সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৪৩)

আমার মেয়েবেলা
কলেজ জীবনের কিছু না বলা কথা
কলেজে অফ পিরিয়ড মানেই শান্তদার চিঠি। শ্যামলী পড়ত, আমি শুনতাম আবার কখনও আমি পড়তাম, শ্যামলী শুনত। এইভাবেই চলতে লাগল বেশ কিছুদিন। কখন কখন শ্যামলী চিঠিগুলো আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলত ‘উত্তর দিবি তো তুই। তুইই ভালো করে পড়। আমি বরং এদিক ওদিক একটু ঘুরে আসি’। ছটফটে মেয়ে শ্যামলী এক জায়গায় বেশিক্ষণ থিতু হতে পারে না। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে আমি একটু যাই বন্ধু। তুই তো জানিস এত কাব্য টাব্য আমার আসে না। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ওর চিঠি পড়ার মতো অত ধৈর্য্য আমার নেই। বরং তুইই পড় ভালো করে। তোকেই তো লিখতে হবে। তবে বন্ধু যাইই লিখিস আর যবেই লিখিস,, একটু ঝাক্কাস লিখিস ভাই, প্রথম চিঠি বলে কথা। একটা প্রেস্টিজের ব্যাপার।’
এমন ভাবে বলত যেন আমি বলেছি যে আজ থেকেই লিখতে বসব। যাক গে বন্ধু বলে কথা। ভালো চিঠি লিখতে পারে না। কী করবে আমার কাছে সাহায্য চেয়েছে কিছু তো একটা উপায় বার করতেই হবে।
আমি হেসে বলতাম, যা ঘুরে আয়,, দেখছি কী করা যায়। দেখছি না বন্ধু শান্তদাকে এবার একটা গুছিয়ে উত্তর দিতেই হবে। না হলে খুব রেগে যাবে এবার। একটা চিঠি লিখে দে না রে শম্পু? আর কতদিন ঝুলিয়ে রাখবি বলতো?
আমি ওর কথা শুনে চুপ করে থাকতাম। ও চলে গেলে শান্তদার চিঠিগুলো বুকের মাঝখানে ধরে সামনে গাছপালার ভিড়ে হারিয়ে যেতাম। দুপুরবেলা হলেই একটা কোকিল একঘেয়ে ডেকেই যেত। কী যে তার উত্তেজনা কী যে এত কাতরতা, একাকিত্ব বুঝতে পারতাম না তখন। মাঝে মাঝে কেমন বিরক্তি লাগত। কোনদিন হয়তো একটা নিস্তব্ধ দুপুর খুঁজছি। ভালো লাগছে না কিছু। সেই সময় ঐ কোকিল টার কুহু ডাকটা কেমন অসহ্য লাগত আমার। মনেহত যেটা ভাবতে চাইছি কিছুতেই যেন পারছি না ভাবতে,, মনটা অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে বার বার। ভালো লাগত না।
কোন কোনদিন গঙ্গার নির্জন পাড়ে বসে থাকতাম একাই। লোকজন ভর্তি নৌকোর আসা যাওয়া দেখতাম। ঐসময় এপার ওপারের জন্য একমাত্র নৌকোই ভরসা ছিল রঘুনাথগঞ্জ এবং জঙ্গিপুর বাসীর কাছে।
কোন কোন নৌকো গঙ্গায় জাল ফেলে একটু একটু করে চলে যেত অনেকদূর। আমি ওদের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে কতদূর পর্যন্ত যে তাকিয়ে দেখতাম,, হুঁশই থাকত না। পানকৌড়ির একটা দল আসত,,এরই মাঝে আবার দু চারটে বক এসে ছোঁ মেরে নিয়ে যেত তাদের খাবার। গঙ্গার পাড়ে মহিলাদের কলকলানি, কাপড় কাচা স্নান করা হাহাহিহি কখনও বা ঝগড়া,,সব দেখতাম। ভালো লাগত বেশ।
বরাবরই আমি জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখতে ভালবাসি। জীবনের অত্যন্ত সাধারণ আটপৌরে একটা ঘটনা ,নিত্যনৈমিত্যিক একঘেয়ে একটা দিনও আমার কাছে সমান গুরুত্ব পায়।
প্রথম প্রথম ওদের এমনিই দেখতাম। গঙ্গার পাড়ে বসে আছি। চোখ চলে যাচ্ছে। দেখতে হয় তাইই দেখতাম। কিন্তু পরবর্তীতে আমি দেখতাম মনোযোগ সহকারে। এক একজন মহিলা এক এক স্টাইলে স্নান করে,, কাপড় কাচে,, ঠাকুর প্রণাম করে। দেখতে বেশ লাগত আমার। কয়েকজন কে বেশ চিনেও ফেলেছিলাম। দেখলেই বলে দিতে পারতাম কতক্ষণের জন্য এসেছে। কি কি কথা বলতে পারে। সবকিছু।
কেউ কেউ দেখতাম একটা করে ডুব দিত আর হাত জড়ো করে মা গঙ্গা মা গঙ্গা বলত। বেশ অনেকগুলো ডুব দিত। বেশ ভক্তিমতী সব ডুবেই ঠাকুরের নাম। জলের ঢেউ এ কাপড় সরে যাচ্ছে খেয়াল নেই। কেমন যেন একটা আলুথালু ব্যাপার। আরে বাবা ভগবান কে ডাকছ খুব ভালো কথা কিন্তু নিজের শরীরটাকে একটু ঢেকে রাখ! তুমি ভগবানের নাম করছ বলে তো তোমার ঐ সাধাসিধে অনাবৃত আলগা শরীর কেউ দেখবে না তা তো হয় না।
ছোটবেলায় ফরাক্কায় যখন গঙ্গায় স্নান করতাম,,,
একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছিলাম বা পরবর্তীতে যখন ঠাকুমার বাড়ি এসে গঙ্গায় গেছি তখনও ঐ একই দৃশ্য আমাকে খুবই ইরিটেড করত।
কিছু লোক আছেন এই মাঝবয়েসী, একটু মোটাসোটা। বেকার। সেরকম কোন কাজকর্ম নেই।
অন্তত ঘন্টা তিন চারেকের জন্য বাড়ি থেকে গঙ্গায় স্নান করতে যাবার নাম করে বেরোন। খিটখিটে আধা বুড়ো বাড়িতে না থাকলে বাড়ির লোকেদেরও শান্তি।
এবার হলো গিয়ে সেই দু চারটে রোমান্টিক বুড়ো স্নান করার জন্য বেছে নেন মেয়েদের বা মেয়েদের কাছাকাছি কোন ঘাটকে। তখন আমাদের সময়ে মেয়েদের ঘাট বলে আলাদা কিছু ছিল না। একটা নির্জন ঘাটই মেয়েদের অলিখিত ঘাট বলেই চিহ্নিত হতো। তবে সেখানে কোন পুরুষ মানুষ স্নান করতে আসলে বারণ করার উপায় বা অধিকার কিছুই ছিল না।
এই দুটি একটি আধা বুড়োর দলের কাউকে না কাউকে কোন না কোন সময়ে দেখা যেতই। মেয়েরা স্নান করবে, মাথার জল কপাল গাল ঘাড় বেয়ে,,, ভিজে কাপড়ে ঢাকা স্বচ্ছ আধা উন্মুক্ত বুক নিতম্ব বেয়ে গড়িয়ে পৌঁছবে নির্দিষ্ট মোহনায়,,, পাড়ে দাঁড়িয়ে ভেজা চুল , ভেজা মুখ মুছবে, চুলের ঝাপটায় ভেজা মুখে বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা ,,,ভালো লাগে তো এসব,, বেশ ভালো লাগে।
আবার ভেজা শরীর ভেজা চুলের শান্ত পবিত্র মুখ একটা অন্য রকম আবেদন ও জাগায়। এসময়ও যে কোন নারীকেই নাকি লাগে চরম আকর্ষণীয়া । তা যাইহোক এইসব বিনে পয়সায় এমন লাইভলি দেখা এবং অনুভব করা মন্দ তো নয়ই, বরং মরুভূমিময় জীবনে একটুকরো সতেজ কিশলয়ের মতো। এটাই বা কম কিসের? একটা উপরি পাওনা বলা চলে।
সেইসময় নাসিরউদ্দিন শাহ, স্মিতা পাতিলের ‘চক্র’ সিনেমাটা বেশ হৈচৈ ফেলে দিয়ে ছিল। বিশেষ করে বাইরের বস্তির একটা কলে স্মিতা পাতিলের স্নানের দৃশ্য দেখার জন্যই দর্শকরা একাধিক বার টিকিট কেটেছিল।
এবং সেইসময় এইরকম একটা খুল্লাম খুল্লা উত্তেজনা পূর্ণ দৃশ্য সমাজের পক্ষে যে কতটা ক্ষতিকর সেটা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত থেকে ছিল গঙ্গার ঘাটে স্নানের নাম করে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটানো ঐ সব মহিলা পুরুষের দল।
আসলে বাস্তব জীবনে সরাসরি যা দেখি সেটা ঠিক। কিন্তু সেটাই যদি সিনেমায় দেখি উচ্ছন্নে গেলাম।
কতকিছু ভাবতাম তখন পাড়ে বসে বসে। দেখতাম অনেক কিছু,, কিছু শিখতামও।
যেমন একদিন হঠাৎ মনে হল এই প্রেমিক প্রেমিক ঠাকুরপোরা মেয়েদের ঘাটে এন্ট্রি নেয় কী করে? হাসার কিছু নয়। চিন্তা করে দেখলে এটা কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আসলে আমাকে যে সবকিছুই জানতে হবে,,তাই,,,,
আমাদের সময়ে মোবাইল ছিল না তাই অনেক সময় ছিল। তো যাইহোক একদিন বেশ সিরিয়াসলি খেয়াল করলাম।
দেখলাম প্রথমেই এরা মিষ্টি করে একটা বৌদি বলে আদরের ঠাকুরপো হয়ে যান। তারপর এনারা হাসি হাসি মুখে প্রথমে গল্প জুড়ে দেন। আলতু ফালতু গল্প। তারপর গলা পর্যন্ত ডুবে বিভিন্ন বয়সী মহিলার বিভিন্ন ভাবে স্নান এবং ভিজে কাপড়ে শরীরের পরতে পরতে ঢাকা আঢাকা প্রতিটি খাঁজ এবং ভাঁজ একেবারে চেটেপুটে দেখে,, আবার আস্তে আস্তে সরে পড়বেন সেখানে ,, যেখানে আর একজন মহিলা স্নানের উদ্দেশ্যে যখন তার কোমর পর্যন্ত ভিজিয়ে ফেলেছেন। আমি এটা জানতাম তিন চার হাত দূরে থেকে শুধু মাথাটুকু বাইরে রেখে শরীর কে ভাসিয়ে রাখা কোনো বড়ো ব্যাপারই নয়।
আবার এমন অনেক মহিলা ছিলেন কোন রকমে একটা ডুব দিয়ে ছুটতেন বাড়ি। তাদের অতো সময় থাকত না। তাড়াহুড়োয় খেয়ালই করত না যে তার শরীরটাকেও কেউ ধর্ষণ করছে। দৃষ্টি দ্বারা যৌন তৃপ্তি মেটাচ্ছে। এমন ভাবে শুধু মাথাটা বার করে রাখা থাকত, যে ওরা ভাবত ওটা একটা নারকোলের খোলা হয়তো।
কিংবা কোন কোনদিন কারোর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই বৌদি ভালো আছেন গো, শরীর ভালো তো? ব্যাস্ আর কোন সমস্যা নেই। বিকেলে ভোরের ফুল টাইপের কিংবা বসন্তের শেষ বিকেলের কোন পাতাঝরা গাছের মতো বা পশ্চিমে হেলে পড়া যৌবনবতী কোন মহিলাকে বৌদি বলার সুবিধে অনেক। বৌদি ডাকে মেয়েদের মনে একটা ভালোলাগার অনুভূতি জাগে। আর তা যদি কোন বয়স্কা মায়ের বয়সী কাউকে বলা হয়। আর দেখতে হবে না। ঠাকুর পো বলে তখন সে যে কি গলাগলি,, ঢলাঢলি শুরু হবে সেকথা আর নাইই বললাম।
শুধু কী ছেলেদের দোষ তা তো নয় মাঝ বয়েসী মহিলারাও কম যেতেন না। বাড়িঘর সংসার অতক্ষণের জন্য ছেড়েছুঁড়ে সকলের সামনে ঠাকুর পোর সঙ্গে গল্প করতে করতে অমন পিঠ বুক খুলে ঘষে ঘষে সাবান মাখার সময় তারা,, কিভাবে যে পেতেন এবং কেমন করে পেতেন সেটা তখন না বুঝলেও এখন বুঝতে পারি।
তখনও পরকীয়া চলত। তবে ঢেকেঢুকে, সে বাড়ির মধ্যেই হোক বা বাইরেই হোক। এখন পরকীয়া শুনে এমন একটা গেল গেল রব উঠেছে যেন এটা এখন এই সময়েই জন্ম নিয়েছে।
তখন মেয়েরা এখন কার মেয়েদের থেকে এসব ব্যাপারে অনেক বেশি চালাক ছিল। সারাজীবন বাড়ির বাইরে চাকরি করতে থাকা দাদার সংসার এবং বৌদিভাই বা বৌদিমণির একনিষ্ঠ ভক্ত অবিবাহিত ঠাকুরপোরাই তো সামলেছে।
ক্রমশ…