গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত আলী মঞ্জ
আমি লিয়াকত আলী মঞ্জু, বিএলএফ, গেজেট নম্বর পাবনা সদর-৫৬, লাল মুক্তিবার্তা
নম্বর – ০৩১১০১০০৬৭, এমআইএস নম্বর – ০১৭৬০০০০৪৯০, মোবাইল নম্বর – ০১৭১৫৮০৪০৩২, পিতা: মোখলেছুর রহমান, মাতা: পিয়ারা বেগম,
স্থায়ী ঠিকানা: দক্ষিণ রাঘবপুর, ওয়ার্ড নম্বর – ৪, পাবনা পৌরসভা, পাবনা।
বর্তমান ঠিকানা: ঐ।
১৯৭১ সালে আমি তৎকালীন পাবনা ইসলামিয় কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলাম। ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের পর থেকেই দিনে দিনে পাবনা শহরে নকশালদের অত্যাচার বেড়ে যাচ্ছিল। তারা এতোটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল যে, নির্বাচনের পর পরই সাঁথিয়া বেড়া অচলের গণপরিষদ সদস্য আহমেদ রফিককে নৃশংস ভাবে হত্যা করের।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর বাঙালিদের শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার আহবান জানানোর পর ছাত্রনেতা রফিকুল ইসরাম বকুল ও আহমেদ করিমের নেতৃত্বে পাবনার জেলা স্কুল মাঠে আমরা শতাধীক যুবক ছেলে সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করি। প্রশিক্ষণের মধ্যে ছিল দেশী বন্দুক ও বোমা তৈরির কৌশল, এমনকি তীর ধনুক ও প্রাক্টিস ও শুরু হলো। ১০ মার্চ আমরা সর্বস্তরের ছাত্র জনতা মিছিল করে ডিসি অফিসে গিয়ে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। পরের দিন ১১ মার্চং টাউন হল ময়দানেও স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২৫ মার্চ সন্ধ্যা বেলায় আমরা খবর পাই নক্সাল নেতা মাসুদের বাসায় তাদের একটা জরুরী সভা চলছে। আমরা তখন মাসুদের বাড়ি ঘেরাও করলে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। এই গুলিতে আমাদের পক্ষের শুকুর নামের একজন ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার পরে আমরা সেখান থেকে ফিরে এসে বাণী হলের সামনে জড়ো হয়ে শহরে যাদের বন্দুক আছে তাদের কাছ থেকে সেগুলো সংগ্রহ করতে বের হই। সে রাতে বেশ কিছু বন্দুক সংগ্রহ করার পর মধ্যরাতে আমি বাড়ি চলে আসি।
২৬ মার্চ সকালে ঘুম উঠেই দেখতে পেলাম পাকসেনারা পাবনা শহরে কার্ফু জারী করে রাস্তায় টহর দিচ্ছে। দুপুরের দিকে খবর পেলাম আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে ডিসি সাহেবের বৈঠক হচ্ছে। আমার বাবা ছিলেন পুলিশ ইনেস্পেক্টর। বিকালের দিকে উনি পুলিশ লাইনে ডিউটি করতে চলে গেলেন। পাবনার এডিসি রেভিনিউ তখন হেরাজ ম্যানশনে ভাড়া থাকতেন। সন্ধ্যার ঠিক আগে হেরাজ ম্যাসমনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আমায় ডেকে তার টুটুবোর রাইফেল ও ১০০ রাউন্ড গুলি হাতে দিয়ে বললেন, বাবা পারলে এই রাইফেল শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধে ব্যবহার করো। আগের দিন রাতে সংগ্রহ করা বন্দুক ও এডিসি সাহের টুটু বোর রাইফেল নিয়ে আমরা একদল ছেলে তখন রাজ্জাক উকিলের বাড়ির ছাদে অবস্থান গ্রহণ করি। পাকসেনারা ঐ পথে যাওয়ার সময় আমরা তাদের উপর গুলি বর্ষণ করলে শত্রুরা আমাদের উপর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু করে। তখন সেখান থেকে পালিয়ে বাড়ি এসে দেখি আমার বাবা পুলিশ লাইন থেকে ২টা ৩০৩ রাইফেল ৫০০ রাউন্ড গুলি নিয়ে এসেছে। ২৭ মার্চ সকাল থেকে পাবনা শহরের সর্বস্তরের জনতা বন্দুক ও দেশীয় অস্ত্র যথা লাঠি, ফালা, সড়কি, তীর ধনুক হাতে টেলিফোন ভবনে অবস্থানরত পাকসেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। এই খবর পেয়ে আমরা বাপ-বেটা দুজন দুটি ৩০৩ রাইফেল হতে তৎকালীন কৃষি ফার্মের পাশে পুকুর পাড়ে অবস্থান নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে গুলিবর্ষণ শুরু করি। দুপুর ১২টার সময় গাছের উপর অবস্থান নেওয়া একজন শত্রুসেনাকে হত্যা করতে সক্ষম হই। চারিদিক থেকে মুহুমর্ূহু গুলি আর হাজার হাজার লোকের জয় বাংলা স্লোগানে শত্রুসেনারা তখন দিশেহারা হয়ে পড়্।ে আরও বেশ কিছু সময় গুলি বর্ষণ করার পর তাদের তরফ থেকে গুলিবর্ষণ থেমে যায়। তখন আমরা ভেতরে ঢুকে ৭/৮ জন পাকসেনাকে হত্যা করার পর শত্রুরা সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়। সেখান থেকে আমি ও আমার বাবা ৫টা চাইনিজ রাইফেল নিয়ে বাইরে চলে আসি। বাইরে এসেই আমার বাবা অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তারপর ২৮ এপ্রিল ময়লাগাড়ি যুদ্ধ এবং ২৯ আগষ্ট তৎকালীন ইপসিক থেকে পাকসেনারা রাজশাহীর পথে যাত্রা করার পর পাবনা সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত হয়। পাবনা শত্রুমুক্ত হওয়ার পর পুরাতন টেকনিক্যালে কন্ট্রোল রুম স্থাপন করে পাবনা শহর মুক্ত রাখার কাজ শুরু হয়। শত্রুরা যাতে পাবনা শহরে প্রবেশ করতে না পারে তার জন্য কন্ট্রোল রুম থেকে আমাদের নগরবাড়িঘাটে শত্রুদের প্রতিরোধের জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু শত্রুরা ঢাকা-আরিচা ঘাট থেকে গানবোট যোগে যাত্রা করে মর্টারের গোলাবর্ষণ করতে করতে নগরবাড়ি ঘাটের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শত্রুদের মর্টারের গোলার মুখে টিকতে না পেরে আমরা নগরবাড়ি ঘাটের অবস্থান ছেড়ে পাবনা শহরে চলে আসি। ১০ এপ্রিল পাকসেনারা পাবনা শহর দখল করে নিরে আমরা গ্রামের দিকে পালিয়ে যাই।
তারপর দাশুড়িয়ার তেতুলতলা, রাজাপুর হয়ে আটঘোরিয়া এসে বাবা মায়ের সাথে গরুর গাড়ি করে গড়–লি, ফরিদপুর, সলপ তালগাছি হয়ে আমার মামার বাড়ি সোহাগপুরে এসে হাজির হই। মামার বাড়ি বেশ কিছু দিন অবস্থান করার পর আমি আবার পাবনা শহরে এসে হাজির হই। পাবনা এসে মে মাসের শেষের দিকে আমি, ভুলু বিশ্বাস, মান্নানসহ আমরা মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য ভারতের পথে যাত্রা করি। তারপুর কুষ্টিয়ার বর্ডার পর হয়ে আমরা নদীয়া জেলার কেচুয়াডাঙ্গা যুব শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করি। জুন মাসের মাঝের দিকে মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের জলপাইগুড়ির পাশের পাঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৩ দিন থাকার পর পাশের বাগডোগড়া বিমান বন্দর থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর কাগ্রো বিমানে করে আমাদের উত্তর প্রদেশের শাহরানপুর বিমানবন্দর হয়ে দেরাদুন জেলার টান্ডুয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ১ মাস প্রশিক্ষণ শেষে কলকাতার দমদম বিমান বন্দর হয়ে আমাদের ব্যারাকপুরে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে ভুলু ভাইকে ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডার করে আমাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ দেওয়া হয়। এই গ্রুপের আমি ১০ জনের লিডার ছিলাম।
অস্ত্র ও গোলাবারুদ দেওয়ার পর আমাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করা হয়। বাংলাদেশের ভেতরে এসে আমরা কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা থেকে ৩টা নৌকাযোগে চরকাতরার জফির ডালির বাড়িতে এসে সেল্টার গ্রহণ করি। সেখানে ৩ দিন থাকার পর আমরা পাবনার দক্ষিণের চর আশুতোষপুর এসে সেল্টার গ্রহণ করি।
অনন্ত মেথরপাড়া রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ ঃ অনন্তমোড়ের মেথরপাড়ায় একটা রাজাকার ক্যাম্প ছিল। আমরা ক্যাম্পের মূল গেটে অবস্থান নিয়ে আহমেদ করিমকে ক্যাম্পের ভেন্টিলেটরের ভেতর দিয়ে একটা গ্রেনেড চার্জ করতে পাঠানো হয়। গ্রেনেড চার্জের পরই সামনে থেকে আমরা মূল আক্রমন পরিচালনা করবো।অনেক সময় পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু গ্রেনেড চার্জের কোন খবর নেই। এরই মধ্যে ক্যাম্পের রাজাকার ও মিলিয়িাদের মধ্যে গন্ডোগোল শুরু হলে আমরা গুলিবর্ষণ শুরু করি। বেশ কিছু সময় গুলি বিনিময়ের পর সেখানে আমাদের কাছে ১৪ জন রাজাকার সারেন্ডার করে। তার কয়দিন পর কোবাদের পেট্রোল পাম্পে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়ে আমরা পেট্রোল পাম্প উড়ায়ে দেই।
খয়ের বাগান রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ ঃ খয়েরবাগান রাজাকার ক্যাম্প আক্রমন করে আমরা ৫ জন রাজাকারকে হত্যা করে একটা ডালার ভেতরে ৫ জন রাজাকারের কাটা মাথা নিয়ে খয়েরবাগান হাটে গিয়ে হাজির হই। একসাথে ৫ জন রাজাকারের কাটা মস্তক দেখে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আনন্দ ও ভয়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তার মাত্র কয়েকদিন পর ১৬ ডিসেম্বর আমরা স্বাধীনতা লাভ করি। যে দেশের স্বাধীনতার জন্য আমরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি, সেই বাংলাদেশকে ভালোবাসা আমাদের ইমানী দায়িত্ব।