T3 || নারী দিবস || সংখ্যায় বিজয়া দেব

আজকের নারী
সেদিন বিয়েবাড়িতে যখন ঢুকছি দেখলাম বিবাহভবনের সাজানো প্রবেশদ্বারের দু’দিকে দুটি মেয়ে থালায় ফুল ও প্রদীপ নিয়ে দাঁড়িয়ে অভ্যাগতদের স্বাগত জানাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম এইটি কি মিঃ অনিরুদ্ধ ঘোষালের বৌভাতের পার্টি? দুজনেই পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। একজন বলল – ঠিক জানি না। আশ্চর্য হলাম। অভ্যাগতদের স্বাগত জানানোর জন্যে এরা দাঁড়িয়ে অথচ এই মৌলিক ব্যাপারটি এরা জানে না! অদ্ভুত তো! ইতস্তত করছি। খুব মুশকিল। এই বিবাহভবনে অন্তত তিনটি বৌভাতের পার্টি হচ্ছে। পেছন থেকে এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন- হ্যাঁ এটাই মিঃ ঘোষালের। যান ভেতরে যান।
মেয়েদুটি খানিক অপ্রস্তুত।
যেখানে ‘দাঁড়িয়ে আমি’ কিংবা ‘বসে আমি’ সেখান থেকে প্রবেশদ্বারটি দেখা যাচ্ছে। মেয়েদুটি ঠায় দাঁড়িয়ে। অভ্যাগতদের মিষ্টি হাসি পরিবেশন করে চলেছে।
প্রায় ঘণ্টাদুয়েক গল্প করে সৌজন্য বিনিময় করে খেয়েদেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে যখন বেরিয়ে আসছি তখন আবার এদের দিকে চোখ পড়ল। তেমনি ঠায় দাঁড়িয়ে।
জিজ্ঞেস করলাম – যদি কিছু মনে না করো কিছু প্রশ্ন করি?
ডানদিকের মেয়েটি বলল – বলুন।
বললাম – কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছ?
মেয়েটি বলল – সন্ধ্যে ছ’টা থেকে।
বললাম – ক’ টা পর্যন্ত দাঁড়াতে হবে?
-রাত দশটা।
-তোমাদের কষ্ট হচ্ছে না?
-হচ্ছে। কিছু করার নেই।
-কত পাবে?
-আশা করছি পাঁচ হাজার পাব।
-আশা করছ? সঠিক করে কিছু স্থির হয়নি?
-হয়েছে আবার হয়নি। সে অনেক ব্যাপার।
আর প্রশ্ন করা গেল না। অতিথি দরজায়। সরে এলাম। বেরিয়ে এলাম।
“সে অনেক ব্যাপার” টি বুঝে উঠবার সময় হল না।
গল্পটি হয়ত কিছু কিছু মেয়ের গল্প। গল্পটি হয়ত আবছায়ার, ধূসরতার গল্প। গল্পটি হয়ত অতি সাধারণ দুটি মেয়ের গল্প। এতই সাধারণ যাদের আমরা দেখি যাদের গোছানো রূপ আমাদের মুহূর্তের জন্যে মুগ্ধ করে, আমাদের যৌনতা পলকের জন্যে জেগে ওঠে, আমরা পুলকিত হয়ে উঠি পরমুহুর্তে ভুলেও যাই। জীবনের অজস্র তরঙ্গের ভেতর একটি ক্ষীণ তরঙ্গ মিলিয়েও যায়। চোখেই পড়ে না কত কত প্রচ্ছন্ন যুদ্ধ ছায়াশরীরে আমাদেরই অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। নিজেদেরকে আমরা এই গভীর গোপন কঠোর লড়াই থেকে আলাদা করে নিতে পারি না। জীবনের পরতে পরতে কত স্তর, প্রতিটি স্তরের কোন পর্যায়ে কীভাবে মেয়েরা কালযাপন করছে তা অনেকসময আলোয় আসে না। আবেগ দিয়ে তাই আজও নারীদিবসকে দেখতে পারি না। যতদিন যুদ্ধ ততদিন নারীদিবসকে রক্তিম স্যালুট।