গল্পেরা জোনাকি তে রীতা পাল (ছোট গল্প সিরিজ)

বাস্তুভিটা
মুঠোফোনটা বেজে উঠতেই হেমাঙ্গিনীর চোখ দুটো আনন্দে চিকচিক করে উঠলো। অপর দিক থেকে ভেসে এলো আতর এর গলা-‘ মা,এবার দূর্গাপূজায় বাড়ি যাবো। মিঠাই বায়না ধরেছে এবার ও কলকাতাতেই পুজো দেখবে। অনেক কষ্টে ছুটি ম্যানেজ করেছি। আর তোমার সাথেও কিছু দরকারী কথা আছে। এবার কিন্তু আমাদের সাথে তোমাকে আসতে হবে।’
ছেদ পড়ল ইথার তরঙ্গে। ফোনটা রেখেই ছাদে চলে গেলেন হেমাঙ্গিনী। নিজের হাতে করা বাগান যেন আনন্দে খিলখিল করে হাসছে। গোলাপ,বেল,জুঁই,জবা—-। মাধবীলতার কাছে গেলেই আতরের বাবার কথা মনে পড়ে যায়। নিচতলায় গেটের পাশে লাগিয়েছিলো। কত যত্ন করে গাছটাকে ছাদে তুলেছিলো। ফুলে ফুলে ভরে আছে গাছটা। শুধু সেই মানুষটা নেই। ক’দিনের জ্বরেই সব শেষ হয়ে গেছিল। মাধবীলতার কাছে আসলেই হেমাঙ্গিনীর চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। বড্ড মনে পড়ে কাছের মানুষটাকে। আবার রাগও হয় এইভাবে ফাঁকি দিয়ে চলে যাবার জন্য। ফুলগুলোর শরীর থেকে একটা অন্যরকম গন্ধ ভেসে আসে যা হেমাঙ্গিনীকে পরম তৃপ্তি দেয়।
শরতের আকাশে সাদা পালকের মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। একেই বোধহয় বলে পরবাসী মেঘ। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। গাছে জল দিয়ে নিচে নেমে এলেন।
সল্টলেকের এই ব্লকের পুজো বেশ পুরনো। পূজার সাজে সেজে উঠেছে পাড়া। মহালয়ার আগের দিন কতগুলো ছেলে লাইট লাগাতে এসে বলল,“ মাসিমা আপনি তো একাই থাকেন। দিদি তো বিদেশে। বাড়িটা ফ্লাট করে নিন। আপনার কিছুই লাগবে না। উপরন্তু একটা ফ্ল্যাট ও নগদ কিছু টাকা পেয়ে যাবেন। আপনি রাজি থাকলে দাদার সাথে কথা বলবো।”
“ না বাবা,তেমন কিছু হলে আমি নিজেই কথা বলে নেব। তোমাদের কাজ হয়ে গেলে পরশকে বলো ও দরজাটা বন্ধ করে দেবে।”
পরেশ এই বাড়ির ড্রাইভারের ছেলে। ছোট্ট থেকেই এই বাড়িতে যাতায়াত করে। হেমাঙ্গিনীকে জেঠিমা বলে। খুব বাধ্য ছেলে। হেমাঙ্গিনীও ওকে খুব স্নেহ করে। কষ্ট করে গ্র্যাজুয়েট কমপ্লিট করেছে পরেশ। বাবার কথামতো সকালে এসে জেঠিমার বাজারহাট করে দিয়ে যায়। ওর বাবা অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই গাড়িটা ও চালায়। তাই হেমাঙ্গিনী ওর উপর খুব ভরসা করে।
হেমাঙ্গিনীর বরাবরের অভ্যাস খুব ভোরে ওঠা। আজ আরো তাড়াতাড়ি উঠলেন। রেডিওর নব ঘোরাতেই বেজে উঠল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ। চোখের সামনে ভেসে উঠলো ছোটবেলার কত স্মৃতি। ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে হেমাঙ্গিনী। পূর্ব বর্ধমানের বেহুলা নদীর ধারে ছিল ওদের বসতবাড়ি। মহালয়ার ভোরে বাবা,জ্যাঠা,কাকা সবাই মিলে যেতেন তর্পণ করতে। বাবা যাবার সময় বলতেন,‘ মা হেম, পুজোর ফুলটা তুলে রাখিস।’ বাড়ির পেছনে একটা শিউলি গাছ ছিল। রাত থেকেই শিউলি ফুলের গন্ধে বাতাস আকুল হয়ে উঠত। হেম এক একটা একটা করে শিউলি ফুল তুলে সাজি ভরে রাখত। শুধুই কি শিউলি! কত রকমের জবা, অলকানন্দা,কল্কে আরো অনেক ফুল। বাবা ফিরে এসে ঘরে পুজোয় বসতেন। নারায়ণ শিলাকে খেতে না দিয়ে কখনই জল স্পর্শ করতেন না। দু’বেলা গায়ত্রী মন্ত্র জপ করতেন। খুব সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ ছিলেন। মহালয়ার দিন খুব বাবার কথা মনে পড়ে। কাছের মানুষগুলো একে একে সব চলে গেছেন। শেষে আতরের বাবাও চলে গেল। নিজে ইঞ্জিনিয়ার ছিল। দাঁড়িয়ে থেকে বাড়িটা তৈরি করেছিল। খুব শখের বাড়ি ছিল ওর। নার্সিংহোম থাকার সময় বারবার বলেছিল-‘ আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো।’ মানুষটা আর বাড়ি ফিরতে পারলো না। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। সব শোকেই একদিন পলি জমে। তবুও মাঝে মাঝে ভেজা স্মৃতিগুলো চোখে আর্দ্রতা এনে দেয়।
আজ চতুর্থী। সকাল থেকে কাজের মেয়ে ঝুনিকে দিয়ে ঘরদোর সব পরিষ্কার করে রেখেছে। পরেশ সঠিক সময়ে এয়ারপোর্টে চলে গেছে আতরদের আনতে। হেমাঙ্গিনী আজ নিজের হাতে রান্না করেছে। রান্নার দিদি হেমাঙ্গিনীকে সাহায্য করেছে। গেট খোলার শব্দ হতেই হেমাঙ্গিনী রাস্তার দিকে ঝুল বারান্দায় বেরিয়ে এলো। গেট থেকেই মিঠাই ‘দিদুন’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো। হেমাঙ্গিনী তাড়াতাড়ি কাপড়টা ঠিক করে একতলায় নেমে এলো। মিঠাই এসেই হেমাঙ্গিনীকে জড়িয়ে ধরল। “ দিদুন,এবার কিন্তু তোমাকে আর ছাড়ছি না। যাবার সময় তোমাকেও নিয়ে যাব।”
“ সে হবে খন্। এখন যা দেখি,ফ্রেশ হয়ে নে। তোর পছন্দের গরম গরম লুচি আর সাদা আলুর চচ্চড়ি করেছি। খাবি চল।”
আতর মাকে প্রণাম করলো। রনি ব্যাগ নিয়ে দোতলার ঘরে গেল। বাকি জিনিসপত্র পরেশ দোতালার ঘরে তুলে দিয়ে এলো। হেমাঙ্গিনী পরশকে বললো,খেয়ে যেতে। আর পুজোর ক’দিন যেন রোজ সকালে আসে।
পরেশ ঘাড় নেড়ে চলে গেল।
পঞ্চমী থেকেই শুরু হয়ে গেল মিঠাইয়ের দুর্গাপূজা দেখা। আঠারো বছরে কোন দিন দুর্গাপূজার সময় দিদুন এর কাছে আসতে পারেনি। তাই এবার সবটা পুষিয়ে নিচ্ছে। পরেশকে নিয়ে মিঠাই একাই বেরিয়ে পড়ছে। প্রথম শুরু করেছে উত্তর কলকাতার বাগবাজারের পুজো দিয়ে। এটা প্রায় একশ বছরের পুরনো পুজো। ওখান থেকে কুমারটুলি,বড় বাজারে এভাবেই চলতে থাকে। কখনো বাবা-মা সাথে থাকে আবার কখনো সাথে থাকে না। কলেজে স্কোয়ার,মোহাম্মদ আলী পার্ক,সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার, সুরুচি সংঘ,একডালিয়া এভারগ্রীন,মোটামুটি সব বিখ্যাত পুজোগুলোই দেখেছে। বিদেশে বন্ধুদের ছবি পাঠাচ্ছে। এই নিয়েই মেতে আছে। মাঝে মাঝে ফেবুতে লাইভ করছে ।সঙ্গে পরেশকে পেয়ে ওর বেশ মজাতেই দিন কাটছে ।
“নবমীর নিশি এল অশ্রু নিয়ে চোখে,বিজয়াতে ফিরবে যে মা কাঁদে সকল লোকে।”
মিঠাই এর মন খারাপ হয়ে গেল। এত বছর পর,এত দিন ছুটি। খুব মজা করেছে, আজ ক্লান্ত হয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে। রাতে হেমাঙ্গিনীর ঘরে আতর আর রনি এল। হেমাঙ্গিনী বললেন,“বল কি বলবি?”
আতর বলল,” মা,তোমার বয়স হয়েছে। কখন কি হয় তার ঠিক নেই। আমাদের এখানে ফেরার চান্স খুব কম। তুমি এখানের সব বিক্রি করে আমার কাছে চলো। ওখানে আমরা আছি তোমার কোন অসুবিধা হবে না। তাছাড়া এই দেশে কি আছে বলতো? স্বাস্থ্যের যা পরিকাঠামো! হসপিটালগুলো দেখলে তো গা গুলিয়ে ওঠে। শুধু কিছু ওভারব্রিজ হয়েছে। বাদবাকি উন্নয়ন তো দেখতেই পাচ্ছি। আমেরিকায় চলো দেখবে,দেশ কাকে বলে! সুসজ্জিত একটা শহর। কি নেই হাতের সামনে! যা চাইবে তাই পাবে। তোমার কোন অসুবিধে হবে না মা। আমাদের সাথে চলো।”
“ তোরা তো এখন ক’দিন আছিস। আমাকে ক’দিন ভাববার সময় দে। তারপর জানাবো। এখন যা ক’দিন খুব ঘোরাঘুরি করেছিস, ঘুমাতে যা।”
ব্লকের প্রতিমা যেদিন বিসর্জন হয় সেদিনই হয় বিজয়ার উৎসব। পাড়ার অনেকেই হেমাঙ্গিনীকে প্রণাম করতে এল। সবার শেষে এলো এলাকার বিখ্যাত প্রোমোটার। এসেই হেমাঙ্গিনীকে হাত জোড় করে প্রণাম করলো। সঙ্গে চেলা চামুন্ডারা ঠক্ ঠক্ করে প্রণাম করে নিল। হেমাঙ্গিনী সবাইকে বসতে বলল। ওপর থেকে রনি আর আতর নেমে এলো। রনিকে দেখেই প্রোমোটার, “আসুন দাদা,আপনাকে খুঁজছিলাম।” হেমাঙ্গিনী আড়চোখে ওদের দেখে নিল। আতর আর রনি এসে ওদের পাশে বসে কথাবার্তা শুরু করল। ওদের কথাবাত্রা শুনে হেমাঙ্গিনী বুঝে গেল ওদের সাথে আগেই কথাবার্তা হয়েছে। হেমাঙ্গিনী ঝুনিকে দিয়ে সবাইকে মিষ্টি দিলেন। প্রোমোটার মিস্টার বাজোরিয়া বললেন,“ তাহলে রনিবাবু পাকা কথাটা এখানেই হয়ে যাক। ”
রনি চুপ করে রইলো।
আতর বলল,“ আমার তো মা’র সাথে কথা হয়ে গেছে। ফাইনাল ক’দিন পরেই জানিয়ে দেবে। ” হেমাঙ্গিনী কারো সাথে কোন কথা না বলে নিজের ঘরে গিয়ে দোর দিলেন।
প্রচন্ড জলতেষ্টায় হেমাঙ্গিনীর গলা শুকিয়ে গেল। খাটের সামনে জলের বোতল রাখা থাকে। আজ তো নেই– তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। ঘরের কোথাও জল নেই। দরজা খুলতেই দেখলেন বাড়ির সদর দরজা হাট করে খোলা। তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলেন। সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে বাইরের গেটের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন। মাধবীলতা গাছের গোড়ায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে বাস্তুসাপটা। অনেকবার সাপটাকে গ্যারেজের কাছে দেখেছে। আতরের বাবা বলেছিল এটা বাস্তুশাপ। কখনো ক্ষতি করে না,একে কখনো মেরো না।
তবে কে মারলো ? কেইবা সকালে সব গেট খুলে দিল? সাপটার কাছে যেতেই আর একটা কালো সাপ ফণা তুলে তাড়া করল—-
হেমাঙ্গিনী কোনরকমে দৌড় আরম্ভ করল, এই সাপটাকে সে আগে কখনো দেখেনি। হেমাঙ্গিনী দৌড়চ্ছে,সাপটাও পিছু ছাড়ছে না। হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। ঠিক তখনই ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘেমে স্নান করে গেছে।
গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। পাশের টেবিল থেকে জল নিয়ে খেলো। সবে ভোর হয়েছে। ঠাকুর বিসর্জন দিয়ে সবাই বাড়ি ফিরছে। ঢাকের আওয়াজ এ ব্যথার সুর – –
সকালবেলা চায়ের টেবিলে মেয়ে, জামাই, নাতনিকে ডাকলেন। হেমাঙ্গিনী চা খেতে খেতে আতরকে বললেন, “ এই দেশে আমার শৈশব কেটেছে। বার্ধক্যটা আমি এখানেই কাটাবো। এই মাটিতে জড়িয়ে আছে আমার যৌবনের সব দিন। এই মাটি ছেড়ে আমি কোথাও থাকতে পারবো না রে । এই বাড়ির প্রতিটা ইট,প্রত্যেকটা জিনিসে তোর বাবার ছোঁয়া আছে। বাকি জীবনটা আমি এদের সাথে কাটাবো। আমার মৃত্যুর পর তোরা যা খুশি করিস। আমি আবার বাস্তুভিটে ছেড়ে কোথাও যাবো না।”
মিঠাই আনন্দে হাততালি দিয়ে বলে উঠল,“ আমার গ্রেট দিদুন। আমি পড়াশোনা শেষ করেই তোমার কাছে চলে আসব। আই লাভ ইন্ডিয়া। এটাই আমার জন্মভূমি। আমি এখানেই ফিরব দিদুন।”