T3 || আমি ও রবীন্দ্রনাথ || সংখ্যায় প্রদীপ গুপ্ত

পরাণসখা, বন্ধু হে আমার
বাবা মায়ের বিবাহবার্ষিকীর দিন মা দেরাজ খুলে বসতেন। দেরাজের ভেতর থাক করে রাখা পুরোনো শাড়িগুলোকে অসীম ভালোবাসায় এক এক করে নামিয়ে মেঝেতে রাখতেন। তখন আমাদের মাটির মেঝে। ঘরের চারদিকের দাওয়াটা শুধু কয়েক সারি ইট দিয়ে বাঁধানো ছিলো। মা তাই শাড়িগুলোকে মেঝেতে নামানোর সময় মেঝেতে মাদুর পেতে তার ওপরে একটা সুতীর শাড়ি পেতে তার ওপর শাড়িগুলোকে নামিয়ে রাখতেন। আমরা ভাইবোনেরা ঘিরে থাকতাম মায়ের চারপাশে। মা একেকটা শাড়ি নামাতেন আর মায়ের মুখের ভেতর এক অপূর্ব আলোছায়ার খেলা চলতে থাকতো। কোনোটা হয়তো বাবা বেনারসে কনফারেন্সে গিয়ে মায়ের জন্য কিনে এনেছিলেন, কোনোটা হয়তো পার্টি কমিউনে থাকা কালীন কোন কমরেড উপহার দিয়েছিলেন। কোনটা হয়তো প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে বাবার দেওয়া উপহার।
–” এটা আমার শাশুড়ি মায়ের বিয়ের শাড়ি। সবচাইতে দামী। জড়ি গুলো দেখ, আসল সোনার জড়ির পার। এটা কোনদিনও হাতছাড়া করবিনা “।
আমরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম সেই শাড়িটার দিকে। মা সে শাড়ির ভাঁজ খুলে গন্ধ নিতেন অনেকক্ষণ ধরে, শেষে শাড়িটার পরতে পরতে ন্যাপথেলিনের বল ভেঙে ছড়িয়ে দিতেন। আর বিড়বিড় করতেন,
–“কত বছর হয়ে গেলো শাড়িটার কিন্তু এতটুকু গ্লেজ কমেনি।
“
পাড়ার বিনায়ক কাকুর বাড়ি ছিলো আমার অবাধ প্রশ্রয়ের আস্তানা। রিফিউজি কলোনীর বাড়িগুলোতে তখনো প্রীতির সম্পর্কগুলো এখনকার মতো ধ্বংস হয়ে যায়নি। যে কোন বাড়ির আম জাম বাতাবিলেবুর ওপর তখন পাড়ার কিশোরদের ছিলো অবাধ দখলদারি। নিজেরা খেয়ে বাড়ির লোকেদের জন্য কিছু পেড়ে দিলেই সবাই খুশী থাকতেন। বিনায়ক কাকুর বাড়ির সব গাছ গাছালির ওপর আমার ছিলো একছত্র অধিকার। বিনায়ক কাকু অসম্ভব ভালো কবিতা আবৃত্তি করতেন। নিজের বাড়ির উঠোনে ম্যারাপ বেধে রবীন্দ্র জয়ন্তী করতেন। সেখানেই মুকুট নাটকে ঈশাখাঁয়ের চরিত্রে অভিনয় দিয়ে আমার অভিনয় জীবনের শুরু। পঁচিশে আসার এক দেড় মাস আগে থাকতেই বিনায়ক কাকু অনুষ্ঠানের তোড়জোড় শুরু করে দিতেন। আমার দায়িত্ব ছিলো পাড়ার ছেলে মেয়েদের জড়ো করা। কবিতা মুখস্থ করিয়ে আবৃত্তি শেখানো, নাটক নির্বাচন করে রিহার্সাল দেওয়ানো এসব কিছুই বিনায়ক কাকুর নেশা ছিলো।
সেদিন খুব ঝড়। আম কুড়োতে দৌড় লাগিয়েছি বিনায়ক কাকুর বাড়িতে, জামার পকেট, হাফ প্যান্টের পকেট সব ভরে গেছে। জামাটাকে শেষে গায়ের থেকে খুলে ঝোলার মতো করে তার ভেতরে আম কুড়িয়ে কাকুর ঘরে ঢুকেছি। অকৃতদার কাকু একটা সেতারকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল মুছছেন।
–” কি হয়েছে কাকু? ”
কাকু ফতুয়ার কাপড়ে চোখ মুছে মুখে হাসি আনার চেষ্টা করলেন।
–” এ সেতারটা তো তোমার বাবার তাই না কাকু? ”
বিনায়ক কাকু মাথা নাড়লেন।
–” বাবা বলছিলেন তোমার বাবা খুব ভালো সেতার বাজাতেন। একজন উস্তাদ ছিলেন “?
কাকুর দু চোখ ভরে জল ঠেলে এলো।
-” শুধুমাত্র এ সেতারটাকে সাথে নিয়েই আমি দেশ ছেড়েছিলাম রে, নিজে বাজাতে পারিনা, তাই মাঝেমধ্যে এটাকে নামিয়ে সাফসুতরো করি। আজও সাফ করছিলাম। করে ঠিকমতো তুলে রাখতে ভুলে গেছিলাম। এ ঝড়ে দরমার ভেলকিটা খুলে এটার ওপর পড়ে —”
কাকু আর একটা কথাও বলতে পারছেন না। হাউহাউ করে কেঁদে — দেখতে পেলাম সেতারের তারগুলো সব ছিঁড়েখুঁড়ে —
কাকু আজ আর নেই কিন্তু ওর বাবার সেতারটা আজও রয়ে গেছে ওর ঘরে। মাঝেমাঝে যাই একটু ঝাড়পোছ করে ফের জায়গামতো তুলে রেখেদি। যখনি ধুলো ঝাড়তে যাই ওর বুক থেকে যেন ভেসে আসে — আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার — পরাণ সখা বন্ধু হে আমার –“
রবিঠাকুর, আমার কাছে তুমি আমার মায়ের শাশুড়ির বিয়ের বেনারসির মতো। আসল সোনার জড়িওয়ালা পাড়। মাঝেমাঝে তোমার সঞ্চয়িতার ভাজ খুলে বুক ভরে গন্ধ নিয়ে ফের দেরাজে তুলে রাখি, অথবা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বিনায়ক কাকুর সেতারের মতো, মাঝেমধ্যে সাফসুতরো করে ফের তুলে রাখি ঘরের কোনায়। বুক দিয়ে আগলে রাখি কিন্তু অভ্যাসে রাখিনা।
তার চাইতে তুমি না হয় ঝড় হয়ে এসো। এসে ভেঙেচুড়ে গুড়িয়ে দাও আমাদের সামলে রাখা অভ্যাস। উড়িয়ে দাও আমাদের নকল ভালোবাসা।