেয়েমানুষের শরীর। আর কিছু চায় না বুঝি। একটু সোহাগ। একটু মিঠে কথাও ঘরের ভিতর জোটে না হতভাগীর।
-বলো কী!
আমবাগানের ভিতর ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভিতর সুকুমারী আর অলোকানন্দা একে অপরকে জাপটিয়ে ধরে ভয় ভুলতে চায়। হঠাৎ পায়ের কাছে কটকটিপোকা ডেকে ওঠে। পায়ের পাশে আলকুশিপাতা লেগে সামান্য কুটকুট করে ওঠে সুকুমারীর।
-গেল বছর ফিনাইল খেয়েছিল হতভাগীটা। রণজয় সেন খবরটা পাঁচকান না করলেও আমি জানি। আমার ডাক পড়েছিল ওর হাগামোতা পরিষ্কার করার জন্য।
-তারপর?
-তারপর আর কি? ও মেয়ের জান কৈমিছের জান।সহজে যাবেনি। বেঁচে গিয়ে এখন বোষ্টমী হয়ে ভুলে থাকতে চাইছে।
-কিন্তু কেন গো মাসি?
-ও রণজয় লোকটার থেকে দূরে থাকিস। লোকটার চরিত্র ভালো না। শহরে ওর মাগী ধরা আছে। গোকুলঘরিয়ার কেউকেউ বলে সে মাগীকে ফ্ল্যাট, গাড়ি কিনে দিয়েছে। একজোড়া যমজ মেয়েও নাকি আছে।
-কী বলো গো?
বুকের ভিতর ঢিবঢিব করতে থাকে অলোকানন্দার। আমাবাগান শেষ হয়ে যাবার পরেও যেন সে ভয় কাটতেই চায় না। লোকটার চাহনি ভালো না। হোক অরিন্দমের বন্ধু। সে নিজে একজন মেয়েমানুষ। সে বোঝে। খুব বোঝে। সুকুমারী বলে চলে।
-তাছাড়া কেউকেউ বলে ওই লোকটার নাকি মেয়েছেলের ব্যবসা আছে শহরে। কীসব ‘অ্যাপ ট্যাপ’ না কি যেন। মোবাইলে খুটখুট করবে আর মেয়েছেলে চলে আসবে তোমার বিছানায়। পুরো আলুকুমড়োর মতো।
মাথা ভনভন করছে তার। একবার কথায় কথায় বলেছিল বটে তাকে লোকটা। শহরে যাবার কথা। শহরে নাকি অনেক কাজ। ভাগ্গিস সে যায়নি। রাধামাধব বাঁচিয়ে দিয়েছে।
কথা বলতে বলতে ঘরের কাছাকাছি চলে এসেছে দুজনেই। রাস্তায় সোলার আলো জ্বলছে। কিন্তু অলোকানন্দার ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার। খুব ছোটবেলায় মাসিদের কাছে শুনতো সে। দাদু নাকি অমন শক্ত নাম দিয়ে বলেছিল,”দেখিস তোরা। ও মেয়ে শুধু নামের জোরেই সব অন্ধকার মিটিয়ে দেবে।”
-আমি বাকি পথ একা ফিরতে পারব মাসি। তুমি চিন্তা করো না।
ঘরে ঢুকে অলোকানন্দা দেখল অন্ধকার শাশুড়ির ঘর থেকে ‘ওঁ ওঁ’ আওয়াজ ভেসে আসছে। আহা। অন্ধকারে মানুষটা বাথরুম করে ফেলেছে। তারই ভুল। তবু যেন ভিতরটা কেমন খিটখিট করে উঠল তার। ঘরের আলোগুলো জ্বালাতে জ্বালাতে আপনমনে বিড়বিড় করতে করতে শাশুড়িকে মেঝে থেকে টেনে বিছানায় তুলল সে। তারপর ন্যাতা নেড়ে নেড়ে মেঝে পুছতে পুছতে ভাবতে লাগলো। ঘড়ি না দেখতে জিনলেও রাতের ঘনত্ব সে বোঝে। ট্রেনের আওয়াজে বোঝে শেষ ট্রেন যেতে আর মোটে দুই ভোঁ বাকি। এখনও ছেলেটা ঘরে ফিরল না। কীভাবে আগলে রাখবে সে ছেলেটাকে। চারপাশে রণজয় সেনের মতো লোক। তার বৌ সুলোচনা হতভাগী হলেও সেও কী কম? যদি কৃষ্ণ ওই কী যেন মোবাইল খুটখুটের পাল্লায় পড়ে! মেয়েছেলের অমন ছবি বাপের জন্মে সে কারোকে আঁকতে দেখেনি বাপু। ঘা ঘিনঘিন করে ওঠে তার। ছবির পাতায় কৃষ্ণেন্দুর করা স্কেচগুলো হঠাৎ মনে পড়ে গেল তার। মনে পড়তেই মনে হলো সেও কেন ওই বৌটার মতো মূর্চ্ছা গেল না।