সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৩৬)

আমার মেয়েবেলা
আশির দশক। বারো ক্লাস পাশ করে নিত্য নতুন শাড়ি পরে কলেজ যাচ্ছি। মায়ের কিছু শাড়ি নিয়ে এসেছি। কিছু ঠাকুমার সাদা শাড়ি। কিছু কাকিমা জ্যেঠিমা পিসির কাছ থেকে চেয়ে চিন্তে যাহোক একটা ম্যানেজ ট্যানেজ করে কোনমতে চালাচ্ছি। আমি খুব ছোট্ট থেকেই শাড়ি পরি। তাই যেকোনো শাড়িই আমার সুন্দর করে পরতে অসুবিধে হয় না। ঠাকুমার সাদা শাড়িই এমন সুন্দর করে পরে যেতাম যে সব বন্ধুরা বলত শম্পা তোকে দারুন লাগছে। খুব সুন্দর শাড়িটা।
আসলে আমি তখন থেকেই জানতাম যে কোন একটা সাধারণ শাড়িই পরিপাটি করে পরতে পারলে অসাধারণ হয়ে যায়। এটা শিখেছিলাম আমার স্কুলের আর বি দির কাছ থেকে। উনি সাধারণত সুতির ছাপা শাড়িই পরতেন। কিন্তু ইস্ত্রি করা পাটভাঙা শাড়ি পরে যখন ক্লাসে ঢুকতেন। তখন আমরা সবাই পাগল। তবে সবাই পাগল হতো কিনা জানিনা। আমি তো পাগল হয়ে যেতাম। কী যে অসাধারণ লাগত দিদিকে কী বলব। তখন থেকেই বুঝেছিলাম সুন্দর করে শাড়ি পরা আমায় যে করেই হোক শিখতেই হবে।
আমার কোন একটা জিনিস যদি ভালো লেগে যায়। তাহলে সেটা আমি শিখেই ছাড়ি। আমার কোন ইগো নেই। যে কোন ব্যাপারে ছোট বড়ো সবাইকেই আমি আমার দিদিমণি বানাতে এক মুহূর্তও সময় নিই না। দিদিকে খুব ফলো করতাম। কেমন ভাবে শাড়িটা পরেছেন। কুঁচি টা এত সুন্দর হয় কীভাবে।
পরবর্তীতে আমি যখন কলকাতায় চলে আসি তখন হোস্টেলের একটা বড়ো দিদির কাছ থেকে শিখেছিলাম। আমার সকালে কলেজ ছিল। আর ঐ দিদিটার বেলায়। ও শাড়ি পরলেই আমি গুটিগুটি পায়ে তার সামনে হাজির হতাম। ওকে হেল্প করতাম। বাবু হয়ে বসে শাড়ির কুঁচি ধরতাম। পিছনে গিয়ে আঁচলের প্লিট পাট করে দিতাম। ঐ দিদিটা খুব সুন্দর করে শাড়ি পরতে পারত। এভাবে কদিনের মধ্যেই আমিও খুব ভালো শাড়ি পরতে শিখে গেলাম। যেটুকু খামতি কলেজে ছিল। কলকাতায় ল পড়তে এসে সেটা পূরণ করে নিলাম।
ছোটবেলা থেকেই যে কোন ব্যাপারে আমার খুব উৎসাহ ছিল। সব কিছু শিখতে চাইতাম। এমন ভাবে নিজেকে তৈরি করে ছিলাম যেন আমি কোনদিন না বলি, যে এই কাজটা আমি জানি না। পারি না বা পারব না বলতে একদমই পছন্দ করতাম না। মা বলেছিল কোনদিন পারি না, জানি না বলবি না। আগে কাজটা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়। দেখবি কাজটা করতে করতে শিখে যাবি। আমরা কি সব শিখে এসেছিলাম? কাজ করতে করতে শিখে গেছি। আমার মা ভীষন গুণী মহিলা ছিল। সব কিছু পারত আমার মা। ইলেকট্রিকের কাজও। তখন আমাদের গ্যাস ছিল না। উনুন আর হিটারে রান্না হত। রান্না করতে করতে হয়তো হিটার টা খারাপ হয়ে গেল। কয়েলটা জ্বলে গেল। মা ঠিক একটা কাঠের পিঁড়িতে বসে স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে কয়েল জোড়া দিয়ে দিত। এই করতে গিয়ে দু চারবার শক ও খেয়েছে। আমাকে বলত তুই দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখ আমি কীভাবে করছি। আমি একবার দুবার ট্রাই করেছিলাম। শক্ খেয়ে আর ও পথে যাই নি।
যাইহোক যা বলছিলাম জানার ক্ষিদে, শেখার ক্ষিদে আমি আমার বাবা মা’র কাছ থেকেই পেয়েছিলাম।
এখনও মনে আছে আমার বয়স তখন এই এগারো বারো। মা আমাকে ইলিশ মাছ কাটা শিখিয়ে ছিল। ইলিশ মাছের মুড়োতে পৈতে খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলে কান মোলাও খেয়েছিলাম। তখন আমার এতটুকুও রাগ হয় নি। মনে হয়েছিল মাছকাটা আমাকে শিখতেই হবে। আমি না হলে হেরে যাব। মা বলেছিল সামান্য মাছকাটাই পারছিস না তুই বড়ো হয়ে কী করবি?
মাছ কাটতে শেখার আর একটা বড়ো কারণ ও ছিল। যেটা আমি কোনদিন বাবা কিংবা মা কেও বলিনি। আমি বাবাকে রিলিফ দিতে চেয়েছিলাম।
মা সকালে স্নান করত। স্নান করার পর মাছ কাটতে চাইতো না। বাবা তাই খুবই সকাল সকালই বাজার যেত। যেদিন পরে বাজার যেত মাকে বলত তোমাকে আর কাটতে হবে না। আমিই কেটে দিচ্ছি। বাবা বটি নিয়ে মাছ কাটতে বসলেই আমি বাবার কাছে এসে দাঁড়াতাম। যদি কিছু দরকার লাগে বাবার। জল নিয়ে বসে থাকতাম। বাবাকে মাছ ধোয়ার জন্য উঠতে না হয় সেইজন্য। আমার ঠিক পছন্দ হতো না। আমি বসে থাকব আর বাবা মাছ কাটবে এটা ঠিক নয় বলে আমার মনে হতো। কোন কোন দিন হাত কেটে যেত বাবার। কী রক্ত বেরোত বাপরে।
ঠিক এই কারণেই মায়ের কানমলা মুখ ঝামটা সহ্য করেও আমি দেখতে দেখতে একদিন দুর্দান্ত মাছ কাটা শিখে গেলাম। ন দশ কেজির মাছ কাটা আমার কাছে কোন ব্যাপারই ছিল না। শ্বশুর বাড়িতে আমার এক ভাই এর মাছ ধরার নেশা ছিল। ও মাছ আনলেই বটি নিয়ে বসে পড়তাম। সে এক এডভেন্চার। নড়বড়ে বটি নিয়ে আমি শাড়ি গুটিয়ে মাছ কাটতে বসেছি। আমার শাশুড়ি মাও কাটতেন। আমরা দুজনে ই খুব মাছ কাটতে ভালোবাসতাম। তাই মাছ কাটা টাকে আমাদের একটা কাজ বলেই মনে হতো না।
সেইসময় আমার ননদ কোমরে হাত দিয়ে সমানে বলেই যেত কী দরকার কাটার। বাজার থেকে কাটিয়ে আনলেই হয়। ও আবার মাছ কাটতে জানে না। শহরের মেয়ে তো সাত খুন মাফ।
তবে এখন ভাবি ভাগ্যিস মাছ কাটা শিখেছিলাম! আমার শ্বশুর বাড়িতে প্রথম ইলিশ মাছ আসলে ইলিশ মাছকে সিঁদুর পরিয়ে শাঁখ বাজিয়ে বাড়ির বৌকেই কাটতে হয়। আবার মনসা পুজোর সময় মনসা ঠাকুরের মাছও বাড়ির বৌকেই কাটতে হয়। আগে আমার শাশুড়ি মা কাটতেন। এখন আমি কাটি। বাবাকে হেল্প করতে গিয়ে মাছ কাটা শেখাটা আমার কাজে লেগে গেল। শ্বশুর বাড়িতে জানিনা বলাটা ভীষন চাপের, ভীষন অসম্মানের। বিশেষ করে পুরোনো বনেদি কুসংস্কারাচ্ছন্ন একান্নবর্তী পরিবারে।
তবে আমি কোন কাজকেই একাল সেকালের বাঁধনে বাঁধতে চাই না। বড়ো মেয়েকে একটু একটু করে শেখাচ্ছি। সব কাজই শিখে রাখা ভালো। কখন কোথায় কীভাবে দরকার লাগে,,,