ক্যাফে কলামে সঙ্কর্ষণ

হোয়াই শুড উই হায়ার ইউ?
জাতীয় সম্পদ হিসাবে মানুষকে গ’ড়ে তোলার যে রাজনৈতিক গুরুত্ব, সেই উপলব্ধিকে যে দেশগুলি লিপিবদ্ধ ক’রেছিলো, তাদের অন্যতম হ’লো তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক মহাচীন। তথাকথিত একটি শিশু রাষ্ট্রেও প্রত্যেক শিশুকে রাষ্ট্রীয় পর্যবেক্ষণে ভবিষ্যতের জন্য উপযুক্ত ক’রে তোলাকে কিন্তু চেয়ারম্যান মাও কাঙ্ক্ষিত প্রাধান্যটুকু দিয়েছিলেন। সদ্য স্বাধীন ভারতে পণ্ডিত নেহরু যখন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্রতী হন, তখন প্রথমবার যে মূর্তিমান বাধার সম্মুখীন তিনি হ’য়েছিলেন, তাঁর নাম শ্রী মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। তাঁর বক্তব্য ছিলো যে অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে স্বাবলম্বী হ’তে অন্ততপক্ষে দুয়েকটি প্রজন্ম দেশকে দিতেই হবে, যাতে ভবিষ্যতে তাদের বংশজরা নিশ্চিন্তে উন্নতি ক’রতে পারে।
ফলস্বরূপ কর্মশিক্ষা প্রাথমিকে যখন আবশ্যিক হয়, তখন মানুষ অস্তিত্বরক্ষার সহজতর পন্থাই খুঁজেছে কেবল। জাতির পিতা হিসাবে শ্রী গান্ধীর বিশ্বাস ছিলো যে রাষ্ট্র জনগণের দৈনন্দিন এই যুদ্ধের পথকে ক্রমশঃ সুগমতর ক’রবে। লক্ষ্যণীয় যে আমাদের বিগত প্রজন্মসমূহের মধ্যেও মূলতঃ এই ভয়ই কাজ ক’রে গেছে যে শিক্ষিত না হ’লে ভবিষ্যৎ বাঁচবে কীভাবে? এই যে সুগমতর জীবনচর্যার প্রলোভন, তা মধ্যবিত্ত বাঙালিকে মূলতঃ ১টিই ধ্রুবসত্যের সামনে দাঁড় ক’রিয়েছিলো, তা হ’লো পড়াশুনো না ক’রলে তাকে কায়িক শ্রম দিতে হবে। মানসিক শ্রমদানের চূড়ান্ত পর্যায়ে তখনও অবধি তার পরিসর বিস্তৃত হয়নি, বরঞ্চ সেখানে কাজের অবকাশ কম ব’লেই তার ধারণা ছিলো। দেশীয় অর্থনীতিও তাকে সে বিষয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ দিতে অক্ষম।
প্রশ্ন আসে যে রাষ্ট্রই বা এক্ষেত্রে কীভাবে অক্ষম ছিলো? কেন্দ্রীয় বা রাজ্যস্তরে স্বার্থহীন নেতৃত্বের অভাবে দেশে দেখা দিয়েছে কর্মহীনতা। জনবিস্ফোরণ ঘ’টেই চ’লেছে, অথচ শিল্পে সরকারি বিনিয়োগ নেই, এমতাবস্থায় যে বিপদটি প্রত্যাশিতভাবেই আসার কথা ছিলো, সে’ই এসে দেখা দিলো, যার নাম পুঁজিবাদ। রাষ্ট্রের ক্ষমতা না থাকায় কতিপয় ব্যবসায়ীকে সে দায়িত্ব দিলো দেশে ‘কাজ জোগানোর’। লক্ষ্যণীয় যে অধিকাংশ প্রথম বিশ্বের দেশেই এই ব্যবস্থা নতুন কিছু নয়। তবে শ্রমিকের স্বার্থরক্ষার্থে সেখানে সরকার সর্বদা সজাগ। কিন্তু ভারতে, বিশেষ ক’রে পশ্চিমবঙ্গে স্বয়ং সরকারেরই যেখানে স্বহস্তে শিল্প ধ্বংস ক’রে ফেলে কোনো সুষ্ঠু আয় নেই, তখন পুঁজিবাদীদের দানের ওপর সে অনেকাংশে নির্ভরশীল। যতো দিন যাবে এই নির্ভরতা বাড়তেও থাকবে, কারণ এই সুযোগে পুঁজিবাদীর বল ক্রমবর্ধমান।
খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়ীর আদৌ দায় নেই জনগণের সেবা করার। সে কর্মসংস্থান ক’রবে ঠিকই, কিন্তু স্বল্প বিনিয়োগে সর্বাধিক উৎপাদন পুঁজি বর্ধনের অন্যতম শর্ত। অতএব সে চাইবে একাধিক শ্রমদিবসের পরিবর্তে ন্যূনতম সময়, শ্রমিক ও অর্থের বিনিময়ে তার কার্যসিদ্ধিটুকু ক’রে নিতে। ঠিক এই মনোভাব থেকেই সৃষ্টি উদ্যমী, পরিশ্রমী, নিবেদিত ইত্যাদি প্রতারণাসূচক প্রশংসাগুলি। কিন্তু এর ফলে যেকোনো একনায়ক শাসনযন্ত্রের নিশ্চিন্ততা বাড়লো অনেকখানি। যারা কর্মহীন তারা সমাজে এতো ব্রাত্য হয়ে প’ড়লো যে কেবল অস্তিত্বরক্ষার্থেই কোনো প্রশ্ন তাদের দিক থেকে ওঠা বন্ধ হ’য়ে গেলো। তথাকথিত যারা শিক্ষিত, তারা উন্নততর জীবনযাপনের লোভে ক্রমাগতঃ অপর শ্রেণীর পুঁজি বর্ধনে আত্মনিবেদিত হ’য়ে পড়ায় তাদের এসব সম্পর্কে কোনো চিন্তাই র’ইলোনা।
ঠিক এইখানেই আমরা ফিরে যাবো কোভিড পূর্ববর্তী শিক্ষা-অর্থনীতিতে, যেখানে সরকারি স্কুলের সমান্তরাল সাধারণ ‘প্রাইভেট কোচিংয়েও’ ভদ্রঘরের ছাত্রসংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। যেক’টি অবশিষ্ট তারাও একে একে ঝুঁকে প’ড়েছে উচ্চমূল্যের পরিবর্তে আধুনিক শিক্ষার পরিষেবা রাখা ‘টিউশন সেন্টারগুলিতে’। এরা যে কেবল ভালো ফলসহ পাশের নিশ্চয়তা দিচ্ছিলো তা’ই নয়, ছাত্ররাও উচ্ছ্বসিত। কিন্তু এর পাশাপাশি যে ভয়ঙ্কর বিষটি ছাত্রদের মধ্যে প্রবেশ ক’রিয়ে দিচ্ছিলো, তা হ’লো বিষয়ের গভীরে না যাওয়া। ইতঃপূর্বে উল্লিখিত উন্নততর জীবনের লোভ সম্ভবতঃ দুয়েকজনকে এই পথে নিয়েও গিয়েছিলো, কিন্তু সেই অভ্যাসকে প্রথম মান্যতা দিলো এই শিক্ষা-পুঁজিবাদই। ধীরে ধীরে ছাত্রদের মধ্যে এই চিন্তা প্রবেশ ক’রলো যে অস্তিত্বরক্ষার্থে কেবল সনদটুকুই প্রয়োজন, অধ্যয়ন বা অন্বেষণ বিষয়গুলি নিরর্থক।
এর ২বছর পর আন্তর্জালিক শিক্ষার প্রতারণা অতিক্রম ক’রে সরকার যখন বিনামূল্যের শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রায় মৃত্যুমুখে পাঠিয়েই দিয়েছে, সেই সময় জনগণের সামনে ত্রাতা হ’য়ে এগিয়ে এলো এই সংস্থাগুলি। স্বাধীন ভারতে এই প্রথম শাসনযন্ত্র স্বয়ং দায়িত্ব সহকারে মানবসম্পদগুলি তুলে দিলো পুঁজিবাদের হাতে। ইতিমধ্যেই দেশময় তৈরী হ’য়ে গিয়েছে অজস্র বেসরকারি সংস্থার অফিস বা প্রতারণাকেন্দ্র, যেখানে মানসিক শ্রমের পরিমাণ কায়িকের তুলনায় প্রায় কিছুই নয়। লক্ষ্যণীয় যে এই মুহূর্তে দেশীয় শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বাধিক সম্প্রসারণ ঠিক ২টি বিষয়ে, ১। ইঞ্জিনিয়ারিং, ২। ম্যানেজমেন্ট। প্রথমটি যেহেতু বেসরকারি শিল্পের অন্যতম স্তম্ভ, তাই অতীতের কৌলীন্য অস্তমিত হ’লেও বিষয় অপরিহার্য। দ্বিতীয়টি উৎপাদন ব্যবস্থার গতিশীলতা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অস্ত্র। শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে এতদ্বারা নির্মিত কৃত্রিম বৈষম্য পরজীবীর শোষণকেই তীব্রতর ক’রে তোলে।
প্রশ্ন হ’লো, সরকার কীভাবে উৎসাহ দিলো তার যুবসমাজকে পুঁজিবাদীর এই অনন্ত দাসত্ব করার? ঠিক ৩টি ধাপে। ১মত প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে সর্বনাশ ক’রে, ২য়ত সরকারি উচ্চশিক্ষার প্রতি মানুষের বিশ্বাস বিনষ্ট ক’রে (কলকাতা ও অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা) এবং সবশেষে স্থায়ী কর্মসংস্থানের পরিসর ক’মিয়ে ফেলে (একাধিক শূন্যপদে নিয়োগ বন্ধ ক’রে)। অর্থাৎ এই মুহূর্তে যা অবস্থা দাঁড়ালো, তাতে কোনো ছাত্র নিজেকে এই প্রশ্ন করার স্থানে থাকলোনা যে সে নিজের চর্চিত বিষয়টি সম্পর্কে আদৌ জানে কিনা? বরঞ্চ নিয়োগকর্তা প্রশ্ন করার আগেই সে’ই সন্দিহান হ’য়ে প’ড়লো যে তাকে দিয়ে এমন কোনো কার্যসিদ্ধি হবে কিনা যা তার চর্চিত বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত? তখনই প্রবেশ ক’রলো ‘সমান যন্ত্রের বহুল ব্যবহার’ বা মাল্টি টাস্কিংয়ের ধারণা।
ঠিক যেমন একটি মাত্র মোবাইল ফোন এই মুহূর্তে কেবল যোগাযোগই নয়, চিত্রগ্রহণ থেকে সঙ্গীত পরিবেশন সবেতেই সক্ষম, তেমনই একই ব্যক্তিকে ৩জনের ৪বেলার কার্যে ব্যবহার করা গেলে ক্ষতি কী? ব্যবস্থাপনা যন্ত্রটিতে মানুষও এই মুহূর্তে একটি অংশ মাত্র। পর্যাপ্ত ব্যবহার না ক’রলে যেমন যন্ত্রাংশের প্রতি ভোক্তার কোনো দায় থাকেনা, শ্রমিকের প্রতি পুঁজিবাদীরও নেই। অর্থাৎ ধীর কিন্তু ক্রমবর্ধমান গতিতে অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ পরিবর্তন এলো। উৎপাদনের ‘স্থির পরিব্যয়’ বা ফিক্সড ওভারহেডে এতোদিন মাসিক বেতনও অন্তর্ভুক্ত ছিলো, কিন্তু এইবার সরকারি আনুকূল্যে প্রতিটি মানুষই হ’য়ে দাঁড়ালো, দৈনিক মজুরি প্রাপ্ত শ্রমিক বা ‘ডেইলি ওয়েজড লেবার’। যতোদিন কাজ ততোখানি প্রাপ্তি। উৎপাদনে অংশগ্রহণ ব্যতীত মানুষের অপর কোনো অস্তিত্বই থাকলোনা।
এমতাবস্থায় রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রাপ্তি কী? বেসরকারির মতো সে’ও এবার প্রকাশ্যেই শুরু ক’রলো ‘চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ’ বা এমপ্লয়মেন্ট অন কন্ট্রাকচুয়াল বেসিস। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জনৈকের ব্যবহার্যতা তার চাকরি সুরক্ষিত হওয়ার অন্যতম শর্ত হ’য়ে দাঁড়ালো। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে এর তুলনায় লজ্জাকর কিছু হ’তে পারেনা, যেখানে বেসরকারি তো অবশ্যই, রাষ্ট্রীয় পরিষেবারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ একপাক্ষিক অপদার্থতা জনগণকে এমন পর্যায়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো, যেখানে মাধমিক পাঠ্যক্রমের ৩৫% জেনেও ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যায়, কিন্তু ৯৫% পেয়েও উন্নততর জীবনযাপন অসম্ভব। নিজস্ব পরিসরের বাইরে তাকানোর যে অবকাশ তা দেশবাসী গ্রহণে অক্ষম। ধারাবাহিকভাবে মানবসম্পদের এমন অপব্যবহার কোনো দেশ ক’রেছে ব’লে শোনা যায়না…
সমাজতান্ত্রিক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কথা বলার লোক ছিলোনা মহাচীনে। পণ্ডিতজী কিন্তু বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
ধন্যবাদ।