অণুগল্পে পার্থপ্রতিম পাঁজা

বসন্ত এসে গেছে

মাথাটা গরম হয়ে গেল সোমলতার। এমন দৃশ্য দেখলে কার না মাথা গরম হয়? দোলের এখনো এক সপ্তাহ বাকি এখনই পুরো রং মেখে ভূত হয়ে ফিরছে মেয়ে! টিচাররাও কিচ্ছু বলে না!
ওটা একটা কোচিং সেন্টার নাকি বৃন্দাবন? রাগে গজগজ করতে থাকে সোমলতা।
যাকে কেন্দ্র করে এত কিছু সে কিন্তু নির্বিকার। যেন কিছুই হয়নি অথবা যা হয়েছে অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার।মেয়ে ঋতুর এই নির্লিপ্ত ভাবটা একেবারে অসহ্য লাগে সোমলতার। নিজেকে আর সামলাতে না পেরে এবার সে চিৎকার করে ওঠে–
–কী করতে যাওয়া হয় ওখানে, পড়াশোনার নাকি অন্য কিছু?
–তুমি যা করতে ওখানে পাঠিয়েছো তাই হয়।
–আমি তোকে এই রং মেখে সং সেজে আসার জন্যে ওখানে পাঠিয়েছিলাম?
— আরে কুল মাম্মি! দেখতে পাচ্ছ না? বসন্ত এসে গেছে!
সোমলতা এবার ভালো করে মেয়ের দিকে তাকায়। সিক্স থেকে মেয়ে সেভেনে উঠেছে। ইতিমধ্যেই ঋতুমতী হয়েছে সে। হঠাৎ করে অনেকটা লম্বাও হয়েছে । শরীরে একটু একটু করে যৌবন ফুটে ওঠার লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে। প্রতিদিনকার কাজের চাপে মেয়ের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখার ফুরসৎ-ই হয়নি তার। সত্যিই তো বসন্ত এসে গেছে…….
একটা কড়া কথা বলতে গিয়েও তাই কথাটা বুকের মধ্যেই আটকে গেল সোমলতার। এমন করে তারও তো একদিন বসন্ত এসেছিল। নারীত্বের সেই প্রথম উদ্বেগ, উত্তেজনা, ভালোলাগার স্রোতে সেও ভেসেছিল একদিন। এমনই এক বসন্তের দিনে ছাদের ঘরে তাকে একলা পেয়ে পিসতুতো দাদা রাজীব যখন জোর করে তার ঠোঁটে চুমু খেয়েছিল, দুটো শক্ত হাতের মুঠোয় আদর করেছিল তার স্ফুটমান দুই অগ্নি বলয়ে ভয় পেয়েছিল সে, লজ্জা পেয়েছিল কিন্তু সত্যি সত্যি কি তার ভালো লাগেনি, উন্মাদনায় শিহরিত হয়নি সে? অন্যের কাছে সে অন্য কথা, কিন্তু নিজেকে সে নিজের কাছে কি করে লুকাবে? তারপর সেই রাজীবদার সঙ্গেই…….
তাহলে? ঋতুকে এই অবস্থায় দেখে তার তো রাগ হওয়ার কথা নয়। তবু কেন সে রাগ করছে? নিজের মেয়ে বলে? নাকি এই বয়সটা পেরিয়ে এসেছে বলে?………
ঋতু মায়ের এই নিজের মনে বিড়বিড় করার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারে না। ঠাই দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে এক সময় বিরক্ত হয়ে তাই সে মাকে বলে–
— এবার কি আমি বাথরুমে যেতে পারি। দয়া করে অনুমতি দাও। আমাকে স্নান করতে হবে তো।
— চল, আজ আমি তোকে স্নান করিয়ে দেবো। ভালো করে সাবান মাখাবো তোকে।
— কী বলছো! আমি কি আগের মতো কচি খুকি নাকি?
— আরে চল না, না হয় আজ তোকে আমিই স্নান করিয়ে দিলাম।
— ধ্যাত, আমার লজ্জা করবে।
–মায়ের কাছে আবার লজ্জা কী? আগে কখনো করিস নি যেন।
–সে তো অনেক ছোটবেলায়, সে অন্য কথা, কিন্তু এখন….
— আরে চল।
মেয়ের হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নেয় সোমলতা। তারপর সারা গায়ের রং মাখা মেয়েকে হঠাৎ করে জড়িয়ে ধরে তার কপালে চকাম করে চুমু খায়।
অবাক হয়ে ঋতু মায়ের মুখের দিকে তাকায়। বলে–
— এটা কী হল?
কচি খুকির মতো হিহি করে হাসতে হাসতে সোমলতা বলে–
–বসন্ত এসে গেছে!

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।