সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ১০)

পদাতিক

” শিক্ষা আনে চেতনা ”
খুব যে এমন একটা শিক্ষিত পরিবার ছিলো পাঁউশির করণ পরিবার সেটা নয়, তিন ভাইয়ের মধ্যে বলরামবাবু আর তার বড়ভাই এই দুজন সেকেন্ডারি পরীক্ষা উত্তীর্ণ ছিলেন আর ছোটভাই স্কুলের মাঝরাস্তাতেই পড়া ছেড়ে ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়লেন। বড়ভাই নিজের জমিতে করাতকল বসালেন। ফলে পাঁউশি ও আশেপাশের গ্রামের সবাই, যাদের কাঠ চেরানোর প্রয়োজন হতো এসে ভীড় জমাতো সেই করাতকলে। অল্পদিনের ভেতরেই কাঠচেরাইয়ের ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠলো, ছোটভাই যে সব ট্রেলার বা লঞ্চ গভীর সমুদ্রে যেতো মাছ ধরতে তাদের সঙ্গ নিলেন। কালেক্রমে নিজেই কিনে নিলেন একটা লঞ্চ। বাকী রইলেন বলরাম করণ নামে একজন মানবিক যুবক। যার দুচোখ জুড়ে রয়েছে মানুষকে সেবা করার স্বপ্ন। মানুষের দুঃখে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে তাঁর অন্তর। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ শক্ত দুচোয়ালে চেপে ধরা দাঁতের সারি আর মায়াভরা দুচোখে আর্তের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন, সে স্বপ্ন দেখা কখনও কখনও ব্যর্থ হলে দুচোখের কোলে নেমে আসে প্লাবন।

তিনি নিজে উচ্চশিক্ষিত হয়ে উঠতে পারেন নি ঠিকই কিন্তু হৃদয় যার মানবপ্রেমের আঁতুড়ঘর তাঁর আদৌ পুঁথিগতবিদ্যার প্রচলিত রাস্তায় হাঁটার প্রয়োজন পড়ে না। প্রকৃতির কাছে, সমাজের কাছে যিনি মানবশিক্ষার পাঠ গ্রহণ করেছেন তিনি তো অন্যদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার প্রয়াসে ব্রতী হবেনই।

গ্রামের একটিমাত্র শিশুকে নিয়ে তিনি শুরু করলেন তাঁর গ্রামের শিশুদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার মহাযজ্ঞ। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে তিনি ছাত্র সংগ্রহে নামলেন। প্রথম প্রথম গ্রামের মানুষেরা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। নিজের তিন মেয়ে, ময়না, চায়না আর মণিকরণকেও স্কুলের মেঝেতে চাটাই পেতে পড়তে বসালেন বলরামবাবু।

উনিশশো পঁচানব্বই সালে ভাঙা দরমার বেড়া আর টালিরচালার নীচে প্রতিষ্ঠিত হলো খগেন্দ্রনাথ শিশুশিক্ষা কেন্দ্র। ঘরে ঠিকমতো খাদ্যের যোগান নেই, কিন্তু বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য শিক্ষিকা নিয়োগ করা হলো। এবার গ্রামের লোকেরা বুঝলেন যে মানুষটি শিক্ষালয়টিকে প্রকৃত অর্থেই এক মানুষের মতো মানুষ তৈরীর কারখানা হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। ক্রমশই তারা ঘরের বাচ্চাদের হাত ধরে নিয়ে এসে ভর্তি করাতে শুরু করলেন খগেন্দ্রনাথ করণের নামাঙ্কিত স্কুলে।

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ছাত্রসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো উনিশ। ফের একবার প্রমানিত হলো, ইচ্ছাশক্তির জোরে দাঁড়িয়ে আছে যে স্বপ্নালু চোখ, সে চোখের শক্তি কোনোরকম প্রতিবন্ধকতার সামনে মাথা নোয়ায় না।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।