গারো পাহাড়ের গদ্যে এস এম শাহনূর (পর্ব – ২)

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া
রবীন্দ্রনাথ তাঁর যাপিত জীবনে ৭ বার আগরতলা ভ্রমণকালে ৫ বার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পদচিহ্ন রেখে গেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর জন্য দুর্ভাগ্যের সংবাদ হচ্ছে, বাংলা সাহিত্যের দিকপাল নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদধূলিতে পাঁচ বার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটি ধন্য হলেও সংস্কৃতির রাজধানী খ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সচেতন জনগণ কবিকে কোনো প্রকার সংবর্ধনা প্রদান/ সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
অখন্ড ভারতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী এক জনপদ আগরতলা। এই শহরে অখণ্ড বাংলা থেকে তরুণ রবীন্দ্রনাথ একবার দুবার নয়,সাতবার এসেছিলেন। ঐতিহাসিক তথ্য উপাত্তে জানা যায়, ১৮৬২ সালে মহারাজ ঈশানচন্দ্র মাণিক্যের মৃত্যুর পর বীরচন্দ্র সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। ১৮৯৮ সালে মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের পুত্র রাধা কিশোর মহারাজ কলকাতা ও ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হন।
➤১৮৯৯ সালের শেষের দিকে রাধা কিশোরের নিমন্ত্রণে কবি প্রথম আগরতলা আসেন । ১৯ ফাল্গুন ১৩০৬ বঙ্গাব্দে কবি তৎকালীন মোগরা কসবা-বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া,গঙ্গাসাগর রেলস্টেশনে নেমে আগরতলায় আসেন। কিশোর রবীন্দ্রনাথকে সর্বপ্রথম ‘কবি’ হিসেবে স্বীকৃতিদান করেন ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য। যাঁর কাব্যখ্যাতি তখন কেবলই পরিচিতজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়, “যে অপরিণত বয়স্ক কবির খ্যাতির পথ সম্পূর্ণ সংশয়সঙ্কুল ছিল, তার সঙ্গে কোন রাজত্ব গৌরবের অধিকারীর এমন অবারিত ও অহেতুক সখ্য-সম্বন্ধের বিবরণ সাহিত্যের ইতিহাসে অভূতপূর্ব।”☆
➤১৯০২ সাল ১৩০৮ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে কবি দ্বিতীয়বার আগরতলায় আসেন।
➤১৯০৫ সালের,বাংলা ১৬ আষাঢ়ে তিনি তৃতীয়বার আগরতলায় আসেন। পরদিন সাহিত্য সম্মিলনে সভাপতিত্ব করেন।
➤চার মাস পর চতুর্থবার কবি চৈত্র মাসে আগরতলায় আসেন। ত্রিপুরার বাজেটে পরামর্শ ও কবির শাসননীতি রাজা পরবর্তীতে প্রয়োগ করেন।
➤২৫ চৈত্র ১৩১২ বঙ্গাব্দে ১৯০৬ সালে পঞ্চমবার তিনি আগরতলায় আসেন। বরিশালে সাহিত্য সম্মিলনিতে সভাপতিত্ব করার জন্য। সেবার কবি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পদচিহ্ন রেখে যান।☆
➤১৯১৯ সালের ৫ – ৮ নভেম্বর সিলেটে সংবর্ধিত হয়ে ৯ নভেম্বর নোবেলজয়ী কবি সিলেট থেকে রেলযোগে আখাউড়া হয়ে ষষ্ঠ বারের মত আগরতলা পোঁছেন।
তখনও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কবি পদচিহ্ন রেখে যান।☆
➤সপ্তমবার ১৯২৬ সালে ঢাকা, ময়মনসিংহ, আঠারো বাড়ি হয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লায় অভয় আশ্রমে আসেন। ২২ ফেব্রুয়ারি রাত ৯ টায় আখাউড়া স্টেশনে তাঁকে শোভাযাত্রার মাধ্যমে আগরতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। মহারাজকুমার ব্রজেন্দ্রকিশোর কবিকে আমন্ত্রণ জানান। কবিকে ভারত ভাস্কর উপাধি প্রদান করেন। ১৫ মে রাজকুমারের সঙ্গে ইউরোপ ভ্রমণে যান।☆
ত্রিপুরার আঞ্চলিক রবীন্দ্রশতবার্ষিকী উদযাপন পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত “রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা” নামে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী স্মারক গ্রন্থ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরে না হলেও এ জেলায় কবিগুরুর পদস্পর্শ সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। ত্রিপুরা মহারাজার আমন্ত্রনে প্রথমবার তিনি ত্রিপুরা আসেন ১৮৯৯ সালের ২৮ মার্চ,। কবিগুরু এসেছিলেন রেলে। তখনো আখাউড়া জংশন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আসাম বেংগল রেলের ছোট একটা স্টেশন মোগরা স্টেশন হয়ে তিনি আগরতলা পৌঁছে ছিলেন।১৮৯৬ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানির অধীনে কুমিল্লা থেকে আখাউড়া রেলপথ সম্প্রসারণ করা হলে এখানে একটি রেলওয়ে স্টেশন স্থাপন করা হয় যা মোগড়া স্টেশন নামে পরিচিত ছিলো। এখন এটি গঙ্গাসাগর স্টেশন। গ্রন্থটির ৪৯ পৃষ্ঠায় বলা আছে “রেল স্টেশন মোগরা হইতে একমাত্র পথ । নৌকায়,হাতীর পিঠে অথবা পাল্কীতে পাঁচ মাইল পথ অতিক্রম করিতে হইবে। আখাউড়া রাস্তা বা আখাউড়া স্টেশন তখন ছিলনা। রাজধানীতে দুইটি মাত্র উল্লেখযোগ্য রাস্তা। রাজবাড়ীর পশ্চিমের দিঘীর পশ্চিমপাড় বাহী শকুন্তলা রাস্তা। ইহাই বর্তমান প্রসাদ তোরণের সম্মুখ দিয়া দক্ষিনবাহী রাস্তার পূর্ব্বদিকে শ্রীপাট। মহারানী তুলসীবতি বিদ্যালয়কে দক্ষিণে রাখিয়া পুরাতন পুলের উপরদিয়া বাজারে পৌঁছে। এই রাস্তা পূর্বদিকে পুরনো আগরতলার দিকে আর পশ্চিমবাহী মোগরার দিকে গিয়াছে।“ বর্তমান গঙ্গাসাগর স্টেশনকেই তখন মোগরা স্টেশন নামে ডাকা হত।