সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ১০)

ক্ষণিক বসন্ত
পূরবী
বিভাস রাউত বেরিয়ে যাবার পর খানিকক্ষণ মাথা গুঁজে বসে রইল পূরবী। আজ তাকে নিয়ে কাগজের নৌকোর মতো উল্টেপাল্টে খেলেছে বিভাস।সেসব তার গা সওয়া হয়ে গেছে।আজকাল ভালোই লাগে। অনেককিছু সুযোগসুবিধা পিবার লগ্নি মনে হয়। কিন্তু ওই চারুকেশী নামের ছোকরিটাকে নিয়ে মানুষটা হঠাৎ এমন সেন্টিমেন্টাল হয়ে যাবে সে ভাবেনি। তার চেয়েও বড় বিষয় হল, ব্যারাকপুরের গানের বারের কথাটা বিভাস জানল কী করে। তাহলে কি তারই আড়ালে লোকটা টিকটিকি পুষছে। ভাবতে ভাবতে তাল ঠেকার মতো মিলিয়ে নিচ্ছিল সেসব। শরীরের ভিতর একটা ভয়ানক জ্বালা করছে আজ। ঘরে ফিরে চান করতে হবে। মাথাটা পরিষ্কার করতে একটা সিগারেট ধরালো পূরবী। মনের ভিতর বেজে ওঠে বোল। ঘেরে নাগ ঘেরে নাগ তেরে। নাক তেরে ঘেরে ঘেরে নাগ। পার্স চশমা গুছিয়ে পাব থেকে বেরিয়ে গেল পূরবী। বাইরে এসেই মুলতানভাইকে ফোন করল সে। ভাই সব মন দিয়ে শুনল। এই মুলতান লোকটাকে পূরবী শ্রদ্ধা করে খুব। আজ পর্যন্ত কখনও সে তার গায়ে হাত দেয়নি। কিন্তু ধান্দার ব্যাপারে সে খুব পেশাদার। মন দিয়ে পূরবীর কথা শুনে গেল সে। তারপর বলল।
-আপ ওঁয়াহা সে নিকাল যাও।কুছ দিন ঘর সে মত নিকালনা। কলেজ মাত জানা। বাকি হাম দেখ লেঙ্গে।
কী দেখে নেবে ভাই কে জানে!পূরবী পানিহাটির দিকের অটো ধরল। মাইকে কোনও অষ্টপ্রহর চলছিল। এতক্ষণ সেখানে সংকীর্তন শোনা যাচ্ছিল। এখন কী যেন গোলোযোগ বেঁধেছে। পূরবী সেদিকে মাথা না ঘামিয়ে কলকাতার দিকের বাস ধরল।মুলতানভাই বলেছে আপাতত কিছুদিন বাইরে না আসতে। আত্মগোপন করে থাকতে। কী হবে কে জানে! আঙুলের কড় গুণতে থাকে সে। তার ঘর সিঁথির মোড়ের কাছে। সেখানে রুগ্ন মা একা থাকে। ওষুধের খরচ কম নয়। সেইসব উঠে যায় এই বিজনেসে। নিজেকে চামড়ায় মোড়া বাদ্যযন্ত্র মনে হয় তার। কখনও তবলা। কখনও পাখোয়াজ। কখনও মৃদঙ্গ, ঢোল, নাল। যেমন বাজাবে তেমনি বাজবে। ধা ধিন গদি গন কৎতে তেটে কেটে ধিনা। যখন যেমন তেমন। ভাবতে ভাবতে বাড়ির সামনে বাস থেকে নেমে পড়ল পূরবী।
সদর দরজার চাবি তার কাছেই থাকে। এতে সুবিধা একটাই। মাকে বাতের কষ্ট নিয়ে ঘরের দরজা অবধি উঠতে হয় না। একবার মায়ের ঘরে উঁকি দিয়ে নিজের অন্ধকার ঘরে ঢুকে খাটের ওপর বসে পড়ল পূরবী। মা ঘুমোচ্ছে। পূরবীদের বাড়ির বয়স নয় নয় করেও দেড়শো বছর। শরিকী কোন্দল একা হাতে বহু বছর সামলেছেন তার বাবা। কিন্তু ভাঙন রোখা যায়নি। শেষমেষ এই এক চিলতে বারান্দা আর দুটি ঘর বরাদ্দ হয়েছে তাদের জন্য। যদিও ঘরের অবস্থা ভালো নয়। ছাদ থেকে যে কোনও মুহূর্তে চাঙর খসে পড়তে পারে। সুযোগ পেলেই মধ্যমগ্রাম বা সোদপুরের দিকে মাকে নিয়ে ফ্ল্যাট কিনে চলে যেতে চায় পূরবী। সেই টাকার খানিকটা এই ভগ্নস্তুপ বেচে, আর খানিকটা মুলতানভাইয়ের কাছ থেকে জোগাড় করবে সে। বাবা হয়তো এই চাপ সহ্য না করতে পেরেই মদ ধরেছিল। এরপর মদ তার বাবাকে ধরল। লিভার পচে মরে গেল বেমালুম। মাত্র পঁয়তাল্লিশে।
সংসারের হাল সে ধরে থাকলেও তার সঙ্গে তার মায়ের কিন্তু তেমন বনিবনা নেই। খাটে পোশাক বদলে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইল পূরবী। অজস্র বোলতান সেখানে অহরহ খেলা করছিল। নিজের অজান্তেই সে তার বাঁ হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল পাশের টেবিলে রাখা ধুলোয় স্নান করতে থাকা তবলার ডাঁয়াটি।এই তবলা একসময় তার বাবা কতো বাজিয়েছে। তারপর উত্তরাধিকারে সেইসব কাল, ক্রিয়া, অঙ্গ, গ্রহ, জাতি, লয় ভর করেছে তার শরীরে। ডাঁয়ার গাব, সুর, কানি, পাগড়ী, খোল, গুড়রী বেয়ে নেমে আসছিল তার হাতের আঙুল। মা তাকে ঘৃণা করে। সে সেটা জানে। মায়ের ঘৃণা তার অর্থোপার্জনের ধরনে। থাক সেই ঘৃণা। কিন্তু মায়ের স্নেহের শূন্যতা পূরবীর জীবনে পূরণ করেছে এই তবলার বোলগুলি। এই কটা দিন এই তবলা জোড়ার কাছেই নিজেকে সঁপে দেবে ঠিক করল পূরবী।
দিনদুয়েক কেটে গেল এইভাবেই। বিভাস রাউতের কী হল, ওই মেয়েটিরই বা কী হল কিছুই জানতে পারল না পূরবী। মুলতানভাইয়ের কথামতো ফোন বন্ধ করা ছিল তার। কলেজে যাওয়াও মানা। মাকে ওষুধ খাইয়ে বাকি সময়টায় সে আবিষ্কার করল তার শরীর থেকে ছন্দ এখনও সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি। তবলাজোড়া থেকে ধুলো ঝেড়ে ছাউনি দুটোকে সামান্য পোক্ত করতে হল। জঙ পড়ে যাওয়া হাতুড়িটা পরিষ্কার করে ধীরে ধীরে গুলি আর পাগড়িতে টোকা মেরে সে বুঝতে পারল এখনও তবলাজোড়া সম্পূর্ণ প্রাণহীন হয়ে যায়নি। বিড়াগুলো যেখানে যেখানে ছিঁড়ে গিয়েছিল, সেইখান গুলোয় সুতো দিয়ে সেলাই করে নিল পূরবী। তারপর ঘরের আয়নার সামনে তবলা নিয়ে বসল সে। ধা ঘেড়ে নাক দি ঘেড়ে নাক গদি ঘেড়ে নাক।আর ঠিক তখনই আয়নার ওপারে ধ্রুবস্যারের মুখটা ভেসে এল।
যখন প্রথম ধ্রুবস্যারের কাছে তবলা শিখতে নিয়ে গেল পূরবীর বাবা তখন তবলাবিশারদ ধ্রুবজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়স পঞ্চান্ন। পূরবীকে দেখে তিনি বলেছিলেন।
-নামে যেমন সুর, বোলেও তেমন সুর আনতে পারবি তো বেটি?
পূরবী কিছু না বুঝেই ঘাড় নেড়েছিল। তখন ধ্রুবস্যার পূরবীর বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন।
-মেয়েকে আগে গানে না দিয়ে তবলায় দিলেন কেন?
পূরবী গান শুনতে ভালোবাসে। গান গাইতে নয়। তার ভালো লাগে তালে তালে ঠুকঠুক করতে। সে কথা স্যারকে বলতে স্যার খুশি হয়েছিলেন। বেশ এগোচ্ছিল তালিম। অন্যদের থেকে শেখার গতিবেগ পূরবীর বেশি থাকায় তার জন্য আলাদা ক্লাস করে দিয়েছিল ধ্রুব স্যার। ঠেকা শুনে ঘাড় নেড়ে বলত।
-না না। হচ্ছে না। থুন শব্দটা সিধা শ্রোতার কানে গিয়ে ঠোকা মারবে। মন্দিরের ঘন্টার মতো।
মাধ্যমিকে অনেকগুলো লেটার আর স্টার পেয়েছিল পূরবী। সে কথা সে সবার আগে গিয়ে জানিয়েছিল ধ্রুব স্যারকে। সব ঠিক ছিল। সোম তাল ফাঁক। সমস্যা হল পূরবীর। একরাতে সে ঘুমের ভিতর দেখল অনন্ত সমুদ্রতরঙ্গ। তার ভিতর পূর্ণিমা চাঁদের আলো যেন রূপালী বালি বিছিয়ে রেখেছে। সেই অনন্ত ঢেউরাশির ভিতর হঠাৎ সে দেখল ধ্রুবস্যারকে।ধবধবে সাদা একটা জোব্বা পরেছেন তিনি রাবীন্দ্রিক কায়দায়। তিনি সেই পূর্ণশুভ্র চাঁদের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন শূন্য দিয়ে। তার হাতে একটা প্রকাণ্ড হার্প। তিনি সেই হার্প দিয়ে এক অপূর্ব সুরতরঙ্গ তৈরি করছেন। সেই তরঙ্গে সমুদ্রজল উথলিয়ে আছড়ে পড়ছে তালেতালে। পূরবী তাকে ডাকতে যাচ্ছিল। কিন্তু ডাক দেবার আগেই তিনি যেন চাঁদের আলোকণার ভিতর মিলিয়ে গেলেন। পূরবীর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তারপর। অন্ধকার ঘরে জেগে উঠে হাঁটুর ভিতর মুখ গুঁজে সে শিউরে উঠেছিল সেইদিন। তার শরীরের ভিতর যেন কেউ একজন জেগে উঠছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজের আঙুলগুলো দেখছিল সে। শিহরিত হচ্ছিল। পরক্ষণেই এক না নিভতে চাওয়া অস্বস্তি। গুরুর প্রতি এহেন মনোভাব লোভনীয় নয়। নিজেকে অনেক বোঝাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল পূরবী। বরং এরপর থেকে ধ্রুবস্যার তাকে স্বপ্নে এসে দেখা দিতে শুরু করল। তবলা ক্লাসে যাবার সময় বাড়তি মনোযোগ দিয়ে নিজের অজান্তেই কড়া রঙের লিপস্টিক মাখত সে। সেইসব দেখে একদিন বাবা বলেছিল।
-এতো সেজেগুজে দিব্বি লাগছে যে বড়।
মা উত্তরে বলেছিল,”দেখো। হয়তো কোনও স্পেশাল বন্ধু জুটেছে।”
মুখ লাল হয়েছিল লজ্জায়। ক্লাসে তালে ভুল হয়ে যাচ্ছিল। তার হাত ধরে ধ্রুবস্যার ঠেকা দেখিয়ে দিলে মনের ভিতর আকুলিবিকুলি করত তার। স্যার অবশ্য বিরক্তই হলেন একদিন।
-ক্লাস করতে এসে এতো সাজগোজ করো কেন? সঙ্গীত একটা সাধনা। সেই সাধনা চঞ্চল মনের কর্ম নয়। এতো সাজলে মন চঞ্চল হবে। সুর ধরতে পারবে না।
মাথা নীচু করে বসেছিল পৃরবী। তখন সবে ‘পূর্বরাগ’ পড়েছে সে। নিঃশব্দে সে সেইদিন মনের ভিতর থেকে বলেছিল,” তুমি কি কিছুই বোঝো না ধ্রুব? কেন আমি সেজে আসি? কার জন্য? সত্যিই বোঝো না?”
বছরে একবার অনুষ্ঠান হতো ধ্রুব স্যারের স্কুলে। কাছেই নির্মলাসদনে সেই অনুষ্ঠানে সকলের বাবা মা কে ডাকা হত। সেখানে সেইবার পূরবীর সঙ্গে বসন্ত শাসমলের যুগলবন্দী রাখা হল। বেশ এগোচ্ছিল। বসন্ত পূরবীর বয়সী।পূরবী সেদিন খুব সেজেছিল। রাণী রঙের শাড়ি। মেরুন টিপ। দু’চোখে ঘন কালো কাজল।মনে মনে নিজের অজান্তেই সে দেখছিল তাকে ধ্রুবস্যার দেখছে কিনা। আড়লয় পেরিয়ে লগগীতে পড়ল দুজনে। পূরবী বাজায়। তাক ধেড়ে।ধাগে নাক তেড়ে। বসন্ত উত্তরে বাজালো ‘তাতি নাড়া ধাতি নাড়া ধাগ তেড়ে কেটে ধাধা ধাগে’। শেষে কথা ছিল ধূমালী দিয়ে শেষ করা হবে। হলে তখন পিনপরা নীরবতা। সকলে দেখছে একটি ছেলের সঙ্গে এক মেয়ে তবলচি পাল্লা দিয়ে সেয়ানে সেয়ানে লড়ছে।ঠিক সেই সময় হঠাৎ পূরবীর মন নড়ে গেল। সাইড উইংসে ধ্রুবস্যার তার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। হাসলে তার গালে সামান্য টোল পড়ে। হাসলে তার চোখে তেহাই গুলো সমুদ্রতরঙ্গ হয়ে যায়। ধ্ ধিন ধাধিন ধাধিন। বাজাতে বাজাতে লয় হারিয়ে ফেলেছিল সে। লহরায় সেই লয়চ্যুতি বসন্ত মেক আপ করে দিলেও ধ্রুবস্যার বিরক্ত হয়ে সরে গেছিলেন। সেটাই পূরবীর শেষ পারফরম্যান্স ছিল। আর সে তবলা ছোঁয়নি তারপর থেকে। বাবা জিজ্ঞেস করত,”কী হয়েছে তোর?” পূরবী বলত না। ধ্রুবস্যারও কখনও ডেকে পাঠাননি। আজ এতো বছর বাদে আয়নার সামনে বসে ভাবে পূরবী। ধ্রুবস্যার কী সেদিন সত্যিই তাকে দেখছিলেন? কী দেখছিলেন তিনি? কোথায় আছেন এখন তিনি? একবারও কী তিনি বুঝতে পারেননি কেন পূরবীর সেই লয়চ্যূতি ঘটেছিল? কে জানে?
ধ্রুবস্যারের বাড়ি টালাট্যাঙ্কের কাছে। যতোদূর জানে পূরবী, বিয়ে একটা বহু যুগ আগে করেছিলেন স্যার। একটি ছেলেও আছে তার। তবে তিরা কেউ তাঁর সঙ্গে থাকে না। যোগাযোগও রাখে না। সেই ছোটবেলাকার ক্লাসের দিনগুলি থেকেই সে দেখে আসছে। বছর চারেক আগে তবলা ক্লাস ছেড়ে দেবার পর বাবাও চলে গেলেন। পূরবী নিজেকে গুছিয়ে সময় পায়নি ওদিকে যাবার। এমনকী খবর নিবারও। তবে লোকমুখে ভাসাভাসা শুনেছে। মানুষটার নাকি স্ট্রোক হয়ে গেছে। ভাইরাস জ্বরের সময় অনেকদিন ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে। সেই খরচে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এটুকুই। তারপর কী হল পূরবী জানে না। কিন্তু এতোবছর পর তার মন বলে উঠল। এতো লোকে তার শরীর ছুঁয়ে গেছে। সে শরীর ধৌত করতে পারতেন একমাত্র ধ্রুবস্যার। তার কাছে ক্ষমা চাওয়া কী উচিত তার? কেন চাইবে? স্যার তো তাকে কখনও কিছুই বলেননি। তাহলে? তবু পূরবী ঠিক করল সে একদিন স্যারের বাড়ি যাবে। এক সপ্তাহ ভাই তাকে ফোন অন করতে বারণ করেছে। কী করবে সে এতোগুলো দিন একা একা ঘরে বসে। বিকেলের দিকে ঘর থেকে বের হবার সময় ওঘর থেকে মা বলল।
-বেরোচ্ছিস?
-হ্যাঁ মা।
-শোন না। আমার শ্যাম্পুটা শেষ হয়ে গেছে। এনে দিবি?
-দেব।
-কোথায় যাচ্ছিস? কলেজ যাস না আজকাল। ছুটি বুঝি?
-হ্যাঁ।ছুটি। আর?
-ফিরবি তো রাতে?
-দেখি।
-ছিঃ। কী কপাল করেছি আমি…
মা আরও কিছু বলছিল হয়তো। পূরবী শুনলো না। ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মায়ের শেষ কথাগুলো বিঁধে যাচ্ছিল বুকে। কপাল কি কেউ নিজে নিজে করে?মানুষের কপাল আপনা থেকেই তৈরি হয়। কখনও তা ভোরের স্নিগ্ধতা আনে, কখনও পানাপুকুরের গন্ধ। মার কাছে সে পানাপুকুরই। তাই থাকুক। ধ্রুবস্যারের বাড়ি খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না পূরবীর। সেই রাস্তা। পাশে ছোট দোতলা হলুদ বাড়ি, সবুজ গ্যারেজঘরের গেট। সব যেন ঠিক আগের মতোই আছে। শুধু রক্ষমাবেক্ষমের অভাবে দেওয়ালে শ্যাওলা পড়েছে সামান্য। হলুদ দেওয়ালে সেই কালো কালো বলিরেখার মতো দাগ মিলিয়ে নিলে বছরের হিসেবটাও মিলে যায় যেন।
দরজার পাশেই অনেকবার বেল বাজানোর পর কেউ না খুলতে আলতো ঠেলা মেরে পূরবী দেখল সদর দরজা খোলা। এই দরজার পর সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলেই ধ্রুবস্যারের ঘর। এক একটি ধাপ পার হতে হতে পূরবী ভাবছিল কী বলবে সে স্যারকে?কী বলে ক্ষমা চাইবে? এতোগুলো বছর? কেন এতোগুলো বছরের পর সে এল? কীভাবে বলবে সে কথা।কেমন দেখতে হয়েছে স্যারকে এখন? সেই টোল পরা গাল,তীক্ষ্ণ অন্তরভেদী চোখ।আগের মতোই কী? ভাবতে ভাবতেই ধ্রুবস্যারের ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল পূরবী। সামনে সে যা দেখল, সে দূশ্য সে আশা করে নি।
ঘরের আড়াআড়ি একটি হাসপাতালের খাট। তার পাশেই হুইলচেয়ার। চেয়ারের অনতিদূরে একটি স্টিলের বাটি উল্টে পড়ে আছে। সেই বাটি থেকে মুড়ি ছিটকে পড়েছে চারদিকে। হুইলচেয়ারের পাশেই একটি কৃষকায় অর্ধান্ধ মানুষ মেঝের উপর হাতড়ে চলেছে। মাটিতে যেন সেই ব্যক্তি গভীর জলে সাঁতার দেবার মতোই ডাঙ্গা খুঁজছেন। ভালো করে দেখলে বোঝা যায় তার বাঁদিকটি নড়ছে না। ডান হাতে হিঁচড়ে হিঁচড়ে সে নিজেকে ওই মুড়ির বাটির দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। ঘরে তাকে সাহায্য করার আর কোনো দ্বিতীয় প্রাণী নেই। কৃষকায় অসহায় ব্যক্তিটিকে এতোগুলো বছর পরেও চিনতে ভুল করল না পূরবী। নিজের অজান্তেই যেন তার ভিতর কোনও অবচেতন জেগে উঠল। বাটিটি সরিয়ে নিয়ে সে ব্যক্তির হাতে দিয়ে পাশে বসল। বাটিটি হাতে পেয়ে মানুষটি যেন বাটির ভিতর দু একটি অবশিষ্ট মুড়ির অংশ খুঁজছিল।
-ধ্রুবস্যার। কেমন আছেন?
-কে?
আধো গলায় শিশুর মতো ধ্রুবস্যার তাকিয়ে রইলেন পূরবীর দিকে। কে জানে চিনতে পারলেন কিনা। শুধু আঙুল দিয়ে কোনোমতে নিজের হুইলচেয়ারটা দেখালেন। পূরবী দেখল হুইলচেয়ার থেকে পড়ে গিয়ে ধ্রুবস্যারের কপালের বাঁদিকে সামান্য ছড়ে গেছে। ড্রেসিং করা দরকার। দু হাতে পাকড়াও করে কোলবালিশের মতোই ধ্রুবস্যারকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে দিল পূরবী। স্যার শুধু তার বদলে বললেন,”জল।জল।”
জল পাশেই জগে ভরা ছিল। সঙ্গে প্লাস্টিকের গ্লাস। সেটিতে ভরে দিতেই নিমেষে খেয়ে যেন স্বস্তি পেলেন তিনি। পূরবী দেখল তার নিজের বুক ভিজে গেছে।সে কাঁদছে। এইভাবে কেউ কারোকে ছেড়ে চলে যায়। স্যার আধো জড়ানো গলায় বলতে চেষ্টা করছিলেন।
-আশা। আশা।
‘আশা’ বোধহয় স্যারের অ্যাটেণ্ডেন্ট।কে জানে? কিন্তু ঘরে আর তো কেউ ছিল না।
-ফোন করব?
-নেই। নেই।
মানুষটিকে আর কিছু বলতে পারল না পূরবী। সন্ধ্যা হয়ে গেল। পা দুটি স্পর্শ করে পূরবী দেখল দীর্ঘ অবহেলার পর সেখানে দগদগে ঘা। রাত আটটা নাগাদ সাদা শাড়ি সবুজ পাড় ইউনিফর্ম পরে একটি পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলা ঘরে ঢুকলেন। পূরবীকে দেখে তিনী বেশ চমকে গেলেন। পূরবী বেশ ধমকের সুরেই তাকে বলল।
-আপনিই আশা?
-হ্যাঁ।
-এই মানুষটাকে এভাবে ফেলে চলে গেছিলেন? পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছে দেখুন। আপনার শরীরে মায়াদয়া নেই।
মহিলার ভিতরে তেমন হেলদোল দেখা গেল না। পূরবী এতে আরও চটে গেল।
-আপনার নামে আমি পুলিশে কমপ্লেন করব দাঁড়ান।
মহিলাটি সামান্য হেসে বলল।
-যেখানে খুশি কমপ্লেন করুন। কিন্তু তার আগে আমার বকেয়া টাকাটা মিটিয়ে দিন। তিনমাস কাজ করছি। হাগা মোতা সব করাচ্ছি।একটা পয়সা পাইনি। স্ট্রোক হবার পর কাজে রাখার সময় তো ওনার বিলেতে থাকা ছেলে তো কতো বড় বড় কথা বলে গেল। তারপর না খোঁজ নেয়। তা খবর নেই। বৌয়ের কথা তো ছেড়েই দিলাম। আমি এ কাজ করতে পারবোনি বাপু। আমার টাকা মিটায়ে দেন। অন্যকাজ ধরি।
পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে পূরবী জিজ্ঞেস করল।
-কতো টাকা বাকি আছে তোমার।
-ন হাজার টাকা মতো।
-বেশ। পাবে। আজ রাতটা তুমি ওনাকে দেখে রাখো। আপাতত হাজার টাকা রাখো। কাল থেকে আমিই থাকব এখানে। একটু জামাকাপড় নিয়ে আসি।
-আপনার ফোন নম্বর দিয়ে যান।
একটু ভাবল পূরবী। ফোন তার বন্ধ। অন করা মানা।
-ভাববেন না। আমি স্যারের ছাত্রী। কাল সকালেই চলে আসব। একটু ব্যাগ গুছিয়ে আনি। বুঝতেই তো পারছেন। জানতাম না এতোকিছু। তাই তৈরি হয়ে আসিনি।
কে জানে কী বুঝল আশা। পূরবীর দিকে তাকিয়ে শেষমেশ রাজি হয়ে গেল। পূরবী ঘরে ফিরতে ফিরতে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিল। প্রকৃত গুরু দক্ষিণা দেবার সময় তার জীবনে এসেছে। ধ্রুবস্যারকে এই রূপে দেখতে পাবে সে, একথা কখনও আশাই করেনি। ঘরে ফেরবার পথে মার জন্য শ্যাম্পু কিনে নিল সে। তারপর ঘরে ফিরে স্যুটকেশ গুছিয়ে নিল। হাতে হাজার বারো টাকা আছে। তার থেকে আট হাজার আয়ামাসিকে দিলে পড়ে থাকবে চার। মাকে একহাজার দিয়ে তিন। এই তিনে কতোদিন কে জানে। কিন্তু পূরবী নাছোড়। সে স্যারকে ভালো করে তুলবেই। সারারাত কেটে গেল দীর্ঘ বিলম্বিত বোলের মতো। ক্রাং কৎ কৎ ধা কৎ ধা কৎ ধাগে তেরেকেটে থুন নানা। ভোরবেলা বের হবার সময় মার ঘরে উঁকি দিতেই পূরবী দেখল মা জেগে।
-কোথায় যাচ্ছিস?
-হোস্টেলে মা। ক্লাস শুরু হবে আমার।
-আচ্ছা। একটা এমারজেন্সি লাইট আনিস তো আমার জন্য। আজকাল এতো কারেন্ট যায়। পড়তে পারিনা।
-আচ্ছা।
বলে বেরিয়ে পড়ল পূরবী। অটো ধরে টালাপার্ক। স্যারের বাড়ি এসে আশার হাতে আটহাজার টাকা দিয়ে বিদায় করল। তারপর স্যারের পায়ে হাত রেখে বলল।
-আমাকে চিনতে পারছেন স্যার?
ধ্রুবজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন পূরবীর দিকে। পূরবী বুঝল এক দীর্ঘ তবলা লহরার দিকে এগিয়ে চলেছে সে। সেই লহরার তরঙ্গে সহজে তেহাই নেমে আসবে না। না আসুক। এতোদিন সে লড়েছে। পুরুষকে সে নিজের শরীরে পুতুলের মতো খেলিয়েছে। আজ সে দেবতার পুজো করবে। সেই দেবতা জাগ্রত না হওয়া অবধি তার বিশ্রাম নেই।