মার্গে অনন্য সম্মান চিত্রাভানু সেনগুপ্ত (সর্বোত্তম)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার
সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৬৪
বিষয় – বিসর্জন
অন্য সে এক মৃন্ময়ী
জানো আমার বাপ কে? হিমালয়। হিমশীতল শুভ্র কিরীট শিরে ধারন করে এ জগত মাঝারে মানে যশে শীর্ষে রখেছে তাঁর মস্তক। সেই হিমালয় কন্যা আমি, নিশ্চল একতাল কঠিন উপলখন্ড হয়ে গঙ্গা সঙ্গমে থিতু হয়ে ছিলাম বেশ কিছুকাল। উত্তুরে সমীরণ তখন শরীরময় বয়ে যেতে যেতে শিহরীত করতো আমায়। কানে কানে বলতো…..” তুই ও বয়ে চল নদীর ধারায়, জীবন পাবি জীবন!” আমার তখন সবে কৈশোরের ভরা উন্মাদনা, অজানাকে জানার প্রবল বাসনা মনে আনাগোনা করছে। নিষিদ্ধের হাতছানিতে আর যৌবন খুঁজে পাবার কুমন্ত্রণায় সাময়িক পদস্খলন মাত্র। ভাসিয়ে দিলাম নিজ অবয়ব । বয়ে চলেছি কেবল চলেছি, কত কাটা-ছেঁড়া,সংঘর্ষ, আঘাত, ক্ষয় । দ্রুততম থেকে ক্রমে কমে বিলম্বিত হল লয়। সমতল হল তল। আমি তবু বয়ে চলেছি এ চর থেকে সে চর, এমাথা থেকে ওমাথা, এঘাট বেঁকে সেঘাট, বয়ে চলেছি জীবন পাবার আশায়, জীবন! তারপর থিতু হলাম যেথায়, সে এক বিরাট ঘাট। বারবনিতাদের নিত্য চলা-ফেলা সেখানে। কুমোর এসে নদীর বুক কাচিয়ে তুলে আনলো আমায়। আমি ততক্ষণে একতাল কাদা। শুনেছিলাম আমায় নিয়ে মূর্তি গড়বেন তাঁরা। আমার মনে তখন চুপিচুপি জীবনকে খুঁজে পাওয়ার উল্লাস, প্রতিমা হয়ে ওঠার দর্পে নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিভূ ভাবতে বসেছি। তারপর কোন এক শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় আমি কেমন খড়ের তৈরি কাঠামোর গায়ে লেগে প্রতিমা হয়ে গড়ে ওঠার বাসনায় আত্মহারা। এমন সময় কোন এক উজ্জ্বল আলোক ছটার মাঝে কে যেন এসে দাঁড়ালেন সামলে। তিনি পুরুষ কি নারী তা আমার জানা নেই , কী আশ্চর্য তাঁর মোহময় রূপ, কী প্রগাঢ় তাঁর আত্মবিশ্বাস! মিটিমিটি হাসছিলেন আমার চোখের দিকে চেয়ে। আমি বললাম….”কে গো তুমি?”
তিনি বললেন….”অন্তর্যামী। বল্ কি চাস?”
আমি বললাম….”কিচ্ছুটি না, নতুন জীবন পেয়েছি আমি দেখ! আমি এখন ভগবানের প্রতিরূপ। কত বিলাশ বৈভব, কত সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত, খ্যাতির জৌলুস পড়ে রয়েছে আমার সামনে, আর কী চাইবো?”
তিনি হেসে বললেন…”আচ্ছা বেশ।”
এরই মাঝে কোন ঘরের এক নবীন যুবক কুমোরের ঘরে এসে বায়না দিয়ে গেলে। তারপর একদিন দিনক্ষণ দেখে বেনারসি শাড়ি, সোনার অলঙ্কার দিয়ে সাজিয়ে বরণ করে নিয়ে গেল আমায় তার ঘরে রাখবে বলে। কত আলোক রোশনাই, দীপ ধূপ, উলুধ্বনি, শঙ্খ বাঁধন, হাসি আনন্দ, খাওয়া দাওয়া আমায় ঘিরে। কেউ বলে, ভারি মিষ্টি দুগ্গা প্রতিমা, কেউ বলে কেমন টানা চোখ। আমি চুপিসারে খুশিতে আত্মহারা। এমন সময় যুবকের ঘরের মানুষেরা নাক শিটকোলে……” এ কেমন মূর্তি আনলি খোকা? এ মূর্তি তো খুঁতে ভরা! কেমন করে চেয়ে থাকে, কেমনতর হাসি, ঘর যেন আলো হয়না। এত্তো টাকা খরচ করলি, বেবাক ঠকিয়েছে। আমার ঘরে এ মানায় না।ছ্যাঃ!”
খোকার মুখে আঁধার ঘনালো সেদিন। ঘরে এসে দেখলে আমায় চেয়ে, বললে…..” এমন অদ্ভুত কেন তুমি? দেখে এলাম অমুকের ঘরে দুগ্গারা দুধ খায়, চোখ নাড়ে।”
আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। পরদিন শুনতে পেলাম….”খোকা এ মূর্তি অলুক্ষুণে। দূর করে দে ঘর থেকে। বারবনিতার ঘাট থেকে তোলা মাটিতে বাস আসে বড়।”
খোকা আবার ঘরে এলে। কড়া সুরে বললে….” ঘরে সবাই ঠিকই বলে, একেবারে ঠকে গেলাম আমি। তোমার গায়ে পাঁকের গন্ধে গা গুলায় আমার। না জানি কতকাল নষ্ট মেয়েদের ঘাটে তুমি ছিলে পড়ে। ভুল করেছি বড় ভুল।”
আমি বললাম……”লুকাইনি তো কিছু। যেমন ছিলাম, সবটা তোমার জানা।”
__”জানা? জানা মানে বয়ে বেড়াবো বারোমাস?”
স্তম্ভিত হলাম আমি। মনের অগোচরে কোথায় যেন লুকানো এক টুকরো প্রাণে মোচড় খেলাম যেন। বলতে চেয়েছিলাম …..”ভালোবাসি তোমায়”, কিন্তু তার মন যে কালা, শোনেনা কিছুই। ভারি তো কাদার মূর্তি, তার আবার মান, তার আবার কষ্ট। আমদানি নেই কানাকড়ি, খরচ বাড়ানোর কল যেন, সে নাকি দেবতা। এমন চললে বিদেয় হও বাপু, আসন খালি থাকবে না। খোকার আক্ষেপ দেখে কাদার মূর্তির কলজেটা কেঁদে ওঠে। আমার তবে কানাকড়িও মূল্য নেই এই সংসারে? তবে আনলে কেন ডেকে? সাজালে কেন এতো উপঢৌকন দিয়ে? খোকা পরিহাস করে বলে…..” ওরে পাষাণী, ও সব নকল। আসল কিছুই দেইনি তোর কোলে। “
মূর্তি চুপ রইলে, ঘরের কথা বলতে নেই সবাইকে। খোকাবাবুর আক্ষেপ বেড়েই চলল প্রতিক্ষণে। একদিন আত্মীয় কুটুম্বদের ডেকে আনলে, আনলে প্রতিবেশী ও। হাটের মাঝে পাড়তে লাগলে মনের সব না পাওয়ার আকুতি। ….” এ মূর্তি বড় বেমানান আমার ঘরে। চুপটি করে বসে থাকে, ওদিকে মনে হাজার প্যাঁচ। হায় ভাগ্য! ঘরে অলক্ষীর বাস ওর কারণেই। “
আমি দুইপা পিছিয়ে লুকিয়ে ফেলি নিজেকে। এ কেমন জীবন, যেখানে নিজের কানাকড়ি মান-ইজ্জতের মূল্য নেই। নিজের আত্মসম্মান বোধ বড় কষাঘাত করে মনকে। তবু দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করার চেষ্টা, কারণ কথায় আছে….” যে সয়, সে রয়।” অর্থাৎ যে কোন রকমে সংসারে রয়ে যাওয়াই বা টিকে থাকাই তো শেষ কথা। তাতেই মোক্ষ লাভ। এমন করেই মনটাকে বুঝিয়ে তুললাম। অন্তর্যামী আবার উদয় হলেন সামনে। ….” কি চাস তুই?”
আমি হেসে বলি….”জীবন তো হয়নি শেষ! কত ভক্তরা অপলক তাকিয়ে ছিলো সেদিন , কত মানুষ আমার পায়ে পড়েছিলো লুটিয়ে , আদর করে তাকিয়ে ছিলো চোখের পানে। তবে? তারা কেউ তো পাশে থাকবে চিরতরে, কেউ তো বাসবে ভালো। কেন তবে এতো হাহাকার করি?”
আমার কথা শুনে সে হাসলে আবারও। বললে….” আচ্ছা বেশ।”
আমি তখন ভক্তদের মাঝে গিয়ে পথ আগলে দাঁড়ালাম। বললাম….”এসেছি তোমাদের মাঝে । দেবে এতোটুকু ঠাঁই ?”
ভক্তরা জোড়হাতে বললে….” তুমি মন্দ নয় মোটে তবে তোমায় রাখতে পারি তেমন অবসর কই? হাজারো কাজের কাজি আমি। বিশ্বে যাকিছু অভাব মিটাই , তোমার জন্য সময় তাতে নেই।”
আমি তাদের হাতটা চেপে ধরে বললাম….” আমি পুজো চাইনে, অধিকারও চাইনে। কেবল থাকতে দিও পাশে।”
তারা মুখ ঘোরালে….” কর কি? গায়ে কাদা তোমার, বাস ছাড়ে বড়। সময় নেই আমার। আসছে বছর নতুন করে মূর্তি গড়বো। ঠাকুরকে হতে হবে রোজ নতুন। পুরানো ঠাকুর একঘেয়েমিতে ভরা। চলে যাও, এখন দিওনা তাড়া।”
আমি তখন কুমোর ঘরে গেলাম। ….”তুমি আমায় নতুন জীবন দিয়েছিলে বাবা, তবে তুমি আমার দ্বিতীয় বাপ। বাপের ঘরে মেয়ের ঠাঁই হবেনা? আমি নাহয় থাকবো পড়ে এই উঠোনে, পুজো দিয়ো না, ছুঁয়ে দেখো না, পড়ে থাকবো। একটি বারও বাপ বলে ডাকবো না তোমায়।”
কুমোর বললে….”ওরে মা, তখন ছিলি একতাল কাদা, আজ প্রতিমা তুই। আমার উঠোনে রাখবো, তত জায়গা কই?”
চোখ বুজে ভাবি….হায় ঈশ্বর! এই জগতে সবই যে বড় ফাঁপা, মিথ্যেয় ভরা। আবেগটাই শুধু বেইমানী করে। এই চরাচরে কেউ কারো নয়, ভগবানকেও ডাকা প্রয়োজনেই। প্রেম তো দূরস্ত , ঘৃণাও এখানে মাপা । কানে এলো একটা কথা।….”আর চাস কিছু?”
আমি চোখ খুলে লুটিয়ে পড়লাম অন্তর্যামীর পায়ে….” এখন আমায় তুমি মুক্তি দাও প্রভু। এই ঘৃণা, অবজ্ঞা, মানহানি, দুর্বিষহ লাগে। এমন জীবন চাইনা আমার। আমায় তুমি পাথর করে দাও প্রভু। সেই আগের মত, হাসতে চাইনে আমি। তবু কান্না তো থাকবে না, হাহাকার তো জাগবে না প্রাণে। ভালোবাসার উত্তরে অবজ্ঞার অপমান তো থাকবে না। ফিরিয়ে দাও আমায় আগের জীবন, পাথর করে দাও কঠিন পাথর। আর কখনো যেন মাটি করনা আমায়।”
মঙ্গলময় দুই হাত তুলে বললেন….”তথাস্তু”।
সকলে মিলে ঘাটে ফিরিয়ে এনে ঢাক ঢোল বাজিয়ে দিলে আমায় বিসর্জন। আমি এখন জলের তলায় রয়েছি অপেক্ষারত….পাথরে রূপান্তরিত হওয়ার প্রত্যাশায়।