স্মরণে লতাজী তে অমিত মজুমদার

ক্যারাম ও একটা বিকেল

আমি তখন খুব ছোটো। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। সময়টা ১৯৮৯ সাল। চলচ্চিত্র বা তার গান কোনোটাই হাতের মুঠোয় তো দূরের কথা নাগালের ধারেকাছেও আসেনি। গান শোনার জন্য বাড়ির রেডিও আর টেপ রেকর্ডার ভরসা। আর ভরসা রাস্তাঘাটে কখন কোথায় মাইক বাজবে। গান শুনতে খুব ভালো লাগতো। একদিন বাড়িতে একটা নতুন ক্যাসেট দেখলাম। আমার মামা ক্যাসেটটা রেখে গেছিলেন। ক্যাসেটের ইনলে কার্ডের গায়ের ছবি পছন্দ হলো না বলে সরিয়ে রেখে দিলাম। ছবির কাউকেই চিনি না। ক্যাসেটে সিনেমার পোস্টারের মতো ছবি না থাকলে কেনো জানি না সেই ক্যাসেট চালাতে ইচ্ছে করতো না৷ কয়েক দিন পর এক বিকেলে ক্যারাম খেলার সময় দেখি এক বন্ধু গুনগুন করে একটা গান গাইছে। “দিল কি বিনা রশি বিনা মানি না”। নতুন কোনো গান শুনলেই সেই গানটা বন্ধুটা গুনগুন করতো। তবে কোনো ক্ষেত্রেই গানের কথা ঠিক থাকতো না। তবে সুরটা মোটামুটি ঠিক থাকতো। সে গানের কথা ভুল গাইছে বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু সুরটা বেশ ভালো লাগলো। কিন্তু তাকে জিজ্ঞাসা করেও গানটার ব্যাপারে কোনো খোঁজ পেলাম না। তখন সাধারণত কোনো উৎসব কিংবা পুজো প্যান্ডেলে আমরা নতুন গান শুনতাম। গানের সুরটা মনে গেঁথে গেলো। কয়েকদিন পর রাস্তায় কোথাও সেই গানটা শুনলাম। গানের কথা এবার পরিস্কার হলো। খোঁজ নিয়ে জানলাম এই গান সেই ক্যাসেটে আছে যেটা আমি কিছুদিন আগে বাতিল করে রেখেছি। নিজের বোকামিতে নিজের ওপর খুব রাগ হলো। ঘরের মধ্যেই গানটা আছে আর সেই গান কিনা এত দিন হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি। বাড়ি ফিরেই ক্যাসেট হাতে নিয়েই টেপ রেকর্ডারে চালিয়ে দিলাম। আহা! এই প্রথম মন দিয়ে শুনলাম গানটা। একবার দুবার না। পরপর অনেকবার। এটা একটা সিনেমার গান। যার নায়ক নায়িকা নতুন৷ ক্যাসেটে অপরিচিত লোক দেখেই সেটা সরিয়ে ফেলেছিলাম। সিনেমার নামও অপরিচিত। তখন কি আমি জানতাম এই সিনেমা আর তার প্রতিটা গান কালজয়ী হতে চলেছে কিংবা সেই ছবির নায়ক আগামী তিন দশক জুড়ে বলিউডে রাজত্ব করবে। হলোও তাই। ছবির নাম ‘ম্যায়নে প্যার কিয়া’। গানটা ছিলো “দিল দিওয়ানা বিন সাজনাকে মানে না”। গানটি গেয়েছেন লতা মঙ্গেশোকর। গায়িকার নাম শুনেছি। বেশ কিছু গানও শুনেছি। অনেক ভালো লাগা গানও আছে সেই তালিকায়। কিন্তু তাঁকে আমি নতুন করে চিনলাম এই গান থেকেই। এছাড়াও আতে যাতে, আজা সাম হোনে আয়ী, কবুতর যা যা যা কিংবা আয়া মৌসম দোস্তি কা। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গানের মধ্যে দিয়ে আরও ভালো করে তাঁকে জানলাম। তিনি আমাদের সময়ে উঠে আসা কোনো গায়িকা নয় অথচ তিনি হয়ে উঠলেন আমার প্রিয় গায়িকা। আমার বাবা মায়ের জন্মের আগে থেকে তিনি গান গাইছেন। আমি যখন তাঁকে অনুভব করলাম তখন তিনি আর গায়িকা বা সংগীতশিল্পী নন। তিনি তখন কিংবদন্তী। সেই সময়েও তিনি চুটিয়ে গান করে চলেছেন। ১৯৮৯ সালে তাঁর বয়স ৬০। ১৯৯৪ সালের ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’ বা ১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ ছবি মুক্তির সময় তাঁর বয়স ৬৬। আবার ১৯৯৭ তে ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ ছবি মুক্তির সময় বয়স ৬৮। সেই গানগুলোও কালজয়ী। ওই বয়সে এটা ভাবা যায় ? একজন কিংবদন্তী ছাড়া কার পক্ষেই বা সম্ভব ? আমাদের ছোটোবেলা থেকে বড়বেলা পর্যন্ত জুড়ে ছিলেন তিনিই। আজও আছেন। আজও চোখের সামনে ফুটে ওঠে ১৯৮৯। ক্যারাম খেলার সেই বিকেল। এখনও কানে ভেসে আসে “দিল দিওয়ানা বিন সজনাকে মানে না”৷

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।