সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ২২

মর্তকায়ার অন্তরালে

||২২||
হায়দ্রাবাদে তাঁর শয়ন কক্ষটিকে একটি ছোটোখাটো গ্রন্থাগার বলা যেতেই পারে | ঘরটিতে বই ছাড়া ওনার একটি ছোটো বিছানা ও পড়াশোনার জন্য একটি চেয়ার টেবিল ছিল |

তিনি পড়াটাকে যে আত্মস্থ করতেন, যার কথা পূর্বেই উল্লেখ করেছি তার সমর্থন পাই স্বামী অমরানন্দের স্মৃতিচারণায় | ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে স্বামী অমরানন্দ ভারতবর্ষে এসেছেন | তিনি এসেছেন কাশীপুরে স্বামী রঙ্গনাথানন্দজি মহারাজকে প্রণাম করতে | তিনি তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখছেন :”আমি যেতেই আমাকে দীর্ঘসময় ধরে নানান যুক্তি দিয়ে কেন সুইজারল্যাণ্ডের চেয়েও জার্মানি বেদান্তের ভাব রোপনের জন্য অধিকতর উর্বর জমি তা বোঝাতে লাগলেন | দেখতে দেখতে ঘণ্টা তিনেক কেটে গেল | যেন উভয় দেশের ভূপ্রকৃতি, ইতিহাস, মানুষ ও তাদের ভবিষ্যৎ মতিগতি – সবই তার নখদর্পনে |”৮ এখানে তাঁর পড়াশোনার সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রসূত দূরদর্শিতার সংমিশ্রণ ঘটেছে |

এই তো গেলো মহারাজের ব্যক্তিগত পড়াশোনার কথা | এর সঙ্গে সমান্তরালভাবে চাইতেন অপরেও পড়াশোনা করুক | তৈত্তিরীয় উপনিষদে বলা হয়েছে : “স্বাধ্যায় প্রবচনাভ্যাম ন প্রমদিতব্যম |” অর্থাৎ নিজে শেখা আর অপরকে শেখানো পরিত্যাগ করো না | স্বামী রঙ্গনাথানন্দজি মহারাজ ছিলেন এর জীবন্ত উদাহরণ | স্বামী অনন্যানন্দ মহারাজকে তিনি বলেছিলেন :”তোমাকে উপনিষদ ও স্বামীজির রচনাবলী অবশ্যই পড়তে হবে |”

ভারতে বিবেকানন্দ, শ্রী শ্রীঠাকুর, শ্রী শ্রীমা ও স্বামীজির সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করুক প্রত্যেক দীক্ষার্থী এই বিষয়ে তাঁর কড়া নির্দেশ ছিল | মহারাজ অপরকে বার বার বই পড়ার জন্য বলতেন | বলতেন : “বই পড়লে ব্যক্তিগত জীবনে পরিবর্তন আসবে, পরে সমাজের ও দেশের সার্বিক উন্নতি হবে |” ব্রহ্মচারীদের মধ্যে যাঁরা গীতা মুখস্থ করতে পারতেন তাদের তিনি ‘স্বামীজির বাণী ও রচনা’ উপহার দিতেন |

স্বামী তথাগতানন্দের লেখা ‘রামায়ণ কথা’ বইটি উদ্বোধন কার্যালয় থেকে প্রকাশিত হবার পর একটা কপি স্বামী রঙ্গনাথানন্দজি মহারাজের কাছে পাঠানো হয় | পাঠ প্রতিক্রিয়া স্বরূপ মহারাজ একটি চিঠি পাঠান | মহারাজ লিখেন : “….বইটির কিছু অংশ পড়বার পর আমি এতটাই মুগ্ধ হই যে ধীরে ধীরে আরও কয়েক পাতা পড়ে ফেলি | পুস্তকটির প্রত্যেকটি লাইন পাঠ করে আমি অত্যন্ত আনন্দ পাই | ……তোমার প্রাপ্য প্রশংসা থেকে তোমাকে বঞ্চিত করব না বলে এই কয়েকটি লাইন লিখলাম |”৯

‘বেদান্ত কেশরী’ পত্রিকার বাৎসরিক চাঁদা ছিল তিন টাকা | মহারাজ ঐ পত্রিকাটির জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করতেন | পুনে থেকে এক ভদ্রলোক সামান্য টাকার জন্য মহারাজকে এভাবে কষ্ট করতে নিষেধ করেছিলেন এবং তিনি পাঁচশো গ্রাহকের প্রয়োজনীয় অর্থ দিতে চেয়েছিলেন | মহারাজজি উত্তরে জানান : “না না, আমি শুধু টাকা চাই না, আমি চাই যে অনেক অনেক লোক পত্রিকাটি পড়ুক |”১০

মহারাজজি যে শুধু নিজে বই পড়তেন অথবা অপরকে পড়তে বলতেন কেবল তাই নয়, তিনি নিজে একজন শক্তিশালী লেখক ছিলেন | ওনার লেখা বইগুলি হলো : ‘The christ We Adore’, ‘The Essence of Indian Culture’, ‘Bhagawan Buddha and our Heritage’, ‘Vedanta of Science’, ‘Indian philosophy of Social Work’, ‘Elernal Valuse for a changing Society ( four volumes), ‘The Message of the Upanishands’, ‘Science and Religion’, ‘The Science of Human Energy Resources’, ‘Polities and Administration for Total Human Develpment Vedanta and the Future of Mankind’.

মহারাজের কাছে work ই worship | বক্তৃতা দেওয়াকে তিনি ভগবানের পূজা বলেই ভাবতেন | এইজন্য তিনি পড়ে যাওয়ার ভয় পেতেন না | বক্তৃতা যে পূজা এইরকম একটি ভাব ইলা বসুর স্মৃতিকথায় ধরা আছে | “স্বামী রঙ্গনাথানন্দজি প্রত্যেক বছর বস্টনে আসতেন তাঁর ধার্মিক বক্তৃতা দিতে | একবার উনি বস্টনে এসে খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন | ওনাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় এবং শরীরে জল জমে যাওয়ার জন্য Intravenous fluids দিতে হয় | কিন্তু বক্তৃতার দিন উনি অ্যাম্বুলেন্সে নার্সকে সঙ্গে নিয়ে মঞ্চে উপস্থিত হন | তখনও তাঁর হাতে saline চলছে | বক্তৃতা দেওয়ার পরে আবার হাসপাতালে ফিরে যান |”১১

খুদে পড়ুয়াদের জন্য তিনি Vivekananda Study Circle ( Junior) গঠন করেন | প্রথমদিকে এর নাম ছিল ‘গল্প আসর’ | প্রতিমাসে একবার করে ‘স্টাডি সার্কেল’ এর সদস্যরা মিলিত হয়ে অনুষ্ঠান করবে | মহারাজজি ভেবেছিলেন, এই ‘স্টাডি সার্কেল’ শিশু-কিশোরদের চরিত্র তৈরি করবে, জীবন গঠন করবে | মহাপুরুষদের জীবনী-বাণী তাদেরকে অনুপ্রাণিত করবে |

মহারাজজি একটা কথা প্রায়ই বলতেন, তা লিখে এই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষ করব | “Knowledge will prevail.Go to knowledge.”

তথ্যপ্রাপ্তি :
১| স্বামী রঙ্গনাথানন্দ : জীবন ও ব্রত, পরিবেশক- রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিউট অব কালচার২০০৯, পৃঃ৪১ ২|ঐ, পৃঃ১৩৭ ৩|ঐ,পৃঃ৪১ ৪|ঐ, মহাজীবনের সংস্পর্শে: স্বামী বেদস্বরূপানন্দ, পৃঃ২৩৫ ৫|ঐ, মঠের উদ্দেশ্যে এক ছুট লাগালাম: প্রবাজিকা শ্রীকান্তপ্রাণা, পৃঃ৩১১-১২ ৬|ঐ, স্মৃতিপুষ্প কুড়িয়ে একটি স্মৃতিমালা: স্বামী ঋতানন্দ, পৃঃ২০১ ৭|ঐ, এক মহান জীবনালেখ্য, পৃঃ৮০ ৮|ঐ, যেন চিন্তারূপী ভগবান আমাতে প্রবেশ করলেন : স্বামী অমরানন্দ, পৃঃ১৭৩ ৯|ঐ, এক বিচিত্র গৌরবময় জীবন : স্বামী তথাগতানন্দ, পৃঃ১২৮-২৯ ১০|ঐ, আমার ইচ্ছা তুমি এখানে এসো : স্বামী অনন্যানন্দ, পৃঃ৯৭ ১১|ঐ, অহৈতুকী কৃপা : ইলা বসু, পৃঃ৪৪০

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।