সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ১৩)

দেবমাল্য

এবার ও একাই আসছে। সঙ্গে যে কত কী আনছে, তা ও-ই জানে। তার ওপরে আবার সামশের ওকে ট্রেনে তুলে দিয়ে গেছে। তানিয়া যদি ঢাউস ঢাউস দশটা লাগেজও নেয়, ও বউদিকে একবারের জন্যও কিছু বলবে না। উপরন্তু দ্বিগুণ উৎসাহে সেগুলো ট্রেনে তুলে দেবে। দেবমাল্য মনে মনে বলল, ওর সঙ্গে যদি একটার বেশি দুটো লাগেজ দেখি না… তাতে যাই-ই থাক না কেন, আমি দেখব না, প্লাটফর্মে রেখেই চলে আসব।
গজগজ করতে করতে হোটেল থেকে বাইরে বেরিয়ে এল ও। না, এখনও গাড়ি আসেনি। ক’টা বাজে এখন! আজকাল ঘড়ি পরার চল উঠে গেছে। আগেকার দিনে শ্বশুরমশাই যতই গরিব হোক না কেন, বিয়েতে আর কিছু না দিক, জামাইকে অন্তত ঘড়ি-আংটি-সাইকেল দেওয়াটা ছিল ন্যূনতম যৌতুক। মাধ্যমিকে ভাল রেজাল্ট করলে বাবার কাছে ঘড়িই আবদার করত ছেলেমেয়েরা। সেই ঘড়ি কবে যে তার কৌলীন্য হারিয়ে ফেলল বোঝা গেল না। এখন তো একেবারেই ব্রাত্য।
দেবমাল্য পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখল, এখনও গাড়ি আসার সময় হয়নি। ফুরফুর করে ঠান্ডা হওয়া দিচ্ছে। এখানে যতই গাড়ি-ঘোড়া চলুক, চারদিকে প্রচুর গাছপালা থাকায় এখানকার বাতাস খুব মিষ্টি। শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে। রাতে ভাল ঘুম হয়নি। এখন কেমন যেন ঘুম ঘুম পাচ্ছে। ও বেশ জোরে জোরে বুক ভরে শ্বাস নিল।
এখনও বেশ অন্ধকার অন্ধকার। ও ফুটের চায়ের দোকানের মাটির দাওয়ায় বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে একটা কুকুর। এটাই বোধহয় গতকাল বিকেলে তার পেছনে ঘুরঘুর করছিল। পুরো এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে দিয়ে রেহাই পেয়েছিল সে। কুকুরটা তখন মহানন্দে লেজ নাড়ছিল। ও একটু এগিয়ে গিয়ে পেছন ফিরে তাকিয়েছিল। কুকুরটা তার পিছু পিছু আসছে কি না, দেখার জন্য। তখন দেখে, ওই বিস্কুটগুলো তার বাচ্চারা হুড়োহুড়ি করে খাচ্ছে। আর ওই কুকুরটা তখন আর একজন ট্যুরিস্টের পেছনে ঘুরঘুর করছে। যেন বলতে চাইছে, আমাকে কিছু কিনে দাও। দেবমাল্য বুঝতে পারল না, ওরা কী করে বোঝে, কে বেড়াতে এসেছে আর কে স্থানীয়। কারণ, তু তু করলেও স্থানীয় কারও পেছনেই ও যাচ্ছিল না।
ওর হঠাৎ মনে হল, একটু চা খেতে পারলে হত। কিন্তু আশপাশে কোনও দোকান খুলেছে বলে ওর মনে হল না। কখন খুলবে কে জানে! তবে স্টেশনে গেলে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। হঠাৎ দূর থেকে অন্ধকার ভেদ করে গাড়ির দুটো হেডলাইটের আলো এসে ঠিকরে পড়ল। ও বুঝতে পারল, এটা তার জন্যই আসছে। এলেই বলতে হবে, ঘুরিয়ে নিন।
‘ঘুরিয়ে নিন’ বলবে কী! জানালায় উঁকি মেরে দেখে যে চালাচ্ছে, সে তার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। মনে হয় সবেমাত্র গোঁফের রেখা উঠেছে। গাড়ি ঘুরিয়ে নিতেই, পেছনের সিটে নয়, একদম সামনের দরজা খুলে ড্রাইভারের পাশে বসে পড়ল দেবমাল্য। বসামাত্রই গাড়ি ছুটতে লাগল। জানালার কাচ নামানো। হু-হু করে হাওয়া ঢুকছে। এখান থেকে বহরমপুর কোর্ট স্টেশন পাক্কা দশ কিলোমিটার। যেতে যথেষ্ট সময় লাগবে। ততক্ষণে চোখ বন্ধ করে একটু ঘুমিয়ে নিলে হয়। ও আলতো করে শরীর ছেড়ে দিল।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।