গদ্যানুশীলনে সায়ন্তী

এক অন্য কলকাতার গল্প

অতিমারীর আলোড়ন সামলে ওঠার অবকাশ মেলেনি, প্রথম ঢেউ আর পরে দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ে যখন ক্রমশ বদলে দিচ্ছিল পরিচিত সমীকরণগুলো ঠিক তখনই দেখা হয় এক রাতের কলকাতার সঙ্গে। কখন কিভাবে, সে কথা থাক !!

রাতের কলকাতা দেখেছি বেশ কিছুবার। কিন্তু কলকাতার এই রূপ দেখার সুযোগ হয়নি আগে। সেদিন বৃষ্টিতে ভেসে গেছিল শহর।। আকাশে তখনও চলছে প্রস্তুতি। রাত তখন প্রায় ১০টা।
হাতে ৩০০ প্যাকেট ভাত আর ডিমের কারী। আমাদের চারজনের পরিকল্পনার অনেকটাই তখন ভেসে গেছে বৃষ্টির জলে। কোথায় দেব, কাদের দেব, কিভাবেই বা বুঝবো কারা না খেয়ে আছে, কাদের খুব প্রয়োজন-সবটাই গুলিয়ে যাচ্ছিল !!

শুরুটা ঠিক এই ভাবেই হলো।

তবু সেদিন আমাদের বাড়ি ফিরে আসার কথা একবারও মনে হয়নি। সমস্তটা ভুলে একটা জেদ চেপে বসেছিল। নিজেদের চোখেই দেখতে চেয়েছিলাম সবটা।

গাড়িতে বসে কিছুই চোখে পড়ছিল না। মুষলধারে বৃষ্টিতে সামনের রাস্তাটাই দেখা যাচ্ছিল না মানুষ তো অনেকদূর। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল এই বৃষ্টিতে বেরোনোই ঠিক হয়নি !!

কিন্তু একটা প্রশ্ন ঘুরছিল মাথায়, ওরা কোথায় ! একটা রোদ মাখা শহরে ফুটপাত জুড়ে যারা বসে থাকে, বাচ্চারা খেলে, হাত নাড়ে ওরা বৃষ্টি হলে কোথায় যায় , কোথায় থাকে !!

একটা চাপা নেশা নিয়েই শুরু হলো আমাদের শহর অভিযান ! গাড়িতে বসে হবে না ! তাই হেঁটে দেখার পালা। ছাতা দিয়ে এই বৃষ্টিকে ধরা যাবেনা, সে চেষ্টাকে জলাঞ্জলি দিয়ে ফুটপাত জুড়ে ঘুমিয়ে পড়া ছোট ছোট ঝুপড়িতে উঁকি দিলাম। আর একবার ওই মাঝ রাতেই চিৎকার করে বললাম “খাবার আছে খাবে ?” জাস্ট একটা বাক্যে বদলে গেছিল সবটা। আসলে খালি পেটে ঘুমও হয়না!! খিদের জ্বালা যে সত্যি বড় জ্বালা !!

সেদিন বৃষ্টি মাখা রাতের কলকাতা বদলে গেছিল এক নিমেষে।। উঁকি দিতে শুরু করলো কত ক্ষুধার্ত মুখ, না দেখলে বিশ্বাস হয়না। তখন শুরু হয়ে গেছে ওদের চিৎকার “ডিম ভাত আছে ডিম ভাত…” !!
ক্রমশ জেগে উঠছিল কলকাতা অসময়ে, মুষলধারে ঝরে পড়া বৃষ্টির আওয়াজকে হার মানিয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল ডিম ভাতের উপচে পরা সুখ….
…”ডিম ভাত আছে ডিম ভাত…”

সেই রাতে প্রবল বৃষ্টিতে হয়নি কোনো কমিউনিটি কিচেন।। আমরা দেখছি….দেখছি …. ঘুমিয়ে থাকা কলকাতাকে। ওরাও বৃষ্টি মাখে, ওরাও ঘুমায় কিন্তু খালি পেটেই।

ওটা ছিল শুরু, এরপর আর থামতে হয়নি। তখন আমাদের মাথায় শহর দেখার নেশা। ফুটপাথ, কোনো শেডের তলা, ঘুমিয়ে থাকা ঝুপড়ি, রেল স্টেশন, প্লাস্টিক মোড়া মানুষ সমস্তটা চাঙ্গা হয়ে গেছে শুধু একটা ম্যাজিক কথায় …” খাবার আছে খাবার ..”

মাঝরাতেও একজায়গাতে খবর হতেই অন্য জায়গা থেকে ছুটে এসেছে মানুষ। এক একজন নিয়ে বলেছে “..ঐদিকে যাও, ওরাও খায়নি..”
কেউ বলেছে “আমাকে আর একটা দে, দুদিন বৃষ্টিতে কেউ আসেনি…”

আমরা সেদিন ছুটেছিলাম কলকাতার একদিক থেকে অন্যদিক। সবটা শেষ হতে হতে হয়েছিল রাত ৩টের বেশি । অতো রাতেও কিছু বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় জেগে ছিল আমাদের জন্য, বারবার call/sms আসছিল “সব ঠিক আছে?” “বাড়ি ফিরলি?” “কিছু খেয়েছিস”..!!

সেদিন রাতে আমরাও কিছুই খাইনি। আসলে এই কলকাতাকে দেখলে কিছুই খাওয়া যায়না। তবু আমাদের নিয়ে ভাবার কত মানুষ !! সেখানে রাগ, অভিমানের কত জায়গা ! কিন্তু খালি পেটে তো এসব কিছু আসেনা।

এই বৃষ্টি ভেজা কলকাতা নিয়ে কবিতা লেখা যায়না, এই কলকাতা আদৌ কতটুকু স্বপ্ন তৈরি করতে পারে তাও জানা নেই। তবু কলকাতা প্রাণের শহর। আমাদের এত মানুষের শহর, অনেক ক্ষেত্রে আমাদের এত এত অপ্রয়োজনীয় খরচ সামলে যদি মাঝে মাঝে এক একটা দিন ডিম ভাতের সুখটাও কিছু মানুষকে দেওয়া যায়, ক্ষতি কি ! আমার শহর হয়তো তাতে আরো বেশি আপন হবে !!

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।