সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ৩৪)

পদচিহ্ন

বলরামবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। ওর ঘরে, মশারীর নীচে, কম্বলটা পায়ের ওপর বিছিয়ে দেওয়া। প্রশ্নটা করা উচিত হলো কিনা ভাবছি। ওর দুচোখ ছলছল করে উঠছে। সামান্য কিছুক্ষণ পরেই যেন মুখের ওপর থেকে কুয়াশাটা কেটে গেলো।
—” দাদা, তোমাকে তো আমি সবকথাই বলি, কোনো কিছুই গোপন করি না, সেদিন আমার বুকের খাঁচাটা একদম ভেঙে গেছিলো গো। ছোট্ট ময়নার ওরকম অসহায় মুখ আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না। ওকে ফেরত নিয়ে আসার কথা ভাবা মাত্রই যিনি ওকে দত্তক নেবেন, তিনি এসে ময়নাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি ময়নার থুতনিতে আদর করে বলে উঠলেন — খুব ভালো মেয়ে। আর কী মিষ্টি তোমার নামটা! বলরামবাবু আমি তিনমাস সময় নিচ্ছি, এ সময়ের ভেতর যদি ময়না আমাদের মেনে নিতে না পারে, তাহলে কথা দিলাম, আপনি এসে ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।
কি বলবো দাদা, সাথে সাথেই আমার চিন্তা বদলে গেলো। আমি বুঝলাম, আমার কাছে থেকে ময়না যতোটুকু ভালো থাকবে, খাবে, পড়বে – তার চাইতে এখানে ও অনেক ভালো থাকবে। আমি ঘাড় নেড়ে, আর পেছনে না ফিরে বাড়ি ফিরে এলাম।”

কিছুক্ষণের বিরতি। এরপর আমার সেই অমোঘ প্রশ্নটা করে বসি।
— আচ্ছা দাদা, আপনার কি একবারের জন্যও মনে হয় না যে, — আমার অবর্তমানে আমার তৈরী এই সাম্রাজ্যের কি হবে?

–” সত্যি কথা বলতে কি, মনে যে একেবারেই হয় না সেটা না। হয় বৈকি। তবে সেসময় আমার মন আমাকে বলে ওঠে — মৃত্যুর পর কি হবে সেটা কি তুই আর ফিরে দেখতে আসবি? জীবিত থাকাকালীন যেটুকু পারবি করে যা।
তবে আমি নিশ্চিত জানি আমি যাদের তৈরী করে দিয়ে গেলাম, তাদের ক্ষমতা আমার থেকে এতোটুকুও কম না। ময়না – শুভাশিস, চায়না – মনোজ, মণিকরণ ছাড়াও বুদ্ধদেব জানা, সুকুমার, বাসুদেব এরা কেউ কারো থেকে কম কিছু না। ময়না যেরকমভাবে সংগঠক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলছে, শুভাশিস – মনোজ সেরকমভাবেই অফিসের দিকটাতে দিকপাল। চায়নাকে দেখুন কী সুন্দর বাচ্চাগুলোকে বুকে আগলে রাখে! মণিকরণও কারো থেকে কম যায় না। কি অদ্ভুত দক্ষতায় কাজ করে যায় সারাটাদিন! অতবড় রান্নাঘরের খুঁটিনাটি ছাড়াও সবদিকে কি আশ্চর্য খেয়াল রাখে! আর বুদ্ধদেব মাস্টার আর সুকুমার সামন্ত যেন দুই দিকপাল। বুক দিয়ে আগলে রেখেছে সবকিছু।
সত্যি বলতে কি, আমি নিশ্চন্ত। আর এখন থেকে ঠিক করেছি প্রতি মাসে বেশ কয়েকদিন করে মোবাইল ফোন অফ করে ডুব দেবো। আমার ওপর থেকে ওদের সমস্তরকম নির্ভরতার সুতোটুকু কাটিয়ে দেবো।

আমি চুপ করে শুনছি একজন দক্ষ সংগঠকের চিন্তাভাবনা। এমন সময়ে দরোজায় ক্যাচ করে শব্দ হলো। দরজার বাইরে একটা মুখ। বলরামবাবুর মেজো জামাই মনোজের মুখ।
— বাবা, সুপারটোনের ফাইলটা রেডি হয়ে গেছে, ওটা কি আপনি একটু দেখে দেবেন?

ঘরের ভেতরে পা রাখলো মনোজ।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।