অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ২০)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

চলো, একবার যাই জলস্রোতের কাছাকাছি‌,
আসছে যে ঋতুরাজ আকাশ-মাটির গানে,প্রাণে ;
যে আলো তোমার মুখে চৈত্র অবসানে নামে ধীরে ,
না ফোটা পলাশ কুঁড়ি আমাদের মর্মবাণী জানে।

সাংবাদিক অমলেন্দু স্যারকে আজ যেন কথায় পেয়েছে। কাঁসাই নদীর ধারে ,শহরের কাছেই ,জায়গাটা যদিও নির্জন নয় , তবুও একটা অদ্ভুত ও অনর্গল শান্ততা চৈত্রের ঘূর্ণিধুলোকে যেন কাছে ডেকে নিচ্ছে । মুখোমুখি উন্মনা ও অমলেন্দু , মুখোমুখি পুরুষ ও প্রকৃতি, যেন পাশাপাশি মিছিল ও স্লোগান । অমলেন্দু বলছে জীবনের কথা ,কবিতার কথা , যেন মৃত্তিকার অনু পরমাণু ভেঙে ভেঙে মৃত্তিকার গভীরে চলে যাওয়া। সেখানে কোনো বাড়তি প্রশ্রয় ও আলগা ,বা তির্যক কথার ধার বা ভাঁজ নেই। নদী কংসাবতী আপন মনে বয়ে চলেছে। যেমন করে দেবী চৌধুরানীর তিস্তা বয়ে চলে। যেমন বয়ে চলে বিভূতিভূষণের ইছামতী,মাণিক বন্দোপাধ্যায়ের নদী পদ্মা, তারাশঙ্করের কোপাই নদী। নদী যেমন মানবসভ্যতা স্পর্শ করতে করতে পৌঁছে যায় সাগরের কাছে , সাংবাদিক অমলেন্দুও আজ কবিতার অমলেন্দু হয়ে যেন এক কবিতার মানবীকে খুঁজে চলেছে । গভীরতারও গভীরে ডুবে যেতে যেতে উন্মনা ওই মানুষটাকে বোঝবার চেষ্টা করছে । তবু তার সংসারী মন তাকে ভাবতে বাধ্য করছে যে ,জীবন থাকলে খিদেও থাকে। বেলা প্রায় দুটো । কিন্তু কথাশিল্পের আনন্দে ভেসে যাওয়া মানুষটির সেদিকে যেন ভ্রুক্ষেপ নেই । মানুষটা তার সাংবাদিক জীবনে যতটা সংযত ও নির্লিপ্ত , এখন এই কবিতার জীবনের ডাকে ততটাই উচ্ছ্বসিত। জানেন উন্মনা , একদিন কবিতাই হবে মানবধর্ম । মানুষ লালন-রবি-নজরুলকে প্রাণের অতল প্রাণে ,গানের গভীরতম গানে রেখে দেবে প্রতিদিনের প্রাণিত জীবনচর্চায় । যদি আপনাদের মতো কবিতা লিখতে পারতাম ,তাহলে হয়তো এই কথাগুলো আরও সুন্দর করে বলতে পারতাম। উন্মনা খুব লজ্জা পেয়ে প্রায় মাটির কাছে মিশে বললো–আমি আবার কবি হলাম কবে ? দুচার লাইন পদ্য লিখলেই কি কবি হওয়া যায় ? কিন্তু আপনি কবির অন্তরে কবি।আপনি কবিতা লিখতে পারেন না এটা আমি মানতে পারলাম না । যেটা সত্যি সেটা হল–আপনি কবিতা লেখেন না । অথচ কবিতা সাহিত্যকে কাঁধে নিয়ে চলবার হারকিউলিয়ান টাস্ক বাংলা ভাষা জননীর কাছ থেকে নিজেই যেচে নিয়েছেন। আপনি তো কর্মশালা থেকে কর্মশালায় , লোকালয় থেকে শালজঙ্গলে , একদিন প্রতিদিন থেকে ছয়ঋতু বারোমাসে ফুলের রেণুর মতো সেই কবিতার কুঁড়ি বিলিয়ে দিচ্ছেন নতুন প্রজন্মের কাছে। সরি স্যার ,কবির অন্তরে কবি কথাটা রবীন্দ্রনাথ থেকে নিয়েছি। বলাকা কাব্যগ্রন্থের কবিতা — ছবি।
লাজুক অমলেন্দু কথাগুলো শুনে বিস্মিত তাকিয়ে থাকলো উন্মনার দিকে। ওর কন্ঠ , আপন মনেই গেয়ে উঠলো–
তুমি কি কেবলই ছবি , শুধু পটে লিখা ?
ওই – যে সুদূর নীহারিকা
যারা করে আছে ভিড়
আকাশের নীড় ,
ওই যারা দিনরাত্রি
আলো- হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী
গ্রহ তারা রবি ,
তুমি কি তাদের মতো সত্য নও ?
হায় ছবি , তুমি শুধু ছবি ? ‌
জীবনের চলার পথে মাঝে মাঝে শুধু চুপ করে বসে থাকাও যে কত সুন্দর,উন্মনা উপলব্ধি করলো নতুন করে।একটা ঘাসের ডগা অমলেন্দুর দিকে বাড়িয়ে বললো– স্যার , আপনি কখনও ঘাসের ডগা চিবিয়েছেন ? আবার অমলেন্দুর লাজুক হাসি চৈত্র দুপুরকে দীর্ঘায়িত করলো–গ্রামের ছেলে,ফুটবল খেলতে গিয়ে ল্যাং খেয়ে দড়াম করে পড়ে গিয়ে নাক ঘসে যেত মাঠের ঘাসে। কাজেই ঘাসের গন্ধ আমাদের শৈশব থেকে শেষ যাত্রা পর্যন্ত থেকে যাবে। হঠাৎ যেন চমকে উঠে ব্যস্ত অমলেন্দু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো–আচ্ছা আপনার খিদে লাগছে না ? আমার তো পেট চুঁই চুঁই করছে। পিছনে একটা চায়ের দোকান আছে, চলুন যাওয়া যাক। এবার উন্মনা রাধাচূড়ার পাপড়ি হয়ে হেসে উঠলো — সংসার করেননি তো,তাই জানেন না , মেয়েরা যেখানেই যায় , তাদের ব্যাগের মধ্যে সংসারের ইত্যাদি-প্রভৃতি বয়ে নিয়ে যায়। কোত্থাও যেতে হবে না। এইখানে চুপ করে বসুন। দেখুন আমার মা কি কি পাঠিয়ে দিয়েছেন। অবাক অমলেন্দুর চোখের সামনে উন্মনার ঝুলি থেকে বেরোলো লুচি, আলুভাজা, কর্পূর ও এলাচের গন্ধ জড়ানো নারকেল নাড়ু‌ ,আর মায়ের হাতে তৈরি মুগপুলি ও পাটিসাপটা। একটা মাঝারি বোতলে জল পর্যন্ত বয়ে এনেছে উন্মনা।
— আপনার মা জানেন , আপনি ইউনিভার্সিটিতে এসে আমারে সঙ্গে দেখা করবেন? উন্মনা চুড়িভাঙা শব্দের মতো হেসে উঠলো– ও মা ,জানবেনা কেন ? মা জানে,মেয়েও জানে। আমি যখন তৈরি হচ্ছিলাম,ওরাই তো সব পরিপাটি করে গুছিয়ে দিয়েছে।
সাধারণ ও প্রতিদিনের খাবার ,অথচ পরিবেশনের গুণে আর নিবেদনের নম্রতায় যেন পথ চলার সুগন্ধ হয়ে নেমে এলো । পরম তৃপ্তিতে খেতে খেতে , তারপর খাওয়া শেষে টিস্যু পেপারে হাত মুছতে মুছতে বলা অমলেন্দুর কথাগুলো শুনতে শুনতে উন্মনার মনে হলো — মানুষটা প্রতিমুহূর্তের জীবনযাপনের মধ্যে ঢুকে থাকেন । এলাচের গন্ধ, নারকেল পুরের সৌরভ ,লুচি আলুভাজার পরম তৃপ্তি — সব কিছুকেই তিনি খুব সুন্দর করে প্রকাশ করতে পারেন ,অথচ কথাকে জড়োয়ার গয়নার মতো করে নিবেদেন করবার কোনো প্রয়াস তার মধ্যে নেই। এই আপাত শান্ত মানুষটি যেন ক্রমশ অপরাহ্নের ছায়া হয়ে নেমে আসছে তার মাঝবয়সী, প্রায় স্তব্ধ হয়ে যাওয়া জীবনে। চৈত্রের ঝরাপাতা ও হঠাৎ হাওয়ার ঘূর্ণিধুলো যেন বসে বসে ওদের গল্প শুনলো। ওরা দুজন কত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা ভাবলো , প্রকাশ করলো । প্রলয় , শুভব্রত, জঙ্গলমহলের ডাক্তারবাবু , হেডমাস্টারমশাই , আর , নতুন কবিদের নিয়ে একটা সংগঠন গড়ে তুলতে হবে , যে সংগঠনের মাথায় থাকবে প্রলয়, শুভব্রত আর উন্মনা। নিজেকে ‘বুড়ো’ বলা মানুষ অমলেন্দু,কবিতার অমলেন্দু থাকবে ওদের ঘিরে।উন্মনা নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করলো , একটা মানুষের চাওয়া ও আকাঙ্খা যদি সীমিত হয়,তাহলে তার সুখের ঘরের চাবি‌ লোপাট করবার ক্ষমতা স্বয়ং ঈশ্বরেরও নেই। অমলেন্দু স্যার ঠিক সেই জাতের মানুষ ! আহা ! এত অল্পে মানুষ এত খুশি হতে পারে ! আর ,অমলেন্দু অনুভব করলো — বিশ্বকবি যেন উন্মনার জন্যেই লিখেছিলেন সেই গান–আমি তোমারই মাটির কন্যা ,জননী বসুন্ধরা…
বেলা পড়ে আসছে দেখে উন্মনা হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলো–স্যার, আমার লেখা কবিতাটা নিয়ে কিছু বলবেন না ? অমলেন্দু ওর চোখে চোখ রেখে বললো–কি বলবো বলুন তো ! আপনার ছন্দ জ্ঞান আর শব্দ নির্বাচন আমাকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু যদি অভিভাবক হিসেবে মান্যতা দেন,তাহলে বলি– ছন্দে কবিতা লেখা একটা নেশার মতো । ক্রমশ তা আপনাকে গ্রাস করবে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও ছন্দ থেকে বেরিয়ে এসে ছন্দের মুক্তি ঘোষণা করেছিলেন। মুক্ত ছন্দ , গদ্য ছন্দ এবং গদ্য কবিতায় সেই মুক্তির উদাহরণ আছে । কবিতার ছন্দ খুব স্বাভাবিকভাবেই আসে‌। তা আসুক। কিন্তু সেখান থেকে আপনাকে বেরোতে হবে‌। বিষয়ের গভীরে ঢুকে বাস্তবের মধ্যে যে পরাবাস্তবতা ,তাকে আবিষ্কার করতে হবে।আর তখনই আপনি মাটির পুতুল আর ভাস্কর্যের পার্থক্যটা নিজেই বুঝতে পারবেন। শব্দের প্রতিমাকে অনেক অলঙ্কার দিয়ে সাজানোর কোনো দরকার নেই । তাকে আটপৌরে করে সাজান। দেখবেন , অযত্নে বেড়ে ওঠা বাগানবিলাস অথবা মাধবীলতার মতো হেসে উঠবে। আপনি সুভাষ মুখার্জী,শঙ্খ ঘোষ , নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, তারাপদ রায় , শক্তি চট্টোপাধ্যায়,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়–এঁদের কবিতা খুব ভালো করে স্টাডি করুন। চলুন , আপনার ফিরতে দেরি হয়ে যাবে । মেদিনীপুর স্টেশনে গিয়ে পরপর দু’বার ভাঁড়ের চা খেয়ে আপনাকে ট্রেনে তুলে দেবো । উন্মনা অবাক হল ।
–আপনি কিভাবে ফিরবেন ?
–আমি আজকের রাতটা এখানেই থেকে যাবো । ইউনিভার্সিটির কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দেবো অনেক রাত পর্যন্ত । তারপর কাল সকালের বাসে বেলপাহাড়ির দিকে যেতে হবে সাংবাদিকতার রুটিরুজির কারণে। সন্ধেবেলায় বাড়ি ফেরার আগে , আমাদের বাজারের চায়ের দোকানে বসে পাগলা বিন্দাসের গান শুনবো।
ট্রেন ছেড়ে দেবার পরে , উন্মনা নিজের দশটা আঙুলের দিকে তাকিয়ে,কী জানি, হঠাৎ ভাবলো– স্টেশনের গেটের সামনে অমলেন্দুর হাতের সাথে তার কোন আঙুলগুলো ছুঁয়ে গেছিলো ? অমলেন্দু সরি বললেও ওর মনে হয়েছিল–
সরি বলার চাইতে অমলেন্দু যদি ওর হাতটা একটু ধরতো, তবে খুব ভালো লাগতো।কোনো পুরুষের সুভদ্র ব্যক্তিত্ব যে এত আকর্ষণীয় হতে পারে , উন্মনার অগোছালো নারীজন্ম আগে জানতো ?

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।